ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

মজা.কম

পাত্রী দেখা

তারেকুর রহমান

০৫ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৫


প্রিন্ট
পাত্রী দেখা

পাত্রী দেখা

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মতি ভাই যেক’টা চুল আছে সেগুলো টেনেটুনে টাক ঢাকার অপচেষ্টা করে গেল। আজ মতি ভাই বিয়ের পাত্রী দেখতে যাবে। এ নিয়ে আয়োজনও কম ছিল না। নিউ মার্কেট থেকে নতুন জুতা কিনে আনলেন। খুব সুন্দর দেখে একটা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছে মতি ভাই। হঠাৎ মায়ের আগমন।


-মতি, তোর বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেখি বুদ্ধিও লোপ পাইছে।
-মা কী হইছে?
-যে পাঞ্জাবি গায়ে দিছোস এটা তোর আব্বার পাঞ্জাবি। বুড়া মানুষের পাঞ্জাবি দেখে বুঝোস না?
-ও আচ্ছা খেয়াল করিনি।
মা একটা পাঞ্জাবি বের করে দেন। সেটি পরেন মতি ভাই। সারা শরীরে ভালো করে সেন্ট মারল। সেন্টের দাগ লেগে গেল জামায়। মা এসে দিলেন বকাÑ মতি, তুই এ কী করলি? সেন্ট মেরে জামার এ অবস্থা করলি কেন? 


-মা আমি বুঝতে পারিনি।
-ও, এটা বুঝতে পারো না আর বিয়ের জন্য লাফালাফি করো?
-আমার বয়স হইছে না?
-কে বলছে তোর বয়স হইছে? এখনো নিজের জামাটাও বের করে গায়ে দিতে শিখোছ নাই।
-কী কও, বয়স না হলে চুল উঠে গেছে কেন?
-সেটা অন্য কারণে। বেশি কথা বলিস না। এখন শুভ কাজে বের হচ্ছি।

পাত্রীর বাড়িতে ঢুকতেই ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল মতি ভাই। টেনে টাক ঢাকা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। মতি ভাই দ্রুত হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে লাগল। ঘরের ভিতর বসে আছে মতি ভাই। আজ মনটা বেশ খুশি। বিয়ে নিয়ে কত কিছু হলো, অথচ আজ সে স্বপ্ন পূরণের ধারপ্রান্তে মতি ভাই। ভেতর থেকে একজন এসে বললÑ আংকেল, পাত্র কি আসে নাই?


কথাটা শুনে বেশ বিব্রতবোধ করল মতি ভাই। তাকে আংকেল বলল এটা মেনে নেয়া যায় না। মতির মা বলে উঠলÑ বাবা, কিছু মনে করো না, এই হলো পাত্র।
ধপাস ধপাস আওয়াজে মতি ভাইয়ের ঘোর ভাঙল। ইয়া মোটা এক পাত্রী এসে মতি ভাইয়ের সামনে বসল। মেয়েটা খিলখিল করে হাসছে। হাসার সময় তার চোখগুলো দেখা যায় না। মতি ভাই মনে মনে ভাবল এটা কি মানুষ নাকি হাতি। মতি ভাইয়ের মা বলে উঠলেনÑ কি কিউট মেয়ে। আচ্ছা মা তুমি কী কী পারো? 
-আমি ঘুমাতে পারি। তিন বেলা বাইরে খেতে পারি।
-এটা তো অনেকেই পারে। তুমি কোন কাজ ভালো পারো?
- খেতে ভালো পারি।
মায়ের আর মেয়ের কথোপকথনে বেশ বিরক্ত মতি ভাই। মতি ভাই এবার প্রশ্ন করতে লাগলেনÑ দেখি একটু হাঁটো তো?
মেয়ে মতি ভাইয়ের কথা শুনে হাঁটতে লাগল। মেয়ে হাঁটলে পুরো ঘর কাঁপে।
-আমাকে তোমার পছন্দ হইছে?
-জি, পছন্দ হইছে।


-আমার কী ভালো লেগেছে?
-আপনার টাকটা ভালো লেগেছে।
-মানে?
-মানে হইলো, আপনার টাকে সস রেখে আমি চিকেন ফ্রাই খামু।
মতি ভাই জানে মেয়েটা ফাজলামি করছে। তার মানে কি আমাকে তার পছন্দ হয়নি? ঘরের ভিতর থেকে অনেকেই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ফিসফিস করে কী যেন বলছে। একজন এসে বললÑ পাত্রের সাথে মেয়ের খালা কথা বলতে চায়।


মতির মা বললÑ কোনো সমস্যা নাই। 
মেয়ের খালা এসে মতির সামনে বসল। মতি তাকে দেখে মনে হয় ইলেকট্রিক শক খেলো। এতো সেই মহিলা যার সাথে আজ থেকে ১০ বছর আগে মাস্টার্স পড়ার সময় প্রেম করেছে। মহিলা মতি ভাইকে জিজ্ঞেস করলÑ মতি তুই এখনো বিয়ে করোস নাই!
-না, করি নাই।


-এই বুড়া বয়সে তুই আমার কিউট ভাগ্নিরে বিয়ে করতে আসলি?
-বুড়া মানে? 
-বুড়া মানে বুড়া। ১০ বছর আগে আমরা একত্রে মাস্টার্স পড়েছি। এখনো তুই বুড়া মনে করোস না।
- না করি না।


-ফাজলামি পাইছোস? তোর কাছে আমার ভাগ্নিরে বিয়ে দিয়ে তার লাইফ নষ্ট করতে দিমু না।
-আমি ওরেই বিয়ে করুম।
-কী কইছোস? এ কথা বলেই ঝাড়ু নিয়ে দৌড়াতে লাগল মতি ভাইকে। কোনোরকম জান বাঁচিয়ে মতি ভাই বাসায় উঠল।

সুখেরই লাগিয়া রে...

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় ত্রিশালের মোড় প্রায় জনশূন্য থাকে। গভীর রাতে চা স্টলগুলো বন্ধ হয়ে যায় বলে সকাল ১০টার আগে চা স্টলগুলো সাধারণত খোলে না। এমনি এক বন্ধ থাকা চা দোকানের টুলে বসে আছেন গোলাপ চাচা। আমাকে দেখে তিনি লুঙ্গির একটা অংশ দিয়ে চোখ মুছলেন। আমি বললাম, চাচা সাতসকালে আপনার চোখে পানি? কোনো সমস্যা চাচা? 
গোলাপ চাচা বললেন, ভাতিজা, আমার সুখগুলো কেন যেন হৃদয়ে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তা চোখের জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। 


আমি বললাম, চাচা, আপনার কথাটা বুঝতে পারলাম না। একটু যদি বুঝিয়ে বলতেন। 
চাচা বললেন, তবে শোন, সুখ জিনিসটা আমার কাছে ব্যাঙের মতো। ধরতে গেলে শুধুই লাফায়। আমি সুখের পেছনে যতই দৌড়াই সুখ আমায় দেখে ততই লাফ দেয়। ছোটবেলা, মানে একেবারে বাচ্চা বয়সে আমরা বিয়ে বিয়ে খেলতাম। এই বিয়ে বিয়ে খেলার মধ্যেও এক ধরনের সুখ ছিল। তো আমি সাজলাম বর অন্য এক মেয়ে সাজল কনে। দু’জনে মিলে কলাপাতা দিয়ে সুন্দর একটা ঘর বানালাম। মনে ভীষণ আনন্দ, কিন্তু কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে এক ষাঁড় তেড়ে আসল।

আমরা ভয়ে দৌড়ালাম। আর ষাঁড় আমাদের সুখের ঘর ভেঙে-খেয়ে চলে গেল। প্রথম সুখ যখন চলে গেল ষাঁড়ের নাড়ি-ভুঁড়ির মধ্যে তখনই বুঝতে পারলাম জীবনে সুখ হয়তো আর পাওয়া যাবে না। নবম শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন কাসের সবচেয়ে মেধাবী এবং সুন্দরী মেয়ের প্রেম সাগরে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম আর হাবুডুবু খেতে লাগলাম সেই অথৈ সাগরে, কিন্তু সুন্দরীকে পাওয়া তো হলোই না বরং তার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে এক দিন আছাড় খেয়ে আমার উপরের পাটির একটি দাঁত ভেঙে গেল। এতে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। কথা বলার সময় দাঁতের ফাঁকা অংশ দিয়ে বায়ুফুড়–ৎ করে বের হয়ে যায়। ফলে স্পষ্ট করে কথা বলতে পারি না।

তিন বার এসএসসি ফেল করার পর চতুর্থবার পাস করে কলেজে ভর্তি হলাম। ভাবলাম, এবার বুঝি সুখ পাওয়া যাবে। সেই আশায় একটা গিটারও কিনে ফেললাম। গিটার বাজাব আর মনের সুখে দরাজ গলায় গান ধরব বলে, কিন্তু কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি। কলেজের কাস, পড়া, প্রাইভেট ম্যানেজ করতে করতে আমার জীবন ছিঁড়ে তেনা তেনা।

কলেজে আমার সাথে পড়ত মর্জিনা। মধ্যম সাইজের সুন্দরী। অনেক ঘোরাঘুরির পর মর্জিনাকে লাইনে এনেছিলাম। একদিন মর্জিনা তার ছোট ভাই আফাজ উদ্দিন (যাকে সবাই আফা বলে ডাকে), আর বড় বোনের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। মর্জিনা আমার কানে কানে বলল, এই সুযোগে আপার সাথে আমাদের সম্পর্কের কথাটা বলো। আমি বললামÑ আপা, তোমার সাথে একটা কথা ছিল, কিন্তু বিধিবাম, আপা ছোট ভাইকে বলল, এই আফা তোর সাথে কী যেন বলতে চায়। আমি যতই বলি ‘আপা’। তারা শোনে ‘আফা’। আচ্ছা বলতো ভাতিজা, এখানে আমার দোষটা কোথায়? তোতলামির অভিযোগে মর্জিনা আমাকে বয়কট করল। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম অন্তরে।


চিন্তা করলামÑ না, আলগা গরু দিয়ে হাল চাষ করে সুখ পাওয়া যাবে না। তাই বিয়েই করে ফেলব বলে স্থির করলাম। ভাবলাম, নিজের ঘরের বউ তো। মাথাব্যথা হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। পা ব্যথা হলে পা টিপে দেবে, কিন্তু জানো তো সধহ ঢ়ৎড়ঢ়ড়ংবং মড়ড়ফ ফরংঢ়ড়ংবং। বিয়ের প্রথম বছর খুব সুখেই ছিলাম, কিন্তু এর পরই শুরু হলো কলের গান। মাথাব্যথা ভালো হওয়া তো দূরের কথা, ঘরে ঢুকলেই তার কথার ঠেলায় আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যেত। অবশেষে বউ ছেড়ে আবার কুমারজীবন শুরু করলাম। বড় ভাইয়ের ছেলে মানে ভাতিজাকে লালন-পালন করে বড় করলাম। একপর্যায়ে ভাতিজাকে বিয়ে করালাম। ভাবলাম এবার ভাতিজাকে বিয়ে করিয়ে সুখের দেখা পাব।

তবে না, সেটাও হলো না। ভাতিজাকে বিয়ে করিয়ে সুখ হলো না। ভাতিজা বউ পেয়ে, বউ নিয়ে শহরে পাড়ি জমাল। প্রতিমাসে আমার জন্য আলু পাঠাত আর চিঠিতে লিখতÑ চাচা, ভাতের বদলে আলু খান। ভাতের ওপর চাপ কমান। রাগে দুঃখে, এই বুড়ো বয়সে আবার বিয়ে করলাম। একটা ছেলেও হলো, কিন্তু অতীব দুঃখের কথা, ছেলে বলে, আমি নাকি তার দাদার বয়সী। আচ্ছা, ভাতিজা বলো তো, আমার কপালে কি সুখ নাই? 


আমি বললামÑ চাচা, ভাতিজাকে বিয়ে করিয়ে সুখ না পেলেও নিজের ছেলেকে বিয়ে করিয়ে সুখ পাবেন আশা করি। নিজের ছেলে বলে কথা। 


চাচা এবার রেগে গেলেন। বললেনÑ যে ছেলে আমাকে বাবা না ডেকে দাদা ডাকতে চায় সে ছেলে দিব জারি গায়া তারপর খাব সিন্নি। এত দিনে আমি মরে পাটখড়ি হয়ে যামু না!

 

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫