ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

গবেষণা

গর্ভাবস্থায় নারী দেহে পরিবর্তন

ডা: দিদারুল আহসান

০৫ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০৬:৪২


প্রিন্ট
গর্ভাবস্থায় নারী দেহে পরিবর্তন

গর্ভাবস্থায় নারী দেহে পরিবর্তন

গর্ভাবস্থায় নারী দেহে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। এ সময় পিটুইটারি থাইরয়েড ও অ্যাডরিনাল গ্রন্থির কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। ফলে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন ও স্টেরয়েড হরমোন তৈরি হয়। এর প্রভাবে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দেয়- 

রঙের পরিবর্তন 
- গর্ভবতী মায়ের স্তনের বোঁটা ও তার আশপাশের ত্বক কালচে রঙের হয়। 
- কিছুসংখ্যক ক্ষেত্রে বোগল ও উরুতেও এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। 
- ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে মুখে মেছতা হয়। 
- সন্তান প্রসবের কিছু দিনের মধ্যে স্তনের পরিবর্তিত রঙ আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।

চুলের পরিবর্তন 
অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভবতীর মুখে সামান্য পরিমাণ বা তার চেয়ে কিছু বেশি পরিমাণের অবাঞ্ছিত লোম গজাতে দেখা যায় যা সাধারণত প্রসবের পর কমে যায়। তবে জটিল গর্ভাবস্থায় সৃষ্টি হলে কিংবা অপারেশনের মাধ্যমে প্রসব করিয়ে থাকলে অস্বাভাবিক রকমের শারীরিক বা মানসিক চাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রসবের এক থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে প্রচুর পরিমাণ চুল পড়তে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে চুল পড়ে গেলেও আবার স্বাভাবিক অবস্থায় তা ফিরে আসে।

ত্বক ফেটে যাওয়া
গর্ভাবস্থায় ত্বকের ওপর চাপ পড়ে। পেট বড় হওয়ার কারণে ত্বক প্রসারিত হতে থাকে। একপর্যায়ে যখন আর প্রসারণ ঘটার ক্ষমতা থাকে না। তখন ত্বকে ফাটল ধরে। এই অবস্থাটাকে বলা হয় Striate Distensae ৯০ শতাংশ গর্ভবতীর ক্ষেত্রে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ত্বকে ফুসকুড়ি 
এ ক্ষেত্রে গর্ভবতীর পেটে লালচে দানা দেখা দেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গর্ভবতীর শেষ মাসে এটি হয়ে থাকে। এই দানাগুলো এক হয়ে মিশে গিয়ে পুরো স্থানেই একটা লালচে ভাব সৃষ্টি করে। এতে থাকে অস্বাভাবিক রকমের চুলকানি। এ অবস্থায় রাতে গর্ভবতী ঘুমাতে পারে না চুলকানির কারণে। কখনো কখনো চুলকানির ফলে রস বেরোতে থাকে। সাধারণভাবে এটি প্রসবের পরপরই ভালো হয়ে যায়। ত্বকের আরেকটি অবস্থার নাম প্রুরিগো গ্রাভিডেরাম। এটি লিবারের সমস্যার কারণে হয়ে থাকে।

এ ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় শেষের দিকে সারা শরীরে দারুণ চুলকানি শুরু হয় এবং সেই সাথে জণ্ডিস দেখা দেয়। প্রথম দিকে যে চুলকানি হয় তা শুধু রাতে হয়ে থাকে। প্রথমে শরীরের নির্দিষ্ট অংশে শুরু হলেও পরে সারা শরীরে তার বিস্তার ঘটে। এর সাথে বমি ভাব ও শারীরিক দুর্বলতা থাকে। সাধারণত সন্তান প্রসবের কিছু দিন পরপরই এটি ভালো হয়ে যায়। তবে ভবিষ্যতে আবার সন্তানসম্ভবা হলে তখনই একইভাবে একই উপসর্গ নিয়ে রোগটি দেখা দিতে পারে।

লেখক : চর্ম, অ্যালার্জি ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : আলরাজী হাসপাতাল, ১২ ফার্মগেট, ঢাকা। 
ফোন : ০১৮১৯২১৮৩৭৮

কয়েকটি মানসিক সমস্যা

ডা: জিনাত ডি লায়লা

হিস্টিরিয়া রোগটি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এটি একটি মানসিক রোগ। মানসিক দুশ্চিন্তা হিস্টিরিয়া রোগের অন্যতম কারণ। রোগী যখন তার দুশ্চিন্তার কথা মুখে প্রকাশ করতে পারে না তখন শারীরিক বা মানসিক উপসর্গের মাধ্যমে তা প্রকাশ করে দুশ্চিন্তা লাঘবের চেষ্টা করেন। সেই সাথে পরিবার ও সমাজের অন্যান্য ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এ ধরনের রোগীদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে আবেগপ্রবণতা বা আবেগের আধিক্য, পরনির্ভরশীলতা ও নাটকীয়তা লক্ষ করা যায়। রোগী হিস্টিরিয়ার উপসর্গ দুইভাবে প্রকাশ করতে পারে।

মানসিক উপসর্গ
• স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া
• অচেনা স্থানে চলে যাওয়া
• হারিয়ে যাওয়া
• ঘুমের মধ্যে হাঁটা ইত্যাদি
• রোগ শুরু হওয়ার আগে রোগীর মনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটে।

হিস্টিরিয়া যেকোনো ধরনের উপসর্গ নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখার মতো কথা হলো এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ভর করা হিস্টিরিয়া রোগের একটি ধরন। এ অবস্থাকেই অনেকে জিনের আছর বলে মনে করে থাকেন। আসলে তা ঠিক নয়। আক্রান্ত রোগী সাধারণত এলোমেলো বা উত্তেজিত আচরণ করে থাকে। বেশিরভাগ আক্রান্ত রোগীই নারী। কুসংস্কার ও অশিক্ষাবশত এগুলোকে ভূতে ধরা, পরীর আছর, দেবতার ভর করা, জিনে ধরা ইত্যাদি ভাবে আখ্যায়িত করা হয়। অস্থিরচিত্ত রোগীর বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন এদের নিয়ে ফকির, দরবেশ ও ওঝাদের কাছে যান। লাভ তো কিছুই হয় না, উল্টো রোগের জটিলতা বাড়তে থাকে। মনে রাখতে হবে এ রোগটি মানসিক রোগ এবং একমাত্র মনোরোগ চিকিৎসার মাধ্যমেই রোগীর আরোগ্য ফিরিয়ে আনা যায়।

এখন আসা যাক অবসাদের কথায়। অবসাদ হচ্ছে ক্লান্তিবোধ করা, উদ্যম শেষ হয়ে যাওয়া এবং নিঃশেষিত মনে করা। দৈনন্দিন কাজগুলো অবসাদের ফলে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপর্যাপ্ত বা অপ্রতুলতা অনুভব করা, কাজকর্মে অনীহা এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার অভাব হচ্ছে অবসাদের লক্ষণ। নারীদের মধ্যে অবসাদ বেশি লক্ষ করা যায়। মানসিক অবসাদের বহু কারণ রয়েছে। মানসিক ক্লান্তি বা অবসাদ আবেগগত ও শারীরিক উভয় কারণেই হতে পারে।

অবসাদের সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে-
বিষণ্নতা, উৎকণ্ঠা/উদ্বিগ্নতা, ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম, কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় বা সিদ্ধান্ত নেয়া, অবসর, মাথাব্যথা/মাইগ্রেন, রাসায়নিক প্রভাবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ক্র্যাশ ডায়েটিং এবং কম খাদ্য গ্রহণ, যার ফলে ভিটামিন ও খনিজ লবণের অভাব দেখা দেয়, পিএমএস, শিশুদের জন্মের পর এবং শিশু লালন-পালনের সময় প্রয়োজনীয় ঘুমের অভাব, রক্তশূন্যতা, লিউকেমিয়া, মাল্টিপল স্কেলেরোসিস, লুপাস সিনড্রোম, লো-থাইরয়েড, এইডস ইত্যাদি।

 

অবসাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রথম কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে যাতে বুঝতে সুবিধা হয়, কোন ব্যাপারটির চিকিৎসা করতে হবে। অবসাদ সংশ্লিষ্ট যেকোনো লক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞাত থাকতে হবে যাতে দৈহিক ও মানসিক উভয় কারণগুলো খুঁজে বের করা যায়। অবসাদ দেখা দিলে এবং তা যদি ছয় মাস স্থায়ী হয় তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া দরকার।

যেকোনো সমাজেই কোনো না কোনো পরিবারে মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু দেখা যায়। মানসিক প্রতিবন্ধী মানে শিশুর যে বয়সে যতটুকু বুদ্ধি থাকার কথা ছিল ঠিক ততটুকু থাকে না। বুদ্ধির পরিমাণ কতটুকু কম তার ওপর নির্ভর করে মৃদু, মাঝারি, গুরুতর মানসিক প্রতিবন্ধী বলা হয়। প্রতি বছর এক হাজার শিশুর মধ্যে তিনজন শিশু মানসিক প্রতিবন্ধী হয়। মানিসক প্রতিবন্ধী শিশু গরিব, ধনী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত যেকোনো পরিবারেই হতে পারে।

মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্মের পর থেকে বসতে শেখা, হামাগুড়ি দেয়া, হাঁটা, দাঁত ওঠা, কথা বলা ইত্যাদি কিছুটা দেরিতে হয়। একটু বয়সে তারা নিজেদের পোশাক-পরিচ্ছদ নিজেরা পরতে পারে না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে না, নিজে গোসল করতে পারে না। কোনটি আগুন, কোনটি পানি বোঝে না, রাস্তাঘাটে ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। একটু দূরে ছেড়ে দিলে বাড়ি ফিরে আসতে পারে না। মানসিক গঠন, মস্তিষ্কের গড়ন, মস্তিষ্কের ক্রিয়া ইত্যাদি ধীর গতিতে হয়। অন্য পাঁচটা শিশু থেকে মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের তাদের কথাবার্তা, চালচলন, চলাফেরা, শারীরিক গঠন ও ব্যবহার দ্বারা সহজেই পৃথক করা যায়।

 

মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের পিতা-মাতার জন্য একটা জিনিস জেনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীতে এর কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি যার দ্বারা এই প্রতিবন্ধী শিশুদের বুদ্ধি বাড়ানো যেতে পারে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর মানসিক ও শারীরিক উন্নতি ঘটানো সম্ভব। প্রতিবন্ধী শিশুর মা-বাবা জেনে নিন আপনার শিশু কোন কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে আর কোনটা পারে না। শিশুর মানসিক বৃদ্ধি কোন স্তর পর্যন্ত হয়েছে তা জেনে নিন। প্রতিবন্ধী শিশুর মানসিক স্তর জানার পর তার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো সবচেয়ে সহজ থেকে কঠিন এই মাত্রায় সাজিয়ে নিন। স্তর জানার পর তার প্রশিক্ষণ শুরু করুন। যেমন- কিভাবে গ্লাস বা মগ ধরতে হয়, শরীরে কিভাবে সাবান মাখতে হয় এবং কিভাবে শরীর পরিষ্কার করতে হয়, কিভাবে গা মুছতে হয়- এগুলো শিক্ষা দিন। প্রতিদিন একইভাবে কাজগুলো করিয়ে যান। শিশুর সাথে কাজগুলো মা-বাবাও করতে পারেন এবং খেলার ছলে করা যেতে পারে। ভালোভাবে কাজ শেষ করার পর শিশুকে তার পছন্দের জিনিস উপহার দিন, তার প্রশংসা করুন, তাকে উৎসাহ দিন।

লেখিকা : সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
চেম্বার : উত্তরা ল্যাবএইড, ইউনিট-২, সেক্টর-১৩, উত্তরা, ঢাকা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫