ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৯ অক্টোবর ২০১৭

প্রশাসন

পেনশনারদের ব্যাপারে দায়বদ্ধতা

কাজী আশরাফ আলী

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১৪:০৪


প্রিন্ট
পেনশনারদের ব্যাপারে দায়বদ্ধতা

পেনশনারদের ব্যাপারে দায়বদ্ধতা

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও সরকার সামাজিক সুরায় জনকল্যাণে বিভিন্ন নীতিমালা প্র্রণয়ন, সংস্কার ও পুনর্গঠনে বহুমুখী পদপে গ্রহণ করছে। পেনশনব্যবস্থায় পরিবর্তন, দুস্থ মহিলা ভাতা, বৈশাখী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ইত্যাদিতে আর্থিক সহায়তা চালু রেখেছে। পেনশনব্যবস্থায় সম্প্রসারণ, তহবিল গঠন ধারণায় সুদূরপ্রসারী পদপে প্রশংসা অর্জন করেছে। পেনশন শতভাগ বিক্রয় করাটা পেনশন ধারণার সাথে অমিল বিধায় সুরার ব্যবস্থা রয়েছে। সামাজিক কল্যাণের শতভাগ নিশ্চয়তায় বৈষম্য বিলোপ, আর্থিক সমতা বৃদ্ধি ও অর্থতুল্য সেবাসহ প্রবীণ-অবসরভোগী পেনশনারদের সামাজিক সুরায় প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বা¯Íবায়নের ল্েয ক্রমানুযায়ী কিছু দফায় বি¯Íারিত উপস্থাপিত হলো। 


জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা যাতে ২০০৯ সালের স্কেলের অনুরূপ স্কেলে প্রায় দ্বিগুণ আর্থিক সুবিধাসহ মাসিক বেতন এবং এককালীন ও প্রাপ্তব্য অর্থে অবসরকালে সচ্ছলতা মোকাবেলা করে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন সে ব্যবস্থা সরকার কর্তৃক কার্যকর করা হয়েছে, যা সত্যিই যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয়। উলেøখ্য, ২০০৯ ও এর আগের বেতন স্কেলগুলোতে বেতন ও ভাতাদি বর্তমান স্কেলের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম। যারা মাসিক পেনশন বা পারিবারিক পেনশন পেয়ে থাকেন, তাদের নিট পেনশন বর্তমান স্কেলে যারা অবসরে যাবেন তাদের তুলনায় অনেক কম।

বেতন স্কেল ২০০৯ ও তার পূর্বের স্কেলের অবসরভোগী পেনশনারদের পেনশন বৃদ্ধি ৬৫ বছর ঊর্র্ধ্বে বয়সীদের ৫০ শতাংশ ও নি¤েœ ৪০ শতাংশ অনুমোদিত। অথচ যারা চাকরিরত তাদের বেতন বেড়েছে দ্বিগুণ। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা পেনশনারদের জন্যও একই হারে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সব পেনশনারের নিট পেনশন শতভাগ বাড়ালে এবং ইনক্রিমেন্ট পাঁচ শতাংশের ঊর্র্ধ্বে হলে সাকুল্যে নিট পেনশন ও পারিবারিক পেনশনধারীরা বাজার মূল্যের সাথে কিছুটা হলেও আর্থিক সঙ্গতি রা করে সম্মানজনকভাবে চলতে পারতেন। পেনশন যারা শতভাগ সমর্পণ করেছেন একইভাবে বাড়ালে শুধু দু’টি উৎসব বোনাস পেতেন, যা তাদের উৎসব খরচ জোগানে সহায়ক হতো। বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। 


পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলের আওতায় ১৯৭৯ সালের চাকরিবিধি অনুযায়ী যারা চাকরি শেষে অবসরে যায়, তাদের অনেকেই বাধ্যবাধকতা না থাকায় শতভাগ পেনশন সমর্পণ করে পারিবারিক খরচ জোগাতে অসমর্থ হওয়ায় অর্থাভাবে, কায়কেশে জীবনযাপন করছেন। ২০১৫ সালের বেতন স্কেল পূূর্বের বেতন স্কেলের দ্বিগুণ এবং পেনশনের হার ও প্রাপ্যতা আহরিত বেতনের পূর্বের ৮০ শতাংশের স্থলে বর্তমানে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ েেত্র হিসাবায়নেও পার্থক্য রয়েছে। শতভাগ পেনশন সমর্পিত ৭০ ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের পেনশন ব্যবস্থায় পুনঃপ্রতিস্থাপনের (পুনরায় ফিরিয়ে আনা) বিষয়টি সরকারের সদয় বিবেচনাধীন আছে এমনটি জানা যায়।

এ েেত্র বয়সসীমা ৬৫ বছর ও ঊর্ধ্বে উন্মুক্ত রাখলে অনেকেই উপকৃত হবেন। প্রত্যাশিতভাবে জীবদ্দশায় সরকার প্রদত্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। উলেøখ করা প্রয়োজন, ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীর মানবিক দৃষ্টির জন্য শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা নববর্ষভাতা পেয়েছেন এবং সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৩ আগস্ট ২০১৭-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী বা বিপত্মীক স্বামী ও প্রতিবন্ধী সন্তানের মাসিক চিকিৎসাভাতা ও দু’টি উৎসবভাতা প্রাপ্যতায় প্রজ্ঞাপন জারি সামাজিক কল্যাণের বা সুরার েেত্র বিশেষভাবে উলেøখযোগ্য ও প্রশংসার দাবি রাখে। 


বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতার নীতিমালায় ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রীয় সুবিধায় তহবিল ব্যয় করে। অনেক ব্যাংক জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে, শিা স্বাস্থ্য খাতে অবদান রাখছে। প্রবীণ-পেনশনভোগীদের পরিবারের কল্যাণে অনুরূপ তহবিল সৃষ্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যাতে তাদের তাৎণিক প্রয়োজনে যেমনÑ নিজ ও সন্তানের শিা-স্বাস্থ্য, কন্যা সন্তানের বিয়ে, বন্যা-দুর্যোগে গৃহ নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সেবা দিতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ম্যান্ডেট অনুযায়ী ইএফটির মাধ্যমে গ্রাহকের শাখায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা প্রেরণ করছে।

গ্রাহকেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সেবার জন্য সুবিধা ভোগ করে প্রশংসা করছে। তবে সঞ্চয়পত্রের ওপর উৎসে কর কর্তনের প্রত্যয়নপত্রের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে যেতে হয় ও আবেদন করতে হয়, যা প্রবীণ অবসরভোগীদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকের ম্যান্ডেটকৃত ব্যাংক শাখায় বার্ষিক কর প্রত্যয়নপত্র প্রেরণ বা গ্রাহকের শাখায় কর কর্তনকৃত টাকার জন্য প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে সেবা সম্প্রসারণ করতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জামানত বা বন্ধক ছাড়া ঋণ দেয় না। ব্যাংকঋণ মঞ্জুরির জন্য গ্রহণযোগ্য জামানত প্রয়োজন হয়। সঞ্চয়পত্র লিয়েন বন্ধ রয়েছে। তবে শুধু অবসরভোগী বা পেনশনার যাদের সঞ্চয়পত্রের আয়ে সংসার চলে তাদের েেত্র স্বল্প পরিসরে প্রাপ্তব্য মাসিক মুনাফা থেকে সমন্বয় বা পরিশোধযোগ্য বিবেচনায় এনে লিয়েন সুবিধা দিয়ে তাৎণিক প্রয়োজনে ভ‚মিকা রাখতে পারে। যেমনÑ শিা, স্বাস্থ্য, গৃহনির্মাণ, দুর্যোগ মোকাবেলায় ঋণ সম্প্রসারণ বা মঞ্জুর করার বিষয়টি মানবিক বিবেচনার দাবি রাখে। 


চিকিৎসা ভাতা চাকরিরতদের মতো মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা হারে অবসরভোগীদের জন্যও নির্ধারিত। ৬৫ বছর ঊর্র্ধ্বে হলে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা ভাতা গ্রেড নির্বিশেষে অবসরভোগী পেনশনার, আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগী ও শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের েেত্রও প্রযোজ্য হচ্ছে। পূর্বে চাকরিকাল ৫৭ বছর যা বর্তমানে অবসর বয়স ৫৯ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ বয়সে রোগবালাই কমবেশি সবই ভোগে। আর পরিবারের কথা আমলে না নিলে ও চিকিৎসাভাতা ব্যয়বহুল বিবেচনায় আনলে ভাতা পুনর্বিন্যাস করে নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। চাকরিকালে এক হাজার ৫০০ টাকা, চাকরি শেষে অবসরে ৬৪ বছর পর্যন্ত তিন হাজার টাকা এবং ৬৪ বছর ঊর্র্ধ্বে চার হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা দেয়া দরকার। আর্থিক সমতা না থাকলে তারা চিকিৎসাসেবা কিভাবে নেবেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে তাই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া দরকার।

তাৎণিকভাবে জটিল চিকিৎসার প্রয়োজনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ তহবিল থেকে এককালীন সাহায্যসেবার বিষয়টিও বিবেচনায় আনার জন্য নির্দেশিত হতে পারে। অর্থ ব্যয় ছাড়া প্রশাসনিকভাবে প্রবীণদের জন্য সেবার পরিধি বাড়ানো যায়। রেল, স্টিমার, বাসগুলোতে টিকিটের প্রাপ্তি সহজীকরণের জন্য পৃথক কাউন্টারের কার্যকর ব্যবস্থা ও মানবিক মনোযোগ প্রবীণদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো থেকে রেহাই দেবে। হাসপাতালগুলোতে পৃথক সিটের ব্যবস্থা হলে চিকিৎসাসেবা পেতে সহজ হবে। 


অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সময়ে সময়ে জারি করা আর্থিক সুবিধাবিষয়ক প্রজ্ঞাপনগুলো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে তাৎণিক প্রজ্ঞাপিত হয় না এবং যথাযথ ব্যাখ্যা সংবলিত হয় না বিধায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হয়। উলেøখ্য, গত ৩ আগস্ট ২০১৭ সালে ১৯ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী বা বিপতœীক স্বামী ও প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতা ১ ফেব্রæয়ারি ২০১৬ সাল থেকে প্রদেয় হলেও জানা যায়, ওই আর্থিক সুবিধা ছাড়করণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাৎণিক যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।


অবসরভোগীদের সংখ্যা বাড়ছে। বয়স ও দায়িত্ব বিবেচনায় তারা সংগঠিত নয়। অবসরভোগী পেনশনাররা সমাজের অংশ। সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত তাদের আশান্বিত করে এবং তাদের নির্ভরতা শুধু সরকারের প্র্রতি কেন্দ্রীভ‚ত। সরকারের সংশিøষ্ট বিভাগ বা প্র্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সময়ে সময়ে অবসরভোগীদের বা পেনশনারদের শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের ও সিপিএফে চাকরি নিয়ন্ত্রিতদের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ, বৈষম্য দূরীকরণ ও আলোচ্য বিষয়ে সামাজিক সুরায় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অবসরে যারা আছেন, আগামীতে যারা অবসরে যাবেন তারা উপকৃত হবেনÑ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নিজ মর্যাদায় থাকবেন এ প্র্রত্যাশা সবার। 
লেখক : নির্বাহী কর্মকর্তা (অব:), রূপালী ব্যাংক লিমিটেড

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫