নাফের দুই পারের মানবতা
নাফের দুই পারের মানবতা

নাফের দুই পারের মানবতা

জসিম উদ্দিন

প্রহসনের চূড়ান্ত প্রদর্শনী চলছে যেন মিয়ানমারে। সেনাবাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে আবার ত্রাণও দিচ্ছে! এক সপ্তাহ আগে রোহিঙ্গাদের জড়ো করা হয় মংডুতে। বলা হলো, তাদের ত্রাণ দেয়া হবে। এক বিস্ময়কর ব্যাপার, যাদের হত্যা খুন করে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের আবার ত্রাণ দেয়া হবে। এ ধরনের ত্রাণ কার্যক্রমে উপস্থিত থাকা নিগৃহীতরা এখন সীমানা পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। তারা জানাচ্ছেন সেনাবাহিনীর সেই প্রতরাণামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে। তারা জানান, ঘটনার দিন তাদের লাইনে দাঁড় করান হয়। একটি গেঞ্জি, তিন কেজি চাল ও আধা কেজি ডাল তাদের দেয়া হয়। ত্রাণবিতরণ কার্যক্রমের ছবি ধারণ করা হয়। ছবি ধারণ শেষ হলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ত্রাণ আবার কেড়ে নেয়া হয়। টাইম ম্যাগাজিনের কাভার পেজে এক ছবিতে দেখা যাচ্ছে নদী পাড়ি দিয়ে এক মুমূর্ষু বৃদ্ধাকে বাংলাদেশে টেনে নিয়ে আসছেন অন্য একজন। তিনি নিজেও একেবারে ক্লান্ত শ্রান্ত চলৎশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। ওই বৃদ্ধাকে টেনে আনতে তার সর্বশেষ শক্তিটুকু ব্যবহার করছেন। দুইজনের দৃষ্টিতে সাহায্যের করুণ আকুতি। টাইম লিখেছে ‘সেইম ফর মিয়ানমার।’ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে লজ্জার সেই সাধ্য নেই!

সাম্প্রদায়িক স্পর্শকাতরতাকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নয়া দিগন্ত খবর দিয়েছে রোহিঙ্গা হিন্দুদের ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন আলেম ওলামারা। সামাজিক সংগঠন সূর্যোদয় সঙ্ঘের মাধ্যমে স্থানীয় আলেমরা তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করছেন। পাঁচ শতাধিক হিন্দু শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। মিয়ানমার থেকে আসা হিন্দুদের অনেক জায়গায় যতেœর সাথে আলাদা করে নেয়া হয়েছে। তাদের রাখা হয়েছে বিশেষ তত্ত্বাবধানে। তাদের কাছে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠন। তাদের সাথে সাথে মুসলিমেরাও তাদের ত্রাণ বিতরণ করছে। অথচ মিয়ানমার সরকার হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ককে প্রচারণার অস্ত্র বানাতে চাইছে। তারা দেখাতে চাইছে হিন্দুদের হত্যা করছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রাখাইনের মংগডু শহরে তারা তিনটি গণকবরের সন্ধান পেয়েছে। যেখানে ৪৫টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। সেনাবাহিনী তাদের ফেসবুকে গণকবরের ছবি দিয়ে দাবি করেছে লাশগুলো রাখাইনের হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং তাদের হত্যা করেছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। বেসামরিক রোহিঙ্গাদের সামরিক কায়দায় আক্রমণ চালিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তাদের হত্যা, ধর্ষণ করে বাড়িঘর নির্বিচারে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এই ধরনের আক্রমণের মধ্য থেকে মুসলিমরা কিভাবে অন্যদের গণকবর রচনা করছে। এ ব্যাপারে তারা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি যে গণকবরে থাকা লাশগুলো হিন্দুদের। অন্য দিকে এদের হত্যা করেছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা, সেটাও তারা দেখাতে পারেনি। এই ধরনের প্রচারণা দিয়ে তারা ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে রাখাইন থেকে উৎখাত করতে চায়। প্রত্যেকটি উৎখাত অভিযানের আগে এমন একটি ঘটনা ঘটছে যাকে সামনে রেখে তারা সব জায়েজ করতে চাইছে। ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা শুরুর আগে পুলিশ চেকপোস্ট ও সেনাচৌকিতে হামলা হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী একে যুক্তি হিসেবে দেখাচ্ছে লাখ লাখ মানুষকে উৎখাত করার জন্য। এর আগে গত বছর যখন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলো তখনো একই ধরনের হামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এবারের অভিযানটি তাদের সবচেয়ে বড় সফলতা এনে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ঘরবসতি ও ভিটেমাটি দখল করে নিজেদের মতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানোর উদ্যোগ নিচ্ছে তারা! মিয়ানমারের সামাজিক উন্নয়ন, ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়কমন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ে বুধবার এক বৈঠকে জানান, রাখাইনে পুড়ে ফাঁকা হয়ে যাওয়া ভূমি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হবে। রোহিঙ্গা বিতাড়নের যে গতি-প্রকৃতি তাতে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় যে, উচ্ছেদ করার লক্ষ্য তাদের ভিটেমাটি দখল করে নেয়া। মন্ত্রী বলছেন, এখন পোড়ামাটিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা হবে। এই মন্ত্রী আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান। আনান কমিশনের প্রতিবেদনকে প্রকৃতপক্ষে একটি প্রহসন বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত মিয়ানমার সরকার। যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে তার নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি এখন তাদের ভিটেমাটি নিচ্ছেন নিজের নিয়ন্ত্রণে। আগুনে পুড়ে যাওয়া রোহিঙ্গা বসতিতে এখন তার নেতৃত্বে নতুন কার্যক্রম চলবে। ধারণা করা যায় ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের’ নামে গ্রামগুলোর চিত্র পুরো বদলে দেয়া হবে।

রোহিঙ্গাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া রোধ করাই হবে এই ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে’র প্রধান টার্গেট। গ্রামগুলোকে এমনভাবে বদলে দেয়া হবে রাস্তাঘাট হয়তো থাকবে আগের মতো কিন্তু পাড়া-মহল্লার চিহ্নকে চিরতরে মুছে দেয়া হবে। ফলে এর অধিবাসীরা নিজেদের বসবাসের জনপদটিকে শণাক্ত করতে পারবে না। তাদের যদি ফিরিয়ে আনাও হয়, খুঁজে পাবে না তাদের মাতৃভূমিকে। পিতৃপুরুষের বসতিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাকে মুছে ফেলার প্রকল্প হাতে নিয়েছেন আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নকারী কমিটির প্রধান উইন মিয়াত আয়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হম্বিতম্বি মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো গুরুত্ব রাখে না এই প্রকল্প তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধরা প্রপাগান্ডা ছড়ানোর কাজে সেনাবাহিনীর চেয়ে পিছিয়ে নেই। এই কাজে শ্রীলঙ্কায় তারা সফল হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় আশ্রয় নেয়া একদল রোহিঙ্গার ওপর হামলা চালিয়েছে উগ্র বৌদ্ধরা। জাতিসঙ্ঘ শরণার্থী সংস্থার আশ্রয়কেন্দ্রে এই হামলা চালায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জোট বোদু বালা সেন (বিবিএস)। ভিক্ষুরা আশ্রয়কেন্দ্রের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। চলমান রোহিঙ্গা বিতাড়নের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দেশটিতে বিক্ষোভ করে। তারা নির্যাতিত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধদের মতোই মনোভাব পোষণ করে। এর পরপরই শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভা জরুরি বৈঠক করে দেশটিতে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। অন্য দিকে ভারত রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেয়ার জন্য বৌদ্ধদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলছে। তারা বলছে রোহিঙ্গারা সে দেশে থাকলে বৌদ্ধদের ওপর হামলা হতে পারে। সে দেশে থাকা ৪০ হাজার রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে বৌদ্ধদের ওপর হামলার একটি রেকর্ডও নেই। এ কাজে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বলে প্রতীয়মান হয়।

রোহিঙ্গা মুসলিম এবং বাংলাদেশীরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের যেই অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছেন সেখানকার বড় একটি অংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা বৌদ্ধদের ওপর হিংসাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন এমন উদাহরণ নেই। উখিয়া টেকনাফের মানুষের চেহারায় মঙ্গলয়েডদের সাথে বাঙালি রক্তের সংমিশ্রণ বোঝা যায়। বাংলাদেশে যেমন মুসলিমদের প্রাধান্য মিয়ানমারের রাখাইনে গিয়ে চেহারা আরো কিছুটা বেশি মঙ্গলয়েড হয়ে সেখানে বৌদ্ধদের প্রাধান্য হয়েছে। মিয়ানমারে মুসলিম নির্যাতন বাংলাদেশ অংশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জীবন ও সম্পত্তির ওপর কোনো ধরনের প্রভাব ফেলেনি। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে বৌদ্ধদের আক্রমণে ক্ষুদ্র একটি জাতিগোষ্ঠী যখন নিঃশেষ হতে চলেছে তখন বিশ্ব বৌদ্ধ পরিষদের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রতিবাদ দেখা যায়নি।

রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন দেশের বন্ধুত্বের মাত্রাটিও এই দুর্যোগে পরীক্ষিত হচ্ছে। তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী নুমান কার্তামালা বিশেষ বিমানে করে সম্প্রতি ঢাকা পৌঁছেন। একই দিন বিমানে কক্সবাজার যান সেখান থেকে সড়কপথে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যা বন্ধে এবং মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন নিয়ে তুরস্কের তৎপরতা লক্ষণীয়। উপপ্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে উদ্যোগ নেবে তুরস্ক। একই সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কটে বাংলাদেশের পাশে তুরস্ক সবসময় থাকবে।’ তার এই বক্তব্য ও তুরস্কের কার্যক্রমের মধ্যে মিল রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতারণাপূর্ণ রাজনীতির এই মওসুমে বাংলাদেশের ঠিক এমন বন্ধু প্রয়োজন। বিশ্বের প্রায় সব দেশকেই রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে সমব্যথী হতে দেখা গেছে। শরণার্থীদের সেবা দেয়ায় সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করছে। অন্য দিকে সমস্যার যেখানে উৎপত্তি অর্থাৎ মিয়নামারের বিরুদ্ধে ঠিক সেভাবে সোচ্চার তারা হচ্ছে না। এই ধরনের বাগাড়ম্বরকে এক ধরনের প্রবঞ্চনা ও প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না।

বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের দেখতে দুর্গম উখিয়ায় সবার আগে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাদের ফার্স্ট লেডি ভ্রমণ করেন। তার পরে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দুর্গতদের দেখতে যান। নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি তুরস্কের তৎপরতা যে প্রবঞ্চনা নয় ইতোমধ্যে তা প্রমাণিত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা এক লাখ রোহিঙ্গার আবাসনের ব্যবস্থা তারা করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশেরে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত অনেক বড় বড় দেশ রয়েছে। এসব বড় দেশ রোহিঙ্গা সঙ্কটে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে এলে বহু আগে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। প্রবাদটিতো রয়েছে, ‘বিপদে বন্ধুর পরিচয়।’ বিপদে কিন্তু সেভাবে বড় বন্ধুদের সাড়া পাওয়া গেল না। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কেউ কেউ এ উপলক্ষে উল্টো তুরস্কের সমালোচনা করতে চাইলেন। এরদোগানকে ‘তুর্কির নতুন সুলতান’ বলে কলাম লিখে গালমন্দ করার অপচেষ্টাও দেখা গেছে এরমধ্যে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বিশাল একটা অংশ ‘পূর্ব সংস্কার’ আক্রান্ত। এদের ভেতর ‘ইসলাম’, ‘মুসলিম’ এই ব্যাপারগুলোতে একটি নেতিবাচক ধারণা গভীরভাবে আসন গেড়ে আছে। যদিও এদের বেশির ভাগ নামে মুসলিম। এদের ভূমিকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি গঠনে অনুকূল নয়।

নাফের এপারে মানবতার ঢল নেমেছে
বাংলাদেশের মানুষ দুর্গত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আগত ৫ লাখ শরণার্থীকে তারা আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে। এমন গতিতে শরণার্থী প্রবাহ স্মরণকালের ইতিহাসে দেখা যায়নি। পুরো ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে শরণার্থী প্রবাহ দেখা গেছে এ প্রবাহ এর চেয়ে বহু মাত্রায় বেশি। প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করার চেষ্টা করেছে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ কিন্তু ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য নিয়ে এগিয়ে গেছে। অনেকে কোরবানির গোশত ঘরে নেয়ার আগে রোহিঙ্গাদের বিতরণ করেছেন। সরকার তার মনোভাব পরিবর্তন করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সাধারণ মানুষ তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেছে।

বাস্তবতা হচ্ছে শরণার্থীদের চাপে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাফেরা চাপের মধ্যে পড়েছে। চাষাবাদের জমিতে আশ্রয়শিবির হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে আসা মানুষের ঢল রাস্তায় ত্রাণবহনকারী যানবাহন, স্যানিটেশন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সাধারণ মানুষের ওপর ধকল সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় অধিবাসীরা নিপীড়িত মানুষের সহমর্মী হয়ে সব মেনে নিচ্ছে। এখন সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ। খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ ও জরুরি সহায়তা তাদের কাছে উদ্যোগী হয়ে পৌঁছে দিচ্ছে। বিপন্ন মানুষের সহায়তায় বাংলাদেশের মানুষ কতটা অন্তঃপ্রাণ রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সরবরাহকারী একটি বেসরকারি দাতব্য সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বুঝতে পারলাম। অনেক ব্যক্তি ওই দাতব্য প্রতিষ্ঠানটির সাথে ত্রাণ দিয়ে শরিক হয়েছে। এরা সরাসরি প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনে ত্রাণবহরে যোগ দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সঠিক ব্যক্তির কাছে ত্রাণ পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন কর্ম। সাধারণত একই ব্যক্তি বিভিন্ন ত্রাণ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ত্রাণ নেন। অন্য দিকে অনেকে রয়েছেন যারা অসুস্থতা দুর্বলতা কিংবা সরবরাহকারী কর্মী বাহিনীর সাথে সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়ে ত্রাণ পান না। আমাদের ত্রাণবহরের কর্মীরা শরণার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করল। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে শনাক্তকরণ কার্ড দিলো। এ কাজে স্থানীয় অধিবাসীরা মাঠে উপস্থিত থেকে আন্তরিকতার সাথে আমাদের ত্রাণকর্মীদের সহায়তা করল।
কেউ কেউ নগদ অর্থ নিয়ে ত্রাণকর্মীদের সাথে স্পটে পৌঁছেছেন। তারা একেবারে শরণার্থীদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে নগদ অর্থ দিয়েছেন। এই সময় নগদ অর্থ শরণার্থীদের খুব প্রয়োজন। সাধারণত ত্রাণসামগ্রীর লিস্ট তৈরি করেন দাতারা। অন্য দিকে দৈনন্দিন অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রী শরণার্থীদের দরকার হয় সেটা তালিকায় থাকে না। নগদ টাকা পেলে তারা চাহিদা অনুযায়ী সেটা কিনতে পারেন। নগদ টাকা দিতে গিয়ে এক দাতাকে বিপদে পড়তে দেখা গেল। শেষ পর্যন্ত একদল শরণার্থী তার ওপর চড়াও হলো। তার পকেট হাতালো তারা। শরণার্থীরা একপর্যায়ে তার ওপর হামলা চালাল। কিন্তু দাতা এমন হামলার মুখেও পীড়িত রোহিঙ্গাদের একটু কটুকথাও বললেন না। পরে ত্রাণ টিমের কয়েক সদস্যকে এই দাতাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে বেশ বেগ পেতে হয়।

সেখানে তুরস্কের ত্রাণ সরবরাহকারীরা প্রতিদিন রান্না করে খাবার দিচ্ছে। শিশুদের পক্ষে কাজ করা ইউনিসেফ, শিখদের একটি গ্রুপকে দেখা গেল একই ধরনের কাজ করতে। উখিয়ার পালংখালি ইউনিয়নে পরিষদের পাশে ত্রাণ বিতরণের এই চিত্র দেখা গেল। ত্রাণকার্যক্রমে সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হলে সবাই প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ পাবেন। এখন স্থানীয় দেশী-বিদেশী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে ত্রাণ বিতরণ করছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ ব্যবস্থার সাথে রয়েছে। পুরো কার্যক্রম এককভাবে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর মাধ্যমে হলে ত্রাণকার্যক্রম সমন্বিত হবে বলে আশা করা যায়। ত্রাণকার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিপুল অভিজ্ঞতা রয়েছে। শান্তি মিশনে ত্রাণ বিতরণ একটি প্রধান কাজ। এ কার্যক্রমে তারা সারা বিশ্বের সুনাম কুড়িয়েছে।

jjshim146@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.