ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

দেশের রাজনীতি ও বিরোধী দলের অবস্থা

হারুন-আর-রশিদ

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ১৭:০৫


হারুন-আর-রশিদ

হারুন-আর-রশিদ

প্রিন্ট

আমাদের সার্বিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গেলে স্বচ্ছ বিবেক থেকে যে উত্তর পাওয়া যাবে, তা অনেকটা এ রকম- ‘শিল্প আছে উৎপাদন নাই, ভোটার আছে ভোট নাই, সরকার আছে সুশাসন নাই, মানুষ আছে জীবনের নিরাপত্তা নাই, বৈদেশিক বাণিজ্য আছেÑ বাণিজ্যে সমতা নাই, প্রচুর শিক্ষিত মানুষ আছে চাকরি নাই, ডাক্তার ও হাসপাতাল আছে চিকিৎসা নাই, ভেজাল ছাড়া খাদ্য নাই, যানজট, জলজট ও জনজট ছাড়া রাস্তা নাই, হকার মুক্ত ফুটপাথ নাই।’ ‘আমরা ১৭ কোটি মানুষ ‘নাই’-এর মধ্যে বসবাস করছি’।

পবিত্র কালাম শরিফ কুরআনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘সৎ কাজের আদেশ এবং সকল ধরনের অন্যায় এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে’। যারা এ কাজটি করবে না তারা ‘মুমিন’ নয়, দোজাহানে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন মর্মন্তুদ শাস্তি। ফেরাউন নমরুদ প্রমুখ স্বঘোষিত শাসক ছাড়াও আরো অনেক শাসককে আল্লাহ কঠিনভাবে পাকড়াও করেছিলেন। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দিব্যি চোখে তা দেখা যাবে। ইতিহাসবিমুখ বলেই আমরা অনেক কিছুই জানি না, বুঝি না। আমরা আলোর পথ ছেড়ে অন্ধকার পথে হাঁটছি বলেই লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছি। মনগড়া ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে নিজের বক্তব্যকে ‘যথার্থ’ বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করছি। আমরা ভুলে যাই, সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায় না। তদ্রুপ, মিথ্যাকে সত্য বলে ঢালাওভাবে প্রচার করা যায় না। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব আগেও ছিল- এখনো আছে।

তবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ধৈর্যধারণের পর অবশেষে সত্যেরই চূড়ান্ত বিজয় হয়েছে। ২০০৫ সালে আমি হজে গিয়েছিলাম।
যে বেদনার্ত দৃশ্য আমি অবলোকন করেছি তা মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ভোলার নয়। মদিনার ওহুদ প্রান্তরে যে পাহাড়ে নবী করিম সা:-এর দন্ত মোবারক শহীদ হয়েছিল- সেখানে উঠে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলাম ভারাক্রান্ত হৃদয়ে। প্রিয় নবী সা:-এর এমন অবস্থার কথা স্মরণ করে অপার বেদনাবোধ অনুভব করেছিলাম। কেন এমনটি হলো- পরে তার রহস্য উদঘাটন করলাম, বুঝলাম ওই যুদ্ধে হামজা রা:সহ আরো ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন, সেই জায়গাটিতে গিয়েই দোয়ায় শরিক হয়েছিলাম। ওহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয়ের মূল কারণ গণিমতের মালের প্রতি কিছু লোকের লোভ এবং এক শ্রেণীর মোনাফেক ব্যক্তি কাফেরদের সাথে হাত মিলিয়েছিল, যার কারণে ওই যুদ্ধে নবী করিম সা:-এর বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। ধৈর্যধারণের কারণে এবং পরাজয় কেন হলো, তার যথাযথ বিশ্লেষণের পর মুসলিম বাহিনী পরবর্তী যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন বলেই ওই যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছিল।

এবার আসুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনে খালি মাঠে গোল দেয়ার মতো একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল কিভাবে? আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ওই নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে অদ্যাবধি দেশ শাসন করে চলেছে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি শক্তি ৫ জানুয়ারি এবং তার পরেও ওই নির্বাচন ও সরকারের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে কেন ব্যর্থ হলো? সংশ্লিষ্ট হাইকমান্ড এ ব্যাপারে যথার্থ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করতে পারেনি। আর আন্দোলনকে জোরালো করতে অদ্যাবধি অকৃতকার্যই শুধু নয়, ঘরে বসে কথা বলার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালে ৫ জানুয়ারির (২০১৪) মতো একটি সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে গঠিত সংসদের আয়ু ছিল মাত্র তিন মাস। তখন কথিত জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুলিশ বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি আমলারা এক মাস ধরে বিরামহীন কর্মসূচি দিয়ে অবশেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নতুন নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিপুল ভোটে বিএনপি পরাজিত হয়েছিল।

আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিকরা বিরোধী দলে থেকে ১৭৩ দিন হরতাল, ভাঙচুর ও আগুন, বোমায় জ্বালাও পোড়াও ছাড়াও বাপের বয়সী সচিবকে ছাত্র লীগাররা দিগম্বর করে ছেড়ে দিয়েছিল দোয়েল চত্বরে। আন্দোলন কিভাবে করতে হয় ওবায়দুল কাদেরের ভাষায়, ‘বিএনপিকে সে প্রশিক্ষণ নিতে হবে আমাদের কাছে।’ তারপর হয়তো বিএনপি মাঠ কাঁপানো রাজনীতির কিছুটা আয়ত্ত করতে পারবে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাই ঘরোয়া আলোচনায় এসব কথা উচ্চারণ করেন। তারা এমন কথাও বলে থাকেন, ৫ জানুয়ারির পর যতটুকু আন্দোলন হয়েছে, তা করেছে জামায়াত-শিবির ও হেফাজতিরা।

জনগণ কোনো আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের সহায়ক ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসবে এ আশা করা যায় না। আমি জনগণের কাতারে ঢুকে তাদের মুখের ‘ভাষা’ শুনেছি। তারা বলছে ক্ষমতায় গিয়ে ক্রিম খাবেন দলের নেতারা, আর আমরা শুধু ভ্যাট ট্যাক্সের নতুন নতুন জালে আটকা পড়ে জীবনযুদ্ধে কষ্ট করেই যাবো। ‘৭১-এর পর থেকে ক্রমাগত এ দৃশ্য দেখে এখন রাজনীতিকদের প্রতি অবিশ্বাস জন্মেছে। আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে ক্ষমতায় পর পর দুই টার্ম আছে, আগামী টার্মেও তারা আসতে চায়। নানা কায়দাকানুন করে বা যেভাবেই হোক বড় দল আওয়ামী লীগ এটা সম্ভব করেছে। ভোটের প্রতিও জনগণের আস্থা কমে গেছে। তারা জেনে গেছে, ভোটার ভোট না দিলেও ভোট দেয়া হয়ে যায়। বাংলাদেশের নির্বাচনে কখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না- এখনো নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এটাই যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিয়ম হয়ে উঠেছে।

সৎ মানুষের শাসন কোথাও নেই। বাংলাদেশে সৎ মানুষের শাসন সহজে কায়েম হবে মনে হয় না। ইসলামি দলগুলোর নিজস্ব কোনো প্লাটফর্ম নেই। আদর্শবাদী না হলে নবী করিম সা:-এর আদর্শ বাস্তবায়ন, যা সাহাবিদের ৩০ বছরের সোনালি শাসনামলে আমরা দেখেছি, বর্তমানে তা কল্পনা করাও যায় না। হতাশ মানুষ মনে করছে, দুষ্ট কৌশলে যে বেশি পারদর্শী- তার জন্যই অপেক্ষা করছে ২০১৯-এর ১১তম সংসদ। তিন বছর পার হয়ে গেল, তবুও বিরোধী দল ঢাকায় একটি বড় ধরনের জনসভা করতে পারেনি। যদি দেশটি গণতান্ত্রিক হয়ে থাকে, তাহলে সভা করতে পুলিশের পারমিশন কেন লাগবে? সরকারি দল প্রতিদিনই সভা করছে, তারা যদি সভা করতে পারে পুলিশের অনুমতি ছাড়া, বিএনপি কেন পারবে না? এ জন্যই লীগের সাধারণ সম্পাদক রসিকতার সুরে টেনে টেনে বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলনে নেই।

কারণ জনগণ তাদের সাথে নেই- এ জন্য মাঠপর্যায়ে আন্দোলনে যেতে তারা ভয় পায়।’ এসব কথার উত্তর বিরোধী দলের দেয়া জরুরি। অনেকে বলেন, বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মী ভয় পায় সরকারিদলীয় বাহিনীকে। তাহলে রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিলেই তো মানুষের আর গালমন্দ শুনতে হবে না। সরকারসমর্থক লোকজন বলে, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলেও পারে, সরকারি দলে থাকলেও পারে সংসদ ও মাঠ কাঁপাতে? কত অঘটন দেশে ঘটে গেছে বিগত আট বছরে। বহু নিরীহ মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার কোটি টাকা সাগর চুরির মতো লুট হয়ে গেছে। বিরোধী দল একটি ইস্যুও কাজে লাগাতে পারেনি।

অন্য দিকে, আওয়ামী লীগ মাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৯৯৬ সালে। কিন্তু বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুকেও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি এখন বলছে ‘সহায়ক সরকার’। সেটার পক্ষে সব গণতান্ত্রিক দলকে একমঞ্চে আনতে হবে। যখন সব বিরোধী দল এক মঞ্চে এক দফা নিয়ে কথা বলবে- সেই দিনই সরকার বাধ্য হবে এ দাবি মেনে নিতে। সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগের যখন রয়েছে, ক্ষমতাসীনেরা সম্মত হলে সহায়ক সরকারের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে পাস করে নিতে সময় লাগবে বড়জোর ১০ মিনিট। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির চাপে পড়ে বিএনপি সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে সময় লেগেছিল ১০ মিনিট।

প্রশ্নটা হলো, সহায়ক সরকারের দাবির প্রতি মাঠের সব বিরোধী দলের সমর্থন বিএনপি আদায় করতে পেরেছে কি? রাজনীতির কৌশলগত দিক থেকে বিএনপি এখনো পিচিয়ে আছে। বর্তমানে যে দিকেই তাকাই শুধু শুনি মানুষের আহাজারি- ‘না’ শব্দটি এখন এতই জোরালো যে, শুধু গুম হওয়া, খুন হওয়ার ভয়ে মানুষ মুখ খুলে বলতে পারছে না মনের কথা। জনগণের মুখের ভাষাও বিএনপি কাজে লাগাতে পারছে না। কোটি কোটি মানুষ বরাবর ভারতের বিরুদ্ধে কিন্তু বলতে সাহস পাচ্ছে না শাসকদলের ভয়ে। বিগত ৪৭ বছরে সরকারের ব্যর্থতা কোনো সময়ই আজকের মতো রূপ নেয়নি। শক্ত সরকারি দলের সাথে পাল্লা দিতে হলে শক্ত বিরোধী দল দরকার। যেটা নেই বললেই চলে। রাজনীতির ফাঁকা মাঠে গোল দেয়া সরকারি দলের জন্য খুবই সহজ।

লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও কলামিস্ট
E-mail : harunrashidar@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫