ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

প্রশাসন

প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে ভাবছে

৪৫ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে ফের দানা বাঁধছে ক্ষোভ

আশরাফ আলী

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:৩০


প্রিন্ট
৪৫ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে ফের দানা বাঁধছে ক্ষোভ

৪৫ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে ফের দানা বাঁধছে ক্ষোভ

দুই বছর অপেক্ষার পরও জনপ্রশাসনের সাথে বিসিএস ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বৈষম্য দূরীকরণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ফের ক্ষোভ দানা বাঁধছে এসব ক্যাডারের প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে। এ নিয়ে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে। তারা ফের আন্দোলনে যাওয়ারও চিন্তাভাবনা করছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে দাবিদাওয়াসংবলিত স্মারকলিপিও প্রস্তুত করেছে। 


সংশ্লিষ্টরা জানান, পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় ২৬টি বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেলের মাধ্যমে কিছুটা লাভবান হতেন। কিন্তু ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল বাদ দেয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের সাথে ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বৈষম্য আরো চরমে ওঠে। ফলে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামেন প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক (প্রকৃচি) এবং ২৬টি ক্যাডার ও বিভিন্ন ফাংশনাল সার্ভিসের কর্মকর্তারা। আন্দোলনের মুখে বৈষম্য দূর করার আশ্বাস দেয় সরকার। কিন্তু প্রায় দুই বছর পার হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে এ নিয়ে ফের ােভের দানা বাঁধছে ২৬টি ক্যাডারের প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে।


প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির মহাসচিব মো: ফিরোজ খান বলেন, আমাদের দাবিদাওয়াসংবলিত স্মারকলিপি প্রস্তুত করেছি, এটি শিগগির প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাব। এরপর সব ক্যাডার নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বসে আমাদের কোন কোন দাবিদাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, এর রূপরেখা তৈরি করব।


সরকার ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর অষ্টম বেতন কাঠামোর গেজেট জারি করে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর ধরা হয় ওই বছরের ১ জুলাই থেকে। এর পরই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি। ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা কালো ব্যাজ ধারণ করেন। এর মধ্যে ২৩ ডিসেম্বর সারা দেশে মানববন্ধন ও ২৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়। ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করে সমন্বয় কমিটি। পরে দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করা হয়। পরে অষ্টম বেতন কাঠামোতে পদমর্যাদা ও বেতনক্রম অবনমনের অভিযোগ তুলে বৈষম্য নিরসনের দাবিতে ২০১৬ সালের ২৬ থেকে ২৮ জানুয়ারি কর্মবিরতি পালন করেন দেশের সরকারি কলেজের শিক্ষকেরা।


এসব বিষয় নিয়ে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক বৈঠকে বসেছিল। বৈঠকে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের মাধ্যমে সৃষ্ট বৈষম্য নিরসনে সব ক্যাডার ও অধিদফতরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ খুলে দেয়ার কাজে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ বিষয়ে ফের আন্দোলনে যাওয়ারও চিন্তাভাবনা করছে তারা। 


বিসিএস সমন্বয় কমিটির নেতারা জানান, ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চার সচিবের সাথে বৈঠকের পর আন্দোলন থেকে সরে আসে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ ও শিা সচিব মো: সোহরাব হোসাইন অংশ নেন। বৈঠকে ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সব ক্যাডার ও অধিদফতরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের যথাসময়ে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে ক্যাডার ও অধিদফতরের পদোন্নতির সোপান সুষমকরণ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
বিসিএস সমন্বয় কমিটির মহাসচিব মো: ফিরোজ খান বলেন, ১৪ মাসে পদোন্নতির সোপান সুষমকরণের (সবার জন্য সমান পদোন্নতির সুযোগ) কাজ শেষ করা হবে বলে সরকারের দায়িত্বশীল চারজন সচিব প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির সাথে বৈঠকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন।

বিভিন্ন অজুহাতে কাজটি সম্পন্ন করতে বিলম্ব করা হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে সচিব কমিটির সভায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে দ্রুত কাজ করার তাগিদ দেয়া হয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কালপেণ করছে। ফলে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রত্যভাবে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে শুধু উপসচিবদের জন্য সার্বণিক সরকারি গাড়ির আদেশ জারি এর আরেকটি উদাহরণ।


আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব উম্মুল হাসনা সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিভিন্ন ক্যাডারের পদ সৃজনের মাধ্যমে পদোন্নতির সমস্যা সমাধানে কিছু কাজ করছি। ক্যাডারভিত্তিক যেসব প্রস্তাব আসছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন ক্যাডারদের সাথে বৈঠক করছি। 


তথ্য ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে আমরা চার ও ১২ বছরের সিলেকশন গ্রেড পেতাম এবং ১৮ বছরের টাইমস্কেল পেতাম। তখন পদোন্নতি না হলেও আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে এর অনেকটাই পূরণ হতো। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল নেই। এটি নিয়েই আমরা তখন আন্দোলনে নেমেছিলাম। সরকারও বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু এখনো কিছুই হলো না, যা দুঃখজনক। বিভিন্ন ক্যাডারে পদোন্নতির সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অধিদফতর ও সংস্থাগুলোতে নতুন পদ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।

আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদোন্নতির নির্ধারিত সময়ে আর্থিক সুবিধা হিসেবে সিলেকশন গ্রেড পেতেন। আবার চাকরির একটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টাইমস্কেলের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা দেয়া হতো।


বিসিএস সমন্বয় পরিষদের প্রচার সম্পাদক স ম গোলাম কিবরিয়া বলেন, উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পদে সুপারনিউমারারি (অস্থায়ী) পদ সৃষ্টি করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিশেষ সুবিধা নিচ্ছেন। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সমন্বয় কমিটির সভায় সব ক্যাডারের জন্য সুপারনিউমারারি পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশনাও আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। অন্য দিকে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ে পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি দিয়ে বিভিন্ন অধিদফতরে প্রেষণে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

এতে ওই সব অধিদফতরের নিচের ধাপের কর্মকর্তারা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করার পরও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। তিনি অবিলম্বে সব ক্যাডার ও অধিদফতরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের যথাসময়ে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে পদোন্নতির সোপান সুষমকরণের কাজ শেষ করা, পদোন্নতির েেত্র বিভিন্ন ব্যাচের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে সব ক্যাডারের সুপারনিউমারারি পদোন্নতি নিশ্চিত করা এবং প্রেষণ পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানান।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫