ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

আলোচনা

সুন্দর সৃষ্টিই ব্যক্তির বিকাশ

মতিন বৈরাগী

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৫৩


প্রিন্ট

মানুষ প্রকৃতিকে পরিকল্পিত সুন্দরে রূপ দিয়েছে। সুন্দর হয়েছে পৃথিবী। অনুভব করছে মানুষ। মানুষের অনুভবে বিষয় সুন্দর হয়ে উঠছে। আর একজনের নির্মাণ অন্যকে দিচ্ছে আনন্দ। মানুষ বলে উঠছে সুন্দর। তাই পৃথিবীর যাবতীয় সুন্দর মূলত নির্মাণ। মানুষ এই নির্মাণে ব্যবহার করেছে তার আবেগ ও কল্পনা। কল্পনা বিষয়ের প্রতিচ্ছবি তৈরি করে যার সাথে যুক্ত হয় প্রজ্ঞা, আর মানুষ নির্মাণ করে। মানুষ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাণী নয়, মানুষ সামাজিক প্রাণী। তাই তার আবেগ কল্পনা সমাজজীবন থেকেই উত্থিত। সে কারণে মানুষের একক শক্তি আপাত দৃষ্টিতে এসব নির্মাণের মূল কারিগর মনে হলেও তা মূলত সামাজিক এবং যৌথ। প্রত্যেকটি নির্মাণে রয়েছে সমাজ ও মানুষের উপস্থিতি।
এই সমাজ মানুষকে গড়তে হয়েছে সুদীর্ঘ সময় ধরে সভ্যতার যাত্রায়। তা যে কোনো স্থানে কালে সময়ে কারো পরিকল্পনায় আবেগে উত্থিতÑ বাস্তবায়নে মানুষেরই অংশগ্রহণ, আর তার সব অভিজ্ঞতা সামাজিকই জীবন প্রয়োজনে নিবন্ধিত থাকে। যা সমাজের প্রয়োজনে লাগে না তেমন সুন্দরের উপস্থিতি অন্তঃসারশূন্য এবং স্থবির। তাই সুন্দর চলমানও বটে। তবে সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনে সুন্দরের অনুভবে পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। সঙ্গত কারণে এ কথাটি বলাই যায় যে, মানুষ নির্মাণ করতে পারে এবং তা তার আশু প্রয়োজন মেটাবার জন্যই কেবল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন এখানে নিত্য হয়ে ওঠে। সে নির্মাণ আশু প্রয়োজনের, তার ভেতর সুন্দর যাই থাক তার অনুভূতি মানবের মনোজগতে তেমন কোনো লম্বিত ক্রিয়া করে না। প্রকৃতির কোনো দৃশ্যাবলি কারো কারো মনে আনন্দ হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রূপ ও প্রয়োজনের সৃষ্টি করতে পারে না। আর কিছু কিছু বিষয়ের অনুভব আরোপিত, যা পরম্পরাকে অনুসরণ করে। তা ওই ভোক্তার কাছে যতটা সুন্দর অনুভবে তার চেয়ে বেশি প্রকাশ প্রবহমান ক্রিয়ায়। এ কারণে কোনো একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে লোকের নজরে আসতে পারে এবং সুন্দর বলে প্রতিভাত হয়ে অনেকের মনে সঞ্চারিত হতে পারে। মানুষ তাকে সুন্দর বলে যতটা বিবেচনা থেকে না ততটা আবেগ থেকে এবং পরম্পরাগত অবস্থানের কারণে।
বাস্তবে মানুষ সুন্দরকে সৃষ্টি করে আর সৃষ্টিটাই হলো ব্যক্তির প্রকাশ। এই প্রকাশের নানা রূপ আছে। জীবনের নানা ক্ষেত্রে এই প্রকাশ নানারূপে মূর্ত হয়।
কেউ আবিষ্কারে, কেউ শিল্প-সাহিত্যে, আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণে, কেউ সমাজ নির্মাণে মোট কথা নানারকম প্রকাশ মানুষের মধ্যে বিরাজমান। সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ একজন মানুষের আবেগেরই প্রকাশ। এই প্রকাশ সুন্দরের দিকেই ধাবমান। সে কারণে পরিকল্পিত নির্মাণশৈলী ছাড়া সমাজ সুন্দর হয়ে উঠতে পারে না। এখানে পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনের গাণিতিক হিসাব রয়েছে বেশি পরিমাণে। কারণ সমাজ একটা বিশাল রসায়নাগার, প্রতি মুহূর্তে নানা কিছুর উদ্ভব ও বিলয় ঘটছে, সঙ্গত কারণে সমাজ নির্মাণের সাথে মানুষের যাবতীয় বিষয় আশয় যুক্ত। প্রতিটি মানুষ সমাজ দেহের ক্ষুদ্র একক হলেও মন ও মননগত দিক থেকে তারও ভিন্নতা আছে। কিন্তু রয়েছে অনেক ক্ষুদ্রের একক সত্তা যা প্রায় স্বাভাবিক সমাজ প্রবাহের মধ্যে চলমান। বেশি অংশ যেহেতু মানুষ নামক প্রাণীটির পরস্পরের সাথে একই সূত্রে অন্বিত সে কারণে মানুষকে সামাজিক পরিকল্পনায় এক করে ধরে রাখতে পারে রাষ্ট্র। আর এর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা।
কিন্তু এই নির্মাণগতি ইতিহাসের গতিধারায় বিবেচনা না পেয়ে ব্যক্তি, ব্যক্তির ইচ্ছায় প্রবাহিত হলে বিশৃঙ্খলা হয়ে ওঠা অনিবার্য। নিপীড়ন, হত্যা-ধ্বংস-যুদ্ধ, পররাষ্ট্র আক্রমণ, নিজ নাগরিকদের উচ্ছেদ ইত্যাদিতে সে হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসমুখী, বিনাশী। তাই রাষ্ট্র যে সমাজকে নির্মাণ করে, তার গতিধারাকে উপলব্ধি না করে আপন অহঙ্কারকে সঠিক এবং সিদ্ধ মনে করলে একসময় সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য এবং নানা অসঙ্গতি প্রকট হয়ে ফুটতে থাকে। ফলে সমাজের অস্থিরতার তাপমাত্রা সমাজের চলমান সুন্দরটুকুও পুড়িয়ে দেয়। জনগণ বিভ্রান্ত হয়, সত্য থেকে পিছিয়ে পড়ে, অন্যায় অবিচার, বিকৃতি হয়ে ওঠে মূল প্রতিপাদ্য। তেমনটি পৃথিবীর সব সমাজে আজ প্রায় স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
পুঁজিবাদের চূড়ান্ত ফলাফল হলো বিকৃতি, বিকৃতি থেকে যুদ্ধ। যুদ্ধ এক দিকে যেমন ধ্বংস ডেকে আনে অন্য দিকে পুঁজির অতিরিক্ত উচ্চ চাপ কমিয়ে নতুন উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শ্রেণীগুলোর জন্য নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে, অর্থাৎ বাজার দখলের মধ্য দিয়ে পুঁজি নতুন গতি পায়। নিঃশেষিত হয় মানুষ। তাই একজন ব্যক্তি একজন ব্যক্তির ক্ষতি করতে পারলেও তা যেমন সমাজ জীবনে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে না কিন্তু একটি আগ্রাসী শ্রেণী যখন রাষ্ট্র দখল করে তখন তারা নানাভাবে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং তার দুর্যোগ ডেকে আনে ও চলমান সমাজ জীবনের বিপুল ক্ষতি সাধন করে। সমাজ থেকে সুন্দর হারিয়ে যায়, অসুন্দরই সুন্দরের জায়গা দখল করে।
রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তারা রাজনীতিবিদ। সাধারণ মানুষও রাজনীতির মধ্যের মানুষ, কিন্তু রাষ্ট্র-রাজনীতির অধীন। সাধারণ মানুষ চলমান রাজনীতিকে অনুসরণ করে এবং একটা ভুয়া নীতির মধ্যে থেকে থেকে অশালীনতা, অপসংস্কৃতির প্রভাবে নিজেদের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলে। রাজনীতির আচরণের মধ্য দিয়ে তারা নেতার ভাষা রপ্ত করে, অভ্যাস গড়ে তোলে এবং ব্যবহারিক জীবনে তার প্রতিফলন ঘটায়। ফলে তার প্রভাব সমাজে পড়তে থাকে এবং সমাজজীবন তার গতিধারা হারিয়ে নতুন গতির মধ্যে সন্নিবেশিত হয়। তখনই রাজনীতির চরিত্রটি প্রকট হয়ে ওঠে। শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে যদিও দিশাহীনতার কারণে এসব সংঘর্ষ নতুন রূপ নির্মাণে পারঙ্গম হয় না, [এবং রাষ্ট্রীয় দমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়] কিন্তু যে দাগরাজি সমাজের গায়ে লাগে তা স্থান করে নেয় দৈনন্দিন জীবনে, সংস্কৃতির জগতে। ফলে উগ্রতা, অনাসৃষ্টি, হৃদয়বিদারক ঘটনাবলির সাক্ষী হয় চলমান সমাজ।
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের রাজনীতিবিদেরা রাজনীতির মতো একটি শিল্প নির্মাণ ক্ষেত্রে তাদের আচরণে, বলনে কথনে কর্মে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা এখন সমাজজীবনে প্রথিত হয়েছে। উগ্রতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, মানুষের নিরাপত্তা কেবল তার নীরবতার মধ্যে। এর দাবানল গ্রাস করেছে শিল্প-সাহিত্যকে। সাহিত্যের পরতে পরতে জ্বলছে এ আগুন। শিল্প-সাহিত্যও এখন হয়ে উঠেছে রাজনীতি নির্ভর।
ইতোমধ্যে মানুষের ভাষার রূপ বদলে গেছে, আচরণের আদ্যপ্রান্ত বদলে গেছে, নীতি ও নিয়মের বিষয়াবলি বদলে গেছে, জীবনযাপনের পরিচিত সুর বদলে গেছে, এই বদল সুরে আর ছন্দে নেই... আছে উগ্রতায়। আইন যার হাতে সে আইন মানছে না, উগ্র প্রয়োগ হচ্ছে তার। কাজে লাগাচ্ছে তারা নিজ সুবিধায়, ভোগ বাড়ছে, হত্যা খুন গুম বাড়ছে, ধর্ষণ আর অস্বাভাবিক যৌনতার কাহিনীগুলো পাখা মেলছে, ড্রাগে সয়লাব হয়ে গেছে দেশ। তরুণেরা দিশাহারা, ভুল শিক্ষায় নীতিহীন, নীতিবোধ গড়ে দেয়ার লোকেরা গড়ছে এমন নীতি যা টকশোতে লাগছে। সমাজ নির্মাণে এই দুঃখজনক পরিস্থিতির জন্য সমাজ নির্মাতারাই দায়ী প্রথমে। তারা রাজনীতির ভাষায় কথা না বলে বলছেন ব্যক্তি অহঙ্কার থেকে, বলছেন দম্ভ থেকে অরাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে। আর এর পাগল করা সুর এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। আর এটা এখন বিশ্বব্যাপী এক মহামারী। মনে হয় এক বিনাশ আজ মানব সভ্যতার দুয়ারে অপেক্ষায়।
এর থেকে উদ্ধার পেতে হলে সুস্থ দৃষ্টিভংগী জরুরি। প্রয়োজন শিল্প-সাহিত্য চর্চায় সুস্থতা। শিল্প-সাহিত্যের আনন্দ মানুষকে জাগিয়ে দেয় স্ন্দুরের দিকে। সাহিত্য মানুষকে করে তোলে রুচিশীল। খুলে দেয় বিবেকের দরোজা। আর এবাবেই সুন্দর সৃষ্টি ঘটায় ব্যক্তির বিকাশ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫