ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

গল্প

পুঁথিমুগ্ধ রাত

জীম হামযাহ

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৪৫


প্রিন্ট

টানা কয়েক দিন বৃষ্টি শেষে রোদের একক আধিপত্যে ফসলি জমি শুকিয়ে চৌচির প্রায়। পুকুর জলাশয়ের পানি অনেকটা কমে গেছে। তেজিয়ান রোদের দাপটে মেঘেরা আকাশের দখল নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত উড়িয়েছে সাদা পতাকা। ভ্যাপসা গরমে হাঁপিয়ে উঠছে জনজীবন। দিনের বেলা কেউ কেউ একটু ঠাণ্ডা পরশের জন্য চলে যান গাছতলায়। কেউবা চেয়ার, মোড়ায় বসে বসে হাতপাখা ঘুরাচ্ছেন। গৃহণীরা টুকটাক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কোনো কোনো যুবা মেয়ে রাখালের বাঁশিতে তন্ময় হয়ে আপন মনে পাখায় ফুল তুলছে। কখনো পুকুর থেকে ভেসে আসে একঝাঁক পাতিহাসের প্যাক প্যাক ডাক। আকাশে সাদা মেঘের উড়াউড়ি দেখে মনে হয় শেষ বিকালে অথবা সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামবে। সেই আশায় কোনো কোনো কৃষক তীব্র রোদে তালপাতার ছাতা মাথায় নিয়ে কোদাল কাঁধে চলে চলে যান জমিনে। ক্ষেতের আইল ভালো করে বেঁধে রাখেন যাতে পানি আটকে। রোদ্দুর দিন শেষে গ্রামে যখন সন্ধ্যা নামে তখন স্বস্তির জন্য শীতলপাটি নিয়ে বসে পড়েন আপন আঙিনায়। গল্প গুজবে রাত গড়ায়। আমাদের বাড়ির উঠোনও এর ব্যতিক্রম নয়। সন্ধ্যার পরপরই সবাই খোলা আকাশের নিচে বসে পড়েন। আমাদের আলাদা একটা পাটি বিছিয়ে দেয়া হয় পড়ার জন্য। আম্মু হারিকেনের বাতিটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে নিজেরা গপ-গল্পে মেতে ওঠেন। আমাদের মন তখন কি আর পড়ার মধ্যে থাকত? যদিও চোখ বইয়ের ওপর থাকত ঠিক, কিন্তু আমরা নিজেদের তাদের গপ-গল্পে ডুবিয়ে রাখতাম। কখনো পড়ার গুনগুন অভিনয় করি। কখনো তাও না। হা করে তাকিয়ে আকাশের তারা গুনি। একটা তারা অবিরাম দৌড়াচ্ছে। আমরা তীক্ষè নজর রাখি শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়। দেখতে দেখতে একসময় নিজেরা দৌড় দেই। আমাদের দৌড়ে চাঁদটাও দৌড়ায়। আমরা চাঁদকে নিয়ে টানাটানি করি। চাঁদকে সাথে নিয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে পুকুর পারে এসে দাঁড়াই। শান্ত স্থির পানিতে থালার মতো চাঁদ দেখে সহ্য হয় না। সাথে সাথে ঘাটে পা ডুবিয়ে পুকুরকে নাড়িয়ে দেই। চাঁদ ভেঙে ফালিফালি। আমাদের মুখে তৃপ্তির হাসি। আমাদের হাসিতে তখন চাঁদনী রাতের হাসি আরো প্রসারিত হয়। আকাশ থেকে চাঁদ তার জ্যোৎস্নার জাল জমিনে আরো বিস্তৃত করে বিছিয়ে দেয়। তখন আমাদের চোখ পড়ে পাতাবনে জোনাকিদের ওপর। দৌড় দেই জোনাকিদের পিছু পিছু। এরই মধ্যে আমরা আঙিনা পেরিয়ে, পুকুর ছাড়িয়ে পাশের নালার পাড়ে চলে এসেছি খেয়াল নেই। আমাদের হাতে মুঠো ভরা জোনাকি। এগুলোকে কাচের বোতলে ভরে রাখতে হবে। বোতল দখল করার জন্য ঘরের দিকে ভো-দৌড়।
হারিকেনের বাতি নিভে যাচ্ছে। হুইল ঘুরিয়ে সলিতা আরো একটু তুললাম। বাতি এবারও নিভে যাচ্ছে। আম্মুকে বললাম তেল নেই? আম্মু বললেনÑ ঘরেও তেল নেই। দাদু বাজারে আছেন। যাওয়ার সময় কেরোসিনের বোতল নিয়ে গেছেন। আসার সময় নিয়ে আসবেন। একটা অজুহাত দাঁড় হওয়াতে মন আবারও খুশিতে বাকবাকুম। আজ আর পড়তে হবে না। আজ আমাদের ছুটি। হারিকেনের হুইলটা উল্টাপাল্টা ঘুরিয়ে সেটাকে নিভিয়ে দিলাম। আশপাশ কোথাও একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। অবিরাম ডাকে কান ঝালাপালা। আমরা দৌড়ালাম সেই ঝিঁঝিঁ পোকার সন্ধানে। এমন সময় দাদু তার নিভু নিভু টর্চ জ্বেলে উঠোনে এসে হাজির। পকেট থেকে আমাদের হাতে চার আনা দামের লজেন্স বের করে দেন। আমরা তাতে মহাখুশি। হাতের ব্যাগটা শীতলপাটির ওপর রাখেন। চাচি কেরোসিনের বোতল আর হারিকেন নিয়ে ঘরে চলে যান। দাদি জিজ্ঞাস করলেন ব্যাগে কী আনছেন। দাদু বললেন গুড় এনেছি পায়েস রান্নার জন্য। কাল বাড়িতে পুঁথির আসর। সবাইকে বলে দিয়েছি। রুস্তম মুন্সি, নন্দিঘোষ সবাই আসবেন। দাদি গুড়ের মচা নেড়েচেড়ে বললেনÑ এই গরমের দিনে এসব ঝামেলার কী দরকার। দাদু বলেনÑ ঝামেলা আর তেমন কী? সবাই উঠোনে বসে যাবে। বড় ডেগে কিছু পায়েস রান্না করে নিলে, সবাই একটু একটু খেয়ে নেবে।
আমরা কান পেতে দাদু দাদির আলাপ শুনছি। বাড়িতে পুঁথির আসর। উঠোনে হ্যাজাক লাইট জ্বালানো হবে। গ্রামের সবাই আসবে। লোকে লোকারণ্য হবে। আমাদের আনন্দ বাঁধ মানছে না। সে রাতে বুকভরা খুশি নিয়ে ঘুমাতে যাই।
সবার কানে কানে খবর পৌঁছে যায়।
সন্ধ্যায় পাড়ার গৃহণীরা ঘরের কাজকর্ম সেরে সবাই হাজির। বিকালে ফুফুও এসেছেন তার শ্বশুরকে নিয়ে। পাড়ার ছেলে মেয়েদের হইচইয়ে আমাদের বাড়ি সরগরম। আমরা উঠোনে দৌড়াদৌড়ি খেলছি। অতিষ্ঠ হয়ে কখনো মাতব্বর গোছের কেউ আমাদের ধমক দেন। আমরা তেমন কান দেই না।
রান্নাঘরে বড় ডেগে ফুফু পায়েস জ্বাল দিচ্ছেন। আরো মহিলারাও সেখানে ব্যস্ত। ততক্ষণে উঠোনে বড় বড় মাদুর পাটি বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা আনন্দে তাতে গড়াগড়ি দেই। একে একে পাড়ার সবাই জমতে শুরু করছেন। কেউ পাটিতে কেউ খাট টেনে, কেউবা চেয়ারে আসন নিয়েছেন। আড্ডায় আড্ডায় হুক্কা তামাকের গড়গড় শব্দ হচ্ছে। তারা চাষবাসের কথা বলছেন। খরা ও চৌচির জমি, ফসল ও মহাজনের ঋণ, হাল-বলদ, ঘর-গেরস্তি এসব বৃত্তে তাদের গল্প। মহিলারাও বারান্দায় মাদুরে বসে বিভিন্ন খোশগল্পে মগ্ন। সেই খোশগল্পের মধ্যে থেকে কখনো হাসির ঢেউ উঠে বাতাসে মিশে যায়। রুস্তম মুন্সি উঠোনের এক কোণে মোড়ায় বসে হুক্কা টানছেন। তাকে ঘিরে সবাই কথার পিঠে কথা বুনছেন। নন্দিঘোষ গলা কেশে বললেনÑ কী আর পুঁথি পড়ব, এখন গলায় কুলায় না। রুস্তম মুন্সি হুক্কায় গড়গড় শব্দ তুলে ধোঁয়া ছেড়ে বলেনÑ এত তাড়াতাড়ি ডেট ওভার হয়ে গেলে নন্দি? কত মানত, গত পরশু গিয়েছিলাম তেলিবিল। উঠোন ভর্তি মানুষ ছিল। সারা রাত গাজী কালু টানছি। সকালে দেখি গলা ভাঙ্গি গেছে। দু’দিন থেকে নুনের চা আর আদা খেয়ে মোটামুটি ঠিক করছি।
রস্তম মুন্সি হুক্কাটা নন্দি ঘোষের দিকে বাড়িয়ে দেন।
নন্দি ঘোষ রুস্তম মুন্সির দিকে ইশারা করে বললেনÑ সবাই তো এসে গেছে শুরু করে দেন তাইলে। রুস্তম মুন্সি মোড়ায় পান চিবাতে চিবাতে পুঁথির বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন। সবার দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে বললেনÑ কি কন, শুরু করে দেই নাকি। সবাই সমস্বরে বলেনÑ হ, শুরু করে দেন।
এককোনা থেকে একজন দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ করে বলেনÑ কথা থামাও শুরু হয়ে যাচ্ছে।
রুস্তম মুন্সি কেশে গলা পরিষ্কার করে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলেনÑ
‘বিশ্ব অধিপতি মহা প্রভু নৈরাকার Ñ সীমাহীন সংখ্যাহীন প্রশংসা অপার
দিক হইতে দিগন্তরে অনন্ত মহিমাÑব্যোম বিশ্বে বিরাজিত জ্বলন্ত গরিমা
সুকৌশলে সুসজ্জিত বিশ্ব কুঞ্জবনÑকোটি বাগবান করিয়া সৃজন
রবি শশী গ্রহ নক্ষত্র শোভিতÑগগনের রূপ মুগ্ধকর বিমোহিত
নাহি আনি নাহি সঙ্গী পরিজনÑ সর্ব সৃষ্টিকর্তা নহে সৃষ্ট কদাচন
বৈজ্ঞানিক যোগী ঋষি বিস্তরÑ তত্ত্বে কোথা পাবে যিনি জ্ঞানের অগোচর।’
রুস্তম মুন্সি এমনভাবে দুলে দুলে পড়ছেন, মুহূর্তের মধ্যে পুরো উঠোন কবরস্থানের নীরবতায় ছেয়ে যায়। হামদ নাতের ছন্দে সবাই হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ছেন। যেন সবাই মহান সৃষ্টিকর্তার প্রশংসায় মগ্ন।
ভূমিকার সরু পথ পেরিয়ে সুরে সুরে এগিয়ে যাচ্ছে মূল পটভূমির দিকে। পুঁথির ছন্দের ঝংকারে ভিড় জমাচ্ছে আকাশের তারকারাজিরাও। দ্বাদশী চাঁদ তার পূর্ণ যৌবন ঢেলে সবাইকে জ্যোৎস্নায় ডুবিয়ে রেখেছে। অদূরে পাতাবনে জোনাকিরা ওড়াউড়ি করলেও আজ আমাদের কোনো তোড়জোড় নেই। দূরে কোথাও একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। ঝিঁঝিঁ পোকার দল অবিরাম ডাকছে। পুঁথির দোলনায় আসরের সবাই দুলছেন। রুস্তম মুন্সি তার সুরের সুতায় বেঁধে টেনে টেনে আনতে লাগল সহস্রাধিক বছরের আরবকে। মক্কা, মদিনা, তায়েফ, বদর, উহুদ, খন্দক সব চোখে ভাসছে চলচ্চিত্রের মতো।
যখন রাসূলের সা.-এর ওফাত পবের্র্র বর্ণনা এলো, সবার চোখ অশ্রুসিক্ত। শেষ বিদায়ের সায়াহ্ণে রাসূল তাঁর সাথীদের বলছেনÑ আমার কাছে যদি কারো কোনো পাওনা থাকে পেশ করো। আমাকে ঋণী করে রেখো না। আমি কোনো ঋণ নিয়ে কবরে যেতে চাই না। সবাই যখন নীরব বোবা কান্নায় এমনি সময় আছহাব আক্কাস এক মর্দ দাঁড়িয়ে আরজ করলÑ হে রাসূল! আমার একটা পাওনা আছে। রাসূল বিনয়ের সাথে বললেনÑ এক্ষুণি বলো হে প্রিয় সাহাবি!
নবীজী! একদিন আমরা যাচ্ছিলাম যুদ্ধে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে। যাওয়ার সময় আপনি ঘোড়ার পিঠে একটি চাবুক মেরেছিলেন। আর সে আঘাত ঘোড়ার পিঠে না পড়ে পড়েছিল আমার পিঠে। হে রাসূল! আমি তার বদলা নিতে চাই। আজ আমি নিজ হাতে তার বদলা নিব। রাসূল বিনীত বলেনÑ তুমি এক্ষণি তার বদলা নিয়ে অনুগ্রহ করো। রাসূল তার হাতে চাবুক দিয়ে আপন পিঠ পেতে দিলেন। উপস্থিত সাহাবারা সবাই তাজ্জব!
‘খিচি মারিবারে চাবুক ঘোড়ার উপর Ñ সেই কোড়া পড়েছিল মোর পিঠ পর
পাইয়াছি বড় দুঃখ আমি তব হাতে Ñ নবি বলি কহি নাই কিছুই লজ্জাতে
মোর কাছে মুক্ত হতে যদি চাও তুমি Ñ লইব তাহার দাদ না ছাড়িব আমি’
আবু বকর, উমর, হাসান, হুসাইন সবাই কাকুতি মিনতি করলেনÑ আমাদের পিঠ থেকে বদলা নিয়ে নাও, তবু নবীজীর শরীরে আঘাত করো না। আক্কাস অনড়। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সিনাটান হয়ে। হাতে মাজছে তেলতেলে চাবুক। আমি অন্যকে মারব কিসের জন্য। আমাকে যেভাবে মারা হয়েছে আমি ঠিক সেভাবে বদলা নেবো। আমার পিঠে যখন চাবুক পড়ে তখন জামা ছিল না। এ যেন তপ্ত বালুরাশিতে দিনের পর দিন রোদে পোড়া পাথরের চেয়েও কঠিন হৃদয়। শুষ্ক মরুর চেয়েও আরো ঊষর আরো পাষাণ। উপস্থিত কারো কাকুতি তাকে গলাতে পারছে না। কোনো চোখের জলও পাষাণ হৃদয়কে সিক্ত করতে পারছে না। সে তার সিদ্ধান্তে ইস্পাতশক্ত কঠিন। প্রতিশোধে অনড়।
রাসূল তার গায়ের জামা খুলে উদাম পিঠ সমর্পণ করলেন আক্কাসের চাবুকের কাছে।
এমন নিষ্ঠুরতা দেখে সবার অন্তর কেঁদে উঠলো হু হু করে। হাসান, হুসাইন অবোধের মতো কাঁদছেন। ভীষণ হুলস্থল! এমন সময় আছহাব আক্কাস এমন এক কাণ্ড করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো।
‘আক্কাস চাবুক তবে রাখিল জমিনেতেÑ চুম্ব দিলো রাসূল আল্লাহর মোহর নবুয়তে
কান্দিয়া চুম্বিল তার নূরানী বদনÑ কদমের ধূলি লই শিরেতে আপন
বলিল এই আশা ছিল অন্তরে আমারÑ মোহর নবুয়ত করি আখেরী দিদার
সে জন্য বাহানা আমি করি এরূপেতেÑধন্য হইলাম চুম্বি আজ মোহর নবুয়তে
হাল ছাহাবাগণ তাজ্জব তামাম Ñ আক্কাসকে দোয়া দিলো নবি নেক নাম।’
নন্দিঘোষ পুঁথির ফাঁকে ফাঁকে বোঝার সুবিধার্থে ঘটনা গল্পের মতো বর্ণনা করেন। নন্দি ঘোষ যতক্ষণ বর্ণনা করেন, রুস্তম মুন্সি ততক্ষণ গড়গড় করে হুক্কা টানেন। নন্দি ঘোষের বর্ণনা শেষে রুস্তম মুন্সি হুক্কা একপাশে রেখে আবার পুঁথিতে সুর দেনÑ
‘কারবালা ময়দানে যবে হোসাইন পৌঁছিল Ñ চলিতে ঘোড়ার পাও জমিনে গাড়িল
হায় হায় তিনবার শব্দ শিরের পরেতে Ñ শুনিতে পাইলেন তিনি গায়েব হইতে
যেখানে জমিতে রাখে কদম ঘোড়ার Ñ খুনের ফোয়ারা উঠে পাতির আকার
সওয়ারী যতেক পশু পড়িল বসিয়া Ñ সামনে না যায় কভু সে জায়গা ছাড়িয়া...।’
পুঁথির আসরে সময় ঘনিয়ে রাত্রি দ্বিপ্রহর। আমার নাবালক চোখে তখন পর্দা নেমে আসে। পুঁথির ছন্দ সুর আর পটভূমিতে হারাতে হারাতে একসময় হারিয়ে যাই নিদ্রার অতলে।
রাতজাগা এ আঙিনায় পুঁথিমুগ্ধ মানুষ তখন দেখছে কারবালার নিদারুণ হাহাকার। শুনতে পাচ্ছে পানির পিপাসায় শিশুদের ক্রন্দন। নারীদের আর্তচিৎকার। ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনি। ঢাল তলোয়ারের ঝনঝনানি। বীর হোসাইন একাই কুপোকাত করছেন শত শত এজিদ সেনা। তরবারির আঘাতে সিটকে পড়ছে মস্তক। রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে কারবালা। ধূলিঝড় তোলে এজিদ ঘোর সওয়ারিদের পলায়ন, পুনরায় আগমন। আপসহীন ইমামের অটল সাহসিক লড়াই...।
তমালের আলতো ধাক্কায় চোখ খুললাম। জেগে ওঠে প্রথমে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলাম না। চোখ মুছে কেবল পুঁথির সুরে কান দিলাম।
এবার নন্দি ঘোষ পাঠ করছেনÑ
‘হোসাইন শহীদ হল কারবালার ময়দানে Ñ কান্দনে পড়িল শোর আকাশ জমিনে
মানুষ ফেরাস্তা আদি মাখলুক খোদার Ñ পশু পক্ষি কান্দে হইয়া কাতর
হৃদয় বিদারী শুনিল যে জন Ñ কান্দিল মাতমে হায় হোসাইন
ইমামের খিমার মধ্যে যে কেহ আছিল Ñ কেহবা কান্দিল কেহ মূর্ছিত হইল...।’
তমাল আমাকে ধাক্কা দিয়ে ইশারা করলো বারান্দার মাটির সিঁড়ির এককোন বসা ময়নার মা’র দিকে। ময়নার মা কেমন নাকি স্বরে হুহু করে কাঁদছেন। তার এমন কান্না দেখে খুব হাসি পেলো। দৌড়ে গেলাম আম্মুর কাছে। বলব যে, দেখ ময়নার মা কেমন কাঁদছেন। আম্মুর কাছে গিয়ে আর বলা হয়নি। দেখলাম আম্মুর চোখ থেকেও টপটপ পানি পড়ছে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। চলে এলাম উঠোনে। সবার চোখে অশ্রু ঝরছে। কারো চোখ টলমল করছে। বুড়ো মজিদের মতো পাষাণ হৃদয়ও বরফের মতো গলে গেছে। অশ্রুতে ভিজে গেছে তারও দাড়ি।
কারবালার মর্মন্তুদ শোকে ছেয়ে গেছে রাতজাগা এ আঙিনা। এ বারান্দা। সেই শোকে ভারীÑ বাতাসও। বাতাসের শব্দে কেবল হুহু কান্না শোনা যাচ্ছে। গর্তের ব্যাঙরাও জমিনের আইলে উঠে অবিরাম মাতম করছে। বেদনায় ভারী হয়ে গেছে আকাশের মনটাও। ততক্ষণে শোকের কালো মেঘে ছেয়ে গেছে পুরো গগন। টলটল করছে দিগন্ত। চাঁদটাও পশ্চিমাকাশে ঝুলে মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে রোদন করছে। শেষ পর্যন্ত আকাশ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
ঝমঝম বৃষ্টি নামল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫