ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ এপ্রিল ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশন সমীপে-২

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:৫৩


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

প্রিন্ট

মহাসচিব নির্বাচন কমিশনে যাননি
গত সপ্তাহের কলামে আমরা পাঠকের কাছে পেশ করেছি আমাদের কিছু কথা, যেগুলো নির্বাচন কমিশন সমীপে উপস্থাপিত হয়েছে। আজ বিষয়টির ইতি টানা হবে। গত সপ্তাহের কলামে যে বিষয়টি তুলে ধরিনি তা হলো, আমাদের প্র্রাথমিক বক্তব্য বা উপক্রমণিকা কী ছিল? আজ তা দিয়েই শুরু করি। আমাদের প্র্রতিনিধিদলে ১০ জন সদস্য ছিলেন। আমি ছাড়াও ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য শাহজাদা আলম, স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াস এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নূরুল কবির পিন্টু। প্রশ্ন ছিল, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব প্রতিনিধিদলে নেই কেন? আমরা বিষয়টি নিজেরাই উপস্থাপন করেছি।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এস এম আমিনুর রহমান। গত ২৭ আগস্ট রাত ১০টার পর যেকোনো সময় তাকে ঢাকা মহানগরের কোনো না কোনো স্থান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ২৭ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ১৭ দিন। এই ১৭ দিনে আমাদের উপলব্ধি হয়েছে, আমাদের মনে ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে; তাকে কোনো না কোনো সঙ্ঘবদ্ধ গোষ্ঠী বা সংস্থা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই অপহরণ করেছে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে বা ২০১৯ সালের শুরুতেই পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অনুমান করে বলতে চাই, সেই সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর কী চাপ আসতে পারে, তার নমুনা অনেক দিন ধরে অনেকভাবেই পাওয়া যাচ্ছিল। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত আমিনুর রহমানের অপহরণ।

নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা আহ্বান রেখেছি, তফসিল ঘোষণা বহু দূরের ব্যাপার, তার আগেও নির্বাচন কমিশনের তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়োজন দেশের পরিবেশ পরিস্থিতিতে। কারণ নির্বাচন একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক কর্ম, রাজনৈতিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। সেই পরিবেশ যদি ক্রমান্বয়ে ভীতিকর ও অসুস্থ হতেই থাকে, তাহলে নির্বাচনের আগের সময়টিতে সব নির্বাচনী খেলোয়াড় হাসপাতালের আইসিইউতে রোগীর মতো হয়ে যাবেন।

ধারাবাহিকতা রক্ষা
গত সপ্তাহের কলামে (বুধবার ২০ সেপ্টেম্বর) আমরা নির্বাচন কমিশনের সাথে অনুষ্ঠিত সংলাপের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আইটেমের একটি পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরেছি। তা হলো, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি। গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আইটেমের আরেকটির অংশ তুলে ধরেছিলাম। আজ সেই অসম্পূর্ণ আলোচনাকে সম্পন্ন করব এবং তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ আইটেমটি পূর্ণভাবে আলোচনা করব। অসম্পূর্ণ আলোচনাটি ছিল সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে। আমরা স্ট্রাইকিং ফোর্সের তত্ত্বটির বর্তমান অকার্যকারিতা আলোচনা করেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যে রাজনীতিকরণ হয়েছে (আংশিকভাবে হলেও) তার অপকারিতা আলোচনা করেছি, মাস্তান ও ক্যাডার নামক রাজনৈতিক-সৃষ্টিকুলের সাম্প্রতিককালের গুরুত্ব ও দৌরাত্ম্য আলোচনা করেছি, ভোটারদের সামনে কী কী অসুবিধা বা তাদের কোথায় কোথায় নিরাপত্তা দিতে হবে, তা আলোচনা করেছি।

অতএব কী করণীয়?
আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ভোটের অন্তত ১৫ বা ১০ বা আট দিন আগে থেকেই বিস্তীর্ণ জনপদে-জনপদে, গ্রামে-গ্রামে, থানায়-থানায়, মহল্লায়-মহল্লায় যেন মাস্তানমুক্ত ও ক্যাডারমুক্ত পরিবেশ বিরাজ করে। মানুষের মনে যেন স্বস্তি থাকে। মানুষ যেন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে কোনো পন্থা বা মাধ্যম বা অস্ত্র নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া। কিন্তু আমরা নির্দ্বিধায় বলতে চাই, মানসিকতার দিক থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পলিটিসাইজড, দায়িত্ব পালনের দিক থেকে ওভার স্ট্রেচড ও ক্লান্ত, বিদ্যমান পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনী দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা অপরিহার্য।

একটি কঠোর, কঠিন ও অপ্রীতিকর প্রশ্ন
আমরা কঠোর ও কঠিন একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করছি। প্রশ্নটি হলোÑ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে কার কী কী ক্ষতি হবে, সেটা বিশ্লেষণ করা হোক। তখন দেখা যাবে বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে কোটারি স্বার্থ রক্ষাকারীরাই সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিপক্ষে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন সাফল্যের সাথে আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করুক, এটা আমাদের দাবি এবং জাতির প্রত্যাশা। নির্বাচন কমিশনকেও চিন্তা করতে হবে, এই সাফল্য অর্জনে কী কী বাধা থাকতে পারে। যদি কমিশন সেইরূপ বিশ্লেষণ করে, তাহলে আমাদের বিশ্বাস, তারাও একমত হবেন সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে। এ সেনাবাহিনী জনগণের সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়া সেনাবাহিনী। যেকোনো বিপদ-আপদ, সঙ্কটে ও কষ্টে পাশে দাঁড়িয়েছে এ সেনাবাহিনী।

জনগণের ভাগ্য প্রভাবিত করে, রাষ্ট্রের ভাগ্য প্রভাবিত করে, এমন ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ হলো পার্লামেন্ট নির্বাচন। এই কর্মযজ্ঞে জনগণের কল্যাণে কেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যাবে না, এটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। পত্রিকার ভাষ্য মতে, নির্বাচন কমিশনের কেউ কেউ বলেছেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে কি হবে না, এটা কারো চাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। আমরা যেহেতু ‘স্টেকহোল্ডার’ তাই আমাদের দায়িত্ব জনগণের প্রয়োজনে দাবি করা। এই চাওয়া পূরণ করবে কি করবে না, এটা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর। পূরণ করলেও কমিশনকে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে হবে, পূরণ না করলেও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে এই কলামে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের রায়ের ১১৭৮ ও ১১৭৯ নম্বর অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত এবং বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার রায়ের ১৯৩ অনুচ্ছেদের প্রথম অর্ধেকের বাংলা ভাবার্থ তুলে ধরছি। খায়রুল হকের মূল রায়ের অনুচ্ছেদগুলো বাংলা ভাষায় ছিল, তাই উদ্ধৃত করা সহজ; সিনহার মূল রায়ের অনুচ্ছেদগুলো ইংরেজিতে ছিল তাই ভাবার্থ উদ্ধৃত করেছি (হুবহু অনুবাদ নয়)।

বিচারপতি খায়রুল হক : অনুচ্ছেদ-১১৭৮ উদ্ধৃত
‘নির্বাচন কমিশনকে আর্থিকভাবে স্বাধীন করিতে হইবে। ইহাকে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করিতে হইবে। লোকবল নিয়োগে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি করা যাইবে না। নির্বাচন অনুষ্ঠান করিতে সর্বপ্রকার প্রয়োজন নিরসনকল্পে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ লইবেন। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সকল প্রকার সহায়তা সরকারের নির্বাহী বিভাগ ত্বরিত প্রদান করিতে বাধ্য থাকিবেন, অন্যথায় তাহারা সংবিধান ভঙ্গ করিবার দায়ে দায়ী হইবেন। এই ব্যাপারে কোনো তরফে কোনো গাফিলতি দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্যে অভিযোগ উত্থাপন করিবেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ত্বরিত গ্রহণ করিবেন, অন্যথায় তাহারাও সংবিধান ভঙ্গের দায়ে দায়ী হইবেন। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ হইতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত নির্বাচনের সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং নির্বাচন কমিশনের বিবেচনা (ডিসক্রিশন) অনুসারে, যাহারা এমনকি পরোক্ষভাবে জড়িত, রাষ্ট্রের সেই সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকিবেন। নির্বাচন কমিশনারগণ অন্তর্মুখী (ইনট্রোভার্ট) হইবেন না। যতদূর সম্ভব তাহাদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা (ট্রান্সপারেন্সি) বজায় রাখিবেন। সতত মনে রাখিবেন যে, জনগণের নিকটেই তাহাদের জবাবদিহিতা (অ্যাকাউন্টেবিলিটি)। তাহারা সকলে জনগণের সেবক মাত্র। তাহারা কি কাজ করিতেছেন, তাহাও জনগণের জানিবার অধিকার রহিয়াছে, তাহারা কি কাজ করিতে পারিতেছেন না এবং কেন পারিতেছেন না, তাহাও জানিবার অধিকার জনগণের রহিয়াছে। নির্বাচনী আইন বা বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত আইনগত পদক্ষেপ ত্বরিত লইতে হইবে। এ ব্যাপারে কোনোরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন চলিবে না। শৈথিল্য প্রদর্শন করিলে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে আইন অমান্যকারী হইবেন।’

বিচারপতি খায়রুল হক : অনুচ্ছেদ-১১৭৯ উদ্ধৃত
‘শুধু তাহাই নহে, সংবাদমাধ্যম ও আপামর জনসাধারণ তাহাদের অধিকার সম্বন্ধে শুধু ওয়াকিবহাল নয়, সোচ্চার হইতে হইবে। তাহা হইলেই শুধু নির্বাচন কমিশন ও সরকার এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হইবে এবং তাহারা সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকিবেন।’

বিচারপতি সিনহার রায়ের ১৯২ অনুচ্ছেদের ভাবার্থ
খায়রুল হকের নেতৃত্বে যে রায় দেয়া হয়েছিল সেই রায়ে আশা করা হয়েছিল, সরকার বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করবে যে, ওই নির্বাচন কমিশন যেন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার তথা স্বাধীন ও উন্মুক্ত বা পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারে। সেই রায়ে আশা করা হয়েছিল, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্বাচন কমিশনে শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে। এস কে সিনহার নেতৃত্বে প্রদত্ত রায়ে মন্তব্য হচ্ছে, ২০১১ বা ২০১২ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কোনো সরকারই উপরি উক্ত আশাগুলো পূরণের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সিনহার নেতৃত্বে দেয়া রায়ে মন্তব্য হচ্ছে, বিরোধী দলও এ বিষয়টি পার্লামেন্টে বা অন্য কোনো ফোরামে উপস্থাপন করেনি। একই রায়ে মন্তব্য হচ্ছে, সরকার বা বিরোধী দলের এরূপ নিষ্ক্রিয়তা বা নিশ্চুপতার ফল হলো, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অতঃপর ১৯৩ অনুচ্ছেদে দীর্ঘ মন্তব্য আছে; যা পরের অনুচ্ছেদে উল্লেখ করছি।

বিচারপতি সিনহার রায়ের ১৯৩ অনুচ্ছেদের ভাবার্থ
জাতীয় সংসদের নির্বাচন যদি স্বাধীনভাবে, পক্ষপাতহীনভাবে এবং কোনো প্রকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া অনুষ্ঠান করা না যায় বা অনুষ্ঠান করা না হয়, তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা বা গঠন করা সম্ভব নয়। ফলে আমাদের দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং পার্লামেন্ট এখনো শৈশবেই রয়ে গেছে। জনগণ এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস বা আস্থা স্থাপন করতে পারছেন না। যদি এই দু’টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ও সম্মান অর্জন করা না হয়, তাহলে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া জ্ঞানী বা মেধাবী রাজনৈতিক ব্যক্তি পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না এবং এ কারণে পার্লামেন্টের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। পার্লামেন্ট যদি যথেষ্ট পরিপক্ব না হয়, তাহলে ওই অপরিপক্ব পার্লামেন্টের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া বিচার বিভাগের আত্মহত্যার শামিল। এ ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সচেতন ও সাবধান হতে হবে। এই রায়ের উপরের অনুচ্ছেদগুলোতে যেমন উল্লেখ বা আলোচনা করা হয়েছে, পরিপক্ব গণতন্ত্রেও যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং যেখানে পার্লামেন্টের সদস্যরা উন্মুক্ত ও গ্রহণযোগ্যভাবে নির্বাচিত হন, সেখানেও ওই ধরনের পার্লামেন্টগুলো বিচারপতিদের অপসারণের কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে পারেননি।

কেন রায় থেকে উদ্ধৃত করলাম
রায় থেকে উদ্ধৃত করার পেছনে কারণ আছে। আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন বাংলাদেশে (বর্তমানে বাধাপ্রাপ্ত) গণতান্ত্রিক রাজনীতি পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের মনে স্বস্তি আনতে, জনগণকে নির্বাচনমুখী করতে যে পরিবেশ প্রয়োজন, সেই পরিবেশ ইতিবাচকভাবে সৃষ্টিতে অনেক উপাত্ত কাজ করে। আমরা সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীরা বলা এক জিনিস, আর অসাধারণ ব্যক্তিত্বরা বলা আরেক জিনিস। সম্মানিত পাঠক, আপনারা খায়রুল হকের রায় এবং সিনহার রায় থেকে উদ্ধৃত করা অনুচ্ছেদগুলো পড়লে নিজেরাই বুঝতে পারবেন, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরাও নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে কী কী মন্তব্য করেছেন। নির্বাচন কমিশনে যে বক্তব্য তুলে ধরেছিলাম, তা থেকে অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক এ কলামের পাঠকের জন্য উপস্থাপন করছি।

নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও পার্লামেন্ট
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক যে কর্মপরিকল্পনা (১৬ জুলাই ২০১৭) পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা হয়েছে তার পৃষ্ঠা নম্বর ৭-এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শুধু নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়ালে চলবে না। বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল বা ভঙ্গুর বা স্পর্শকাতর। নির্বাচনী ব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল হয়নি। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১০ মে ২০১১ সালে সংক্ষিপ্ত মৌখিক রায়ের মাধ্যমে আদেশ দিয়েছিলেন দশম ও একাদশ পার্লামেন্টের নির্বাচন ত্রয়োদশ সংশোধনী মোতাবেক তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, পার্লামেন্ট চাইলে প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার বিধান বাদ দেয়ার জন্য সংশোধনী আনতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পার্লামেন্ট সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশের দেড়-দুই মাসের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন করে ফেলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় মৌখিক সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশের তারিখ থেকে প্রায় ১৬ মাস পর প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সংক্ষিপ্ত মৌখিক রায় ও লিখিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যে দু-একটি জায়গায় অতি গুরুত্বপূর্ণ তফাত রয়ে গেছে। অর্থাৎ, সংক্ষিপ্ত রায়ে যে কথা বা যে বাক্যগুলো আছে, সেই বাক্যগুলো হুবহু বা তার মর্ম লিখিত রায়ে নেই, বরং সাংঘর্ষিক বক্তব্য আছে। কোনো অবস্থাতেই একটি রায়ে এরূপ অসঙ্গতি গ্রহণযোগ্য নয়, কাম্য নয়। এরূপ অসঙ্গতির বিহিত কী হবে বা না হবে সেটা বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলতে পারবেন। কিন্তু সেই মৌখিক-সংক্ষিপ্ত ও লিখিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন বা পক্ষপাতমূলক বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান রাজনৈতিক সরকারই দায়ী, যাতে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। রাজনৈতিক সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তথা বিতর্কিত আইনগুলো নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার পথে বাধা বলে আমরা বিবেচনা করি।

পার্লামেন্ট ভাঙা নিয়ে আমাদের বক্তব্য
নির্বাচনের আগেই পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে। একজন সিটিং পার্লামেন্ট মেম্বার যেসব প্রটোকল পান, যেসব ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগ করেন, সেসব প্রটোকল, ক্ষমতা বা সুবিধা কারো মুখের কথায় ছেড়ে দেয়ার মতো নয়। অতএব নির্বাচনী খেলার মাঠ সবার জন্য সমানভাবে উপভোগ্য বা ব্যবহারযোগ্য করতে হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতেই হবে। বর্তমান পার্লামেন্টের অনেক সদস্যই আগামী নির্বাচনেও প্রার্থী হবেনÑ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এমন কোনো পন্থা বা ক্ষমতা আছে বলে প্রমাণিত হয়নি, যার মাধ্যমে সিটিং এমপিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য শুধু বস্তুগত সহায়তাই যথেষ্ট নয়, নীতিগত সহায়তা ও নৈতিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান আইন বা বিধান সংশোধন করে হোক বা নতুন বিধান সংযুক্ত করে হোক, নির্বাচন কমিশনের জন্য বা নির্বাচন কমিশনের প্রতি বন্ধুপ্রতিম ও শুভেচ্ছাপ্রতিম এমন একটি সরকার বাংলাদেশে প্রয়োজন। এটাকে তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকার বলা যায়, নিরপেক্ষ সরকার বলা যায়, নির্দলীয় সরকার বলা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বলা যায়। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সেই সরকারের বৈশিষ্ট্য হতে হবে অন্ততপক্ষে চারটি। এক. রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে। দুই. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রভাব বিস্তারের সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষমতা বা সূত্র বা মাধ্যম বা পন্থা রহিত থাকতে হবে। তিন. সরকারের সদস্যদের কোনো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা থাকতে পারবে না। চার. সরকারের প্রধানতম কাজ হবে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা দেয়া এবং সহায়তার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তাই করবে। নির্বাচন কমিশনের চাওয়া কোনো সহায়তার ব্যাপারে তারা নেতিবাচক উত্তর দিতে পারবেন না।

নির্বাচন কমিশনও একটি ‘স্টেকহোল্ডার’
রাজনৈতিক দলগুলো স্টেকহোল্ডার বিধায় নির্বাচন কমিশনের দাওয়াতে গিয়ে বক্তব্য দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন মত প্রকাশ করতেই পারে; এটা তাদের স্বাধীনতা বা এখতিয়ার। তবে সবার প্রস্তাব শোনা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়ক বলে আমরা বিবেচনা করি। কোন প্রকারের সরকার হবে, সেটা স্থির হবে পার্লামেন্টের আইন দিয়ে। ওই আইনের বক্তব্য কী হবে, সেটা নির্ধারণ করার জন্য স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেয়া প্রয়োজন। দলগুলোকে স্টেকহোল্ডার বিবেচনা করে বিভিন্ন দিনে নির্বাচন কমিশন যেমন মতবিনিময় সভায় দাওয়াত দিয়েছে, তেমনি পার্লামেন্টে আইন প্রণয়নের আগে নির্বাচন কমিশনকেও স্টেকহোল্ডার বিবেচনা করে পার্লামেন্টের কাছে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করার অধিকার ও প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমরা মনে করি।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি মনে করে, যেভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার বিদ্যমান এবং দায়িত্ব পালন করছে, সেভাবে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কষ্টকর ও অসুবিধাজনক হবে। কোনো একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের পক্ষে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা এবং না করলে আইনগত সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি সম্বন্ধে আমরা অবহিত থেকেই আবেদন করছি তথা প্রস্তাব করছি। নির্বাচন কমিশন এমন সুপারিশ করবে যেন আমরাসহ সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বিশেষত প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ জন্য উপযুক্ত সরকারব্যবস্থা উদ্ভাবনে নির্বাচন কমিশন ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ই-মেইল : mgsmibrahim@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫