ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

সু চিও সহিংস বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের পথে হাঁটছেন

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৪:২২


প্রিন্ট
সু চিও সহিংস বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের পথে হাঁটছেন

সু চিও সহিংস বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের পথে হাঁটছেন

বুদ্ধের বাণী ও রোহিঙ্গা বাস্তবতা
 
 

এরফান শাহ


গৌতম বুদ্ধের বাণী ‘জীব হত্যা মহাপাপ’। তাহলে কার সন্তুষ্টির জন্য রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে? বুদ্ধের দর্শন ‘পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক’। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে কিভাবে সুখ নিশ্চিত হতে পারে? ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ বুদ্ধের এ বাণীর সাথে পৈশাচিকতা কিভাবে সমান্তরালভাবে চলতে পারে? ওকূলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদস্যু আর একূলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলিম। এ হচ্ছে নাফ নদীর দুই কূলের চিত্র, পার্থক্য ও চরিত্র।


প্রায় ২২ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন রাজ্য আরাকানে প্রায় দুই শ’ বছর মুসলমানদের শাসন ছিল। আরাকান বহু শতাব্দী ধরেই রোহিঙ্গা মুসলমান, রোসাঙ্গ হিন্দু আর মহাযানি বৌদ্ধদের মাতৃভূমি। মধ্যযুগে এ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা চন্দ্র-রোসাং আর মুসলমানরা রোহাং নামে পরিচিত ছিল। হিন্দু চন্দ্র রাজারা এবং মুসলিম সুলতানরা ছিলেন আঠারো শতকের আগ পর্যন্ত আরাকানের শাসক। রাখাইন উপকূল থেকে বর্মি অধ্যুষিত মিয়ানমার পাহাড় দিয়ে বিচ্ছিন্ন। বর্মি রাজারা প্রায়ই এ অঞ্চলে হামলা করতেন। প্রাচীন সভ্যতায় সমৃদ্ধ আরাকানের বিপর্যয়ের শুরু মূলত ১০৪৪ থেকে ১০৭৭ খ্রিষ্টাব্দে বার্মার রাজা আনাওরথার আগ্রাসনের সময়ে।

তিনি হাজার হাজার স্থানীয় রোসং, রোহাং এবং রেকং বা রাখাইনকে হত্যা করেন; দেশত্যাগী হয় লাখ লাখ আরাকানি। চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা, রাখাইন, মারমাসহ অনেক জনগোষ্ঠী সে সময় দেশত্যাগী হয়ে বাংলাদেশে বসত গড়ে। রাজা আনাওরথাই স্থানীয় বৌদ্ধ মতবাদ হটিয়ে থেরাভেদা বৌদ্ধ মতবাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। গৌড়ের সুলতানদের সহযোগিতায় আরাকানের সম্রাট নরমেখলা ২৪ বছর বাংলায় নির্বাসিত থাকার পরে ১৪৩০ সালে আরাকানের সিংহাসন ফেরত পান।

তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে আরাকানি রাজারা বাঙালি ও মুসলমানদের আরাকানের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। সুতরাং আরাকানের রোহিঙ্গাদের বাঙালি বা মুসলমান যাই বলা হোক না কেন, তারা কোনোভাবেই বহিরাগত নয়। বরং ১৭৮৫ সালে আরাকান দখলকারী বর্মিরাই হলো বহিরাগত। বাঙালি তথা বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে। তাই বলে কি তারা বাংলাদেশী? এ তথ্য বিশ্বদরবারে তুলে ধরা সবার দায়িত্ব।

যার যার অবস্থান থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতিবাদ করতে হবে। আরাকানের প্রকৃত ইতিহাস এবং বর্তমান চিত্র বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে। আয়তনের তুলনায় ঘনবসতিপূর্ণ ও জনবহুল বাংলাদেশ। সরকার মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, যা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। রোহিঙ্গারা যেন নিজ দেশে ফিরে গিয়ে স্বাধীনভাবে নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারে, সেজন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকেই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে।


রোহিঙ্গারা অর্ধশতাব্দী ধরে বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান হতে পারে আরাকানের স্বাধীনতা অন্তত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে। বিষয়টি জাতিসঙ্ঘ তথা আন্তর্জাতিক মহলকে বুঝতে এবং বোঝাতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিষয়টি বিশেষ করে চীন, রাশিয়া ও ভারত এবং সার্ক, আসিয়ান, আরবলিগ, ওআইসি, জাতিসঙ্ঘ তথা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তুলে ধরতে হবে। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে প্রতিবেশী দেশ এবং মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে নেতৃত্ব দিতে হবে। দেশের মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন রয়েছে মজলুম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি। অতএব, এ ইস্যু এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।


ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরাকান দখলের পর বর্মি শাসকেরা হিন্দু ও মুসলিম অধিবাসীদের প্রতি শত্রুতা শুরু করেছিলেন। এ বৈরিতা কমেছিল ব্রিটিশদের হাত থেকে মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রপন্থীদের শাসনের সময়। বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট উ নু রোহিঙ্গাদের আরাকানের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে বার্মার প্রথম সংবিধানসভার নির্বাচনে তারা ভোট দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে বার্মা স্বাধীন হওয়ার পর রোহিঙ্গারা সে দেশের সংসদে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৫১ সালে তারা পায় আরাকানের অধিবাসী হিসেবে পরিচয়পত্র। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের আরাকানের জাতিগোষ্ঠী বলে অভিহিত করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শাও সোয়ে থাইক বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা যদি স্থানীয় আদিবাসী না হয়, তাহলে আমিও তা নই’। কিন্তু নে উইনের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের মহাকাব্য। তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হলো। বন্ধ হয়ে যায় রোহিঙ্গা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার। শুরু হয় ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ নামে রোহিঙ্গাবিতাড়ন কর্মসূচি। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন চলে আসছে। 


২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের সময় সে সময়কার প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ঔদ্ধত্যের সাথে বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বিতাড়নই এ সমস্যার সমাধান।’ রাখাইন রাজ্য তথা সাবেক আরাকান রোহিঙ্গাশূন্য করা তাদের রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা করা হয় না। নাগরিক অধিকার ও ভোটের অধিকার নেই তাদের।

বাঁচা-মরা, বিবাহ ও সন্তানধারণ, চাকরি, ভ্রমণ, লেখাপড়া, ব্যবসায়বাণিজ্য ও চলাফেরা সবই সামরিক শাসকদের নিয়ন্ত্রণাধীন। মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ উগ্রপন্থীরা রোহিঙ্গাদের বিনাশ চায়। গৌতম বুদ্ধের বাণী ‘বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি’র বাস্তবায়ন রোহিঙ্গারা পায় না বিধায় তারা আজ আমাদের দুয়ারে এসেছে শরণার্থী হয়ে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়; শান্তিতে নোবেল বিজয়ী, ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ খ্যাত অং সান সু চিও সহিংস বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের পথে হাঁটছেন। রোহিঙ্গা বিতাড়নের পরোক্ষ হলেও সমর্থক তিনি। কবি আবুল হাসানের ভাষায় বলতে হয়, ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসঙ্ঘ আমাকে নেবে না।’


এ নশ্বর পৃথিবীতে কোনো কিছুই অমর বা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি উজির, সচ্ছল, ক্ষমতাবান, হতে পারেন কাল উনিই ফকির, নিঃস্ব, অসহায়। অপরের দুঃখে যদি আমরা দুঃখিত হতে না পারি, অপরের ব্যথায় যদি ব্যথিত হতে না পারি, মানুষের বিপদে যদি আমরা পাশে না দাঁড়াই, তাহলে এত আয়োজন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও মানবতাÑ সবকিছু বৃথা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, ‘তুমি পিতৃহীনের প্রতি কঠোর হয়ো না এবং ভিক্ষুককে ধমক দিয়ো না’। হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘যে মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহ পাক তাকে দয়া করেন না’Ñ বুখারি ও মুসলিম। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যদি অর্ধেক খেজুর দান করে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পার, তবুও বাঁচ। যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে সে যেন ভালো কথা বলে বাঁচে’Ñ বুখারি ও মুসলিম। হাদিসে বর্ণিত আছে, কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক মহিলা জান্নাতে গিয়েছেন। বিড়ালকে নির্যাতন করার অপরাধে অন্য এক মহিলা জাহান্নামে গিয়েছেন। 


e-mail:arfanshah0@yaoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫