ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় কত দিন

কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৭:৫৪


প্রিন্ট

শিক্ষার্থী মূল্যায়নের জন্য প্রশ্ন প্রণয়নের গুরুত্ব অপরিহার্য। আমাদের দেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষা পূর্ববর্তী স্তরে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা মুক্ত প্রশ্নের মাধ্যমে করা হয়। এই ব্যবস্থা হলো কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন প্রণয়ন ব্যবস্থা। যাকে আমরা সৃজনশীল প্রশ্ন বলে জানি। এর দু’টি অংশ রয়েছে, ব্যাখ্যামূলক অংশ এবং নৈর্ব্যক্তিক অংশ। ব্যাখ্যামূলক অংশ হলো রচনামূলক অংশ। এই অংশটি সৃজনশীল প্রশ্ন হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন মহলে। ব্যবহারিক বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে ৭০ নম্বর রচনামূলক প্রশ্ন যা বিভিন্ন পরীক্ষক কর্তৃক মূল্যায়ন করা হয়। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এ অংশ মূল্যায়নের জন্য ১১ দিন সময় নির্ধারিত। এই সময়ের মধ্যে একজন পরীক্ষক তাকে প্রদেয় সব উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে প্রধান পরীক্ষকের নিকট প্রেরণ করেন। অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিধান রয়েছে।

উত্তরপত্রের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৯০০টি বা ততধিক। বিভিন্ন পরীক্ষক তার জন্য নির্ধারিত সংখ্যার বাইরেও উত্তরপত্র সংগ্রহ করেন বলে সংখ্যার তারতম্য রয়েছে। গড়ে প্রায় ৫০০টি উত্তরপত্র একজন পরীক্ষককে মূল্যায়ন করতে হয়। বিবেচনার বিষয় হলো ৫০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য সঠিক সময় কত দিন? বিভিন্ন পরীক্ষকের সাথে আলাপ করে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ২৫টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা যায়। দৈনিক ২০টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হলে ৫০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য সময়ের দরকার অন্তত ২৫ দিন। আবার যদি দৈনিক ২৫টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয় তাহলে সময় লাগে ২০ দিন। শিক্ষা বোর্ড ১১ দিনের যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে কোনো অবস্থায়ই ওই সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে প্রধান পরীক্ষকের নিকট প্রেরণ করা সম্ভব নয়। যদি প্রেরণ করা হয় তাহলে মূল্যায়নের মান সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে যায়।

উত্তরপত্র মূল্যায়ন করার জন্য প্রত্যেক পরীক্ষককে দুই ধরনের কাজ করতে হয়। কভার পৃষ্ঠার কাজ এবং প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়ন। কভার পৃষ্ঠার কাজ হলো বিষয় কোড, পরীক্ষক কোড, উত্তরপত্রের ক্রমিক নম্বর, অতিরিক্ত উত্তরপত্রের সংখ্যা প্রাপ্ত নম্বর কভার পৃষ্ঠার দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশে লিপিবদ্ধকরণ, দ্বিতীয় অংশের বৃত্ত কালো কালির বলপয়েন্ট কলম দ্বারা ভরাট করা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের পর প্রতিটি প্রশ্ন উত্তরে প্রাপ্ত নম্বর কভার পৃষ্ঠার তৃতীয় অংশে লিখা। দ্বিতীয় কাজটি হলো উত্তর নির্দেশনা অনুসারে মূল্যায়ন করা।

উত্তরপত্রের ক্রমিক নম্বর ডিজিট, পরীক্ষর কোড ডিজিট, বিষয় কোড ডিজিট, অতিরিক্ত উত্তরপত্র ডিজিট, প্রাপ্ত নম্বর ডিজিট মিলে ১৫টি। এই ১৫টি সংখ্যা কভার পৃষ্ঠায় দুইবার লিখতে হয় এবং একবার এই ১৫টি বৃত্ত ভরাট করতে হয়। প্রধান পরীক্ষকের কোড ডিজিট কভার পৃষ্ঠার দুই অংশে আটটিসহ মোট ডিজিট ২৩টি কভার পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করতে হয়। পরীক্ষকের দু’টি স্বাক্ষর তো আছেই। কভার পৃষ্ঠার খাতার অংশে প্রতিটি প্রশ্নের প্রাপ্ত নম্বর ডিজিট দুই থাকলে সাতটি প্রশ্নের জন্য ১৪টি ডিজিট এবং প্রাপ্ত নম্বরের যোগফল ডিজিট দু’টিসহ মোট ১৬টি ডিজিট এ অংশে লিখতে হয়। এভাবে হিসাব করে দেখা যায় শুধু কভার পৃষ্ঠার কাজ সমাপ্ত করতে তিন মিনিট সময় ব্যয় হয়। প্রতিটি উত্তরপত্র মূল্যয়নের জন্য যদি ১৫ মিনিট সময় ব্যয় হয় তাহলে মোট সময় ১৮ মিনিট ব্যয় হয় প্রতিটি উত্তরপত্রের মূল্যায়ন শেষ করতে। এ হিসাবে ৫০০ উত্তরপত্র মূল্যায়নে ৯ হাজার মিনিট ব্যয় হয় অর্থাৎ ১৫০ ঘণ্টা। যদি ১১ দিনে প্রধান পরীক্ষকের নিকট উত্তরপত্র পৌঁছাতে হয় তাহলে দৈনিক সাড়ে তের ঘণ্টা খাতার কাজ করতে হবে। তাহলে প্রশ্ন জাগে তিনি তার কর্মস্থলে কখন কাজ করবেন? উত্তরে বলা যায়, হয় তিনি এ সময় কর্মস্থলে গমন করবেন না, না হয় তিনি তার জন্য নির্ধারিত রুটিন অনুসারে অফিসিয়াল বা পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য যেমন শ্রেণিকক্ষে বক্তৃতা প্রদান বা লেকচার তৈরি প্রভৃতি কর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখবেন। তা ছাড়া দৈনিক সাড়ে তের ঘণ্টা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলে তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয় কি না তা বিবেচনার দাবি রাখে।

বর্তমানে মুক্ত প্রশ্নের যুগের আগে যখন বদ্ধ প্রশ্নপদ্ধতি ছিল তখন প্রতিটি প্রশ্ন-উত্তর মূল্যায়নের পর প্রশ্ন-উত্তর শুরুর বাম দিকে দুই ডিজিটের মার্কস প্রদান করা হতো। যেমন ০০, ০৫, ১০, ১৫ প্রভৃতি। কিন্তু কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপদ্ধতি চালু হওয়ার পর প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়ন করার পর প্রতিটি বর্ণসংবলিত প্রশ্ন-উত্তরের পাশে ০১, ০২, ০৩, ০৪ বা ০০ প্রভৃতি লিখতে হয়। চারটি উত্তরের আটটি ডিজিট আবার এই আটটি ডিজিট উত্তর শুরুর বামে যোগ করে দেখাতে হয়। যেমন ০১+০২+০৩+০৪=১০ অর্থাৎ একজন পরীক্ষক কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়নের পর মার্কস প্রদান করতে গিয়ে মোট ২২টি ডিজিট লিখতে হয়।

কভার পৃষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করতে যদি তিন মিনিট এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে ১৫ মিনিট তাহলে সময় ব্যয় হয় ১৮ মিনিট। প্রতিটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে কলমের যে ২২ বার ব্যবহার করতে হয় তাতে সময় ব্যয় হয় ১৭ সেকেন্ড। সাতটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে দুই মিনিট সময় ব্যয় হয়। তাই প্রতিটি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে ২০ মিনিট সময় লাগবে এই হিসাবে এক ঘণ্টায় তিনটি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা যায়। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষকের সাথে আলোচনা করে জানা যায় পরীক্ষকেরা দৈনিক শিডিউল কাজের বাইরে অতিরিক্ত চার ঘণ্টা যদি খাতার কাজে ব্যয় করেন তাহলে উত্তরপত্র ধীরস্থিরভাবে মূল্যায়ন করা যায় এবং এতে পরীক্ষকদের মানসিক চাপ কম থাকবে। প্রতি ঘণ্টায় তিনটি হিসাবে চার ঘণ্টায় ১২টি উত্তরপত্রের কাজ করা যায়। এ ক্ষেত্রে ৫০০টি উত্তরপত্রের জন্য সময় ব্যয় হবে ৪১ দিন এবং ৩০০টির জন্য ২৫ দিন।
দেখা যায় শিক্ষকেরা কভার পৃষ্ঠায় তিন মিনিটের কাজের জন্য কখনো স্ত্রী, কখনো সন্তান, কখনো প্রতিবেশীদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া সন্তান কখনো নিজ নিজ ছাত্রছাত্রীর দ্বারে যান। তাই প্রতিটি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য ২০ মিনিট থেকে তিন মিনিট বিয়োগ করলে যে ১৭ মিনিট সময় পাওয়া যায় তা হলো পরীক্ষক কর্তৃক প্রতিটি উত্তরপত্রের জন্য ব্যয়িত সময়। ফলে এক ঘণ্টায় তিনটিরও বেশি বা চারটি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা যায়। দৈনিক চার ঘণ্টা এ কাজে ব্যয় করলে ১৬টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা যায়। ফলে ৫০০টি উত্তরপত্রের জন্য প্রায় এক মাস এবং ৩০০টি উত্তরপত্রের জন্য ১৯ দিন সময় দরকার হয়।

কিন্তু বোর্ড কর্তৃক বেঁধে দেয়া ১১-১২ দিনের মধ্যে উত্তরপত্র প্রধান পরীক্ষকের কাছে প্রেরণ করতে হলে একজন পরীক্ষকে দৈনিক ১০-১১ ঘণ্টা কাজ করতে হয় ৫০০টি উত্তরপত্রের ক্ষেত্রে আর দৈনিক ছয় ঘণ্টা কাজ করতে হয় ৩০০টি উত্তরপত্রের ক্ষেত্রে। বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক এবং উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় কি না তাতে প্রশ্ন থেকে যায়।

লেখক : শিক্ষক নেতা, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি
ই-মেইল: kazimain@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫