ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

মধ্যপ্রাচ্য

কুর্দি গণভোট নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো কেন এতো উদ্বিগ্ন?

নয়া দিগন্ত অনলাইন

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১০:২০ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১০:৩৭


প্রিন্ট
ইরাক ছাড়াও তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া, আর আর্মেনিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে কুর্দিরা বাস করে

ইরাক ছাড়াও তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া, আর আর্মেনিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে কুর্দিরা বাস করে

ইরাকি কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নে সেখানে রোববার এক গণভোট হতে যাচ্ছে। যেহেতু ইরাক ছাড়াও আশপাশের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে আছে - তাই এ গণভোটকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

কেন এই উৎকণ্ঠা, আর কুর্দিরাই বা কেন নিজেদেরকে অন্যদের চাইতে আলাদা বলে মনে করে?

ইরাক ছাড়াও তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া, আর আর্মেনিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে কুর্দিরা বাস করে। তাদের সংখ্যা আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটির মতো।

মধ্যপ্রাচ্যে তারা চতুর্থ বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী, কিন্তু তারা কখনোই তাদের নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি।

কুর্দরা হচ্ছে মেসোপোটেমিয়ার সমভূমি আর পার্বত্য এলাকাগুলোর আদি বাসিন্দা।

এই এলাকা এখন ভাগ হয়ে গেছে নানা দেশের মধ্যে - দক্ষিণপূর্ব তুরস্ক, উত্তর পূর্ব সিরিয়া, উত্তর ইরাক, উত্তর পশ্চিম ইরান, আর দক্ষিণ পশ্চিম আর্মেনিয়া।

তারা একই নৃগোষ্ঠী, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ভাষার বন্ধনে আবদ্ধ। কুর্দিদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম, তবে অন্য ধর্মের লোকও আছে।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই স্বাধীন কুর্দিস্তানের দাবি উঠতে শুরু করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে পশ্চিমা দেশগুলোর করা ১৯২০ সালে সেভরেস চুক্তিতে কুর্দি রাষ্ট্রের কথা ছিল।

কিন্তু তিন বছর পর লুজান চুক্তিতে যে আধুনিক তুরস্কের মানচিত্র তৈরি হলো - তাতে কুর্দি রাষ্ট্রের ধারণা বাদ পড়লো। কুর্দি এলাকাগুলো একাধিক দেশে ভাগ হয়ে গেল এবং কুর্দিরা হয়ে গেল সংখ্যালঘু।

এর পর কুর্দিরা যখনই কোথাও স্বাধীনতার চেষ্টা করেছে, তাদের সেই আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে।

সিরিয়ার কুর্দি সংগঠনগুলো ইসলামিক স্টেটের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। কিন্তু আইএস বিরোধী যুদ্ধে তুরস্ক তাদের সহযোগিতা করছে না। কারণ তুরস্ক রাষ্ট্র এবং সেদেশের ১৫-২০ শতাংশ কুর্দিদের মধ্য গভীর অবিশ্বাস ও বৈরিতা রয়েছে।

১৯৭৮ সালের আবদুল্লা ওচালান পিকেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তার লক্ষ্য ছিল তুরস্কের কুর্দিদের জন্যএকটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ছয় বছর পর সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হলে তাতে ৪০ হাজার লোক নিহত এবং লক্ষ লক্ষ লোক গৃহচ্যুত হয়। তবে এখন পিকেকে স্বাধীনতার পরিবর্তে স্বায়ত্বশাসন চাইছে। তবে যুদ্ধবিরতি হলেও লড়াই পুরোপুরি থামেনি।

তুরস্কে ১৯২০ এবং ১৯৩০ দু'বার কুর্দি অভ্যুত্থানের পর এখন সেখানে কুর্দি নাম ও পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়, কুর্দি ভাষার ব্যবহার সীমিত করা হয়। এমনকি কুর্দিদের আর কুর্দি বলে ডাকা হয় না তাদের বলা হয় 'পাহাড়ি তুর্কি' বলে।

কুর্দিরা মনে করে তুরস্ক তাদেরকেই আসল শত্রু বলে মনে করে, ইসলামিক স্টেটকে নয়।

সিরিয়ায় কুর্দিদের সংখ্যা জনসংখ্যার ৭ থেকে ১০ শতাংশ। এখানকার কৃর্দি নেতাদের কথা হলো সিরিয়া সমস্যার সমাধান করতে হলে তাতে কুর্দিদের অধিকার এবং স্বীকৃতি থাকতে হবে।

ইরাকেও কুর্দিদের সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মতো। সেখানে কুর্দিদের সশস্ত্র লড়াই প্রথম শুরু হয় ১৯৬১ সালে। এর পর ১৯৭০ সালে তাদের কার্যত স্বায়ত্বশাসন দেয়া হয় কিন্তু তা অচিরেই ভেঙে পড়ে। সত্তরের দশকে কুর্দিদে বিভিন্ন এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে আরবদের বসতি স্থাপন করানো শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় কুর্দিরা ইরানকে সমর্থন দেয়।

আর তার পর সাদ্দাম হোসেন তার প্রতিশোধ নেন নির্মম অভিযান চালিয়ে। দুটি কুর্দি বিদ্রোহ দমন করা হয় ১৯৮৮ এবং ১৯৯১ সালে, এর পর মার্কিন মিত্ররা সেখানে নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু তার পরও ১৯৯৪ সাল থেকে অভ্যন্তরীন সঙ্ঘাত চলতেই থাকে। তবে ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর ইরাকের তিনটি প্রদেশ - ইরবিল, ডোহুক ও সুলাইমানিয়ায় - কুর্দিরা আঞ্চলিক সরকার গঠন করে সর্বোচ্চ স্বায়ত্বশাসন ভোগ করছে।

ইসলামিক স্টেট ২০১৪ সালে উত্তর ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিলে কুর্দি আঞ্চলিক সরকার পেশমার্গা যোদ্ধাদের কুর্দি এলাকাগুলোয় সৈন্য পাঠায়। সে সময় থেকেই কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার গণভোটের কথা ওঠে কুর্দি পার্লামেন্টে। ২০০৫ সাল থেকে ইরাকি কুর্দিস্তানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারজানি বলছেন, এ গণভোটের ফল মানতেই হবে তা নয়।

ইরাকি কুর্দিস্তানের নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, এবং সেনাবাহিনী আছে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের আছে তেল। তবে আশপাশের দেশে থাকা সব কুর্দিদের নিয়ে একটি দেশ গঠনের স্বপ্ন অনেক কুর্দিই দেখে থাকেন, তবে সেরকম কিছু কায়েম করার বাস্তবতা যে এখন নেই এটাও বোঝেন তারা।

কুর্দিস্তানে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের আগে তুরস্ক এবং ইরান সীমান্তে সামরিক মহড়া শুরু করেছে।

তুরস্ক এবং ইরান এই গণভোটের তীব্র বিরোধী কারণ এই দুই দেশের আশঙ্কা তাদের দেশের কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব পড়বে।

কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে সব ব্যবস্থা নেবে তুরস্ক : ইলদিরিম
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে পরিকল্পিত গণভোট অনুষ্ঠিত হলে তার দেশ ওই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ঠেকাতে সব ব্যবস্থা নেয়ার পথ খোলা রেখেছে। এমনকি প্রয়োজনে আঙ্কারা সীমান্ত অতিক্রম করে সামরিক অভিযান চালাবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

শনিবার আঙ্কারায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী। তুরস্ক সীমান্ত অতিক্রম করে সামরিক অভিযান চালাবে কি না- একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে তাতে তা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

এ দিকে তুরস্কের পার্লামেন্ট দেশটির সরকারকে ইরাক এবং সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর অনুমোদনের মেয়াদ বাড়িয়েছে। ২০১৫ সালে প্রথমবার এই ম্যান্ডেট দেয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে ইরাকের কুর্দিস্তান সীমান্তে সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছে তুরস্ক।

অন্য দিকে ইরাকের কুর্দিস্তানের গণভোট কাউন্সিলের সদস্য হোশিয়ার জেবারিয়া বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়েই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং এটি স্থগিত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।

ইরাক থেকে কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে ওই অঞ্চলে আজ ২৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কুর্দিস্তান স্বশাসন কর্তৃপক্ষ বদ্ধপরিকর।

এ দিকে ইরাকের কুর্দিস্তানে স্বাধীনতার ওপর গণভোট অনুষ্ঠানে ঠিক আগে ওই অঞ্চলসংলগ্ন ইরানি সীমান্তে সামরিক মহড়া চালিয়েছে ইরানে সেনাবাহিনী। কুর্দিদের এ গণভোট অনুষ্ঠান নিয়ে গোটা অঞ্চলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুর্দিস্তানের জনগণ ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল এবাদি একাধিকবার এই গণভোট স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরাকের তিন প্রতিবেশী দেশ ইরান, তুরস্ক ও সিরিয়াসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এই গণভোটের বিরোধিতা করেছে। তবে কুর্দি নেতারা এ গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন বলে জানা গেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫