ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

নারী

মাহির দুঃখগাথা

ওমর ফারুক

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের প্রবেশপথ শাহ আমানত সেতু এলাকা। তার একটু পশ্চিমে কয়েক শ’ গজ গেলে ভেড়া মার্কেট। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শ্রমিক কলোনির ঝুপড়িতে বসে লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত খাচ্ছিলেন ১৯ বছর বয়সী মাহি। সমাজে তার পরিচয় হিজড়া। অপরিচিত লোক দেখে তিনি তা লুকানোর চেষ্টা করেন। যেন কোনো অপরাধ করেছিলেন তিনি। পাশে গিয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর তিনি কেঁদে ফেললেন অঝোর ধারায়। তিনি বলেন, ‘ভাই আমাকে বাঁচান, মনে হয় না খেয়ে মরব।’
মাসে দুই হাজার টাকায় ভেড়া কলোনির ঝুপড়ি একটি ঘরে বসবাস করছে মাহি। অমাবস্যায় কর্ণফুলী নদীর পানি বাসায় ঢুকে টয়টম্বুর হয়। অন্ধকার ঝুপড়িঘরটিতে কয়েকটি রঙিন জামা-কাপড় ছাড়া বলতে গেলে কিছুই নেই। ১০ বছর বয়সে সম্ভ্রান্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মাহিকে মা-বাবা ও ভাইবোন সমাজের নিষ্ঠুরতার কাছে হার মেনে দূরে ঠেলে দেয়। কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যার টেক এলাকায় তার সমলিঙ্গদের (হিজড়া) সাথে জায়গা হয়। এসব কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন মাহি। তার জীবনের কথা শোনালেন এ প্রতিবেদককে।
মাহির পরিবর্তন
কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকার মুহাম্মদ ইউসুফের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সন্তান মাহি। ছেলে হয়ে জন্ম নেয়া মাহি শার্ট-প্যান্ট পরে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। ছেলে হিসেবে জন্ম নিলেও ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের কাপড় পরতে ভালো লাগত, মেয়েদের সাথে মিশতে ভালো লাগত। এ জন্য তার ভাই ও বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাকে অনেক মারধর খেতে হয়েছে। তার বয়স যখন সাত বা আট বছর তখন থেকেই তার হাঁটা-চলা মেয়েদের মতো হতে থাকে। যত বয়স বাড়তে থাকে সে উপলব্ধি করে সে অন্যদের থেকে আলাদা। তখন সে বিষণœতায় ভুগত আর ভাবত তার মতো আর কেউ নেই। মাহি বলছিলেন, এর একপর্যায়ে তিনি ১০ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে যোগ দেন অন্যান্য হিজড়াদের সাথে।
বাঁধন ছাড়া
২০০৮ সালের এক সকালে পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর মাত্র ১০ টাকা নিয়ে কুমিল্লা থেকে ট্্েরনে করে চট্টগ্রামে ষোলশহর রেল স্টেশনে পৌঁছে সে। সেখানে দেখা হয় তার মতো স্বভাবের কয়েকজনের সঙ্গে। তারা তাকে নিয়ে যায় কর্ণফুলী থানার মজ্জ্যারটেক এলাকায়। সেখানে ৯ জন হিজড়ার সঙ্গে তার শুরু হয় জীবনের আরেকটি অধ্যায়। ছল্লা (ভিক্ষা) করে, নেচে-গেয়ে প্রতিদিন যা পাওয়া যায় তার অর্ধেক নিয়ে যায় গুরুমা, বাকি টাকা দিয়ে চলে নিজের জীবন। মাহি জানান, নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর পরিবারের কেউ খবর রাখেনি। গত ৯ বছরে তর তিন ভাই মোহাম্মদ রনি, মোহাম্মদ রুবেল ও ফারহাদের বিয়ে হয়। বিয়েতে পাননি দাওয়াতও। ছোট বোন মাহিন প্রায় সময় ফোন করে মায়ের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলেও নানা কারণে পরিবার নিয়ে থাকার সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িতে বেশ কয়েকবার গেলেও পাষণ্ড বড় ভাইয়েরা তাকে বাড়িতে না আসতে নির্যাতন চালায়। মাহি বলেন, আমরা হিজড়ারা পরিবার-পরিজনের কাছে ডাস্টবিনের ময়লার মতো। তিনি বলেন, আমাদের ভোটাধিকার নেই। সম্পত্তির কোনো অধিকার নেই, কোথাও গ্রহণযোগ্যতা নেই। সমাজ আমাদের মেনে নেয় না। আমার জন্য ভাইবোনেরাও সমাজে মুখ দেখাতে পারে না।
মাহির ইচ্ছে ও কষ্ট
মাহি তার ইচ্ছেগুলো অধরা প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে খুব ইচ্ছে ছিল পড়ালেখা শেষ করে পুলিশের চাকরি নেবো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ব। কিন্তু স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকদের অসহযোগিতার কারণে পঞ্চম শ্রেণীতে বন্ধ হয়ে যায় পড়ালেখা।
তিনি বলেন, আমাদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। গণপরিবহনে যাত্রীরা আমাদের পাশ থেকে উঠে যায়। খাবার দোকানে ঢুকলে অন্য ক্রেতারা বের হয়ে যায়। পথ চলতে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের শিকার হই। নানাভাবে আমরা অবহেলা ও বয়কটের পাত্র হই। যেন আমরা মানুষ না, ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী।
মাহি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা করে মা, বাবা ও পরিবারের সাথে থাকতে। আমার মা-বাবা আমাকে রাখতে চায়, কিন্তু বিবাহিত ভাই ও সমাজের মানুষের কথার ভয়ে তারা আমাকে তাদের কাছে রাখে না। তিনি বলেন, আমার মনে খুব কষ্ট। মাঝে মধ্যে মনে হয় আত্মহত্যা করি। তিনি বলছিলেন, ১০ বছর বয়সে তার মা-বাবা তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে হিজড়াদের কাছে ঠেলে দেয়।
মাহির মা সুফিয়া বেগমের (৬০) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যে গর্ভে সন্তান ধারণ করে, তিনিই বোঝেন সন্তান দূরে থাকার কী যন্ত্রাণা। আমাদের সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও অনৈতিক প্রভাবের কারণে নিজের সন্তানকে নিজেদের কাছে রাখতে পারছি না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫