ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

প্রকৃতি ও পরিবেশ

আজ বিশ্ব নদী দিবস

প্রতিদিন দেড় লাখ ঘনমিটার বর্জ্য পড়ছে ঢাকার ছয় নদীতে

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার, ০৫:৫২


প্রিন্ট
প্রতিদিন দেড় লাখ ঘনমিটার বর্জ্য পড়ছে ঢাকার ছয় নদীতে

প্রতিদিন দেড় লাখ ঘনমিটার বর্জ্য পড়ছে ঢাকার ছয় নদীতে

সকাল প্রায় ১০টা। ছোট বড় অনেক জাহাজ-নৌকা বুড়িগঙ্গার পাড়ে সদরঘাটে এসে ভিড়ছে। কার্গো জাহাজগুলো নোঙর করছে কেরানীগঞ্জ প্রান্তে। শত শত নৌকা এপাড় থেকে ওপাড়ে ছুটছে কর্মজীবী মানুষকে নিয়ে। নিচে তাকালেই কালির মতো রঙের দুর্গন্ধযুক্ত পানি। তার ওপর লঞ্চ, জাহাজ, নৌকা থেকে ফেলা হচ্ছে ময়লা, আবর্জনা, তেলের বিষাক্ত গাদ ইত্যাদি। এ দৃশ্য নিত্য দিনকার। 


এখানেই শেষ নয়। বিশাল ঢাকা শহর, নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের কিছু অংশের মনুষ্যবর্জ্য নির্গত হচ্ছে নদীতে। শহরকেন্দ্রিক বেশির ভাগ শিল্প কারখানা, ট্যানারি ও সব পয়ঃবর্জ্যরে কারণে নদীগুলোর পরিস্থিতি ভয়াবহতর হয়ে উঠেছে। 


বিআইডব্লিউটিএর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছেন ঢাকার চার পাশের ছয়টি নদীতে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ ঘনমিটার বর্জ্য পড়ছে। এ নদীগুলো হচ্ছেÑ বংশী, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা। এতে করে দূষিত হচ্ছে ঢাকার চার দিকের নদ-নদী, জলাশয়, খাল, বিল ও জলাধার। পানি অক্সিজেনশূন্য হওয়ায় প্রাণধারণে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। 


তোফায়েল আহমেদ নয়া দিগন্তকে জানান, ঢাকার ৯টি প্রধান শিল্প এলাকার হটস্পটের প্রায় ৭ হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন ৯০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য ও ১৩ লাখ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য এবং ৪ হাজার টন কঠিন বর্জ্য এই নদীগুলোতে নির্গত হচ্ছে। তিনি জানান, বিশেষ করে শুষ্ক মওসুমে এসব নদীর পানি ঘন ও তেলবর্ণ ধারণ করে। এতে পানিতে অক্সিজেনের অভাবে বর্জ্যপদার্থ দ্রবীভূত করতে পারছে না। ফলে রোগজীবাণু ও বীজাণু ছড়িয়ে রোগব্যাধি সংক্রমিত হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে প্রাণিজসম্পদ। মাছশূন্য হয়ে পড়ছে নদীগুলো। শীতলক্ষ্যার পানিতে ভারী রাসায়নিক দ্রব্য অ্যামোনিয়া ও নাইট্রেটের পরিমাণ মাত্রা অধিক হওয়ায় সরকার ২০১১ সালে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাকশোধন যন্ত্র স্থাপন করা হয়। কিন্তু দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় এ প্রক্রিয়া পুরোপুরি কাজে আসছে না। অপর দিকে নদীগুলো থেকে শহরে সরবরাহকৃত পানিতে অতিমাত্রায় ক্লোরিন ব্যবহার করায় তা মানবদেহে ক্ষতির কারণ হচ্ছে। 


বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্জ্যে সয়লাব ঢাকার চার পাশের নদীতে। কোনোভাবেই এটা কমছে না। এসব বর্জ্যের একেকটার একেক রকম প্রতিক্রিয়া হয় পানিতে। এসব বিষয়ে গবেষণা দরকার। তা ছাড়া বর্জ্য ফেলা বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। 


বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার চার পাশে নদীর পানিতে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিওডি (জৈব দূষণ) ও ফোকাল পলিফর্ম (অজৈব দূষণ) রয়েছে। পানিতে বিওডি বা জৈব দূষণ বেশি থাকার অর্থ হলো অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া। এর ফলে এই পানিতে মাছ ও শৈবাল জাতীয় জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ হ্রাস পায় এবং পানি শুদ্ধকরণের জন্য ভালো ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না। ফলে পানির স্বাভাবিক বিশুদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পানির জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বিওডি প্রতি লিটার পানিতে ৪০ মিলিগ্রাম থাকলে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সেখানে রয়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। 


শুধু দূষণ নয়, অবৈধ দখলের ফলে ধীরে ধীরে নদীগুলো স্থান পাচ্ছে ইতিহাসের পাতায়। এক সময়ের প্রশস্থ নদীগুলো এখন অনেকটাই খালের আকার ধারণ করেছে। নাব্যতা হারিয়েছে দেশের প্রায় সব নদী। ফলে আকস্মিক বন্যা ও ভাঙনের কবলে পড়ছেন নদী ও এর তীরবর্তী বাসিন্দারা। এভাবেও নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক নদী।
এমন বাস্তবতায় পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। ২০০৫ সাল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব নদী দিবস। সে হিসেবে এবার তা হচ্ছে ২৪ সেপ্টেম্বর। শুরু থেকেই বাংলাদেশের পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন এই দিনটি পালন করে আসছে। কানাডার বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও নদী অন্তপ্রাণ ব্যক্তি মার্ক অ্যাঞ্জেলো বিশ্ব নদী দিবসের প্রবর্তক। ২০০৫ সাল থেকেই সারা বিশে^ এটি পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার (২০১৭) প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে : ‘দখল দূষণমুক্ত প্রবহমান নদী; বাঁচবে প্রাণ ও প্রকৃতি’। 
দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), রিভারাইন পিপল ও ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশের উদ্যোগে আজ জাতীয় প্রেস ক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে ‘বাংলাদেশের নদীর সঙ্কট ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এমপি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান মো: আতাহারুল ইসলাম ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য শারমীন মুরশিদ উপস্থিত থাকবেন। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখবেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো: আলাউদ্দিন, ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশের সমন্বয়ক ও বাপার যুগ্মসম্পাদক শরীফ জামিল এবং রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫