ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বর্ণবাদী মন গায়ের রংকে যোগ্যতার মাপকাঠি মনে করে!

আনিসুর রহমান এরশাদ

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১৭:২৯


প্রিন্ট
বর্ণবাদী মন গায়ের রংকে যোগ্যতার মাপকাঠি মনে করে!

বর্ণবাদী মন গায়ের রংকে যোগ্যতার মাপকাঠি মনে করে!

চামড়ার সাদা-কালোর বিবেচনায় মানুষের মধ্যে বিভাজন বৈষম্যপূর্ণ সমাজের কুৎসিত রূপ! বাইরের চামড়া কালো নাকি সাদা বিবেচনা করে নারীর শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা বর্ণবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। আসলে যারা সাদা রংয়ের মানুষকে কালোর ওপরে প্রাধান্য দেয় তারা ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক প্রভুদের গোলামীকেই পরোক্ষভাবে লালন করে, আজন্মকাল মানসিক দাসত্ব বহন করে, প্রভুর চেহারাই তার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হতে থাকে।

বিউটি স্ট্যান্ডার্ড ‘সাদা প্রভুদের’ মত হয়ে যাওয়াটা দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল ছাড়া আর কিছুই নয়। সৌন্দর্যের ‘সর্বজনীন’ মানদণ্ড হিসেবে সাদাত্ব মডেলকেই ভিত্তি ধরার কারণ ঔপনিবেশিক শাসকরা সকলেই সাদা। নারীর ভালো রেজাল্ট-চাকরি-চরিত্র এসব কিছুর চাইতেও যখন গায়ের রং বড় হয়ে ওঠে, তখন স্রষ্টাকেই অবহেলা করা হয়। গায়ের রং  স্ব‍াভাবিক এক প্রকৃতি প্রদত্ত ঘটনা৷ তাই মানুষকে মূল্যায়ন করতে হবে তার অর্জন-কর্ম দিয়ে, যাতে মানুষের হাত নেই স্রষ্টার দান তা’ দিয়ে নয়।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত মানুষ জাতি কবিতায় বলেছেন- ‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল ভিতরে সবারই সমান রাঙা।’ আমরাও মুখে বলছি যে- ভেতরের সৌন্দর্যই আসল সৌন্দর্য, রুপের চেয়েও গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাস্তবে  ফর্সা সুন্দরী তরুণীরা প্রেম করলেও পাত্র পাবে আর কম যোগ্যতা নিয়েও চাকরি পাবে। ছেলের বিয়ে দিতে গেলে ফর্সা মেয়ে খোঁজা, ছেলের গায়ের রং কালো হলেও দুধ আলতা সাদা বউ চাওয়া ছেলের বাবাদের কমন বৈশিষ্ট্য। কোনো মানুষই জন্মের সময় অপর একজন মানুষকে চামড়ার রং বা গাত্র বর্ণের ভিত্তিতে ঘৃণা করে না; সমাজই বিভাজনের বোধ তৈরি করে। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতিতেও সুন্দরী নারী মানে দুধে-আলতা বরণ কন্যা। নারীদের শিক্ষা ও পেশাগত মর্যাদার চেয়ে  শারীরিক সৌন্দর্যকেই অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতা অসুস্থ মানসিকতারই পরিচায়ক। যে নিম্নবিত্ত পরিবারে একটি কালো মেয়ে আছে, সে পরিবারের বাবা-মায়েরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন দেশে সরাসরি বর্ণবাদ না থাকলেও যা আছে তা কতটা ভয়াবহ।

অনেকে মনে করেন-কালো রং সাফল্যের অন্তরায়, সাদা হতে পারার মধ্যেই সাফল্য-সার্থকতা নিহিত। সাদাই জীবন ও জীবনের শ্রী, সুদর্শন মানেই অভিজাত-ভদ্র ঘরের সন্তান আর কুৎসিত মানেই গরিব পরিবারের সন্তান। রাজপুতের মতো দেখা যায় বা রাজকন্যার মতো সুন্দর- কোনো কালো ছেলে-মেয়ে দেখে কেউ বলে না। আর রাজা মানেই ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী, বিত্তশালী। অথচ রং কালো হলেই মন কুৎসিত হয় না, আর চেহারা উজ্জল হলেই মন সুন্দর হয় না। নিগ্রো মানেই বর্বর নয়,  দানবের মত শক্তিশালী নয়, পশু নয়। ছোটবেলা থেকেই রং নয় গুণ দিয়েই মানুষকে বিবেচনা করার সচেতনতা এবং সংবেদনশীলতা তৈরি করা বা তৈরি হওয়া দরকার। শুধু দেহের রংয়ের কারণে জীবনধারা ভিন্ন হয়ে যাবে এটা সংকীর্ণতা ও অমানবিক। শুধু ফর্সা নয় বরং গায়ের কালো রংকেও উদযাপন করতে পারতে হবে।

সাদা চামড়ার হতে চাওয়া বা সাদা চামড়া পেতে চাওয়ার প্রবণতা ধনী-প্রভাবশালী-উচুঁ শ্রেণিতেই বেশি দেখা যায়।  বর্ণ বৈষম্য আর  বর্ণ বৈষম্যবাদী সমাজ প্রাচীন কালের প্রভু-ভৃত্য সর্ম্পকের কথা স্মরণ করায়।  আভিজাত্যের  মধ্যে যারা বাস করেন, সবসময় ঘরে বা ছায়ায় আরামে থাকেন; তাদেরতো কালো হবার সুযোগ নেই। রোদে পুড়লে, কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্ত থাকলে, সূর্যের তাপে খেতে খামারে কাজ করে ঘ‍ামলে, বদ্ধ পরিবেশে গার্মেন্টসে কাজ করলে, আজীবন শ্রম দিলে কিংবা কিচেনে আগুনের তাপে থাকলে স্কিন ডার্ক বা কৃষ্ণ বর্ণ হতেই পারে। তাই বলে যদি তাদের নিম্ন শ্রেণির মানুষ মনে করা হয়, তাচ্ছিল্যকর-হেয়কর বিবেচনা করা হয়- তবে তা’ মানুষের অপমান। কালো বলে কি অচ্ছুৎ নাকি যে ধরলে মান যাবে, ছুইলে জাত যাবে।  এই ধরণের মানসিকতা প্রবল থাকলে কালোরা সাদা হবার চেষ্টা করবে; সাদাতো আর হবে না বড়জোর ফ্যাকাশে হবে। মানুষের সুন্দর খোঁজার প্রবণতা এমন মানসিকতা যা’ কালোদের জীবনকেই অস্বাভাবিক করে তোলে। মেয়ে ‘কালো' হলে বিয়ে দিতে গেলে পাত্রপক্ষকে কৃষ্ণবর্ণকে বলতে হয় ‘শ্যামলা' বা ‘শ্যামবর্ণা'৷ বিয়ের দিন কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে বিউটি পার্লার থেকে কড়া মেকআপ নিয়ে ফর্সা রংয়ের সুশ্রী হয়ে শ্বেত-শুভ্র পরীর মতো মঞ্চে বসে থাকে বধু!'

কালো হওয়া যেন দুর্ভাগ্যের, কালো মেয়ে যেন অসহনীয়। অথচ  যে নারীকে কায়িক পরিশ্রম করতে হয়, লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়; তার পক্ষে সাদা চামড়া ধরে রাখা কঠিনই বটে এবং তার বাচ্চার চেহারাও কালো হয় । কালো চামড়া নিম্ন বর্ণের অচ্ছুৎ হিন্দু থেকে কনভার্ট হওয়া ‘আতরাফ’ মুসলমানকে বাঁকা চোখে দেখার যৌক্তিকতা ধারণ করে। একজন মেয়ে যখন জানে শুধুমাত্র তার চেহারাটা কালো হবার কারণে বিয়ে হচ্ছে না কিংবা পাত্রপক্ষ পছন্দ করছে না। তখন পুরুষের প্রতি তার ঘৃনা জন্মে, অপমান বোধ হয়। ফলে কালো মানুষ  সাদা মানুষের সাথে সম্পূর্ণ খাপ খাইয়ে নিতে পারে না; ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের পরিত্যক্ত ভাবতে শুরু করে, সম্মিলিতভাবে সাদাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে চেষ্টা করে। এর পরিণতিতে জন্ম নেয় হীনমন্যতা এবং ক্ষেত্রবিশেষ নিঃসঙ্গতাবোধ। সমাজ যদি সব মানুষকে সমান ভাবতে না পারে- একটা কালো ছেলে বা মেয়ে আজীবন কালোই থেকে যাবে, মানুষ আর হয়ে উঠতে পারবে না।

চামড়ার উজ্জ্বলতা থাকলেই তা’ সম্ভ্রান্ত বংশীয় আশরাফ প্রমাণের গৌরব বহন করে। সাদারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভেবে গায়ের রং থেকে জ্ঞান-গরিমা শক্তি সব দিক দিয়েই অহংকারী হয়। স্কিন কালার হিসেবে ফর্সা রংকে স্ট্যান্ডার্ড মনে করার ফলে সাদা মানুষের সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স বাড়ে, আর কালোদের ইনফেরিয়রিটি তাদেরকে মানসিক দাসত্বের অবস্থায় নিয়ে যায়। আজও আমরা সাদা চামড়া বিদেশীদের মাথায় তুলে রাখি। কোনো মেয়ে দেখতে সুন্দর হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে- তার গায়ের রং ফর্সা হওয়া; যা এক ভয়াবহ সামাজিক চিত্র। কালো সন্তান  ঘরে যাতে না আসে সেজন্য চার–চারবার গর্ভপাত করানো এবং ফর্সা বাচ্চা দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্তের মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে কালো রংয়ের ত্বকের স্ত্রী মনিপুর স্কুলের ড্রয়িং শিক্ষিকা সুমি আত্মহত্যা করেছিলেন। কালো রংয়ের তরুণ পেশাজীবীকে বিয়ে করার পর ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বর্ণবাদী মানসিকতা থেকে অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুকে হেনস্তা করেছেন। মগজে ‘সাদা প্রভুদের’ বসবাস আর মানসিকতায় বর্ণবাদ থাকার কারণে মুখের মহানুভবতা বাস্তবে দেখা যায়নি।

বিয়ের বাজারে সাদা মানুষের চাহিদা বেশি থাকায় কালো মানুষও প্রসাধনী মেখে সাদা হতে চায় বা রুপ চর্চা করে। এর পেছনে দায়ী সুন্দর না হবার হীনমন্যতা ও বিজ্ঞাপনের প্রভাব। বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রচার-প্রচারণা এমনভাবে চলে যে- গায়ের রং কালো হওয়াটা আজন্ম পাপ, এই পাপ থেকে মুক্তি পেতে সাদা হতে প্রসাধনী ব্যবহার করতে হবে। এখনতো ত্বকের রং ফর্সাকারী ক্রিম ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির সাথে সমানে পাল্লা দিচ্ছে ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম।  নিম্নাঙ্গ ফর্সাকারী ক্রিমও বাজারে এসেছে, যা’ একজন মানুষের জন্য লজ্জাজনকও বটে। অথচ এগুলো শুধু ত্বকের উপরের লেয়ারটাকেই কিছুটা উজ্জ্বল করে কিন্তু গায়ের আসল রংটাকে পরিবর্তন করতে পারে না। ফেয়ারনেস ক্রিমগুলোর বিজ্ঞাপন রং বৈষম্য বাড়ানোর পাশাপাশি নানান রকম মানসিক সমস্যা তৈরি করছে। রং ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘গায়ের রঙ ফর্সা হলেই জয় সুনিশ্চিত।’ বিজ্ঞাপনের নারী মডেল বলেন,‘ গায়ের রং ফর্সা হওয়া আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।’ মাত্র ২১ দিনে গায়ের রং ফর্সা করার ক্রিমও বিক্রি হয় বাংলাদেশে। অর্থাৎ ফর্সা রং যেন আভিজাত্যের প্রতীক; চাকরির সাফল্য, বিয়ে সবকিছু নির্ভর করছে রং ফর্সা হওয়ার ওপর।

একই মেধা এবং একই চেহারা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র গায়ের রং এর জন্য পিছিয়ে থাকার এই মানসিকতা সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একজন মানুষ কালো নাকি সাদা- এসবেতো তার কোনো কৃতিত্ব বা ব্যর্থতা নেই। অথচ কৃষ্ণ বর্ণ হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত মেয়ে বিয়ে দিতে চেয়েও নেতিবাচক-তীর্যক কথা শুনতে হয়। এমনকি পেশাজীবনেও বাড়তি সুবিধা দেয় দৈহিক সৌন্দর্য, সুন্দরী ও সুদর্শন কর্মীরা গড়পরতা চেহারার কর্মীদের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পান এবং বেতন বৃদ্ধি বা প্রমোশনের দৌড়ে এগিয়ে থাকেন। কোম্পানীর এমডি কিংবা চেয়ারম্যানের প্রাইভেট সেক্রেটারীর পদ থাকে সুন্দরী তরুণীদের হাতের মুঠোয়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কারেরী গায়েন তাঁর এক গবেষণায় কালো মেয়েদের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে তিনি দেশের চারটি প্রধান দৈনিকে প্রকাশিত ৪৪৬টি পাত্র চাই, পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে পরিষ্কার দেখেছেন, সমাজে কালো মেয়েরা ভয়ানক অবজ্ঞার শিকার। বিয়ের জন্য ফর্সা মেয়েই পরম আকাঙ্ক্ষিত। তিনি দেখেন যে ফর্সা না হওয়ায় শহরে- গ্রামে অসংখ্য নারী গঞ্জনা, নির্যাতন সয়ে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচে কিংবা আত্মঘাতী হয়।

আমেরিকায় শতকরা ৯০ ভাগ সাদা হবার পরও কালো বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা নোবেল বিজয়ী ও কালজয়ী নেতা হতে পারেন। বিশ্ব সুন্দরীর তালিকায় কালো হয়েও শীর্ষস্থান দখল করতে পারেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, মহাত্মা গান্ধী,  ব্রায়ান লারা, মাইকেল জ্যাকসন, বক্সার মোহাম্মদ আলী এবং ব্রাজিলের পেলে কি সাদা চামড়ার ছিলেন? অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার, সুবর্ণা মুস্তাফা, তিশা, নন্দিতা দাশ, কাজল, শিল্পা শেঠি, শ্রীদেবী, হেমা মালিনি, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মিতা হক, জয়িতা, বেবী নাজনীন, শুভমিতা, সোমলতা, শ্রেয়া ঘোষাল, বিবি রাসেল, আমেরিকার  সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কনডোলিৎসা রাইস ফর্সা নন। মিশেল ওবামা, অপরাহ ইউনফ্রে, ভেনাস উইলিয়ামস, মরগ্যান ফ্রিম্যান, সেরেনা উইলিয়ামস, বিপাশা বসু ও তারামন বিবির গায়ের রং কালো বা শ্যামবর্ণ হলেও তাঁদের খ্যাতিতে তা’ বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। কালো চামড়ার মানুষ হয়েও ফিলাস হুইটলি, জুপিটার হ্যামন, জোরা নিয়েল হার্সটন,ল্যাংস্টন হিউজ, রিচার্ড রাইট, রালফ এলিসন,অ্যালেক্স হেইলি, মায়া অ্যাঞ্জেলো, টনি মরিসন তাদের প্রতিভা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। গায়ের রংকে তোয়াক্কা না করে সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছেছেন অনেকেই, অনেকে অবশ্য কালো থেকে ফর্সাও (!) হয়েছেন। আমাদের দেশে রুবেল, রফিক, হাসান মাসুদদের মতো তারকারা আছে। তারপরও এটাই ঠিক আমাদের মিডিয়াগুলোতে ফর্সা চামড়ার অধিকারীদের অগ্রাধিকার দেয়।

তাই গায়ের রং নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে প্রতিবাদ করুন, মোটেও বিচলিত হবেন না। বলে দিন- সৌন্দর্য মানে গায়ের রং না; সৌন্দর্য মানে সুন্দর, সহজ, সাবলীল, বন্ধুত্বপূর্ণ ও মানবিক। কালোই সুন্দর,কালো মুখই সুন্দর,রঙের উর্ধ্বে সৌন্দর্য। ফর্সা চামড়া না পাওয়ায় আড়ালে-আবডালে অপমানের জ্বালায় লুকিয়ে চোখের পানি ফেলবেন না। ছেলেরাও ‘আপনার গায়ের রংটা যদি আরেকটু ফর্সা হতো,’ ‘গায়ের রংটা আরেকটু উজ্জ্বল হলে মানাত বেশি’ এসব বলা বন্ধ করুন। ‘মেয়ের গায়ের রং ফর্সা তো’ এমন প্রশ্ন না করে প্রশ্ন করুন ‘মেয়ের মনটা সুন্দর তো,আচার-ব্যবহারে ভদ্রতো’। বিয়ের অনুষ্ঠানে “ছেলেটা একটু কালো হয়ে গেল না?” অথবা “আর মেয়ে ছিল না যে এমন একটা কালো মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে?”-এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ করুন।  কালো অমুক বা  কাউল্লা তমুক বলবেন না। ‘দেখতে কাজের মেয়ের মতো’  শুনলে জবাব দিন। কালো আর ফসার্র প্রতি বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে আস‍ুন।  ফর্সা মুখ মানেই সুন্দরী নয়, ফর্সার বিপরীত শব্দ কালো নয়, সৌন্দর্য এবং কালো পরস্পর বিপরীত শব্দ নয়। শরীরের রংয়ের কারণে অন্যান্য যোগ্যতা গৌণ হয়ে যাবে না। গায়ের রং জনিত বৈষম্য দূর হলে প্রসাধনহীন হয়ে বিয়ে করতেও অসুবিধা হবে না ।

দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে মেয়েটা সুন্দর না হলে, কাটিং ভালো না হলে, ফরসা রং না হয়ে ময়লা বা গায়ের রং কালো-শ্যামলা হলে, চেহারার গড়ন আকর্ষণীয় না হলে সে বধুও হতে পারে না। পাত্রের কালো বোনও তার ভাইয়ের জন্য সাদা ভাবী খোঁজে। পাত্র নিজে বেশ কালো হলেও কিন্তু ফর্সা পাত্রী ছাড়া বিয়েই করবে না। কালো মাও কালো মেয়েকে ছেলের বউ হিসেবে মানবে না। পাত্রী পক্ষের ডিমান্ড থাকে ছেলে সুর্দশন ও ফর্সা হতে হবে,অথচ পাত্রীর ভাই বা বাবা শ্যমলা কিংবা কালো। কালো-সাদা সমস্যার কারণে কন্যা দায়গ্রস্ত পরিবার এক পাত্রী দেখিয়ে অন্য পাত্রী বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। বাবা-মায়ের কালো মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখে কালো মেয়েটি হীনম্মন্যতার মধ্য দিয়ে সময় কাটায়।  কালো মেয়ের বিয়ে বিরাট সমস্যার, অনেক ব্যয়বহুল, কালো মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে ভবিষ্যৎ বংশধর কালো হতে পার‍ার আশঙ্কায় যৌতুকের পরিমাণ চড়া। যেন ফর্সা বা সুন্দর না হতে পারাটা কালো নারীদের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, যেই ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। আমরা মুখে নিজেদের উদার বললেও বাস্তবে অন্ধকার আর কালোকে সমার্থক করে দেখি। কালো দিবস, কালো পতাকা, কালো রাত, কালো বা অন্ধকার জগৎ, অন্তর কালা ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ফ্রন্ট ডেস্ক কিংবা রিসেপশনে, নাটকে, সিনেমায়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়, সংবাদ পাঠে ফর্সা মেয়েদেরই প্রাধান্য। গায়ের রং যেন শুধু সৌন্দর্য বিচারের মাপকাঠিই নয়, যোগ্যতা  বিচারেরও মাপকাঠি! গায়ের রং দিয়ে বিভেদরেখা টানার মাধ্যমেই পরিবারে ও সমাজে বর্ণবাদ লুকায়ে থাকে!

কথায় আছে- নদীর পানি ঘোলা ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে  যাদের চর্মকোষে মেলানিন রঞ্জক পদার্থ বেশি থাকে, তাদের চর্ম গাঢ় রঙের বা কালো হয়। মেলানিনের মাত্রা বেশি থাকাতে চামড়ার রং যদিও গাঢ় হয়, তাহলেও এর একটা বিরাট উপকার আছে। সূর্যালোকে যে অতিবেগুনি রশ্মি থাকে, তা ওই মেলানিন কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শরীরের ভেতরে ঢোকে না, ফলে তাদের ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকে। ডার্ক ত্বকের অধিকারীদের  স্কিন ক্যান্সার, অ্যালার্জি, র‍্যাস কিংবা চর্ম রোগ অনেকটাই কম হয়। গাঢ় রং চামড়ার রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও বেশি বলে গড় আয়ু হিসাব করলে দেখা যাবে, গাঢ় চামড়াবিশিষ্ট মানুষ সাদা চামড়ার মানুষের চেয়ে বেশিদিন বাঁচে। আসলে এসব যাই বলা হোক পাত্র ঠিকই সুন্দরী, কম বয়সী নারীই খুঁজবে, শেষ পর্যন্ত নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যই তার যোগ্যতা আর সৌন্দর্যের মাপকাঠি হবে। এমন ধ্যান-ধারণা দূর না হলে  দেশ সত্যিকারের প্রগতিশীল হবে না, দেশবাসীর মনন সুস্থ হবে না, বিভেদ-বৈষম্য মুক্ত সমাজ হবে না।

গানেও আছে ‘ভালোবাসব, বাসব রে......দুধে-আলতা গায়ের বরণ, রূপ যে তার কাঁচা সোনা...’। সুন্দর মেয়ের বর্ণনা মানেই ত্বক সাদা বা ফরসা! শুধু ফ্যাশন বা গ্ল্যামার দুনিয়ায় সুন্দর চেহারার মানুষের চাহিদা বেশি এমনটা নয়, অনেক পেশাতেই কেবলমাত্র সুন্দর চেহারার কারণে বাড়তি সুবিধা ও বসের সন্তুষ্টি হাসিল করছেন। কেবল চেহারার কারণে বেশি সুবিধা দেওয়ায় কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হয়, সৌন্দর্যের লোভে অনৈতিক সুবিধার বিনিময় যোগ্যতা-দক্ষতাকে গৌণ করে । দুঃখজনকভাবে কালো-সাদা সবাই মানুষ হিসেবে সমান বিবেচিত না হওয়ায় কালো বা অসুন্দর হওয়াকে অভিশাপ মনে করে, পদে পদে অপমান-অপদস্থ-তিরস্কৃত হতে হয়,  কখনো কখনো ঘটে যায় অপ্রীতিকর ঘটনা। তাই চেহারা নয়, অন্তর ও কাজ  দেখাই যথেষ্ট। সুন্দরদের কালোর ওপর কোনো প্রাধান্য ধর্মে নেই,  বর্ণ নিয়ে অহংকার করা জাহেলি রীতি- কুসংস্কার। কারো বাহিরের রুপ দেখে তাকে মূল্যায়ন করবেন না, তার ভেতরের রুপ আপনাকে মুগ্ধ করতেও পারে। যার বাহিরের রুপ দেখে আপনি মুগ্ধ হয়েছেন হয়তো তার ভেতরের রুপ অত্যন্ত কুৎসিত।  ফলে  সাদা চামড়াতেই সুখী হবেন এমন কোনো গ্যারান্টি নাই।

ধরুন একটি বাসায় সম বয়সী দু’জন বাচ্চা আছে, একজনের গায়ের রঙ শ্যামলা আর অন্যজন ফর্সা। যে  ফর্সা সে সবার বেশি ভালোবাসা পাবে,  সবাই কোলে নিয়ে আদর করবে আর কালো বাচ্চাটার সাথে বড়রা বৈষম্য করবে, এমনকি ছোটরাও তার সাথে খেলবে না। কালোকে মুখে মায়াবতী বললেও ক্লাসে কালো-শ্যামলা-চাপা-ময়লা (!) মেয়েটার বন্ধু কমই থাকে। ছোট বাচ্চাটাও সহপাঠী বান্ধবীকে বলে ‘তোর হাত কালো, আমার হাত সাদা’ কিংবা  ‘ ওই আন্টি এত কালো কেন?’ ছোট্ট শিশুর মনেও এমন বর্ণবাদী চিন্তা! রূপকথার গল্পে রানি আর রাজকন্যা মানেই দুধে-আলতা রং, মেঘবরণ চুল; আর রাক্ষুসী মানেই কালো রং, ভাটার মতো চোখ। ‘দেখতে সুন্দর শুধু গায়ের রংটা একটু চাপা’  শুনতে শুনতে কিশোরীর মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও কম নয় । পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এমন যে- কালো শব্দটির সঙ্গেই নেতিবাচক অর্থ সংযুক্ত। খুব ভালো মানুষ বোঝাতে বলি সাদামনের মানুষ।  আর অসৎ লোকের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে গিয়ে বলি অমুকের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও। অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকার রঙ কালো।

চাকরির ভাইবা বোর্ডে ফর্সা মেয়েটা চেহারার জোরেই কালো মেয়েটাকে টপকেও  যায়।  সিটিং সার্ভিস নামে পাবলিক বাস গেইট লক করে চালাচ্ছে,  আপনাকে সিট খালি নেই বলে তোলেনি; কিন্তু ঠিকই সুন্দরী তরুণীর হাতের ইশারায় হেলপার গেইট খুলে দিয়েছে। কিংবা আপনি রিক্সা চালককে বললেন মামা যাবেন? মামা রাজি হলেন না। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঠিকই আপু যখন মিষ্টি করে বললেন মামা চলেন; এক পলক দেখেই মামা রাজি হয়ে গেলেন। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই গায়ের রংয়ের আলাদা কদর আছে। কার্টুন থেকে শুরু করে সাহিত্য-নাটক-চলচ্চিত্র সর্বত্রই সুন্দরী মেয়ের পাশে কালো মেয়েরা বড়ই কোণঠাসা। নারী যত সুন্দর-ফরসা, সমাজে তাঁর কদর তত বেশি। অথচ গায়ের রংয়ের কারণে বৈষম্য ও অসম্মান কোনোভাবেই সভ্যতা নয়।

সমাজে কালো ত্বকের সপক্ষে একটি চেতনা বিপ্লব হওয়া প্রয়োজন। ত্বকের রং যা-ই হোক, নিজের যোগ্যতায় গর্বিত ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে,  একটি অসুস্থ সামাজিক মানসিকতাকে পুষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। গায়ের রং নিয়ে বৈষম্য দূরীকরণে সংগ্রাম করতে হবে, আচরণ- বুদ্ধি-দক্ষতাকেই মূল্যায়নের মাপকাঠি বানাতে হবে। অসুন্দররা সুন্দর কর্তৃক মানসিকভাবে নির্যাতিত হবে, গাত্রবর্ণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে- এটা মেনে নেয়া যায় না। স্রষ্টার সব সৃষ্টিই সুন্দর, কেউ শতভাগ পারফেক্ট না। কালো কোনো মানুষ না; কালো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি-মানসিকতা-সমাজ। কালোর ভিতরেও সুন্দর আছে, সাদার ভেতরেও কালো আছে। যতদিন কালো অশুভ বলে বিবেচিত হতে থাকবে, ততদিন সমাজও অন্ধকারেই থাকবে। তাইতো বলি ‘গায়ের কালো ভালো, মনের কালো ছাড়ো’ ‘কালো জগতের আলো’। মানুষের মনের রূপই আসল রূপ বাইরেরটা নয়।

অবশ্য ছেলে কালো হলেও সমস্যা নেই, কালো মেয়েদেরই যত  বিড়ম্বনা। সাদা মানেই শুভ্র-শুভ-শান্তি আর কালো মানেই অসুন্দর-ভয়-খারাপ-অমঙ্গল-বেমানান-অশুভ-অনাকাঙ্ক্ষিত এমন চিন্তা-চেতনা বাদ দিন, কালো মেয়েদের প্রতি সমাজের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলতে নিজেই উদ্যোগী হোন;  আপনি যেমন আছেন, সেভাবেই নিজেকে ভালোবাসতে শিখুন। সমাজে মেয়েদের গাত্রবর্ণ নিয়ে ‘বর্ণবাদ' সম্পর্কে সচেতন হোন এবং বন্ধে এগিয়ে আসুন। ত্বকের সাদা-কালোর মাধ্যমে স্মার্টনেস নির্ধারন না করে উত্তম মানবিক বৈশিষ্ঠ্য ও সুন্দর  মনের সমন্বয়ে স্মার্টনেস বিবেচনা করুন।  সাদা আর কালোর দ্বন্দ্ব মানি না মানবো না। আসুন নিজে সচেতন হই,  অন্যকে সচেতন করি,  প্রতিবাদী হই এবং সমস্বরে বর্ণ বৈষম্যকে না বলি।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫