ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

ছাত্র ও অভিভাবকদের ওপর কোচিং বাণিজ্যের চাপ

ফাতেমা খাতুন

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৫২


প্রিন্ট
ছাত্র ও অভিভাবকদের ওপর কোচিং বাণিজ্যের চাপ

ছাত্র ও অভিভাবকদের ওপর কোচিং বাণিজ্যের চাপ

বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হচ্ছে কোচিং সেন্টার। কোচিং ব্যবসা করে লাখ লাখ টাকা আসে। গ্রামগঞ্জে ও অলিগলিতে প্রভাব বিস্তার করেছে কোচিং সেন্টার। শহর ও গ্রামাঞ্চলে অভিভাবকেরা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। ছেলেমেয়েদের কোচিং সেন্টারে পাঠালে ফল ভালো হবে, কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট শিক্ষক ছাড়া ছেলেমেয়ের পড়াশোনা হবে না, এ ধারণা অভিভাবকদের। অভিভাবকেরা প্রতিযোগিতায় নেমেছেন কে কয়টি কোচিং সেন্টারে ও প্রাইভেট পড়াতে পারেন।

আমার জানা মতে, নতুন ঢাকার একজন অভিভাবক মন্তব্য করেছেনÑ তার ছেলে পিএসসি পরীক্ষার্থী। ছেলেকে যেভাবে হোক এ প্লাস পেতে হবে। মা দুঃখের সাথে বলেছেন, ‘আমার ছেলেকে সর্বক্ষণ পড়তে বলি।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমার স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।

স্বামীর সাথে আমার একটি কথা, কোচিং সেন্টার এবং প্রাইভেট শিক্ষকের বেতন, বই-খাতা, গাইড, মডেল টেস্ট ও সিলেবাস ইত্যাদি কেনার জন্য টাকা লাগবে। এত টাকার চাপ নিতে গিয়ে দু’জনের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে, এর সমাধান কে করবে; ওই অভিভাবকের প্রশ্ন? বাংলা মিডিয়ামে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। পুরান ঢাকার নামকরা স্কুলে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অঙ্ক ও ইংরেজিতে ১৬৮ জন পাস করেছে। ৫৫০ জন শিক্ষার্থী সবাই জেএসসি পরীক্ষার্থী। এই ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগ কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় ওই ছেলেমেয়েদের নেই।

পুরান ঢাকার আরেকটি সরকারি নামকরা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রের বাবা বললেন, তিনি শ্রেণিশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়াতেন, কিন্তু ওই ছাত্র ফেল করেছে তৃতীয় শ্রেণীতে। এর একমাত্র কারণ কোচিং সেন্টার ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকার অবহেলা।

আরেকটি নামকরা স্কুলের ছাত্রছাত্রী পিয়নের কাছে প্রাইভেট পড়ে। আমার প্রশ্ন, ওই পিয়ন কী শিক্ষা দিচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের? মডেল টেস্ট ও গাইডবুকের ছড়াছড়ি। পরীক্ষার ফি ও কোচিং সেন্টারে দিতে হচ্ছে অভিভাবকদের লাখ লাখ টাকা। শিক্ষক সমিতি ও গাইড বুকের মালিকদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আছে। যার ফলে অঙ্ক টেস্ট বুক চারটি কিনতে হবে, অন্যান্য টেস্ট বুক দু’টি কিংবা তিনটি করে কিনতে হবে, কী আছে ওই টেস্ট বুকে?

শিক্ষা এখন পণ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। সরকার বোর্ড থেকে বই দিচ্ছে প্রতি বছর ছাত্রছাত্রীদের। সরকার ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র এবং বাংলা দ্বিতীয়পত্রের বই নির্ধারিত করে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও গাইডবুক ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র ও বাংলা দ্বিতীয়পত্র অনেকগুলো বইয়ের পড়ার চাপ ছাত্রছাত্রীরা নিতে পারছে না। বইয়ের চাপের কারণে ফেলের সংখ্যা বাড়ছে। পড়াশোনা কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট পড়ার চাপ নিতে পারছে না বলে ভালো করতে গিয়ে মন্দ হচ্ছে।

সরকারের কাছে অনুরোধ করছি- অচিরেই কোচিং সেন্টার, গাইডবুক, নোটবুক ও মডেল টেস্ট বন্ধ করুন এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ফেসবুক বন্ধ রাখুন। এমন একদিন আসবে যখন স্কুল ও কলেজে ছাত্রছাত্রী থাকবে না, শুধু শিক্ষক ও শিক্ষিকা আর বেঞ্চ নিয়ে শ্রেণী চালানো হচ্ছে। কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট পড়াশোনা বন্ধ হলে ছাত্রছাত্রীরা স্কুল ও কলেজমুখী হবে। শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধ করুন।

ছেলেমেয়েদের শৈশব ও কৈশোর ধ্বংস করবেন না। পড়াশোনা ও খেলাধুলা করে হাসিখুশি অবস্থায় তারা বাঁচতে পারে এই সুযোগ করে দিন। প্রশ্ন ফাঁস হয় স্কুলের শিশু শ্রেণী থেকে এইচএসসি পর্যন্ত কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে। এইচএসসি ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয় কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে। শিক্ষা বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের। এ ব্যাপারে সরকারের কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে দল-মত নির্বিশেষে।

লেখক : একজন শিক্ষক ও অভিভাবক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫