ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা

শাহ্ আব্দুল হান্নান

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৪৬


শাহ্ আব্দুল হান্নান

শাহ্ আব্দুল হান্নান

প্রিন্ট

আমি নিজে জীবনে অনেক ইতিহাস পড়ে বুঝলাম, ইতিহাস হলো বড় শিক্ষক। মানুষ কী কী ভালো কাজ করেছে এবং তা কারা করেছে, তাদের কী যোগ্যতা ছিল, কোন কোন পরিস্থিতিতে সফল হওয়া যায়, তা ইতিহাস পাঠে জানা যায়। এখানে ব্যক্তিগত একটা বিষয় থাকে, লোকটা কত যোগ্য। আবার পরিস্থিতির একটা ব্যাপার থাকে। অনেক সময় যোগ্য লোকও পরিস্থিতির কারণে অনেক কিছুই করতে পারেন না। পরিস্থিতি অনুকূল হলে কম যোগ্য লোকও পারেন। এগুলোর ইতিহাস পড়লে আমরা জানতে পারি, যারা বড় কিছু অর্জন করেছেন, তাদের কী কী যোগ্যতা ছিল এবং তাদের সময়ের পরিস্থিতিটা কেমন ছিল।

তেমনিভাবে মানুষের ব্যর্থতাগুলো জানা যায়। ব্যক্তির দোষের কারণে ইতিহাসে কী কী বিষয়ে ব্যর্থ হচ্ছে, আবার পরিস্থিতির কারণে কারা কারা ব্যর্থ হয়েছে, তা জানা যায়। কাজেই ইতিহাস একটা বড় শিক্ষক। যেসব বিষয় অবশ্যই পড়তে হবে- এর মধ্যে একটা হচ্ছে সাহিত্য, আরেকটা ইতিহাস। আরো অনেক কিছু আছে যা পড়তেই হবে। সাহিত্য জীবনের দর্পণ। তা পড়ে একটা সমাজ কেমন ছিল তা জানা যায়। এটা মনে করা ঠিক হবে না যে, শরৎচন্দ্র পড়লে শুধু উপন্যাস পড়লাম। তা নয়, ভিন্ন সমাজকেও বুঝলাম। ওই সময়ের হিন্দুসমাজের দ্বন্দ্বগুলোও বুঝলাম। একই কথা সত্য সবার ক্ষেত্রে। শেক্সপিয়র পড়লে আমরা জানতে পারি, ওই সময়ের সাহিত্যের উপজীব্য কী ছিল? সেই সমাজ কেমন ছিল? সেখানে বড়লোকেরা কেমন ছিল? সাধারণ মানুষ কেমন ছিল? কী কী ধরনের প্রশ্ন তাদের সামনে ছিল?

আমাদের ইতিহাস ও সাহিত্য- দুটিই লাগবে। অথচ ব্যাপকভাবে এ দুটির চর্চাই কমে গেছে। ধর্মের বিষয়ে পড়াশোনা নেই। ধর্মকে তো ফিলোসফিই বলা যায়। এটাও মানুষ পড়ছে না। সাহিত্য ও ইতিহাসও কম পড়ছে আগের তুলনায়।

এরা পড়ছে বিজনেস। আর অবশ্যই সায়েন্স বা বিজ্ঞান শিখছে, যে সায়েন্সের মাধ্যমে টেকনোলজি তৈরি করা যাবে; যে সায়েন্সের মাধ্যমে বিশ্বের প্রকৃতি জগতের অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে; যার সূত্র বের করা যায়, কারণগুলো জানা যায়। কিন্তু এরপরও এই সায়েন্স আর বিজনেস পড়ে মানুষ হওয়া যায় না। এর মাধ্যমে রোবট হওয়া যায়। বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ কিন্তু কমবেশি রোবট। হতে পারে ব্যতিক্রম, এখনো আছে এশিয়ার কিছু দেশে। কিংবা যদি বলি মুসলিম ওয়ার্ল্ডের কথা, আফ্রিকার কিছু দেশ; এখনো তারা রোবট হয়নি। কিন্তু বাকি বিশ্ব রোবট হয়ে গেছে। ইউরোপ রোবট হয়ে গেছে। আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া রোবট হয়ে গেছে। এটাই হচ্ছে অবস্থা। আমরা তো রোবট চাই না। তাহলে আমাদের ফিলোসফি বা ধর্ম পড়তে হবে; সাহিত্য ও ইতিহাস পড়তে হবে।

পরবর্তী সময়ে আরো দেখা গেল, এরা এই স্বার্থপরের মতো বলতে লাগল, ‘টাইম ইজ মানি।’ তার মানে সময় অন্য কোনো কাজে নষ্ট করা যাবে না; অর্থোপার্জনের কাজে ব্যবহার করতে হবে। যা দিতে হবে, ‘মানির’ জন্য দিতে হবে। তাই যদি হয়, তাহলে আমাকে ব্যবসায় শিখতে হবে বেশি করে, যা অর্থ দেয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেটা করতে গিয়েই মানুষ বিজনেস সায়েন্সে চলে গেল। পিওর সায়েন্স, টেকনোলজির সাইডে ছিল কিছুটা। কোনোটাই খারাপ না, যদি সব কিছু মিলে হতো; ধর্ম ও নৈতিকতাকে সাথে নিয়ে যদি করা হতো। কিন্তু ধর্ম বাদ দেয়ার কারণে এগুলো একেবারে একপেশে, একতরফা, একমুখী হয়ে গেল। এসব কারণেই মানুষ শেষ পর্যন্ত রোবট হয়ে যাচ্ছে; আমাদের ছেলেমেয়েরাও।

যদি এর থেকে ফিরে আসতে হয়, ধর্মেই ফিরে আসতে হবে। এটা বলতে বোঝাচ্ছি না যে, ধর্ম বলতে ইসলাম সবখানেই। অবশ্যই ইসলাম চাই। এরপরও বাস্তববাদী বলেই মনে করি, যেখানে হিন্দু ধর্মই প্রধান, সেখানে হিন্দু ধর্মেই ফিরে আসতে হবে। বৌদ্ধদের বৌদ্ধ ধর্মের দিকেই ফিরে আসতে হবে। খ্রিষ্টানদের ফিরে আসতে হবে খ্রিষ্টান ধর্মের দিকে। কেননা, কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। যদি পরিবর্তন চাই, তাহলে সবখানেই ধর্মের দিকে ফিরে আসতে হবে। কেননা আমরা মুসলিম বিশ্বে হয়তো করলাম কিছুটা; কিন্তু আমরা তো বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারব না। টিকতেও হয়তো পারব না। এ জন্য বিশ্বব্যাপী দরকার ধর্মে ফিরে যাওয়ার একটা আন্দোলন। খ্রিষ্টান ও হিন্দুদের যদি এ রকম উদ্যোগ থাকে, এটাকে স্বাগত জানাই। তবে বিজেপির মতো হওয়া উচিত নয়, যেখানে মুসলিমবিরোধী একটা চেতনা আছে। বরং এ রকম হতে হবে যে, হিন্দু ধর্মের প্র্যাকটিস তারা পুরোপুরি করবেন। নৈতিক মূল্যবোধ পুরা নেবেন, আইন থাকলে তাও মানবেন। কিন্তু অন্য ধর্মের লোকদের তারা মানবাধিকার দেবেন।

ইসলামের ক্ষেত্রে একই কথা। এমন হওয়া সম্ভব। পোপ বর্তমানে যেসব কথা বলছেন, তা এ রকমই। ব্যাক টু ফ্যামিলি ভ্যালুস, রিজেক্ট সেকুলারিজম- এ রকম কথাই বলছেন তিনি। চার্চ অব ক্যান্টারবারি এ কথাই বলছেন। কারণ, হয়তো বস্তুবাদ, সেকুলারিজম ও নাস্তিকতার প্রভাব তারা বেশি অনুভব করছেন। এর প্রভাব এই রোবটের মতো লোকগুলোর ওপর কতটা পড়বে, যদি মৌলিক শিক্ষা সংশোধন না করা হয়? হ্যাঁ, এরা পারবেন যদি তাদের দাওয়াত খুব বেশি হয়। তাদের সত্যিকার মুভমেন্ট, সেখানে দাওয়াত থাকবে, যেমন আমরা বলি দাওয়াতের কথা। যেমন ইসলামপন্থীরা যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন, তারা বলে থাকেন, আমাদের দাওয়াত দিতে হবে, লোকদের বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরু বিল মারুফ করতে হবে। নিহি আনিল মুনকার করতে হবে। খ্রিষ্টান ধর্মের তাৎপর্যও এটাই। ইসলামে বলা হয়েছে ‘আমরু বিল মারুফ’, কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মে এই মূল কথাটা যে নেই, তা বলা যাবে না। নিশ্চয়ই ঈসা আ: চেয়েছেন যে, ধর্মের কথা অন্যদের বলো। চার্চের এ ব্যাপারে অনেক দায়িত্ব। তাদের ভালো লোকদের অনেক দায়িত্ব আছে এটা করার জন্য।

গোটা বিশ্বেই ব্যাক টু রিলিজিয়ন, ব্যাক টু মোরালিটি, ব্যাক টু এথিকস- এটা হতে হবে। না হলে মানুষের মুক্তি নেই। মানুষ একেবারেই বর্বর, স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। প্রতারক, বাটপাড়, লোভী হয়ে যাচ্ছে। চলছে জাতির ওপর জাতির অত্যাচার, ব্যক্তির ওপর ব্যক্তির অত্যাচার, শ্রেণীর ওপর শ্রেণীর অত্যাচার।

আমার মনে হয়, ইতিহাস আমাদের পড়ানো হচ্ছে না। এসএসসিতেও ইতিহাস খুব ভালো করে নেই। তাদের বোধ হয় সীমাবদ্ধতাও আছে, এত সাবজেক্ট কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়াবে। কিন্তু ইতিহাস পড়তে হবে। কিছু হলেও পড়তে হবে। ওপরের দিকে ইতিহাস থাকতে হবে। গ্র্যাজুয়েশন কোর্সে যে সাবজেক্টই পড়–ক, একটা অংশ ইতিহাসের ওপর পড়া উচিত। শুনেছি, হার্ভার্ডে যে সাবজেক্টেই পড়–ক, ইতিহাস যেহেতু বেসিক একটা নলেজ, এটা পড়তে হবে। এখন আমাদের কোনো কোর্স যদি ১৩০ ক্রেডিটের হয়, তার মধ্যে আমরা যা পড়াচ্ছি, সবটাই পড়ালাম। কিন্তু অর্ধেক অর্থাৎ ৬৫ ক্রেডিটে পড়ালাম। বাকিটা আমরা ১০ সাবজেক্ট পড়লাম। তাহলে একটা ব্যাপক উপলব্ধি হবে। কিভাবে করতে হবে, কবে হবে জানি না। কিন্তু করতে হবে। ইতিহাস ও সাহিত্যকে উপেক্ষা করা যাবে না।
ঐতিহাসিকভাবেই মানতে হবে, কালচারের ভিত্তি ধর্মই ছিল। এটা না মানা মানে, বাড়াবাড়ি। হিন্দুদের ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্ম প্রাথমিকভাবে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম, অন্যরা মাইনর গ্রুপ। খ্রিষ্টানেরা তো অনেক পরে এসেছে। বৌদ্ধ ধর্মই বৌদ্ধদের কালচারের ভিত্তি ছিল। পরবর্তী সময় একটা কালচার এসেছে পশ্চিমাদের থেকে।

আমাদের বর্তমান কালচারে একটা মিশ্রণ ঘটছে। দেশে মিক্সড কালচার সৃষ্টি করার চেষ্টা হচ্ছে, যেন এখানে হিন্দু ধর্ম ও ইসলাম মিশে যায়। অথবা এর কাছাকাছি যেন চলে আসে ধর্ম হিসেবে। এখানে মঙ্গল প্রদীপ দিয়ে শুরু করা হবে। কিন্তু আমি মনে করি, মানুষের মৌলিক পরিচয় হচ্ছে ধর্ম। কুরআনও তাই বলে। আল্লাহ পাক সূরা বাকারায় বলেছেন, ‘লা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমুন’- তোমরা মৃত্যুবরণ কোরো না, যতক্ষণ না তোমরা মুসলিম হয়েছো।’

অবাক লাগে, আল্লাহ তায়ালা বললেন না যে, আমেরিকান বা পাঞ্জাবি বা ভারতীয় না হয়ে মারা যেও না। এটা প্রমাণ করে রাব্বুল আলামিনের কাছে মূল পরিচয় হচ্ছে, মুসলিম পরিচয়। তাই হিন্দু ধর্ম একজন হিন্দুর আসল পরিচয়। এই পরিচয়ের ভিত্তিতে যদি বাংলাদেশে দুটি কালচার থাকে, তাতে সমস্যা নেই। এক রাষ্ট্রে কয়েকটা কালচার থাকতেই পারে। ভারত এক রাষ্ট্র হলেও অন্তত ২০টা ভাষা আছে সে দেশে। কী সমস্যা এতে? যে ভাষা বেশি চলে, সেটা রাষ্ট্রভাষা হলো। ইসলাম যারা মানে না, মুসলিম আইডেন্টিটির মধ্যে যে, কোনো রকম আপস নেই, এটা তারা বুঝতে পারে না।

বিশ্বাসই মানুষের কাজকে, সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেই বিশ্বাস আসে ধর্ম থেকে। যে মূল্যবোধ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা আসছে ধর্ম থেকে। আমি কী মাছ খেলাম, এটা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। এ দেশের সবজি খেলাম, এটা আমার জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। কিন্তু এটাকেই কিছু লোক প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এটা করছে মূলত তারা, যারা ইসলামকে সহ্য করতে পারছে না। এটা করছে যারা নাস্তিক কিংবা নাস্তিকের কাছাকাছি তারা। যারা বামপন্থী, যারা না বুঝে মনে করছে ‘আমাদের আর কিছু করার নেই, এখন ইসলামবিরোধিতাই আমাদের একমাত্র কাজ। যেহেতু আমাদের কিছু করার নেই, আমরা কী প্রতিষ্ঠা করবো? সোস্যালিজম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কমিউনিজম সম্ভব নয়। তাহলে আমরা কাজ নিলাম ইসলামবিরোধিতা করার- এমন মনোভাব। তাদের যে ব্যর্থতা তারা তা মানতে পারছে না। তাদের উচিত ছিল ইসলামকে বিচার-বিবেচনা করা। তারপর যদি এটা গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে গ্রহণ করা। কিন্তু সেই বিচার তারা করতে পারছে না। কারণ অন্ধ বিদ্বেষ দ্বারা তারা পরিচালিত। নিজেদের পরাজয় তারা মানতে পারছে না।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫