ঢাকা, সোমবার,১১ ডিসেম্বর ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

হজের খুতবা ২০১৭

মুমিনদের হৃদয়গুলো জুড়ে দিন

শাইখ সায়াদ আশ্ শিস্রী

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:২৭


প্রিন্ট

(গত সংখ্যার পর)
ইসলামী শরিয়ায় হারাম করা হয়েছে ধোঁকা ও প্রতারণা, অন্যায়ভাবে অন্যের মাল ভক্ষণ, সুদ, জুয়া, লটারি ইত্যাদি।
অপর দিকে আদেশ করা হয়েছে- ন্যায়নিষ্ঠা, ইনসাফ ও লেনদেনের দলিল প্রমাণ সংরক্ষণের।
হে মুমিনগণ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজে প্রদত্ত তাঁর খুতবায় বলেছেন, ‘তোমাদের রক্ত তথা জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম মর্যাদাসম্পন্ন।’
ইসলাম চায় সমাজে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হোক। যার মাধ্যমে জীবন সমৃদ্ধ হবে। ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নতি ঘটবে। অন্তর প্রশান্তি লাভ করবে। মানুষ শুধু আল্লাহর দাসত্ব করবে।
আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং নিজেদের ঈমানের সাথে জুলুম তথা শিরকের মিশ্রণ ঘটায় না তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’

একজন মুসলিম প্রতিশ্রুতি ও কৃতচুক্তি রক্ষা করবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছো, তোমরা তোমাদের চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো।’ প্রকৃত মুসলিম নিরপরাধ লোকদের ওপর সীমালঙ্ঘনকে ঘৃণা করবে। সীমালঙ্ঘনমূলক কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী দলগুলোর নিন্দা করবে। ইসলামী শরিয়াহ এমনসব বিধান দিয়েছে যা সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আকিদা-বিশ্বাসের নিরাপত্তা, চিন্তা-দর্শনের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা, নৈতিক নিরাপত্তা। ইসলাম দেশ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চায়।
ইসলাম সমাজের মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার বীজবপন করে। একজন মানুষ নিজের জন্য যা চাইবে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে।
হিংসা খুবই নিন্দনীয়, কাউকে অপছন্দ করা ঘৃণিত।

ইসলাম সাধারণভাবে সব স্থানে ও দেশে নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থীতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়। তবে এ বিষয়টি এ পবিত্র এলাকার জন্য আরো বেশি প্রয়োজনীয়। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের (ইবাদতের) জন্য প্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয়েছে, সেটি মক্কার বরকতময় এ ঘর, যা বিশ্বজাহানের জন্য হিদায়াতের উৎসস্থল। যাতে রয়েছে নিদর্শনাবলি, মাকামে ইবরাহিম। যে এতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে।’
আল্লাহ এ দেশের সরকারের মাধ্যমে হারামাইন শরিফাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন প্রথম কিবলা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিরাজের কেন্দ্র মাসজিদে আকসাকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন। ফিলিস্তিনে আমাদের ভাইদেরকে সুরক্ষা দেন। তাদের নিরাপত্তা ও জীবনের সচ্ছলতা দেন। তাদেরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেন।
হে মুমিনগণ! এই মর্যাদাপূর্ণ স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, জাহিলিয়াতের সব বিষয় আজ আমার পদাবনত হলো। গোত্রীয় বর্ণবাদ, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, বাপ-দাদা নিয়ে গর্ব প্রকাশ, পরস্পরের ওপর পরস্পরের দম্ভ ও অহঙ্কার- সবই আজ আমার পদাবনত হলো।

হজের মওসুমকে আঞ্চলিক দাবি-দাওয়া, দলীয় স্লোগান, গোষ্ঠীগত দাবি প্রকাশ এবং মিছিল শোভাযাত্রার ক্ষেত্র বানানো জাহিলিয়াত। বরং হজ হবে শুধু আল্লাহর জন্য, হজ হবে শুধু আল্লাহর জন্য। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা শুধু আল্লাহর জন্য হজ ও ওমরাহ সম্পন্ন করো।’ তাই হজ দলীয় পরিচয় তুলে ধরার স্থান নয়। গোষ্ঠীগত দাবি তোলার জায়গা নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফায় প্রদত্ত তাঁর হজের খুতবায় বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে এমন একটি বিষয় রেখে যাচ্ছি যদি তোমরা সেটিকে আঁকড়ে ধরো তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; সেটি হলো- আল্লাহর কিতাব, আল্লাহর কিতাব।’
হে মুসলিম উম্মাহ! আপনাদের রবের কিতাবকে আঁকড়ে ধরুন, এর মাধ্যমেই সত্যিকার হিদায়াত পাবেন। সফলতা লাভ করতে পারবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার ওপর মানুষের জন্য হকসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যে হিদায়াতের পথে চলবে সে নিজের জন্যই তা করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি কুরআন নাজিল করেছি, যাতে রয়েছে আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য রহমত তথা করুণা।’
তিনি আরো বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে প্রমাণ এবং আমি তোমাদের কাছে নাজিল করেছি সুস্পষ্ট আলো।’
হে উম্মাহর নেতৃবৃন্দ! আপনাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর কিতাব। এ কিতাবের নির্দেশনা অনুযায়ী চলুন। কিতাব অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করুন। উম্মাহর মাঝে এ কিতাবকে ছড়িয়ে দিন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার কাছে সত্য কিতাব নাজিল করেছি, যা তোমার সামনে যা আছে তার সত্যায়নকারী এবং তার ওপর নিয়ন্ত্রণকারী। অতএব আল্লাহ তোমার ওপর যা নাজিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করো, তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তার বিপরীতে তাদের ইচ্ছার অনুসরণ করো না।’
হে উম্মাহর আলিমগণ! আল্লাহর কিতাব হিদায়াতের পরিপূর্ণ উৎস। কুরআন থেকেই উম্মাহর সব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করুন। আল্লাহর কিতাবের বিধানগুলোর ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করুন।
হে বাবা-মা ও মুরুব্বিগণ! বর্তমানে আমাদের সন্তানদের কুরআনের শিক্ষা কতই না প্রয়োজন। কারণ কুরআনেই রয়েছে পরিপূর্ণ হিদায়াত। উন্নত চরিত্র ও নৈতিকতা। ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে কুরআন শিখে ও শেখায়।’

হে সাংবাদিকগণ! আপনাদের দায়িত্ব হলোÑ মহাগ্রন্থ আল কুরআন যে কল্যাণ ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয়ের দিকে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে তার প্রচার ও প্রসার ঘটানো।
হে সম্পদশালী ব্যক্তিগণ! আল্লাহ আপনাদেরকে যে অর্থ-সম্পদ দিয়েছেন তার কিছু অংশ আল্লাহর কিতাবের প্রচার ও প্রসারে ব্যয় করুন। কুরআন শিক্ষা ও কুরআনের দাওয়াতে ব্যয় করুন।
আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে সম্পদ খরচ করে, তাদের উদাহরণ হলো একটি শস্যদানার মতো, যার থেকে সাতটি শিষ গজায় আর প্রতিটি শিষে থাকে একশতটি শস্যদানা। আল্লাহ যাকে চান আরো বাড়িয়ে দেন।’

হে হাজীগণ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতে খুতবা প্রদানের পর বিলালকে আজান দিতে বললেন, বিলাল আজান দিলেন। অতঃপর ইকামত দিলেন, তিনি কসর করে দুই রাকাত জোহরের সালাত আদায় করলেন। তারপর আবার ইকামত দেয়া হলো, এবার দুই রাকাত আসরের নামাজ আদায় করলেন। তারপর তিনি আরাফাত ময়দানে তাঁর উটের পিঠে বসে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জিক্র করলেন, দোয়া করলেন।
সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হলেন।
তিনি তাঁর সাহাবীগণকে কোমলতা অবলম্বনের উপদেশ দিয়ে বললেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা প্রশান্তির সাথে চলো, দ্রুততার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।’
মুজদালিফায় পৌঁছে তিনি একত্রে তিন রাকাত মাগরিব ও দুই রাকাত এশার নামাজ আদায় করলেন এবং সেখানেই রাত কাটালেন। সময় হওয়ার সাথে সাথে ফজর আদায় করে চারদিক আলোকিত হওয়া পর্যন্ত দোয়া করলেন। অতঃপর মিনায় পৌঁছে আকাবার জামারায় সাতটি পাথর নিক্ষেপ করে কোরবানি করলেন। কোরবানির পর মাথার চুল কামিয়ে মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ করলেন। আইয়্যামে তাশরিকের তিন দিন তিনি মিনায় অবস্থান করে প্রতিদিন তিনটি জামারায় পাথর নিক্ষেপ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ হচ্ছেÑ ১৩ তারিখ পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করা। আর এটিই উত্তম। তবে কেউ যদি ১২ তারিখ পর্যন্ত অবস্থান করতে চায়, করতে পারে।
হজের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে কা‘বার তাওয়াফ করেন।
হে আল্লাহর সম্মানিত ঘরের হাজীগণ! আপনাদের আজকের এ অবস্থান, খুবই মর্যাদার অবস্থান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আরাফাহ দিবস ছাড়া অন্য কোনো দিন আল্লাহ এত বেশি লোককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন না। তিনি তাদের নিকটবর্তী হন। তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন।’
বেশি বেশি জিকর ও দোয়ার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখার উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফা দিবসে রোজা রাখেননি।
হে আল্লাহ! হাজীগণের হজ কবুল করো। তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দাও, তাদের সব প্রয়োজন পূরণ করে দাও। হে আল্লাহ! মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করে দাও। তাদের হৃদয়সমূহকে জুড়ে দাও। অন্তরগুলোকে পরিশুদ্ধ করে দাও। তাদের দেশে তাদেরকে নিরাপত্তা দাও। প্রত্যাবর্তন দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দাও।

আনুবাদক : আ. ন. ম. রশীদ আহমাদ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫