ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

গল্প

রোহিঙ্গা প্রহর

রুহুল আমিন বাচ্চু

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:১২


প্রিন্ট

কদির বাপের বিশেষ আকর্ষণ চায়ের কাপে টুংটাং শব্দে ছন্দ তুলে পথচারীদের নজর কাড়া। মাঝে মধ্যে কেতলির ঢাকনা তুলে তাজা পাত্তির ঘ্রাণ ছিটিয়ে দেয় বাতাসে। তাতে ঘ্রাণের উৎসের খোঁজে চা-খোরদের আনাগোনা বাড়ে। গ্রামীণ পরিবেশে দোকান। বান্ধা কাস্টমার তো আছেই নগদ-বাকিতে। পথচারীদের কাছে দিনে বিশ-পঞ্চাশ কাপ বিক্রি করতে পারলে সেটাই আসল লাভ।
তিন রাস্তার মোড়ে কদমতলা মসজিদের সামনে চা-বিস্কুটের দোকান তার। আরেকটি দোকান রয়েছে মসজিদে ঢোকার ডানপথে। তারই পড়শি আবুল চালায়। দুই দোকানের বান্ধা কাস্টমার আলাদা। পথচারীদের হিস্যা অবশ্য ভিন্ন, যার যা পছন্দমতে দোকানে বসে চুমুক মারে।

কদির বাপের বড় ছেলেটা বেলা হলে হাই তুলতে তুলতে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম হাজিরা দিয়ে পাশে দাঁড়ানো তালগাছে হেলান দিয়ে আধঘণ্টা ঝিমিয়ে নেয়। এরপর আড়মোড়া ভেঙে কেতলি, চায়ের কাপ মসজিদের পুকুরে ঘষেমেজে বাবার সামনে রাখে। সব সময় তার চোখে-মুখে বিরক্তির রেখা স্পষ্টত নড়াচড়া করে। দুই দোকানেই চায়ের সাথে বিস্কুট, এনার্জি ড্রিঙ্কস, চিপসের নানান রঙের ভেতরে সামথিং ফাঁপা প্যাকেট।

ফজর নামাজ শেষে আলিমুদ্দিন এদিক-সেদিক ঘূর্ণি মেরে দোকানের বাইরে থাকা স্থায়ী বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করে। কদির বাপ দোকানের ঝাপ খোলার আগেই নিত্যদিন এই মানুষটাকে দেখে বিরক্ত হয়। কিন্তু কখনো প্রকাশ করে না। সব কাস্টমার লক্ষ্মী, এ ভাবনা মনে তাজা রাখে। একটা বিষয় মনে ফোড়ন কাটে। ও ব্যাটা তো বাকির কাস্টমার। সকালের বনি নগদে উশুল না হলে দিনটা যদি মন্দ যায়!

এক সময় মন দোলাচালে থাকলেও আজকাল এ বিশ্বাস স্থায়ী হয় না। চলছেই তো এভাবে গত ত্রিশ বছর। নগদে বাকিতে চারজনের সংসার তো চলছে। মনে মনে শোকর আলহামদুলিল্লাহ বলে গ্যাসের চুলায় পানি চড়ায়। একসময় আবুলের দোকানকে প্রতিপক্ষ ভাবলেও আজকাল ওসবে ভাব ধরে না। এশার নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের সামনে বসে দশ-বারো মিনিটের বয়ান শোনে। হাদিস-কুরআনের ব্যাখ্যা শুনে মন শান্ত করে। খোদা যার রিজিকে যা রাখছেন এর কমতি হবে না, বেশিও না। মানুষ কী কারণে কাকের মতো কা কা করবে!
র্দূ যা, র্দূ যা। নিজের মনটাকে কাকতাড়ুয়া বানিয়ে চায়ের পাত্তি ঢেলে দেয় কেতলিতে।
- আলিমুদ্দিন, চা তো অইলো, বিস্কুট দুইখান চুবাইয়া খাইবা?
মনে মনে ভাবে দুইটা বিস্কুট খাওয়াতে পারলে দুই টাকা লাভ হবে। কিন্তু ওই ব্যাটা বিস্কুটের ফাঁদে হাত বাড়ায় না। বলে, বেড টি। বেড টিতে বিস্কুট খায় না।
- বেড টি তো বড়লোকেরা শুইয়া শুইয়া খায়। তুমি তো বেলাইনে।
কথা বাড়ায় না কদির বাপ। গত রাতেও ভালো ঘুম হয়নি। স্ত্রীর নাকফুলটা ভেঙে দিয়েছে। মন-মেজাজ খারাপ। আরেকটা যে চট করে এনে দেবে সহজে কথা দিলেও বাস্তবতা কঠিন। আলিমুদ্দিন নিজেই দোকানের ভেতর থেকে গতকালের পত্রিকা বের করে কখন থেকে পড়ছে। চায়ের পাত্তির উশ্খুশ ঘ্রাণ তার নেশাটাকে বেহাল করে দিচ্ছে। দুইজন মোটরসাইকেল আরোহী হঠাৎ
ব্রেক কষে দোকানের সামনে দাঁড়ায়। একজন হেলমেট খুলে মাথার চুল ঝাঁকিয়ে বলে, চা অইবে, দুধ চা?
মিষ্টি কম। লগে টোস্ট বিস্কুট?
কদির বাপ ওদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। মনে হচ্ছে আলো-আঁধারের খেলায় মন কিছু একটা খুঁজজে। লোক দু’টি চেনা মনে হচ্ছে। আবার ভাবে লক্ষ্মী কাস্টমার। আজ নগদ দিয়েই শুরু করবে।
আলিমুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে কদির বাপ ওদের তাড়া দেখিয়ে চারটে টোস্ট একটা প্লাস্টিকের প্লেটে আদরের সাথে দু’হাতে বাড়িয়ে ধরে। ওরা নিজেরা ইংরেজিতে টুকটাক কথার মধ্যে টোস্ট ভাঙতে থাকে।

আলিমুদ্দিনের হাতে মেলে ধরা পত্রিকায় তাকিয়ে ওদের একজন দাঁত কিড়মিড় করে বলে, যদি যাইতে পারতাম হালাগোরে বান্দরের নাচনি খেলাইতাম। অন্যজনের চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা। প্রায় চিৎকার করে উঠে সে গজগজিয়ে। আরাকানের মগ হালারা অহনো আমাগোরে চিনস্ নাই? একাত্তরে আমাগো মুরব্বিরা দেখাইয়া দিছে বড় গুলানরে...
আলিমুদ্দিন নড়েচড়ে বসে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। মনে মনে ভাবে সে যে একজন মুক্তিযোদ্ধা, এখনই তো প্রকাশ করার সময়। কদির বাপ ওদের চা ধরিয়ে আলিমুদ্দিনের দিকেও এক কাপ তুলে ধরে। ওরা চায়ে টোস্ট চুবিয়ে খেতে থাকে।

আলিমুদ্দিন বুকপকেট থেকে প্লাস্টিকের মোড়ানো দু’টি পত্রিকার কাটিং বের করে ধরে ওদের সামনে। একটি দু’বছর আগের সিরিয়ার শিশু আয়লান কুর্দির। তিন বছর বয়সী মৃত আয়লানের উপুড় হয়ে থাকা সমুদ্র সৈকতের ছবিটা বিশ্ব বিবেক খোলাসা করে দিয়েছিল। আরেকটি টেকনাফের সৈকতে চিত হয়ে ভেসে থাকা মেয়ে শিশুটি। যার নাম নেই, পিতামাতার খোঁজ নেই। হয়তো তারাও ডুবে মরেছে অথবা গুলি খেয়ে মরেছে। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর সে শিশুটি কি বিশ্ববিবেককে আরেকবার নেড়ে দিতে পারবে!

এ নীরব প্রশ্ন আর সরব ছবি দু’টি বারবার খদ্দরদের চোখের সামনে মেলে ধরছে আলিমুদ্দিন। পত্রিকার ডান পাশে ছোট্ট করে একটা হেডিং ‘মায়ানমারের সেনাদের গুলি খেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো টেকনাফে।’ সেইসব আরাকান বধ্যভূমিতে সন্তান ফেলে আসেনি। জীবনটা কোনো রকম ধরে নৌকায় তরঙ্গবিক্ষুব্ধ নাফ নদী পাড়ি দিয়ে টেকনাফ সৈকতে সন্তান জন্ম দিয়ে নিজেকে সঁপে দিলো মৃত্যুর কোলে। তার স্বামীকে কেটে টুকরা টুকরা করে আগুনে পুড়িয়েছে অহিংসা পরম ধর্মের পূজারীরা। আলিমুদ্দিন ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করে, কাকারা আপনাদের চিনলাম না। হেলমেট হাতে লোকটা আলিমুদ্দিনের প্রশ্নের জবাব চোখের রাগত দৃষ্টিতে বিনিময় করে।

কদির বাপের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা বলে, চা খুব ভালো বানাইছেন মুরব্বি। আরো দুই কাপ দেন, লগে টোস্ট। আলিমুদ্দিন জবান না খুলে ইশারায় তাকেও টোস্ট আর চা দিতে বলে।
মনডায় কয় হালাগো দেশে গিয়া বিশ-পঞ্চাশটারে ফিনিশ দিয়া আহি। আলিমুদ্দিনের মনের উশখুশ ভাবটা বারবার তড়পাতে থাকে। সে যে একজন মুক্তিযোদ্ধা ওদের জানাতে চায়। তার একাত্তরের তেজি মনোভাবটা বিকট শব্দে উদগিরণ করতে চায়। বলতে চায় আমি এখনো আছি, আমারে লগে লইবেন কাকারা?

ছেলে দুটো এবার আলিমুদ্দিনের চাপা ভাঙা গালের দিকে তাকিয়ে বলে কামডা এবার খোয়ানগো। আপনারা পেপার পড়বেন, টিভির খবর দেখবেন, আর মনে মনে গোস্বা পয়দা করে মানে ইয়ে-ইয়ে করবেন।
- আইচ্যা কাকারা আমেরিকা, রাশিযা, চীন হেরাটি জোর কইরা কিছু কইবো না? হেরাও যে আরাকান রাজ্যে ঢুকতে পারতাছে না অপমান মনে হয় না?
- বাপরে দুনিয়াডা অহন কারবারিগো। হেগো ব্যবসা আছে, টাকা আছে, যেইডা চায় হেইডা পায়। কে মরলো কে বাঁচলো হেইডা হেরা দেখবো ক্যান? মানুষগুলোন তো তাগো খালাতো ভাই, মামাতো বইন না। আমাগো মতন দিলও নাই। আর কয় গণতন্ত্র, মানবতা, শান্তির দূতওয়ালী। শয়তানের বাচ্চারা...
- আমরা কী করুম? দেশে তো আগুন জ্বলতাছে। কী কয়, রোহিঙ্গারা হে দেশের নাগরিক না, ভোটার না। হেরা নাকি অন্য দেশের মানুষ। হেইপারে জবরদস্তি থাকতাছে শত শত বছর ধইরা?
- কত অইলো?

কদির বাপ থতমত খেয়ে বলে, না বাজান লাগবো না। আপনেরা মেহমান মানুষ।
- ওই কি কয়রে হালার কাক্কু? মাগনা খামু তো হলে; গেরামের দোকানে ক্যান? পঞ্চাশ টাকার একটা নোট এগিয়ে ধরে হেলমেটওলা। কদির বাপের হাত কাঁপছে, হাত এগোতে চাচ্ছে না যেন। ওরা মোটরসাইকেলে বসে স্টার্ট দিয়েই এক্সিলেটারে চাপ দিয়ে হাওয়া। কদির বাপ পাওনা বিশ টাকার নোট একটা নিয়ে রাস্তার মোড় পর্যন্ত দৌড়ে যায়।
- বড় ভালো পোলারা। বিশ টেকা তোমাকে বকশিশ দিচ্ছে। আরে রাখ রাখ। বড়লোকের পোলাপান তো! আলিমুদ্দিন মজা করে শেষ চুমুক মুখে তুলে নেয়।
কদির বাপের দোকানের কাস্টমাররা এখনো জড়ো হয়নি। কদির বাপ এ ফাঁকে আধা কাপ চায়ের সাথে একটা টোস্ট ভিজিয়ে চেখে নেয়।
- আইচ্যা কদির বাপ, সিরিয়ায় আয়নালের লাইগা আমাগো মন কান্দছিল, এখন রোহিঙ্গাগো লাইগা...
- আমাগো যে কিচ্ছু করার নাই, হের লাইগা মনে মনে ভাবি আর জ্বলি।
দু’জনের দীর্ঘশ্বাস যেন জমাট বেঁধে ছোট্ট চায়ের দোকানে স্থবির হয়ে যায়। আলিমুদ্দিন বেঞ্চ ছেড়ে দেয়। চায়ের কাপে টুংটাং শব্দে দোকানের আবহ পরিবর্তিত হয় কাস্টমারের আগমনে।

বেলা ১০টার দিকে চোখ ডলতে ডলতে কদির বাপের বড় ছেলে কাদির দোকানে ঢোকে।
দোকানের বাটখারা দিয়ে কদির বাপ তেড়ে আসে,
- হারামজাদা, রাইতভর মোবাইলে টিপাটিপি আর দিনভর ঘুম। জমিদারি পাইছস? এক্কেরে দিমু তোরে শেষ কইরা। কালু পাটোয়ারী বাপ-বেটার মাঝখানে এসে দাঁড়ায়।
- কিরে বাবা, বয়স তো অইছে। কয়দিন পর বিয়াশাদি করবি। বাপেরে সাহায্য না করলে সংসার চলবো কেমনে? লেখাপড়াও তো করলি না-
কালু পাটোয়ারীর কথা ধরে কদির বাপ গজগজ করে, কত চেষ্টা করলাম, টেকা-পয়সা খরচ করলাম, লেখাপড়া করব না। কয় কিনা আমারে দিয়া অইবে না। ব্যবসা করব, টেবলেটের ব্যবসা। দোকানদারি পোষায় না। মানুষেরে নেশা ধরাইয়া টাকা রোজগার? মুতি তোর হেই টাকায়। আর কোনো দিন কইছস তো তোরে কোরবানির ছুরি দিয়া জবাই দিমু।

কালু পাটোয়ারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কী কইবা আর? চাইর দিকে যা অবস্থা। বাবা নামে সব বেতাল। ইয়াবা বলে বাবা? তোগো বাবা কয়জন থাকেরে? অইছেরে বাপজান, কম কামাই কম খাওন। শান্তমতো থাক, সুখে থাক। এই বাবারে নিয়া কেউ বাঁচতে পারে নাইরে বাজান। দেখলাম তো। নিজে খাবি অন্যেরে খাওয়াবি। সংসার-দুনিয়া ও আখিরাত সব খোয়াইবিরে বাজান। এ বাবারে নিয়া চিন্তাও করিস না। আলিমুদ্দিন আবার ফিরে আসে দোকানে। আজকের পত্রিকার খবর নিতে। এত সময়ে হকার দিয়ে যাওয়ার কথা। ছেলেটা গেছে মসজিদের পুকুরঘাটে। দোকানে কাস্টমার নেই। কদির বাপের মনে কিলবিল করতে থাকে গত রাতের ঘটনা। রাতে দোকানের ঝাপ বন্ধ করার আগমুহূর্তে একটা অটোরিকশাকে ঘেরাও করে এই দুইজন মোটরসাইকেল আরোহী। একটু আলো-ছায়ার হিসাব থাকলেও দোকানের আলোয় এদের ঠিকই চিনতে পারে। পরে খবর পায় অটো আরোহী সরদারবাড়ির রাজ্জাকের ছেলে কাশেম।

তার নগদ পঁচিশ হাজার টাকা আর মোবাইল নিয়ে যায় এরা পিস্তল ঠেকিয়ে। নিজেকে সামনে নেয় কদির বাপ। আলিমুদ্দিনের কানে গেলে বিপদ হতে পারে। দশ কান হয়ে চলে যাবে পুলিশের কাছে। তারপর ছত্রিশ ঘা নিয়ে এ বয়সে চলার উপায় থাকবে না। তার ধারণা সরদারবাড়ির কেউ না কেউ এ টাকার সংবাদ পেয়ে ওদের লেলিয়ে দিয়েছে। কদির বাপ মোবাইল টিপে সময় দেখে। বেলা সাড়ে এগারোটা। খিলপাড়া বাজার থেকে চাপাতা, চিনি, বিস্কুট, ডিম এসব আনতে হবে। দোকানের ক্যাশ মিলিয়ে আড়াই হাজার টাকা লুঙ্গির কোঁচরে গিঁট মেরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিশ্চিত হয়। ছেলেকে দোকানে বসিয়ে বস্তা হাতে বের হয় কদির বাপ আল্লাহর নাম নিয়ে।
রিকশাভাড়া বাজার পর্যন্ত বিশ টাকা। বিশ টাকা মানে চার কাপ চায়ের দাম। ঘড়িধরা ১২ মিনিটের পায়ে চলার রাস্তা। মাঝামাঝি জায়গায় খিলপাড়া কলেজ। কলেজের গেটে ছাত্রদের জটলা, ব্যানার, ছবি এসব দেখে আতঙ্কিত হয়। না জানি আবার কোন ঝামেলা। গেটের ভেতরে একটা টেবিল সাজানো, সেখান থেকে কেউ ঘোষণা দিচ্ছে মাইকে।

ধীরকদমে পা বাড়ায় কদির বাপ। কলেজ গেটের ওপর বড় করে লেখা ‘রোহিঙ্গাদের সাহায্য করুন’, ‘মানবতার কল্যাণে সকলেই এগিয়ে আসুন’। ব্যানারের দুই পাশে দু’টি ছবি। এক পাশে সাগর থেকে উঠে আসছে দুইজন রোহিঙ্গা তাদের মাথায় দুটো শিশুর লাশ, অন্য পাশে সেই মেয়েশিশুটির ডুবন্ত মৃতদেহ।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুকুরে ডুবে নিহত তার তিন বছর বয়সী মেয়ে আমেনার মৃতদেহ। কদির বাপ নিজেকে সামলাতে পারে না। রাস্তার পাশে মেহগনিগাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে উদগত কান্নায় ভাসিয়ে দেয় নিজেকে। সারা দেহ তার কম্পিত হয় বারবার। আড়াল থেকে বের হতেই সাঁ সাঁ করে তার পাশ দিয়ে চলে যায় সেই মোটরসাইকেল দুই আরোহীসহ। মাইকে ঘোষণা শোনে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ভাইদের সহায়তা করুন। যে যা পারেন টাকা-পয়সা, পোশাক-আশাক, শুকনো খাবার দিন। আপনার দান ত্রাণ হিসেবে পৌঁছে দেবো আমরা। আগামী শুক্রবার আমাদের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে চলে যাবে দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত রোহিঙ্গাদের কাছে। ওরাও মানুষ, ওরা আমাদের ভাই। আমাদের বেশ মানবিক দায় নিয়েছে, আপনিও শরিক থাকুন।
দূর থেকে লক্ষ করে কদির বাপ পথচারীরা পকেট হাতড়ে টাকা-পয়সা ফেলছে ওদের মেলেধরা কাপড়ে।
কদির বাপের একটু সামনে সেই দুই আরোহী। কদির বাপের বুকের ঘণ্টা দুপ দুপ বাজছে। এই না ওরা চাদর টেনে সব কিছু ছিনতাই করে!
দুইজনের পেছনে সে, ওদের একজনের কথা শোনা যায়,
- জীবনে বহুত আকাম করছিরে হালা, আইজ একটু ভিন্ন কিছু কইরা দেহি, কী কস্?
কদির বাপের দম বন্ধ হয়ে আসে। এই বুঝি পিস্তল বের করে ফাঁকা ফায়ার করে। হেলমেটওলা পকেটে হাত ঢুকায়। কদির বাপ যেন হেলে পড়ে যাচ্ছে। মুহূর্তে কিছু একটা ঘটবে।
- একটা রশিদ লিখে দাও তো ছোট ভাই। পঁচিশ হাজার টাকা। ছেলেরা হতবাক।
ওদের অন্যজন বলে, ওই ব্যাটা অকটেনের টাকা রাখছস, কেমতে যাবি?
- দিবো ওই হালা, আসাদুল্লা। হালায় যে আমাগোরে আনছে। ওরা চলে যায়।
কদির বাপ থর থর কম্পনে এগিয়ে যায়। ছোট্ট করে বলে বাবারা লেইখ্যা দিছে দুই হাজার সাত শ’ টাকা। গাঁট খুলে টাকা বের করে সে। আলিমুদ্দিন পেছনেই ছিল, খপ করে ওর ডান হাত চেপে ধরে। কদির বাপ একটু হাসে, আমার তো মাটি আছে, ঘর আছে, বউ-পোলাপান আছে, রোহিঙ্গাদের তো কিছুই নাই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫