ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

কবিতা

কবিতায় দ্রোহ প্রতিবাদ ও মানবিকতা

সায়ীদ আবুবকর

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৩


প্রিন্ট

শেক্সপিয়রের দ্য টেমপেস্ট নাটকে প্রসপেরোকে উদ্দেশ করে ক্যালিবান বলেছিল, ‘তুমি আমাকে ভাষা শিখিয়েছ, তাতে আমার লাভ হয়েছে এই যে, আমি জানি কী করে অভিশাপ দিতে হয়।’ মনিবের প্রতি ক্যালিবানের এই আচরণ একজন উপনিবেশবাদীর বিরুদ্ধে এক ধরনের দ্রোহের সামিল। শেক্সপিয়র জানতেন কবিতার ভাষাকে কখন কোন প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে প্রয়োগ করতে হয়। প্রতিরোধ সাহিত্য, সে কবিতা হোক, উপন্যাস, ছোটগল্প কিংবা নাটক, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত সাহিত্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। ভাববাদী রোমান্টিক যুগের কাব্য-আন্দোলনের দিন আর নেই। যন্ত্রসভ্যতার নির্দয় নিষ্পেষণে যখন হাহাকার করছে মানুষ; পুঁজিবাদ, বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার যাঁতাকলে পড়ে যখন করজোড়ে ফরিয়াদ করছে মানবতা, তখন ভাববাদ নিয়ে ভাবিত হওয়ার অবকাশ মানুষের নেই। তার আত্মার সঙ্গী তাই বিপ্লবী ও সংগ্রামীরা। সঙ্গত কারণেই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন বিপ্লবী কবি-সাহিত্যিকেরা।

বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক বিপ্লবী। দ্রোহ ছিল তাঁর রক্তে-মাংসে, হৃদয়ে ও সত্তায়। মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্যেই বিদ্রোহের গোপন আগুন জ্বালিয়ে দেন তিনি। এ মহাকাব্যের রাবণপুত্র মেঘনাদ একজন দেশপ্রেমিক বীরপুরুষ-যোদ্ধা আর পরদেশ-আগ্রাসী রাম মূলত শাসক ইংরেজ। মধুসূদনের এ প্রতীকী ব্যবহার তাঁর ভেতরে লুকায়িত স্বাধীনতার স্পৃহাকেই ইঙ্গিত করে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাবণ তাঁর সমগ্র শক্তি দিয়ে যে রামকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছে, সে রাম মাতৃভূমি ভারত-আগ্রাসী ইংরেজ; মধুসূদন সেখানে নিজেকেই উপস্থাপন করেছেন রাবণের আদলে। ‘জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?’ এ শুধু মহাকাব্যের প্রয়োজনে রচিত পঙ্ক্তিই নয়, মধুসূদনের অন্তরে জাত দাবানলসম স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাও বটে।

কিন্তু বাংলার প্রকৃত বিদ্রোহী হলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। নজরুলের বিপ্লবী কবিতাগুলো এক সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত না হওয়ায় আজো বিশ্ববাসীর অজানাই রয়ে গেছে যে, কতটা তীব্র ছিলো নজরুলের বিদ্রোহের আগুন। ইংরেজ কবি পি বি শেলি (১৭৯২-১৮২২) ও জর্জ গর্ডন বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪) বিদ্রোহী কবি বটে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাঁরা কেউ-ই নজরুলের চেয়ে বড় কবি ছিলেন না। এঁদের বিদ্রোহ ছিলো বস্তুত প্রতীকী, শৈল্পিক নৈপুণ্য ও ভাষার আলঙ্কারিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ; ফলে তা বুদ্ধিজীবী-পাঠকশ্রেণি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, ব্যাপক সাধারণ পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছোতে পারেনি কখনো। পক্ষান্তরে নজরুলের বিদ্রোহ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, খরস্রোতা নদীর মতো বেগবান, ভাষা খবুই সাধারণ, স্বল্পশিক্ষিতেরও বোধগম্য, চিত্রকল্প এতই পরিচিত যে, নাটকের দৃশ্যের মতো যে কাউকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। নজরুল যখন বলেন:
দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে।
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

তখন পাঠকের চোখে যেমন পানি টলমল করে, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীও হয়ে ওঠে সে ভেতরে ভেতরে। নজরুলের মধ্যে কোন রাখঢাক নেই; তাঁর কণ্ঠ যেন কোনো যোদ্ধার, ঘোষণা বীরপুরুষের :

আসিতেছে শুভ দিন
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।
[কুলিমজুর, সাম্যবাদী]

পাঠক তখন তাঁর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা না করে পারে না। শেলির ‘ওড টু ওয়েস্ট উইল্ড’ একটি বৈপ্লবিক কবিতা বটে; কিন্তু কবিতার শেষ পঙক্তি পর্যন্ত না পৌঁছোলে কবিতাটি পুরোপুরি কবিতা হিসেবে পাঠকের কাছে ধরা দেয় না। ওয়েস্ট উইন্ডের কাছে কবি আহ্বান করছেন সে যেন তাঁকে শুকনো পাতার মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়, সাগরের ঢেউয়ের মতো জাগিয়ে দিয়ে তাঁর বিপ্লবের বার্তা যেন সে ছড়িয়ে দেয় সারা বিশ্বে। কবি, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী যে সত্য হবেই, তাঁর ওপর জোর দিচ্ছেন এই বলে:

O Wind,
If Winter comes, can Spring be far behind?

কবি ওয়েস্ট উইন্ডের কাছে শক্তি ভিক্ষা করছেন এই বলে যে, তিনি তাঁর কৈশোরের অফুরন্ত তেজ হারিয়ে ফেলেছেন, তাই তিনি তার কাছে শরণাপন্ন হয়েছেন। কিন্তু নজরুলের যৌবন অসীম। তিনি তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় অবলীলায় ঘোষণা করেন যে, তিনি নিজেই এক অফুরন্ত শক্তি, তিনি কারো কাছে মাথা নত করেন না:

আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস
আমি আপনারে ছাড়া কবি না কাহারে কুর্নিশ।

নজরুল তাঁর সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে মানবতাবাদের যে বিস্ময়কর মন্ত্র উচ্চারণ করে গেছেন একের পর এক, তার নজির বিশ্বসাহিত্যর ইতিহাসে একটিও নেই। নজরুল বিদ্রোহ করেছেন সমুদয় অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, পরাধীনতা, কুসংস্কার, জরাজীর্ণতা, প্রাচীনতা, ধর্মান্ধতা ও মানুষের পশুত্বশক্তির বিরুদ্ধে; স্বদেশ ও স্বজাতির জন্যে ছিল তাঁর বুক ভরা দরদ। নজরুলই বিশ্বের একমাত্র কবি যিনি মানুষে মানুষে মিলনের সেতু নির্মাণ করেন ভালোবাসার মন্ত্রে :
গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান [সাম্যবাদী, সাম্যবাদী]

নজরুল প্রচলিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন হৃদয়হীন ধর্মীয় জীবনের প্রচণ্ড সমালোচক, কারণ তিনি ধর্ম পছন্দ করেন কিন্তু ধর্মের নামে ভণ্ডামি, কপটতা, শঠতা সহ্য করেন না একদম। তাই তো তিনিই বলতে পারেন এভাবে:
ও মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ জোর করে নাও কেড়ে;
যাহারা আনিল গ্রন্থ কেতাব সেই মানুষের মেরে
পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল!
[ মানুষ, সাম্যবাদী]
বাংলা ভাষার আরেকজন প্রকৃত বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭)। নজরুলের মতো তিনিও ছিলেন আপাদমস্তক বিপ্লবী। ‘আগামী’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ’সিগারেট’, ‘দেশলাইকাঠি’, ‘আঠার বছর’, ‘হে মহাজীবন’ প্রভৃতি তাঁর চমৎকার সব কবিতা, যেখানে লুকিয়ে আছে বিদ্রোহের ছাইচাপা আগুন, সুযোগ পেলেই যা জ্বলে উঠবে দাউদাউ করে:
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ,
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ;
মাটিতে লালিত, ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে
মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রেখেছে আমাকে।
(আগামী, ছাড়পত্র)

সুকান্তের ‘একটি মোরগের কাহিনী’ প্রতিবাদী সাহিত্যের এক অদ্বিতীয় নমুনা, কবিতাটির প্রতীকী অর্থ-দ্যোতনার জন্য।

তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষদেরকে তিনি মোরগ প্রতীকের মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, তা বিশ্ববিবেককে নাড়া না দিয়ে পারে না। কবিরা কোনো কথা সরাসরি বলতে চান না। তাঁরা একটা প্রতীকের আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুকান্তও তাই করেছেন। একটা মোরগের কথা তিনি আমাদের শোনাতে চান গল্পের মতো করে। তিনি বলে চলেন:

একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেলো
বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে,
ভাঙ্গা প্যাকিং বাক্সের গাদায়-
আরো দু’তিনটি মুরগির সঙ্গে।

আশ্রয় যদিও মিললো,
উপযুক্ত আহার মিললো না।

কবির মূল্য উদ্দেশ্য মোরগের জীবনের ট্র্যাজেডির কথা বলা। আশ্রয় তো পেল প্রাসাদে। কিন্তু প্রাসাদ যে প্রাণহীন। কবি বলেন:

অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে
বারবার চেষ্টা করলো প্রাসাদে ঢুকতে,
প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড।
------- ------ -----
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,
একেবারে সোজা চলে এল
ধবধবে সাদা দামি কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে:
অবশ্য খাবার খেতে নয়-
খাবার হিসেবে।

সুকান্ত এ ধরনের গল্প বলার আড়ালে যে কাজটি মূলত করতে চেয়েছেন, তা হলো, বিশ্ববিবেককে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলা এবং অধিকারবঞ্চিত, ক্ষুধার্ত, সর্বহারাদেরকে প্রতিরোধের শপথে উদ্দীপ্ত করা।

চল্লিশের দশকের দু’জন কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁদের বিপ্লবী কবিতার জন্য। ফররুখের ‘লাশ’ কবিতা ছাড়া বাংলা সাহিত্যের প্রতিরোধ সাহিত্য কল্পনাই করা যায় না। যেকোনো ভাষার যেকোনো শ্রেষ্ঠ কবিতার সঙ্গে এটি তুল্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে। বাংলা তেরশ পঞ্চাশ সনের দুর্ভিক্ষের যে ভয়াবহ চিত্র এঁকেছিলেন ফররুখ এ কবিতায়, তা বিশ্বের যেকোনো স্থানের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এবং চিরদিনই তা মানুষকে বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী করে তুলবে। কবি যখন এ রকম করে বলেন:

পৃথিবী চষিছে কারা শোষণে, শাসনে
সাক্ষ্য তার রাজপথে জমিনের ’পর
সাড়ে তিন হাত হাড় রচিতেছে মানুষের অন্তিম কবর।
পড়ে আছে মৃত মানবতা তারি সাথে পথে মুখ গুঁজে।

তখন তাঁর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা ছাড়া পাঠকের গত্যন্তর থাকে না।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর পদাতিক কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শ্রেণির অস্তিত্ব ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার চেষ্টা করেন ঝটিকার মতো। বুলেটের মতো বুর্জোয়া শ্রেণির বক্ষদেশ বিদ্ধ করে যেতে থাকে তাঁর এক-একটি পঙ্ক্তি। কবি যখন এ রকম করে বলেন:

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।
(মে-দিনের কবিতা)

তখন রোমান্টিকতার পথ পরিহার করে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় তৃতীয় বিশ্বের ভুখানাঙ্গা আত্মভোলা মানুষগুলো, চোখে যাদের জ্বলে ওঠে বিপ্লবের বারুদ।

প্যালেস্টাইনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮)। একটি মাত্র কবিতাই যথেষ্ট তাঁর কাব্যমেজাজ বোঝার জন্য। ‘পরিচয়পত্র’ তাঁর এমনই একটি কবিতা। মাহমুদ বলেন:

লিখে রাখুন!
আমি একজন আরব।
আপনি চুরি করে নিয়েছেন আমার পূর্বপুরুষদের ফলের বাগান
এবং আমার জমিজায়গা যেখানে আমি আমার সন্তানদের সাথে
চাষবাস করতাম।
এবং আপনি আমার জন্যে কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি
কেবল পাহাড়গুলো ছাড়া।

সুতরাং লিখে রাখুন প্রথম পৃষ্ঠার উপর:
আমি মানুষকে ঘৃণা করি না
সীমা লংঘনকারীও আমি নই।
কিন্তু আমি যদি ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ি
দখলকারীর মাংসই হবে আমার খাদ্য
সাবধান...সাবধান হয়ে যান
আমার খিদে এবং আমার ক্রোধের ব্যাপারে।

দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে মাহমুদ দরবেশের এক-একটি কবিতা এক-একটি অ্যাটোম বোমার মতো। প্যালেস্টাইনের সমস্ত যোদ্ধা মিলে যা করতে পেরেছেন, মাহমুদ দরবেশ একাই তাঁর কবিতার অ্যাটোম বোমা নিক্ষেপ করে সেই কাজই করেছেন বর্বর শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে। বিপ্লবী এই কবি তাঁর মাতৃভূমি প্যালেস্টাইনকে কবিতায় উপস্থাপন করেছেন স্বর্গের উদ্যান হারানোর প্রতীক হিসেবে। মাতৃভূমি প্যালেস্টাইন তাঁর কাছে স্বর্গের উদ্যান, যা পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি সংগ্রাম করে গেছেন সারা জীবন।

মায়া অ্যাঞ্জেলো (১৯২৮-২০১৪) ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। অবিশ্বাস্য এক লোমহর্ষক জীবন পাড়ি দিয়ে তিনি পরিণত হয়েছেন আজ এক কবিতার কিংবদন্তিতে। তাঁর যাপিত জীবন যেমন বিস্ময়কর, তেমনি বিস্ময়কর তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতার পরতে পরতে ছাইচাপা আগুনের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিপ্লবের আগুন। মায়া অ্যাঞ্জেলো নিজেকে সব সময় তুলনা করেছেন খাঁচার বন্দী পাখির সঙ্গে। তাঁর নিজের জীবন হয়ে ওঠে সমগ্র কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবন, পৃথিবীর সব শৃঙ্খলবন্দী নিপীড়িত মানুষের জীবন। তিনি যখন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আমি জানি খাঁচার পাখি কেন গান গায়’-এ এ রকম করে বলে ওঠেন:

মুক্ত পাখি বাতাসের পিঠের উপর লাফায়
এবং বাতাসের সমুদ্রে ভাসে
যতক্ষণ না থেমে যায় ঢেউ;
অতঃপর সে গোলাপি সূর্যের রশ্মিতে
ডুবিয়ে দেয় ডানা
এবং বলে ওঠে উচ্চৈঃস্বরে,
এ আকাশ আমার।

তখন আনন্দে নেচে ওঠে পৃথিবীর স্বাধীনতাপ্রিয় নির্যাতিত মানবতা। সঙ্গত কারণেই মায়া অ্যাঞ্জেলো হয়ে ওঠেন নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ের মানুষ, বিশ্বমানুষের বিবেকের সুর, আধুনিক কবিতার নতুন দিগন্ত।

আমেরিকার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ কবি অ্যালেন গিনসবার্গ (১৯২৬-১৯৯৭)। তিনি ছিলেন ১৯৫০-এর দশকের বিট জেনারেশনের নেতৃত্বদানকারী কবি। তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্যিক কবিতা ‘হুংকার’, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদের ধ্বংসাত্মক রূপের বিরুদ্ধে ফেটে পড়েছেন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে। মানবতাবাদী এই কবি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ লিখে ধিক্কার জানিয়েছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীকে। সঙ্গত কারণেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক সূর্যসন্তান হয়ে রইলেন এ বিদেশী কবি তাঁর একটিমাত্র কবিতার কারণে। অ্যালেন গিনসবার্গ যখন বলেন:

লক্ষ লক্ষ শিশু তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে
তাদের পেটগুলো ফোলা, চোখগুলো বড় বড় গোল
যশোর রোডের লম্বা বাঁশের কুঁড়েঘরগুলোতে-
না আছে তাদের মলত্যাগ করার মতো কোনো জায়গা, না কোনো বাঁধাপথ

লক্ষ লক্ষ পিতা ভিজছে বৃষ্টিতে
লক্ষ লক্ষ মাতা ছটফট করছে যন্ত্রণায়
লক্ষ লক্ষ ভাই মুচড়ে পড়েছে দুঃখে
লক্ষ লক্ষ বোনের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই কোনোখানে।

তখন পাঠক টের পান মৃত্যুপথযাত্রী মানুষদের জন্যে কী দরদে আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠেছে তাঁর হৃদয়।

চিলির কবি পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩) ‘অ্যা স্যাড স্টেট অব ফ্রিডম’ কবিতায় ফুঁসে উঠেছেন দাসত্ববাদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন:

তুমি নষ্ট করে চলেছো তোমার দুচোখের মনোযোগ,
তোমার হাতের উজ্জ্বল শ্রম
এবং অনর্থক বানিয়ে চলেছো ডজন ডজন রুটি
যার একটা টুকরাও ব্যবহার করবে না তুমি।
তুমি স্বাধীন অন্যের ক্রীতদাস হওয়ার জন্য।
তুমি স্বাধীন ধনীকে আরো ধনী বানাবার জন্য।
(স্বাধীনতার একটি বিষণœ অবস্থা, পাবলো নেরুদা)

দাসত্বপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বটে কিন্তু অসচেতন শ্রমজীবী মানুষ সুচতুর ধনিক শ্রেণির আধুনিক দাসত্ববাদের বেড়াজালে যে পদে পদে আটকে পড়ছে, সে কথা কবি ঘোষণা করছেন এখানে অকপটে।

ম্যাক্সিম গোর্কি, নিকোলাই অস্ত্রভস্কি, জোসেফ কনরাড, বরিস পাস্তেরনাক, ই এম ফস্টার, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক তাঁদের বিপ্লবী সাহিত্যকর্মের জন্য বিশ্বব্যাপী নন্দিত। ডব্লিউ বি ইয়েটসও এঁদের মতো একজন, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা-আন্দোলনের পক্ষে যিনি অনেক কবিতা রচনা করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা দিবস স্বচক্ষে দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন তিনি। এ দিবসকে উৎসর্গ করে তিনি ‘অ্যা গ্রেট ডে’ শিরোনামে একটি কবিতাও রচনা করেছিলেন। এ কবিতাটিতে ইয়েটস স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:

বিপ্লব ও কামানের গোলা জিন্দাবাদ!
ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা এক ভিক্ষুক
বেত্রাঘাত করছে আরেক ভিক্ষুককে।

বিপ্লব ও কামানের গোলা জিন্দাবাদ!
ভিক্ষুকের স্থান বদল হয়েছে,
কিন্তু বেত্রাঘাত চলছেই।

দেশ স্বাধীন হয়েছে, বিজ্ঞানের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, পৃথিবী সভ্য হয়েছেÑ এসব ভেবে আত্মতৃপ্ত হয়ে আঙুল চোষার কোনো অবকাশ নেই। মানবতার বিরুদ্ধে আগ্রাসন সব দেশে সব স্থানে সব সময়ই চলবে কখনো উপনিবেশবাদের নামে, কখনো সমাজতন্ত্র, কখনো ধর্ম, কখনো বা গণতন্ত্রের নামে এবং কবি-সাহিত্যিকেরাও বসে থাকবে না, তাঁদের সাহিত্যও গর্জে উঠবে সার্বক্ষণিক, পারমাণবিক বোমার মতো, সবখানে। 

 

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫