ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

চট্টগ্রাম

নৃশংস নির্যাতন ও ধর্ষণের দুঃসহ স্মৃতি বুকে আরেফা ও সেতারার

জি এ এম আশেক উল্লাহ কক্সবাজার ও হুমায়ুন কবির জুশান উখিয়া

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:২৬


প্রিন্ট
 নৃশংস নির্যাতন ও ধর্ষণের দুঃসহ স্মৃতি বুকে আরেফা ও সেতারার

নৃশংস নির্যাতন ও ধর্ষণের দুঃসহ স্মৃতি বুকে আরেফা ও সেতারার

স্বামী ও ৩ সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় হারেসা
হারিয়াখালী ঘাটের রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার কেউ নেই
 

 


 
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পথে মারা গেছে দুই শিশুসন্তান। শরণার্থীশিবিরে গতকাল মারা গেল আট মাসের তৃতীয় সন্তান। মৃত সন্তান কোলে নিয়ে বিলাপ করছেন মা হারেসা : নয়া দিগন্ত


স্বামীকে যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন হারেসা বুঝতেই পারেননি তাকে হত্যা করা হবে। চোখের সামনেই যখন তাকে গলা কেটে হত্যা করে সেনারা তখন হারেসা ও তার সন্তানরা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। সেনারা এভাবে গ্রামের যুবকদের যখন ধরে ধরে হত্যা করছিল তখন হারেসা ভয়ে সন্তানদের নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে প্রতিবেশীদের সাথে পাহাড়ে আশ্রয় নেন। 


এরপর মংড়– থেকে নাইক্ষ্যংদিয়া হয়ে সাত দিনে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছেন গত সোমবার রাতে। মঙ্গলবার সকালে শাহপরীর দ্বীপ জিরো পয়েন্ট থেকে নৌকায় টেকনাফ আসার পথে হারিয়াখালী ঘাটে এসে পৌঁছেন হারেসা। এ সময় মারা যায় তার আট মাসের কোলের শিশু তসলিমা। তখন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই সাথে দমকা হাওয়া। কান্নার আওয়াজ ও মানুষের জটলা দেখে কাছে গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখতে পান মৃত শিশুটি কোলে নিয়ে এক মায়ের আহাজারি। কথা বলে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা গেল। 


হারেসা জানান, তার বাড়ি মংড়–র আনডংপাড়ায়। তার স্বামী গফুর হোসেন কৃষিকাজের পাশাপাশি মুরগি ব্যবসায়ী ছিলেন। চার সন্তান নিয়ে সুখেই কাটছিল তাদের সংসার। তিনি জানান, পালানোর সময় তার ১০ বছর বয়সী প্রথম ছেলেটি নিখোঁজ হয়। তিন সন্তান নিয়ে রোদ-বৃষ্টিতে টানা পথ চলে তারা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রতিবেশীদের সাথে বাংলাদেশে আসার পথে নৌকায় তার আরেক সন্তান মারা যায় এবং তাকে ভাসিয়ে দেয়া হয় সাগরে।

গত মঙ্গলবার সকালে সাবরাংয়ের হারিয়াখালী ঘাটে পৌঁছে কোলের শিশুটিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একেবারে বিধ্বস্ত হারেসা এখন বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন, কোথায় যে আশ্রয় নেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তার বিলাপ শুনে স্থানীয় লোকজন তার মৃত শিশুটিকে কোলে নিয়ে ক্ষণিক আশ্রয়ের জন্য নিয়ে যান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে টেকনাফের সাবরাংয়ের হারিয়াখালী ঘাটের দৃশ্য এটি। 


সাবরাংয়ের হারিয়াখালী ঘাটে দেখা যায়,শাহপরীর দ্বীপ জিরো পয়েন্ট থেকে টেকনাফে আসার জন্য নৌকায় করে হারিয়াখালী ঘাটে আসছে শত শত রোহিঙ্গা। বৃষ্টিতে ভিজে এবং হিমেল বাতাসে সবাই কাবু হয়ে পড়েছেন। নৌকা থেকে নেমেই তাদের আর কারো হাঁটার শক্তি নেই। পেটে ুধা। কেউ কেউ ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত। ইট বিছানো ভাঙা রাস্তায় বসে পড়ছেন অনেকে। হারিয়াখালী ঘাট পয়েন্টে সাহায্য প্রদানকারী লোকজনও কম। অথচ এখানে আসা রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাদ্য দেয়া জরুরি মনে হলো। 


কিছু রোহিঙ্গা টমটম করে যাচ্ছিলেন টেকনাফের দিকে। সেখানে মংড়– থেকে পালিয়ে আসা হোসেন আহমদ, রশিদা বেগম, আমানুল্লাহ, শাকের আহমদসহ অনেকে জানান, আরাকানের শিলখালী, ধুমছেপাড়া, কোয়াসং ও আদংয়Ñ এই চারটি পাড়া বর্মি সেনারা জ্বালিয়ে দেয় এবং ওই এলাকার ১০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানের মধ্যে প্রায় সাত হাজার মানুষকে হত্যা করার পর তাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলে। কয়েক হাজার মানুষ এখনো পাহাড়ে আত্মগোপন করে রয়েছেন। বর্তমানে এ চারটি পাড়া জনশূন্য। বর্মি সেনারা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া ঘরবাড়ির সব চিহ্ন মুছে সরিয়ে ফেলছে। 


মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়ায় টেকনাফে আসার জন্য এখনো প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষা করছেন। কয়েক দিন ধরে আবহাওয়া খারাপ থাকায় কেউ আসতে পারছেন না শাহপরীর দ্বীপে। সাবরাং পৌঁছে আরাকানের রাসিদং পাড়ার অধিবাসী খায়রুল আমীন আরাকানের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে তার নিকটাত্মীয় সোলতান আহমদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। সোলতান জানান, অবস্থা এখনো ভয়াবহ। এখনো রোহিঙ্গাদের দেখামাত্রই গুলি করছে বর্মি সেনারা। ভয়ে আমরা ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু কল্লোল পাহাড়ের গভীর অরণ্যে লতাপাতা খেয়ে কোনো রকম জীবনে বেঁচে আছি।


শান্তি ফিরে না এলে মাতৃভূমিতে যেতে চান না অনেক রোহিঙ্গা 
দীর্ঘ পথ হেঁটে ১৩ দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন আরেফা বেগম। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরতার দৃশ্য এখনো ভুলতে পারছন না তিনি। টমটম নিয়ে ক্যাম্পে আসার সময় আরেফা বেগম ও সেতারার সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, প্রাণ বাঁচাতে মাতৃভূমি ত্যাগ করলেও দেশের মায়া অন্যরকম। দেশের জন্য তাদের মন কাঁদে। তবে শান্তি ফিরে না এলে আরাকানে ফিরে যেতে চান না এই দুই রোহিঙ্গা নারী। 


গতকালও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী পুরুষ। প্রতিটি নারীর কোলে রয়েছে এক থেকে দুই মাসের শিশু। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আশায় এত দিন তারা আসেননি। এ দিকে গতকালও উখিয়ায় অঝোর বৃষ্টি হয়েছে। বালুখালী কাস্টমস এলাকায় খালের পাশের অস্থায়ী রোহিঙ্গা বস্তি পানিতে থইথই করছে। সেখানে নিজেরা বৃষ্টিতে ভিজলেও বুকের সঙ্গে জড়িয়ে শিশু সন্তানদের বৃষ্টির হাত থেকে রা করার চেষ্টা করছেন অনেক মা। এ সময় অনেক নারীকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। রাস্তার ধারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বস্তি ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রে রাখতেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনেকে তাঁবু না পেয়ে বৃষ্টিতে ভিজে সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। নারী ও শিশুদের চিকিৎসা ক্যাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। 


মিয়ানমারের সেনা ও উগ্রপন্থী মগদের নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচতে তিন সন্তানকে বাঁচাতে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন আরেফা বেগম ও সেতারা বেগম। নিজেরা অভুক্ত। অভুক্ত তাদের সন্তানরাও। আর্তনাদ করে হাত পাতছেন। কিন্তু কোনো খাদ্য পাননি। ত্রাণ নিতে যে যুদ্ধ করতে হয় তাতে বিজয়ী হতে পারছেন না তারা। কারণ এরা নতুন এসেছেন। গত দুদিনের বৃষ্টি তাদের আরো দুর্বিপাকে ফেলেছে। সন্তানদের কিভাবে বাঁচাবেন, নিজেরা কিভাবে বাঁচবেন সে চিন্তায় অস্থির তারা। আরেফা ও সেতারার মতো হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতন ও ধর্ষণের দুঃসহ স্মৃতি বুকে নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫