ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৮ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশন সমীপে

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৭:৩৩


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

প্রিন্ট

সবাই জানলে ভালো
নির্বাচন কমিশনের সাথে সুশীলসমাজ ও মিডিয়া জগতের প্রতিনিধিদের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু দিন আগে। সংলাপের পরপরই আমরা জেনেছি সংলাপে দেয়া বক্তব্যগুলো। সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে অনেকেই পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছেন, এতে অনেকেই অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আমরা উৎসাহিত হয়েছি। ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও সংলাপে গিয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকালবেলা আমরা গিয়েছিলাম নির্বাচন কমিশনে। সেখানে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। নির্বাচন কমিশন যে সাত দফা কর্মপরিকল্পনা ১৬ জুলাই জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, আমরা সবগুলো দফা নিয়ে আমাদের বক্তব্য রাখিনি। আমাদের দৃষ্টিতে যে কয়েকটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে, আমরা তার ওপর বক্তব্য রেখেছি। এর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এক. নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে, দুই. নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে, তিন. নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও পার্লামেন্ট। দেশবাসীর সাথে আমাদের বক্তব্য শেয়ার করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। আজকের কলামে বেশির ভাগ এবং আগামী সপ্তাহের কলামে অবশিষ্ট অংশ শেয়ার করব বলে আশা করি।

নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি
নির্বাচন কমিশন ধারাবাহিকভাবে সংলাপ করছেন ‘স্টেকহোল্ডার’দের সাথে। রাজনৈতিক দল অবশ্যই অন্যতম স্টেকহোল্ডার। সুষ্ঠু নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগী হন, জনগণ তথা ভোটাররা। এই প্রক্রিয়ায় মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রধানতম ক্যাটালিস্ট বা নিয়ামক শক্তি হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। অতএব নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সক্ষমতার অনেক আঙ্গিক আছে। একটি আঙ্গিক হলো আইনগত শক্তি। আরেকটি আঙ্গিক অদৃশ্য, কিন্তু অনুভবযোগ্য; যথা : অন্তরের শক্তি বা আন্তরিকতা বা ইচ্ছাশক্তি বা নিয়ত। উভয় আঙ্গিক সম্মিলিতভাবে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতাকে দর্শনীয় করে তোলে বা প্রায়োগিক রূপ পায়। অনেক বিজ্ঞজনই বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক আইনগত ক্ষমতা যথেষ্ট, কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগে নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট আগ্রহী নয় বা আন্তরিক নয়; তথা রাজনৈতিক সরকারের প্রভাবের বাইরে গিয়ে স্বাধীন চেতনা নিয়ে কাজ করতে নির্বাচন কমিশন দ্বিধাগ্রস্ত বা অনাগ্রহী।

অসাধারণ নাগরিকের কথা
আমরা সাধারণ নাগরিক, সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী। আমাদের কথা মূল্যবান মনে হতেও পারে, না-ও হতে পারে। কিন্তু অসাধারণ ব্যক্তিদের অসাধারণ কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। তাই আমি বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় দু’জন প্রধান বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে যেই মন্তব্য করেছেন তা আপনাদের সদয় দৃষ্টিতে আনছি। প্রথমে আমি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের (২০১১-২০১২) মন্তব্যগুলো উপস্থাপন করব। পরে আমি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার (২০১৭) মন্তব্যগুলোর ভাবার্থ উপস্থাপন করব।

বিচারপতি খায়রুল হক
এক. এ বি এম খায়রুল হক মহোদয়ের রায়ের অনুচ্ছেদ ১১৭৭-এর সারমর্ম : কারচুপিমুক্ত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন সত্যিকার স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সব জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তির একান্ত নির্ভেজাল প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দুই. এ বি এম খায়রুল হকের রায়ের অনুচ্ছেদ ১১৭৮। ‘নির্বাচন কমিশনকে আর্থিকভাবে স্বাধীন করিতে হইবে। ইহাকে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করিতে হইবে। লোকবল নিয়োগে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি করা যাইবে না। নির্বাচন অনুষ্ঠান করিতে সর্বপ্রকার প্রয়োজন নিরসনকল্পে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ লইবেন। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সকল প্রকার সহায়তা সরকারের নির্বাহী বিভাগ ত্বরিত প্রদান করিতে বাধ্য থাকিবেন, অন্যথায় তাহারা সংবিধান ভঙ্গ করিবার দায়ে দায়ী হইবেন। এই ব্যাপারে কোনো তরফে কোনো গাফিলতি দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্যে অভিযোগ উত্থাপন করিবেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ত্বরিত গ্রহণ করিবেন, অন্যথায় তাহারাও সংবিধান ভঙ্গের দায়ে দায়ী হইবেন। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ হইতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত নির্বাচনের সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং নির্বাচন কমিশনের বিবেচনা অনুসারে, যাহারা এমনকি পরোক্ষভাবে জড়িত, রাষ্ট্রের সেই সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকিবে। নির্বাচন কমিশনারগণ অন্তর্মুখী হইবেন না। যতদূর সম্ভব তাঁহাদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা বজায় রাখিবেন। সতত মনে রাখিবেন যে, জনগণের নিকটেই তাঁহাদের জবাবদিহিতা। তাঁহারা সকলে জনগণের সেবক মাত্র। তাঁহারা কি কাজ করিতেছেন তাহাও জনগণের জানিবার অধিকার রহিয়াছে, তাঁহারা কি কাজ করিতে পারিতেছেন না এবং কেন পারিতেছেন না, তাহাও জানিবার অধিকার জনগণের রহিয়াছে। নির্বাচনী আইন বা বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত আইনগত পদক্ষেপ ত্বরিত লইতে হইবে। এ ব্যাপারে কোনোরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন চলিবে না। শৈথিল্য প্রদর্শন করিলে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে আইন অমান্যকারী হইবেন।’ তিন. এ বি এম খায়রুল হক মহোদয়ের রায়ের অনুচ্ছেদ-১১৭৯। ‘শুধু তাহাই নহে, সংবাদমাধ্যম ও আপামর জনসাধারণ তাহাদের অধিকার সম্বন্ধে শুধু ওয়াকিবহাল নয়, সোচ্চার হইতে হইবে। তাহা হইলেই শুধু নির্বাচন কমিশন ও সরকার এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হইবে এবং তাহারা সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকিবেন।’


বিচারপতি সিনহা
এক. এস কে সিনহা মহোদয়ের রায়ের অনুচ্ছেদ ১৯২-এর ভাবার্থ। খায়রুল হকের নেতৃত্বে যে রায় দেয়া হয়েছিল সেই রায়ে আশা করা হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করবে যে, ওই নির্বাচন কমিশন যেন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার তথা স্বাধীন ও উন্মুক্ত বা পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারবেন। সেই রায়ে আশা করা হয়েছিল, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্বাচন কমিশনের শূন্য পদগুলো পূরণ হবে। এস কে সিনহার নেতৃত্বে প্রদত্ত রায়ে মন্তব্য হচ্ছে, ২০১১ বা ২০১২ সালের পরবর্তী বাংলাদেশের কোনো সরকারই উপরে ব্যক্ত আশাগুলো পূরণের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাদের নেতৃত্বে প্রদত্ত রায়ে মন্তব্য হচ্ছে যে, বিরোধী দলও এ বিষয়টি পার্লামেন্টে বা অন্য কোনো ফোরামে উপস্থাপন করেনি। সিনহা মহোদয়ের নেতৃত্বে প্রকাশিত রায়ে আরো মন্তব্য হচ্ছে, সরকার বা বিরোধী দল কর্তৃক এরূপ নিষ্ক্রিয়তা বা নিশ্চুপ থাকার ফল হলো বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। দুই. এস কে সিনহার ১৯৩ অনুচ্ছেদের প্রথম অর্ধেকের ভাবার্থ। জাতীয় সংসদের নির্বাচন যদি স্বাধীনভাবে, পক্ষপাতহীনভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া অনুষ্ঠান করা না যায় বা অনুষ্ঠান করা না হয়, তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য পার্লামেন্ট গঠন করা সম্ভব নয়। ফলে আমাদের দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আমাদের দেশের পার্লামেন্ট এখনো শৈশবেই রয়ে গেল। জনগণ এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের ওপরে বিশ্বাস বা আস্থা স্থাপন করতে পারছে না। যদি এ দু’টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ও সম্মান অর্জন করা না হয়, তাহলে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া জ্ঞানী বা মেধাবী রাজনৈতিক ব্যক্তি পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না এবং এ কারণে পার্লামেন্টের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়।

সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তরিকতা প্রয়োজন
এ প্রসঙ্গে আমাদের আবেদন, আপনাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বস্তুগত উপাত্তগুলো সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নেবেন। কিন্তু আপনাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আপনাদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা বৃদ্ধি করতে সরকার সাহায্য করতে পারবে না। এর জন্য আপনারা নিজেরাই যথেষ্ট। আমাদের আবেদন : বাংলাদেশের এই সঙ্কটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবেশে আপনারা নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করুন। অন্ততপক্ষে বৃদ্ধি না করলেও যতটুকু সক্ষমতা আছে বলে সবাই বিশ্বাস করেন, সেটুকু প্রয়োগ করুন। সংবিধান যতটুকু ক্ষমতা আপনাদের দিয়েছে ততটুকু প্রয়োগ করতে গেলে যদি বাধা আসে, তখন নিশ্চিতভাবেই দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী আপনাদের পক্ষে থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আপনারা যদি নিজেদের সক্ষমতা প্রয়োগ না করেন তাহলে কোনোমতেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৬৬
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার ব্যাপারে অতি প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৬৬(১) এবং ৬৬(২)(চ) পড়ার পর পরবর্তী তিনটি পড়লে ভালো। ৬৬(৩) এবং ৬৬(৪) ও ৬৬(৫)- হুবহু, সম্মানিত নির্বাচন কমিশনের সমীপে পড়ে শোনানো হয়। কোনো একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত এবং সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না কী কী পরিস্থিতিতে বা শর্তে, সেগুলো সংবিধানের ধারা ৬৬(১), ৬৬(২), ৬৬(৩), ৬৬(৪) ইত্যাদিতে বর্ণিত আছে। এখানে ঐ ধারাগুলো উদ্ধৃত করছি। ৬৬(২) কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি (ক) ..., (খ) ..., (গ) ..., (ঘ) ..., (ঙ) ..., ৬৬(২)(চ) আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করিতেছে না, এমন পদ ব্যতীত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ধারা ৬৬(৩) উদ্ধৃত করছি। এই অনুচ্ছেদের (অর্থাৎ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬-এর) উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোনো ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না। এমপিগণ, আমাদের দৃষ্টিতে, এমপি পদে বহাল থেকে আরেকবার এমপি নির্বাচন এজন্যই করতে পারবেন না। অনুচ্ছেদ ৬৬(৪) উদ্ধৃত করছি। কোনো সংসদ সদস্য তাহার নির্বাচনের পর এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হইয়াছেন কি না কিংবা এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হইবে কি না, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালবেলা আমাদের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের প্রতি আবেদন রেখেছে, আহ্বান রেখেছে, যেন নির্বাচন কমিশন তাদের ক্ষমতা প্রয়োগে আগ্রহী হন। আমাদের প্রতিনিধিদল মৌখিকভাবে উদাহরণ তুলে ধরেছে এমন সব ঘটনার, যেখানে নির্বাচন কমিশন নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগে অনীহা প্রকাশ করেছে; এমনকি ক্ষমতা পরিত্যাগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ কথাগুলো প্রযোজ্য এ জন্য যে, বাংলাদেশের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ব্যক্তিত্বরা নিজেদের অনীহা বা অনাগ্রহ বা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই ক্ষমতাগুলো প্রয়োগ করেননি; যার কারণে মানুষ মনে করে- নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট সক্ষম নয়। আমাদের প্রতিনিধিদল উৎসাহিত করতে চেষ্টা করেছে যেন তারা নিজেদের ক্ষমতা বিকশিত করতে আগ্রহী হন; যেন তারা দেশের রাজনৈতিক সরকারের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন।

সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গ
নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে কি হবে না, এটা আলোচ্য বিষয়। নির্বাচন কমিশন প্রথম সংলাপ করেছিলেন সুশীলসমাজের ব্যক্তিদের সাথে। নির্বাচন কমিশন মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সাথেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। একাধিক রাজনৈতিক দলও ইতোমধ্যে এসেছেন। সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রসঙ্গে প্রতিটি বৈঠকেই আলোচনা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ওই আলোচনাগুলোর বর্ণনার ওপর নির্ভর করে আমরা বলছি, বেশির ভাগ আলোচকই সেনা মোতায়েনের পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। কিছু পত্রিকায় এই মর্মে একটি কথা এসেছে যে, কেউ কেউ বলেছেন, নির্বাচন একটি সিভিল বিষয়, এখানে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন কী? এরূপ কথা যখন উত্থাপিত হয়েছিল ওই সম্মেলন কক্ষে, তখন অন্য আলোচকেরা পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন সেনাবাহিনী যদি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে বা শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়নে এবং নির্বাচনকাজ সম্পাদনের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে কেন পারবে না? আরো একটি যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সেনাবাহিনী সব সময় ত্রাণকাজে, সরকারের হুকুমে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া আরো বহুবিধ কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে ও হচ্ছে। ওই কাজগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য বা ক্রাইটেরিয়া হলো দু’টি, যথা কাজগুলো জনগণের কল্যাণে বা উপকারের জন্য কি না। দ্বিতীয়ত, কাজগুলো করার জন্য সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও দক্ষতা আছে কি না।

অতিরিক্ত যুক্তি
ওপরে উল্লিখিত যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির অতিরিক্ত আমরা কিছু কথা উপস্থাপন করব। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান একজন সাবেক সৈনিক। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের জুন পর্যন্ত পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে তিনি জড়িত ছিলেন। যখন কনিষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন, তখন সরাসরি সৈন্য দল নিয়ে মাঠে-ময়দানে ছিলেন। যখন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়েছেন তখন নীতিনির্ধারণীপর্যায়ে ছিলেন বা বৃহত্তর কমান্ডপর্যায়ে ছিলেন। শুধু ব্যতিক্রম ১৯৮৬ সালের নির্বাচন, তখন তিনি একজন প্রশিক্ষক হিসেবে ব্যস্ত ছিলেন।

স্ট্রাইকিং ফোর্সের ধারণা অকার্যকর
সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে একটি সাধারণ ধারণা হলো, তাদের স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখা হবে। অর্থাৎ কোনো গোলযোগ দেখা দিলে এবং সেই গোলযোগ যদি সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সামলাতে না পারে, তাহলে সেনাবাহিনীকে ডাকা হবে। এ তত্ত্বটি বর্তমানের জন্য আংশিকভাবে (বৃহৎ অংশ) অপ্রযোজ্য। ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মরিয়া গেল’- এ রকম একটি বাংলা প্রবাদ আছে। নির্বাচনকালে যেসব গোলযোগ হয়, সেগুলো যারা করে তারাও খুব ভালো করে জানে, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী আছে। অতএব, স্ট্রাইকিং ফোর্সকে ডাকার প্রয়োজন পড়বে এমন কোনো গণ্ডগোল তারা করে না, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো গণ্ডগোল সামলাতে না পারলেও অফিসিয়ালি স্বীকার করতে চায় না যে, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে স্ট্রাইকিং ফোর্স ডাকার প্রয়োজন পড়ে না। এই যুগকে আমরা ডিজিটাল যুগ বলতে পারি। ডিজিটাল যুগের অপরাধগুলোও ডিজিটালাইজড হয়ে গেছে। অর্থাৎ অতীতের তুলনায় রূপান্তরিত হয়েছে।

ভোটারদের নিরাপত্তা কোথায় প্রয়োজন?
আমাদের দরকার, জনগণ যেন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারে। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে হলে কয়েকটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে যথা- (১) ভোটের আগে প্রার্থী যখন ভোটারদের সন্ধান করেন বা প্রার্থী যখন ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন তখন যেন ভোটারদের সামনে কোনো কথা না থাকে, (২) ভোটের দিন ভোটার যেন শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেন, (৩) ভোটকেন্দ্রে যেন শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে পারেন, (৪) ভোট দেয়ার সময় যেন ভোটারকে কেউ ভেতরে ভয়ভীতি না দেখায় এবং তার সিল মারা ব্যালটটি যেন বাক্সে ফেলতে পারেন, (৫) ভোটার যেন ভোটকেন্দ্র থেকে নিরাপদে নিজবাড়িতে ফেরত এসে অবস্থান করতে পারেন, (৬) ভোটকেন্দ্রগুলোয় ভোটের সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন ভোট গণনা হবে, তখন যেন কেউ সেখানে আক্রমণ না করে বা ভোটের বাক্স কেড়ে না নেয় বা ফলাফলের পরিবর্তনে কাউকে বাধ্য না করে।

মাস্তান ও ক্যাডার প্রসঙ্গ
ওপরের অনুচ্ছেদে বর্ণিত ছয়টি উপাত্ত বা ছয়টি কর্ম দ্রষ্টব্য। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এ কাজগুলোতে কে বাধা দিচ্ছে? আমি ব্যাখ্যা করব এই বলে, বাংলাদেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। গুম, খুন, অপহরণ ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। দেশের বহু জায়গায়ই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দাপট প্রচণ্ড। গত ৯-১০ বছরে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে হোক বা ঘটনাক্রমেই হোক যেকোনো কারণেই হোক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। তাদের অনেক সদস্যের চিন্তাচেতনা সরকারের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার দিকে ঝুঁকে আছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তুই হলো ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন দেয়া বা ক্ষমতাসীন দলের জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। বাংলাদেশে দু’টি শব্দ বহুলপরিচিত- মাস্তান ও ক্যাডার। এখনকার মাস্তান ও ক্যাডারদের কাছে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র থাকে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় এলাকায় এলাকায়, মহল্লায় মহল্লায়, জেলায় জেলায় ক্যাডার বাহিনী ও মাস্তান বাহিনী দোর্দণ্ড প্রতাপে বিরাজ করছে। এ ধরনের মাস্তান ও ক্যাডার বাহিনী নির্বাচনের আগে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। নির্বাচন কমিশনের কাছে যে দাবি বছরের পর বছর করে যাওয়া হচ্ছে, সেটি হলো- নির্বাচনকালে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বা জোটগুলোর জন্য রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা এবং প্রচারের সুযোগ-সুবিধা সমান করতে হবে। ২০১৭ সালের বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন মাস্তান ও ক্যাডারদের ভয়ে বা তাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাধারণ গ্রাম্য নাগরিকদের পক্ষে বাড়িতে থাকা অথবা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বা না যাওয়া কোনোটাই সম্ভব নয়। এরূপ পরিস্থিতিতে কী করণীয়? আগামী সপ্তাহের কলামে এই করণীয় নিয়ে আলোচনা করব। তা ছাড়া একটি কঠোর, কঠিন, অপ্রীতিকর প্রশ্ন তুলে, সেই প্রশ্নের উত্তর আলোচনা করে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গটি শেষ করব। আগামী সপ্তাহের কলামে নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে বাকি কথাগুলোও শেষ করব ইনশাআল্লাহ।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান,
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ই-মেইল : mgsmibrahim@gmail.com

 

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫