ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

অভুক্ত শিশুসন্তানদের মুখের দিকে তাকালে কান্না আসে

আবু সালেহ আকন, টেকনাফ থেকে

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ২১:২৮


প্রিন্ট
বর্মি বাহিনী ও নাডালা বাহিনীর প্রথম টার্গেট ছিল আলেম ওলামা ও মসজিদ মাদরাসা।

বর্মি বাহিনী ও নাডালা বাহিনীর প্রথম টার্গেট ছিল আলেম ওলামা ও মসজিদ মাদরাসা।

ক্ষুধার্ত সন্তানদের মুখের দিকে তাকালে চোখে পানি আসে। তাদের খাবার জোগাতে এখন হাত পাততে হয় মানুষের কাছে। এক বেলা খেলে বাকি দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। একটি খুপড়ি ঘরে সবাই থাকি। সোজা হয়ে ঘুমানো পর্যন্ত যায় না। ক্ষুধা লাগলে শিশুরা কান্নাকাটি করে। কিন্তু কিছুই করার থাকে না। অথচ তারা কোনো দিনই খাবারের জন্য কষ্ট পায়নি।

কুরআনের একজন হাফেজ মাওলানা আবুল কাশেম বলেন, মাদরাসায় চাকরি করতাম। জমিজমা যা ছিল তা দিয়ে টাকা পেতাম। অথচ এখন নিদারুণ কষ্টে আছি। আল্লাহ যে আরো কত লানত লিখে রেখেছেন তা একমাত্র তিনিই জানেন।

মিয়ানমারের মংডুর মগনামা পাড়ায় তার বাড়ি। বর্মি বাহিনী ও সেখানকার উগ্রবাদী বৌদ্ধদের হাত থেকে বাঁচতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি বাংলাদেশে চলে এসেছেন।

গতকাল রোববার বালুখালী কাস্টমস ছড়ার পাশের রাস্তায় কথা হয় হাফেজ আবুল কাশেমের সাথে।

তিনি মিয়ানমারের মুসলমানদের করুণ চিত্র তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বর্মি বাহিনী ও নাডালা বাহিনীর প্রথম টার্গেট ছিল আলেম ওলামা ও মসজিদ মাদরাসা। যেখানে মগ ও বর্মি বাহিনী হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে সেখানেই তারা মসজিদ মাদরাসায় আগুন লাগিয়ে এবং আলেম ওলামা ও কুরআনের হাফেজদের হত্যাকাণ্ড শুরু করেছে। মংডুর মংনামা পাড়ার তৌহিদিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন তিনি। গত ৩ সেপ্টেম্বর ওই এলাকায় হানা দেয় মগ ও বর্মি বাহিনী। পুড়িয়ে ফেলা হয় ওই মাদরাসাটি। আগুন লাগানো হয় শত শত ঘরবাড়ি ও মুসলমানদের দোকানপাটে।

তিনি বলেন, তার পাড়ায় মোট ৭০০ ঘর ছিল মুসলমানদের। একটির পর একটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। অন্তত অর্ধশত লোককে তিনি হত্যা করতে দেখেছেন। তার তিন আত্মীয় মো: কাসিম (৩৫), সৈয়দ নুর (১৮) এবং মো: তৈয়বকে চোখের সামনে দিয়ে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে বর্মি বাহিনী। ওই সময় স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তান নিয়ে পাড়া থেকে বের হয়ে যান হাফেজ কাশেম। এরপর পাহাড় পেরিয়ে নাফ নদী পার হয়ে তিনি চলে আসেন এ পারে। আশ্রয় নেন বালুখালীর ওই ক্যাম্পে। পাহাড়ে বনে জঙ্গলে থেকে বর্মি সেনাদের নজর এড়িয়ে তাকে এপারে আসতে হয়েছে।

তিনি বলেন, পাঁচটি সন্তানকে সাথে নিয়ে কত কষ্টে যে আসতে হয়েছে তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। এর মধ্যে সন্তানরা কোথায় হারিয়ে যায়, সাপ বিচ্ছু তাদের আক্রমণ করে কি না তা খেয়াল রাখতে হয়েছে। এমনও সময় গেছে ক্ষুধার তাড়নায় শিশুরা কেঁদে উঠলে তাদের মুখ চেপে ধরেছেন যাতে তারা কাঁদতে না পারে।

হাফেজ কাশেম বলেন, তিন দিন হয় ওই ক্যাম্পে এসেছেন। স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার দিতে গেলে এখন মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। ত্রাণের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। এভাবে মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে খাওয়ার চেয়ে না খেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। কিন্তু অবুঝ শিশুসন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজটি করতে হচ্ছে। ক্ষুধার্ত শিশুগুলো খাবার চেয়ে যখন কেঁদে ফেলে তখন স্বামী-স্ত্রী দুইজনই মুখ বুঝে কাঁদেন। একদিন তাদের সব ছিল। ঘরে খাবারের কোনো অভাব ছিল না। পাঁচ সন্তানকে কোনো দিন না খেয়ে এক বেলাও কাটাতে হয়নি। অথচ তারা এখন দিনে এক বেলাও পেট পুরে খেতে পায় না। পরনে কাপড় নেই। ওই শিশুসন্তানরাও ঘুমাতে পারে না। পাহাড়ি ঢলে ক্যাম্পে বুক পানি হওয়ায় ওই পাঁচটি সন্তান নিয়ে শনিবার মধ্য রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দাঁড়িয়ে কাটাতে হয়েছে। ছোট্ট দুই শিশুকে কোলে করে তিনি এবং তার স্ত্রী রাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

হাফেজ আবুল কাশেম বলেন, আল্লাহর সর্বোচ্চ পরীক্ষা চলছে হয়তো। থাকা-খাওয়ার সঙ্কটতো চরমে। পায়খানা-প্রস্রাব করারও কোনো জায়গা নেই। ইজ্জত আব্রু কিছুই আর থাকছে না। গোসলের জায়গা নেই। পুরুষরা কোনোভাবে সারতে পারলেও নারীদের জন্য নিদারুণ কষ্ট। নারীরা যে কাপড় পরিবর্তন করবেন তারও সুযোগ নেই। একই কাপড়ে তাদের দিনের পর দিন কাটাতে হচ্ছে। এ কাপড় ভিজছে, আবার শরীরেই শুকাচ্ছে। মানুষের কতটা দুর্ভোগ হলে এ পরিস্থিতিও মানিয়ে নিতে হয়!

হাফেজ আবুল কাশেম বলেন, মগ আর বর্মি সেনাদের বিরুদ্ধে কখনোই তারা কথা বলতে পারেননি। মগরা যা চেয়েছে সেভাবেই মুসলমানদের মেনে নিতে হয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫