ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

অন্যান্য

ইহুদি নিধন থেকে রোহিঙ্গা নিধন : জাতিগত নিধন বন্ধের পথ কী?

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ২০:২৫


প্রিন্ট
ইহুদি নিধন থেকে রোহিঙ্গা নিধন : জাতিগত নিধন বন্ধের পথ কী?

ইহুদি নিধন থেকে রোহিঙ্গা নিধন : জাতিগত নিধন বন্ধের পথ কী?

নাৎসিদের ইহুদি-নিধনযজ্ঞ চরম আকার ধারণ করে বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে, হিটলারের নাৎসি দল-শাসিত জার্মানিতে। ইহুদি-বিরোধী এই জাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের দায়ও ইহুদিদের উপর চাপিয়ে দিয়ে তারা নিধনমূলক আইন-কানুন প্রণয়ন করে। ১৯৩৯ সালে হিটলার বিভিন্ন দেশ আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালে ইউরোপে ইহুদি নির্যাতন ও নিধন চরমরূপ নেয়। তারা আইন করে ইহুদিদের নিজস্ব নিবাস অধিগ্রহণ করে বন্দী-নিবাসে প্রেরণ করে এবং পর্যায়ক্রমে হত্যা করে। প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়; এ ঘটনা 'হলোকস্ট' (Holocaust) নামে পরিচিত। 

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদেরকে জাতিগত নিধনে ঘটনাটি গত কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের নিষ্ঠুরতম ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক পত্রিকা দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। ১৬ সেপ্টেম্বর দৈনিকটির এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে- একবিংশ শতকের শুরুতে দারফুর, সুদান এবং ১৯৯০ দশকের দিকে কসোভোতে যে জাতিগত নিধন হয়েছে সে তুলনায় এই অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল অবাক করার মতো দুর্বল।

এই বিষয়ে মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো বেসামরিক নেতা অং সান সু চি এই নৃশংসতায় দুঃখজনকভাবে নীরব রয়েছেন এবং সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে তার ক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজন হলো বার্মার সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা। মিয়ানমারের এই নৃশংসতায় চীনের ওপর কোনও প্রভাব পড়ছে না। এমনকি পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ক্ষেত্রে এমন নৃশংসতাকে স্বাগত জানাতেও দ্বিধা করছে না চীন। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই জাতিগত নিধন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে প্রকাশ্য বিতর্কের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো সরকার জাতিগত নিধনের পথ বেছে নিলে, তাতে বিভেদ এবং ঘৃণা শুধু বাড়ে। ঘৃণার মধ্যে শান্তিতে সহ-অবস্থান করা যায় না। বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতিসত্তার সমাহার যেখানে, সেখানে সহ-অবস্থান খুব জরুরি। শান্তির জন্য সেটিই একমাত্র পথ। যেটি কফি আনান কমিশন সুপারিশে বলেছেন। সুপারিশের মধ্যে অন্যতম- রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান, তাদের অবাধ চলাচলের সুযোগ ও আইনের চোখে সমান অধিকার নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা; নিজ ভূমিতে ফিরে আসা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এ সুপারিশ বাস্তবায়নই মিয়ানমারে শান্তির একমাত্র পথ। বিশ্বশান্তির জন্যই সংঘর্ষ-যুদ্ধ-মুনাফার চাইতে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান বেশি জরুরি।

'মিয়ানমারে ফেরার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো'

ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা কিছুতেই মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নন। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভারতের হায়দ্রাবাদের রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে ৩৮০০ রোহিঙ্গা বাস করছেন।

গত পাঁচ বছর ধরে ভারতে বাস করা রোহিঙ্গারা প্রাণ হারানোর আশঙ্কায় স্বদেশে ফিরে যেতে চাচ্ছেন না। ভারত সরকারের কাছে তারা মানবতার খাতিরে তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবি আবেদন জানিয়েছেন।

আব্দুর রহিম নামে এক রোহিঙ্গা শরণার্থী বলেন, ‘আমাদের এখানে বাস করতে দেয়ার জন্য আমরা ভারত সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সরকার যদি আমাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাতে চায়, তাহলে তা করতে পারে কিন্তু দেশে ফেরার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।’

২০১২ সাল থেকে তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বাস করা আব্দুর রহিম বলেন, দেশে তাদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তবেই সেখানে ফেরার কথা ভাবতে পারি।

মুহাম্মদ ইউনুস (৬৩) নামের আরেকজন বলেন, বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমার সবসময় তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে আসে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এ নিয়ে তিনবার শরণার্থী হয়েছি। ওরা কখনোই তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করেনি।

মিয়ানমারে মুহাম্মদ ইউনুস ব্যবসায়ী ছিলেন। মিয়ানমার সরকার তার সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ভারতে আশ্রয় নেয়ার পরও তাদের সমস্যা দূর হয়নি। অন্যদের সাথে গত তিন মাস ধরে তিনি জম্মু থেকে হায়দ্রাবাদে বাস করছেন। এখানে এখন দৈনিক পাঁচ শ' টাকার মজুরিতে কাজ করছেন। যদিও মাসের মধ্যে মাত্র ১৫ দিন কাজ পাওয়া যায়।

দিল্লিতে আশ্রয় নেয়া সাবিকুন নাহার নামে এক তরুণী তার চরম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘নিজের গ্রামে ফেরার কথা ভাবলেই সেনাবাহিনীর হামলার ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাড়া করে। আমাদেরদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্ম মানতে বাধ্য করেছিল। স্থানীয় মসজিদে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল। এত ভয় পেতাম যে রাতে ঘুম আসত না।’

রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে : জাতিসঙ্ঘ
মিয়ানমারের রাখাইনে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে শরণার্থীর সংখ্যা এক মিলিয়ন বা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ।

ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলছে, চলতি সঙ্কটের সবচেয়ে খারাপ দিক হতে পারে এটাই যে, মিয়ানমার থেকে সব রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে চলে আসতে পারে। সংস্থা দুটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো দ্রুততার সাথে সহায়তায় এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার একজন পরিচালক মোহাম্মেদ আবদেকার মোহামুদ ও ইউএনএইচসিআর -এর সহকারি হাই কমিশনার জর্জ অকোথ অব্বুর নেতৃত্বাধীন যৌথ দল সম্প্রতি কক্সবাজারে শরণার্থী পরিস্থিতি দেখে এসেছেন।

বৃহস্পতিবার ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেছেন, শরণার্থী সংখ্যা এখন চার লাখ এবং প্রতিদিন ১০-২০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকছে। নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিচ্ছে ১০-২০ হাজার করে রোহিঙ্গা।

তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা সোজা করে বলেছেন, বাংলাদেশ গভীর মানবিক সঙ্কট মোকাবেলা করছে। একই সাথে তারা বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলেছেন নিজেদের অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

তারা বলেছেন, যে রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে তারা দুটো ধারণা করছেন- একটি হল যে পরিস্থিতি ভালো হবে যদি আর কেউ বাংলাদেশে না আসে, কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ বা খারাপ দিক যেটি হতে পারে তা হল এমন অবস্থা চললে সব রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে চলে আসতে পারে।

ইউএনএইচসিআর -এর সহকারী হাই কমিশনার জর্জ অকোথ অব্বুর রীতিমত উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেছেন, মাত্র আড়াই সপ্তাহে চার লাখ রোহিঙ্গা এসেছে, এটা অনেক বড় একটি সংখ্যা। সে কারণেই এ বিষয়ে এখন অনেক কিছু করনীয় আছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন।

রাখাইনে চলমান সহিংসতার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং সেখানে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে দেশটির কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়েছে জাতিসঙ্ঘ।

এর আগে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ এক জরুরী বৈঠকে বসে। বৈঠকে নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সেখানে সেনা অভিযান বন্ধে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানও জানানো হয়।

কিন্তু তাতে ঠিক কতটুকু সাড়া মিলছে?

জাতিসঙ্ঘের এই কর্মকর্তারা বলেছেন, যে সহায়তা আসছে তা মোটেও যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসা উচিত। কাল করবো, পরশু করবো এমন ভাবলে চলবেনা, আজই করতে হবে, আজই এগিয়ে আসতে হবে সহায়তা নিয়ে। এখানকার সরকার ও জনগণ তাদের সাধ্যমত করছে কিন্তু এগিয়ে আসতে হবে বিশ্ব সম্প্রদায়কেই।

এই কর্মকর্তারা বলছেন, হুট করে এতো শরণার্থী বাংলাদেশে চলে আসবে সেটা শুরুতে তারা বুঝতে পারেননি। এখন অনেক কিছুই করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

সেজন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় সুবিধা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। শরণার্থী সংখ্যা তিন লাখ হওয়ার পর জাতিসঙ্ঘ ৭৭ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার কথা বলেছিল এখন সেটি চার লাখ পার হওয়ায় এবং আরও বিপুল সংখ্যক শরণার্থী পথে থাকায় কি পরিমাণ সহায়তা লাগতে পারে সেটি নতুন করে নির্ধারণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।

বাবা-মা বেঁচে আছেন কিনা জানে না এই রোহিঙ্গা শিশুরা
জাতিসঙ্ঘের একটি সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কমপক্ষে এক হাজার তিন শ' শিশুকে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা মা-বাবা বা কোনো আত্মীয় স্বজনকে ছাড়াই বাংলাদেশে এসেছে।

সাহায্য সংস্থাগুলো ধারণা করছে, এসব শিশুর বাবা-মার দু'জনকেই অথবা বাবাকে মিয়ানমারে মেরে ফেলা হয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নিপীড়নের মুখে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা চার লাখ পেরিয়েছে কদিন আগেই।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের হিসেব মতে প্রতিদিনই গড়ে দশ থেকে পনের হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে, যার একটি বড় অংশই শিশু।

এখন জাতিসঙ্ঘ বলছে তাদের সাথে কক্সবাজারে কাজ করছে এমন সাহায্য সংস্থাগুলোর হিসেবে এখন পর্যন্ত এক হাজার তিন শ'র বেশি শিশুকে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা বাংলাদেশে এসেছে বাবা-মা বা আত্মীয় স্বজন ছাড়াই।

ইউনিসেফের একজন কর্মকর্তা মাধুরী ব্যানার্জি বলছেন, "আজ পর্যন্ত ১৩১২ জন শিশুকে পাওয়া গেছে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অর্থাৎ পিতা মাতা বা স্বজনদের ছাড়া। তাদের সহায়তার চেষ্টা করছি আমরা। মানসিক বা ট্রমা থেকে তারা যেন বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক হতে পারে সে চেষ্টা করা হচ্ছে।"

ইউনিসেফের এই কর্মকর্তা বলছেন এসব শিশুরা নিজের কিংবা পরিচিত না হলেও কোনো না কোনো পরিবারের সাথেই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাই সেখানে রেখেই তাদের সহায়তার চেষ্টা করছেন তারা।

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের একজন মোহাম্মদ নুর বাংলাদেশে এসেছিলেন অনেক আগেই। তিনি বলছেন এসব শিশুদের বাবা-মাকে মিয়ানমারের সেনারা মেরে ফেলেছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থার হিসেব অনুযায়ী এ দফায় নতুন করে আসা শিশু সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি।

স্থানীয় একটি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল আবছার চৌধুরী বলছেন তার ধারণা যতো শিশু এসেছে তার প্রায় অর্ধেকের সাথেই বাবা নেই।

"কমপক্ষে ৪০ শতাংশ আসছে অভিভাবক ছাড়া। তবে কেউ কেউ আসছে শুধু মায়ের সাথে বা দাদির সাথে", বলছেন তিনি।

কক্সবাজারের রেড ক্রেসেন্টের কর্মকর্তা সেলিম মাহমুদ বলছেন, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই তাদের জানিয়েছেন যে তারা সাথে করে এমন অনেক শিশুকে এনেছেন যাদের পরিবারের সদস্যদের তারা আসার সময় খুঁজে পাননি।

সাহায্য সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, এ দফায় পরিবার ছাড়া অন্যদের সাথে আসা এমন অনেক শিশুকে পাওয়া গেছে যাদের বয়স মাত্র তিন কিংবা চার বছরের মধ্যে।

সঙ্গত কারণেই এসব শিশুদের অভিভাবকদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সেটি তারা কিংবা তারা যাদের সাথে বাংলাদেশে এসেছে তারাও ঠিক মতো বলতে পারছে না।

সীমান্তে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ৪০০ রোহিঙ্গা নারী
গত দুই সপ্তাহে চার শতাধিক রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার নো ম্যানস ল্যান্ডে। উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপনে হুমকির মুখে পড়েছে এ শিশুদের জীবন। অনেক শিশুই ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। সন্তান হারানো এমন মায়েদের একজন সুরাইয়া সুলতান।

সীমান্তের ৫০০ গজ দূরের একটি কর্দমাক্ত স্থানে আরো অনেক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সাথে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় ছিলেন সুরাইয়া। সে সময় তার প্রসব বেদনা শুরু হলে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাকে একটি নৌকায় ওঠায়। নৌকার চার দিকে শাড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়। সেখানেই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সুরাইয়া। শিশুটির নাম রাখা হয় আয়েশা।

এরপর অসুস্থ মা ও শিশুকে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় নয়াপাড়া উদ্বাস্তু শিবিরে। এ শিবিরটির কর্মকর্তা মোমিনুল হক জানিয়েছেন, একই রকম অবস্থায় আরো অনেকে এসেছে এ শিবিরে। তাদের প্রায় সবারই অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। মোমিনুল হক বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো তাদের সহায়তার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য সীমিত।’

ভয়াবহ এ দুরবস্থার মধ্যেই দিন কাটছে রোহিঙ্গা মা ও নবজাতকদের। অনেক মা সন্তান প্রসবের সময় মারা গেছেন। কোনো সেবা বা সাহায্য ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে। কারো নবজাতক মারা যাচ্ছে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে। সন্তান হারিয়েছেন মাসুমা বাহাদুর (২৮)। তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল আমার সন্তানের। তার স্বামী আবু বকর চিকিৎসা সহায়তার খোঁজে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন ছেলে আর বেঁচে নেই।’

কাছাকাছি কোনো কবরস্থান না থাকায় আবু বকর নিকটস্থ জঙ্গলে কবর খুঁড়ে তিন দিন বয়সী ছেলেকে দাফন করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরেক রোহিঙ্গা নারী জানিয়েছেন, মৃত্যুর দুই দিন পরও দাফন দেয়ার ব্যবস্থা করতে না পেরে নাফ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন ছেলের লাশ।

বাংলাদেশ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী মনজুর কাদির আহমেদ জানান, যথাযথ খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মায়ের বুকের দুধও পাচ্ছে না এসব নবজাতকেরা। জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা ভিভিয়ান তান বলেন, এক লোক কম্বলে মোড়ানো একটি ঝুড়ি নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। ঝুড়ি খুলে দেখলাম তার ভেতর দুই যমজ নবাজাতক। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার সময় পথিমধ্যেই তার স্ত্রী এ সন্তানদের জন্ম দিয়েছেন। তাদের কাছে আসার কিছুক্ষণ পর একটি বাচ্চা মারা যায়।

জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থলি লেক বলেন, সীমান্তের উভয় পাশে অনেক নারী ও শিশু আছে যাদের জরুরি সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে সব ধরনের ত্রাণকার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কারণে এ বিষয়টিতে বাংলাদেশের এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করে ইউনিসেফ।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫