ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিশ্বসমাজ কতটুকু তৎপর

ইকতেদার আহমেদ

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৭:১৯ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৮:০২


ইকতেদার আহমেদ

ইকতেদার আহমেদ

প্রিন্ট

রোহিঙ্গারা বংশ পরম্পরায় দীর্ঘ এক হাজার বছর বার্মার আরাকান প্রদেশে বসবাস করে আসছে। আরাকান একদা মুসলিম শাসনাধীন স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন দিয়ে বার্মাকে ভারতবর্ষ থেকে পৃথক করা হয়। তৎপরবর্তী ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাবস্থায় আরাকানে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়। ওই দাঙ্গায় রোহিঙ্গারা ব্যাপক হারে মগ তথা রাখাইনদের দিয়ে হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন ও নিষ্পেষণের শিকার হয়। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করলে তখনকার শাসক বার্মার বর্তমান তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী সু চির পিতা অং সান আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। অং সান সামরিক বাহিনী দিয়ে নিহত হওয়া পরবর্তী উনু ক্ষমতাসীন হলে তিনিও অং সানের ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার স্বীকার করে নেন।

নেউইনের শাসনামলে তিনি সর্বপ্রথম রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। নেউইন ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৬২ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আরাকান ত্যাগে বাধ্য হয়ে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে আসেন এবং এদের কেউই পরে আরাকানে প্রত্যাবর্তন করেননি। বাংলাদেশ অভ্যুদ্বয় পরবর্তী ১৯৭৮ সালে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অত্যাচার ও নিষ্পেষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য হয়। ১৯৭৯ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির অধীন এসব রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন শুরু হলেও তা মাঝপথে থমকে যায়। এ চুক্তিটিতেও রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে অত্যাচার ও নিষ্পেষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আগমনের ঘটনা ঘটতে থাকে। এভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে পাঁচ লাখ অতিক্রম করে। সাম্প্রতিক সময়ে অত্যাচার ও নৃশংসতার মাত্রা অতীতের সব ইতিহাসকে ছাড়িয়ে গেলে পুনরায় ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন ঘটতে থাকে, যা এখনো অব্যাহত। এভাবে আসা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা যে ১০ লাখ অতিক্রম করবে এমনই ধারণা পাওয়া যায়।

মিয়ানমারের ১৪টি প্রদেশে বর্তমান মুসলিম জনগোষ্ঠী ৭০ লাখ। স্বাধীনতা লাভের সময়ে মিয়ানমারের সামগ্রিক মুসলিম জনসংখ্যার অর্ধেকের অধিক আরাকানে বাস করত। সে সময় আরাকান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অধ্যুষিত প্রদেশ ছিল। সে সময় আরাকানের আয়তন ছিল ২০ হাজার বর্গমাইল। পরে সেখানকার শাসকেরা রোহিঙ্গাদের আরাকানে সংখ্যালঘিষ্ঠ করার প্রয়াসে এর উত্তরাংশের আরাকান পার্বত্য জেলা এবং দক্ষিণাংশের একটি অঞ্চলকে আরাকান থেকে পৃথক করায় বর্তমানে এটির আয়তন ১৪ হাজার ২০০ বর্গমাইল। বার্মার সামরিক শাসকেরা যেমন বার্মার নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রেখেছে, অনুরূপ আরাকানের ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য এর নাম পরিবর্তন করে রাখাইন রেখেছে। অথচ ১৭৮৫ সালে বার্মার রাজা বোদাপাউপিয়া যখন আরাকান আক্রমণ করে অঞ্চলটি দখল করে নেন, তখন তিনি আরাকান থেকে রোহিঙ্গা ও মগ উভয় সম্প্রদায়কে বিতাড়নপূর্বক চট্টগ্রামে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন। পরে বার্মা ব্রিটিশদের দখলে এলে রোহিঙ্গা ও মগরা পুনরায় আরাকানে ফিরে যায়। যদিও মগদের একটি অংশ স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামের কক্সবাজারে থেকে যায়। এরা সেখানে এখন রাখাইন নামে পরিচিত।

জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর পরিচালিত দু’টি শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ২৫ হাজার কিন্তু এর বাইরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ বর্তমানে যারা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, এদের নাম ও ঠিকানা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অতীতের মতো বর্তমানেও যদি শরণার্থী হিসেবে আগমনকারীদের নাম ও ঠিকানা লিপিবদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটে তাহলে সময়ের পরিক্রমায় তারা একসময় এ দেশের মূল স্রোতের নাগরিকদের সাথে মিশে যাবে এবং সে ক্ষেত্রে এদের প্রত্যাবর্তন দুরূহ হবে।

এর আগে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আগমনকারী বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এ দেশের একশ্রেণীর অসাধু লোকের সহায়তায় বাংলাদেশের পাসপোর্ট সংগ্রহপূর্বক পাকিস্তান সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। এ দেশের রোহিঙ্গা নাগরিক বিদেশের মাটিতে কোনো অপরাধ করলে তা বাংলাদেশের জন্য অপমান ও লজ্জার কারণ হিসেবে দেখা দেয়। অতীতে বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করেছে এবং বর্তমানে যারা প্রবেশ করছে এদের সবার নিবন্ধন অত্যন্ত জরুরি। নিবন্ধনের কাজটি সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সমাধা করা গেলে বাংলাদেশের পক্ষে এদের সংখ্যানুযায়ী জাতিসঙ্ঘসহ অন্যান্য দেশের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সাহায্য ও সহযোগিতা এবং নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন অথবা সাময়িক বিদেশের যেকোনো রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ সহজতর হবে।

বাংলাদেশ অভ্যুদ্বয়-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে যে হারে রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে প্রবেশ ঘটেছিল, সে তুলনায় প্রত্যাবর্তনের সংখ্যা নগণ্য। বর্তমানে সেখানে যে পরিস্থিতি ও পরিবেশ বিরাজ করছে তা প্রত্যাবর্তনের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। তা ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরা রোহিঙ্গাদের সেখানকার নাগরিক হিসেবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনপূর্বক প্রত্যাবর্তন দূরের কথা প্রতিনিয়ত বিতাড়নে বাধ্য করছে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বল প্রয়োগ ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

নাগরিকত্ব বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী রোহিঙ্গারা যেকোনো মাপকাঠিতে মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমারের অভিনব শর্তারোপের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে অত্যাচার ও নিষ্পেষণের মাধ্যমে তাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়ন অমানবিক, পৈশাচিক ও বর্বরোচিত। এ ধরনের পৈশাচিকতা ও বর্বরতা কোনো সভ্য দেশ ও জাতির পরিচায়ক নয়।
মিয়ানমার বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং নিজেকে বাংলাদেশের বন্ধু বলে দাবি করে। একটি বন্ধুরাষ্ট্র কখনো নিজ দেশের নাগরিককে অত্যাচার ও নিষ্পেষণের মাধ্যমে অপর বন্ধুদেশে প্রবেশে বাধ্য করতে পারে না। মিয়ানমার যখন বন্ধুত্বের চরম অবমাননায় তার নিজ দেশের নাগরিকদের বলপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য করে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে, তখন দেখা গেল বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী সস্ত্রীক সেখানে গিয়ে চাল আমদানির চুক্তি চূড়ান্তকরণে ব্যস্ত। এ ধরনের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরে সচরাচর খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অথবা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িত থাকেন। মিয়ানমারের সাথে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে, এমন অবস্থায় খাদ্যমন্ত্রীর সস্ত্রীক সেখানে চাল আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরে যাওয়া আমাদের জন্য জাতি হিসেবে একদিকে অবমাননাকর; অপর দিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয়।

আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা স্বাধীনতা-পরবর্তী সেখানে চরমভাবে অত্যাচার ও নিষ্পেষণের কারণে পর্যায়ক্রমে বিতাড়নের শিকার হয়ে প্রথমত পূর্বপাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে থাকলেও এদের ওপর অমানবিক অত্যাচার ও নিষ্পেষণের ঘটনায় জাতিসঙ্ঘসহ পৃথিবীর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে সেভাবে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে অনেকে অভিযোগ করে থাকেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ও পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আনার জন্য যেরূপ পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি। এ কথাটি অনস্বীকার্য যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় শতভাগই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গারা যে সময় থেকে শাসকদের হাতে বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তার অনেক পরে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুর এবং দক্ষিণ সুদানে বসবাসরত সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী ধর্মীয় ও জাতিগত জাতিসত্তার দাবিতে স্বাধিকার আন্দোলনে লিপ্ত হলে অতি দ্রুত জাতিসঙ্ঘসহ উন্নত বিশ্বের খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপে ২০০২ ও ২০১১ সালে উপরোল্লিখিত দু’টি অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে আবির্ভূত হয়।

বর্তমানে আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একটি বড় অংশ শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে বসবাস করছে। বাংলাদেশ ছাড়া পাকিস্তান ও সৌদি আরবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা রয়েছে। এরা সবাই উপরোল্লিখিত দেশগুলোতে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক হিসেবে শরণার্থীর মর্যাদায় বসবাস করছে। রোহিঙ্গাদের সামরিক শাসক দিয়ে নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও, বিভিন্ন অজানা কারণে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনে সেখানকার সামরিক শাসকদের বাধ্য করা যাচ্ছে না।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমার রাষ্ট্রের অধীন পৃথক জাতিসত্তা। সেখানে অনুরূপ ১৪টি প্রধান জাতিসত্তা এবং দুই শতাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। এরা সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বিধায় এদের নাগরিকত্ব কখনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের উত্থাপন আইনের বরখেলাপ ছাড়াও নীতিজ্ঞান ও নৈতিকতার পরিপন্থী। বাংলাদেশ জাতিগত জাতিসত্তার স্বাধিকারের নীতিতে বিশ্বাসী। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করা হয়েছে- রাষ্ট্র প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পন্থা ও পদ্ধতির মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে। বাংলাদেশের পক্ষে সাংবিধানিক এ বাধ্যবাধকতা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রণিধানযোগ্য, ভারতবর্ষ বিভাজনকালে ধর্মীয় জাতিসত্তার নীতি অনুসৃত হলেও বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সময় ভারত সে নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে জাতিগত জাতিসত্তার সপক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে সার্বিকভাবে সহায়তা দেয়। এমতাবস্থায় আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রশ্নে ভারতের পক্ষে কোনোভাবে মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের অবস্থানে সমর্থন জোগানো প্রত্যাশিত না হলেও দুঃখজনকভাবে আমাদের তা দেখতে হচ্ছে।

সম্প্রতি আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) নামের যে সংগঠনটির নাম উদ্ধৃত করে সেখানকার পুলিশ ও সেনা চৌকিতে সশস্ত্র হামলার কথা সেনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। বিশ্বস্ত বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে সম্পূর্ণ আরাকান অঞ্চল রোহিঙ্গাশূন্য করার জন্য আরসার নামে মিয়ানমারের সেনা শাসকেরাই এ অভিযানটি পরিচালনা করেছে। আরাকানের যে ভৌগোলিক অবস্থান তাতে বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে এ ধরনের সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান যে অবস্থান তাতে রাষ্ট্রটি কোনোভাবেই এ ধরনের সশস্ত্র পন্থায় রোহিঙ্গাদের দাবি আদায়ের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে না। এমতাবস্থায় উদ্ভূত সমস্যা সেখানকার সেনা শাসকদের সৃষ্ট, এটির ওপর বিশ্বাস স্থাপনের দৃঢ় ভিত্তি রয়েছে।

যেকোনো দেশের নাগরিকদের তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, অত্যাচার ও নিষ্পেষণের মুখোমুখি করলে তারা আত্মরক্ষা বা বাঁচার শেষ অবলম্বন হিসেবে সশস্ত্র পন্থা গ্রহণে বাধ্য হয়। মিয়ানমারের শাসকেরা দীর্ঘকাল যেভাবে আরাকানের রোহিঙ্গাদের জন্মগত অধিকার হতে বঞ্চিত করে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত করছে, তাতে সার্বিক বিবেচনায় প্রতীয়মান হয় তাদের জন্য সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন অবশ্যসম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আর তাই জাতিসঙ্ঘসহ পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো রোহিঙ্গাদের জন্মগত নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারকে সম্মত করাতে ব্যর্থ হলে তাদের উচিত হবে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে আরাকানের মধ্যে রোহিঙ্গাদের অবাধে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের জন্য একটি নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন। এ ধরনের নিরাপত্তা অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরা নিশ্চিতকরণে ব্যর্থ হলে সে ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী দিয়ে তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্ররূপে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে সাময়িক আশ্রয়দাতা দেশ হওয়ায় এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশেরও তৎপরতা হতে হবে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক এমন সব কাজে সার্বিক সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫