ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

কর্পোরেট দিগন্ত

চায়ের দিন কি ফুরিয়ে আসছে

আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ২০১৬-১৭ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী চায়ের রফতানি আয়ের পরিমাণ তলানিতে ঠেকেছে। চলতি অর্থবছরে মাত্র ৩৪ হাজার মিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পেরেছে এ খাতটি। অথচ দু’দশক আগেও বিশ্বের শীর্ষ চা রফতানিকারক দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। ডব্লিউটিএক্সপোর গত ৭ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী রফতানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪টি দেশের মধ্যে ৭৭তম। তা ছাড়া রফতানির পরিমাণ শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ মাত্র। আর বিগত ২০১৬ সালে রফতানি আয় মাত্র ৯ লাখ ১৩ হাজার ডলার। তবে কি রফতানি পণ্য হিসেবে চায়ের দিন ফুরিয়ে আসছে?
দেশে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী প্রচলিত রফতানি পণ্য পাট, চা ও চামড়া। পাট বা পাটজাত দ্রব্য ও চামড়া রফতানি কোনো মতে টিকে থাকলেও রফতানির পণ্য তালিকা থেকে চায়ের নাম এখন বাদ পড়তে যাচ্ছে। দেশে ভালোমানের চায়ের উৎপাদন বাড়লেও বিদেশ থেকে নি¤œমানের চা এনে বাজার সয়লাব করার অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। রফতানিকারক এই পণ্যটি এখন পরিচিত হচ্ছে আমদানিকারক পণ্য হিসেবে। এ অবস্থায় চা আমদানি বন্ধ করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চা বোর্ড।
ইপিবির হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছর থেকে এ বছর রফতানি বাড়লেও তার পরিমাণ মাত্র ৫৮৯.৬৬ মিলিয়ন ডলার। মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদা জোগাতে গিয়ে রফতানি সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসছে। কাগজ-কলমে ‘রফতানি’ বলা হলেও চট্টগ্রামের দেশের আন্তর্জাতিক চা নিলাম বাজার থেকে সেই স্বল্প পরিমাণ চা বাস্তবে কিনে নিচ্ছে কয়েকটি ব্র্যান্ডের স্থানীয় প্যাকেটিয়াররা। আর শতকরা ৯৭ ভাগেরও বেশি চা দেশের অভ্যন্তরে ভোক্তা চাহিদা মেটাতে গিয়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে।
এভাবে গত প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে ও চা রফতানি হচ্ছে নামেমাত্র। দেশীয় বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় চায়ের অভ্যন্তরীণ দরদাম বেজায় চাঙা রয়েছে। ভোক্তাদের চাহিদা বাড়লেও চায়ের উৎপাদন বাড়ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশের অভ্যন্তরে চায়ের ভোগ ৩.২৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধির হার উৎপাদন বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। চা রফতানি বছরে গড়ে ২.৯৮ শতাংশ হারে কমে গেছে। এ দেশে প্রায় ১০০ বছরের পুরনো, ঐতিহ্যবাহী ও দীর্ঘ প্রচলিত রফতানি পণ্য চা গত কয়েক বছর ধরে ক্রমেই বিদেশের স্থায়ী বাজার হারিয়ে ফেলছে। আর সেই সুবাদে নীরবে বাংলাদেশেরই বাজার আয়ত্ত করে নিচ্ছে অন্যান্য উৎপাদক দেশ।
জানা গেছে, বিগত চার মাসে (২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) দেশে মোট চা আমদানি হয়েছে ৩৬ লাখ ২৩ হাজার ৭৮০ কেজি। ২০১১ সালে চা আমদানি হয়েছিল ৪ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন কেজি। ২০১২ সালে চা আমদানি সামান্য কমলেও ২০১৩ সালে এই পণ্যটি আমদানি হয় ১০ দশমিক ৬২ মিলিয়ন কেজি। ২০১৪ সালে চা আমদানি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন কেজি। ২০১৫ সালে আমদানির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন কেজি চা আমদানি হয়। ২০১৬ সালে চা আমদানি হয়েছে ৭ দশমিক ৭০ মিলিয়ন কেজি আর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চা আমদানি হয়েছে ১ দশমিক ১৪ মিলিয়ন কেজি।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ১৬২টি বাগানে চা উৎপাদন হয়েছে সাড়ে আট কোটি কেজি। প্রতি কাপ চা তৈরিতে দুই গ্রাম চা-পাতা দরকার হয়। এ হিসাবে গত বছরের উৎপাদন হিসাব করা হলে চার হাজার ২৫২ কোটি কাপ চা তৈরির সমান চা উৎপাদিত হয়েছে দেশে। তবে এ সময় চায়ের চাহিদা ছিল আট কোটি ১৬ লাখ কেজি। এই হিসাবে চাহিদার চেয়ে চা উৎপাদন বেশি হয়েছে ৩৪ লাখ কেজি।
অন্যদিকে চা রফতানিতে কম-বেশি শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা ও শুল্ক-অশুল্ক নানাবিধ বাধা অপসারণ করেছে আফগানিস্তান, রাশিয়াসহ সিআইএসভুক্ত দেশগুলো, পূর্ব ইউরোপীয় একাধিক দেশ। তারা বাংলাদেশে উৎপাদিত চা কিনতে বিশেষভাবেই আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও সেসব দেশের ক্রেতাপক্ষের ফরমায়েশ পূরণ করা মোটেও সম্ভব হচ্ছে না। বনেদি শিল্পখাত হিসেবে পরিচিত চা শিল্প-বাণিজ্যের কর্মচঞ্চল বিশাল অঙ্গনে জড়িয়ে আছে কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সস্তা, সুলভ অথচ অভিজাত এবং সব শ্রেণীপেশা বয়সী মানুষের কাছে অতি পছন্দের পানীয় হচ্ছে একমাত্র চা। বিশ্বে বছরে ১৫৭ কোটি কেজি চা রফতানির বাজার রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ মাত্র ৩০ লাখ কেজিতে ওঠানামা করছে। আর বার্ষিক চা উৎপাদন পাঁচ কোটি থেকে ছয় কোটি কেজিতেই ঘুরেফিরে সীমিত রয়েছে।
বিশ্বের ক্রেতারা যেখানে চায়ের রঙ, ঘ্রাণ ও স্বাদÑ এই তিনটি বিষয়ে গুণগতমান উন্নত করার ওপর তাগিদ দিয়ে আসছে, সেখানে এ দেশে যুগোপযোগী আধুনিকায়ন থেকে চা শিল্প অনেক পেছনে পড়ে গেছে। ১৫০ চা বাগান সচল বলা হলেও রুগ্ণ, অদক্ষ ও অব্যবস্থাপনার কারণে বেশির ভাগ চা বাগানে আবাদ, উৎপাদন এবং প্রত্যাশিত মান পূরণ হচ্ছে না। এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে গত আট বছর আগে ৯৭ লাখ কেজি চা রফতানি করা হলেও বর্তমানে তা ১৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এর মূল কারণ চা আবাদ, উৎপাদন আগের জায়গায় স্থির থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে চা একটি রফতানিমুখী, আমদানি প্রতিস্থাপক, শ্রমঘন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প। এ শিল্প খাতে ১৬৬টি চা বাগানে এক লাখ চার হাজার ৪৯৭ জন স্থায়ী শ্রমিক, ২৮ হাজার ৩১৩ জন অস্থায়ী শ্রমিক এবং পাঁচ হাজার ৭২৬ জন কর্মচারী রয়েছে। তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য সংখ্যা দ্ইু লাখ ৬৯ হাজার ১৩৩ জন। দেশে চায়ের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বৃহৎ চা বাগানের পাশাপাশি ২০০২ সাল থেকে ক্ষুদ্রায়তন চা চাষও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পঞ্চগড় ও এর আশপাশ এলাকায় এক হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে চা চাষ করা হয়েছে। সেখান থেকে ১৫ লাখ কেজিরও বেশি চা উৎপাদিত হচ্ছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫