ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

হজের খুতবা ২০১৭ মসজিদে নামিরাহ থেকে

শাইখ সায়াদ আশ্ শিস্রী

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

সব প্রশংসা করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর জন্য। যিনি নিজ বান্দাদেরকে শারীরিক সুস্থতা দিয়েছেন, দিয়েছেন নিজেদের দেশে নিরাপত্তা। প্রশংসা তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের জন্য, তিনি মহান অনুগ্রহশীল।
সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি পাপি ও অবিশ্বস্তদের ভালোবাসেন না।
সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, তিনি আল্লাহর দ্বীনের বিশদ বিবরণ পেশ করেছেন। দিয়েছেন তাঁর পক্ষে বলিষ্ঠ যুক্তি ও প্রমাণ। তিনি সব ধরনের অবিশ্বস্ততা ও অপবাদ থেকে মুক্ত।
হে মুমিনগণ! শরিয়াহ বাস্তবায়ন এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করুন। আর এভাবে আল্লাহর ভালোবাসা ও সাহচর্য্য লাভ করে সফলতা অর্জন করবেন।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদেরকে ভালোবাসেন।’ ‘আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন।’
আল্লাহকে ভয় করুন, দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহকে যারা ভয় করবে তাদের অবস্থান ঝর্ণাধারা প্রবাহিত জান্নাতে।’
তাকওয়া অবলম্বনকারীদের উদ্দেশ করে বলা হবে, ‘তোমরা শান্তি ও নিরাপদে তাতে প্রবেশ করো।’
‘যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য বিপদ-সঙ্কট থেকে বের হওয়ার পথ করে দিবেন এবং তাকে এমনভাবে জীবিকা দেবেন যে, সে ধারণাও করতে পারে না।’
তাকওয়া তথা আল্লাহকে ভয় করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তাওহিদ। তাওহিদ হলো ইবাদতে আল্লাহকে একক মর্যাদা দেয়া। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করা যাবে না। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ডাকা যাবে না।
তিনি বলেন, ‘শুধু তোমার রবের উদ্দেশে সালাত আদায় করো ও কোরবানি করো।’
তিনি আরো বলেন, ‘মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য, সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডাকবে না।’
তাওহিদ সব নবী রাসূলের দ্বীনের ভিত্তি। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি সব জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি যেন তারা তাদের জাতিকে উদ্দেশ করে বলে, তোমরা শুধু আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত বর্জন করো।’
তিনি আরো বলেন, ‘তোমার আগে যাকেই রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছে তাকে এ বিষয়ে ওয়াহ্ই করা হয়েছে যে, আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো।’ তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহই তোমাদের রব, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি সব বিষয়ের স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত করো।’
শাহাদত তথা সাক্ষ্য প্রদানের আরেকটি বিষয় হলো, এ সাক্ষ্য দেয়া যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তাঁকে রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছে গোটা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য। তিনি যা বলেছেন সত্য বলেছেন। তাঁর আদেশ মানতে হবে। তিনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন, তার ভিত্তিতেই আল্লাহর ইবাদত করতে হবে আর এর মাধ্যমেই সফলতা ও মুক্তি অর্জন করা যাবে। আল্লাহ বলেন, ‘সে নিজ থেকে কিছু বলে না, যা বলে ওয়াহ্ইর ভিত্তিতেই বলে।’
হে লোক সকল! মুক্তি লাভ ও জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র পথ হলো ঈমান। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে আল্লাহ তাকে তাঁর করুণা ও অনুগ্রহের মধ্যে প্রবেশ করাবেন এবং সরল ও সুদৃঢ় পথের দিকে পরিচালিত করবেন।’
আরকানুল ঈমান তথা ঈমানের ভিত্তিগুলো সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঈমান হলো, তুমি আল্লাহ, ফেরেশতা, রাসূল, পরকাল ও তাকদিরের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।’
আরকানুল ইসলাম তথা ইসলামের স্তম্ভগুলো সম্পর্কে বলেন, ‘ইসলাম হলোÑ তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজানে সিয়াম পালন করবে, আল্লাহর ঘর পর্যন্ত যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে হজ আদায় করবে।’
হে আল্লাহর বান্দারা! সালাত হলো দ্বীনের ভিত্তি, সালাত রব ও বান্দার মাঝে সেতুবন্ধন। হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের সাথে একান্তে কথা বলে।’ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও।’
কুরআন মজিদে সালাতের সাথে জাকাতকে যুক্ত করা হয়েছে। জাকাত অন্তরের পরিশুদ্ধি ও সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম। জাকাত অভাবগ্রস্তদের অভাব দূর করার জন্য সহায়ক। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে, তোমরা তোমাদের দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে। সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত প্রদান করবে; আর এটিই হলো সুদৃঢ় দ্বীন।’
ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ হলোÑ রমজানের সিয়াম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘রমজান হলো ওই মাস যাতে মানুষের হিদায়াতের জন্য কুরআন নাজিল করা হয়েছে। যাতে রয়েছে সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ আর মানদণ্ড। তোমাদের মধ্যে যেই এ মাস পাবে, সে সিয়াম পালন করবে।’
পঞ্চম স্তম্ভ হলোÑ আল্লাহর ঘরের হজ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হজ বিধিবদ্ধ করা হয়েছে, এমন লোকের জন্য যে সেখানে যেতে সক্ষম।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মাবরুর হজের প্রতিদান শুধু জান্নাত।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরি দশম সনে হজ আদায় করেন। আরাফাহ দিবসে তাঁর ওপর নাজিল হয়, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’
এ আয়াত থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হলো যে, আল্লাহর দ্বীন ও শরিয়াহ পরিপূর্ণতা পেয়েছে। দ্বীন ও শরিয়তে রয়েছে সব ধরনের উন্নত নৈতিকতা।
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ ঐক্য, সংহতি ও কল্যাণকর কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে সহযোগিতা করো না।’
তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর দুশমন ছিলে। আল্লাহ তোমাদের অন্তরগুলোকে জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তোমরা হয়ে গেলে ভাই ভাই।’
দ্বীনের আরেকটি সৌন্দর্য হলোÑ দ্বীন মুমিনদেরকে উত্তম চরিত্র ও উন্নত নৈতিকতা অবলম্বনে উৎসাহ দিয়েছে। ‘আমার বান্দাদেরকে বলো তারা যেন উত্তম কথা বলে।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার অবস্থান উত্তম চরিত্রের ওপর।’ আরো বলেন, ‘আল্লাহর করুণায় তুমি তাদের জন্য কোমল হয়েছো।’
মুমিনদেরকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন উত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। ইসলামী শারিয়াহর একটি সৌন্দর্য হলোÑ এটি সকল সৃষ্টির জন্য কল্যাণকর। এতে রয়েছে করুণা ও অনুগ্রহ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাকে পাঠানো হয়েছে বিশ্বজাহানের করুণাস্বরূপ।’
ইসলামী শরিয়াহর আরেকটি সৌন্দর্য্য হলোÑ ন্যায়পরায়ণতা, অনুগ্রহ এবং প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা, অনুগ্রহ ও আত্মীয়স্বজনকে যথাযথ অধিকার প্রদানের আদেশ করেছেন।’
ইসলামী শরিয়াহর সৌন্দর্য হলো, মানুষের গোটা জীবনকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা। ‘নিশ্চয়ই কুরআন সুষ্ঠু ও সুদৃঢ় পথের নির্দেশনা দেয়।’ এর আওতায় ইসলাম পারিবারিক জীবনকে সুসংহত করে, যাতে স্বামী-স্ত্রীর জীবন সুখময় হয়। সন্তানদের ভালোভাবে গঠন করা যায়, যেন তারা সমাজের জন্য উত্তম ভিত্তি হতে পারে।
আল্লাহ বলেন, ‘এটি তাঁর একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয়ই এর মধ্যে রয়েছে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শন।’
শরিয়াহ একদিকে সন্তানদের আদেশ করেছে পিতা-মাতার সাথে সদয় আচরণের, অপরদিকে পিতা-মাতাকে আদেশ করেছে সন্তানদের উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের।
ইসলামী শরিয়াহ সব ধরনের অশ্লীলতা ও ক্ষতিকর বিষয়কে হারাম করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘বলো! আমার রব প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন। নিষিদ্ধ করেছেন পাপ, সীমালঙ্ঘন ও শিরককে, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলীল অবতরণ করেননি। আরো নিষিদ্ধ করেছেন, তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা বলবে যা তোমরা জানো না।’
বাকি অংশ আগামি সংখ্যায়
অনুবাদ : অধ্যাপক আ ন ম রশীদ আহ্মাদ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫