ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক সমীকরণ

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৩০


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

আজকের বিশ্বে যেকোনো জাতীয় সঙ্কট আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করছে। অতীতে ধীরগতিতে ক্রমশ জাতীয় সঙ্কট অঞ্চল এবং বিশ্বকে স্পর্শ করত। এখন দুটি কারণে সাধারণ ঘটনাও বৈশ্বিক রূপ ধারণ করছে। প্রথমত, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব এবং দ্বিতীয়ত বিশ্বায়ন। সাধারণ বাণিজ্যিক বিষয় থেকে রাজনীতির অসাধারণ ইস্যু- সব কিছুই বিশ^কে আলোড়িত করছে। আর সন্ত্রাস, সহিংসতা এবং যুদ্ধের মতো বিষয় নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুণে আন্তর্জাতিক সমীকরণ সৃষ্টি করছে। রোহিঙ্গা সঙ্কটও অতি অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বলয়ে পক্ষ-বিপক্ষ, শত্রুতা-মিত্রতা এবং সমর্থন-বৈরিতা সৃষ্টি করেছে। বিষয়টির অমানবিকতা, নির্মমতা ও ব্যাপকতা সামগ্রিকভাবে মানবজাতিকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছে। মিয়ানমার সরকারের পরিকল্পিত এই গণহত্যা ও নির্যাতন পৃথিবীর সর্বত্র নিন্দিত হচ্ছে। গরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো এহেন নৃশংসতার প্রতিবাদ করছে। পৃথিবীর তাবৎ মানবিক সংগঠন ও সুশীলসমাজ মানবতার বিরুদ্ধে এই অপরাধে মিয়ানমার সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছে। এটা হচ্ছে একটি স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু এর বিপরীত দৃশ্যও আছে। রাষ্ট্র বা সরকারগুলো যখন তাদের নিজ নিজ স্বার্থ ও সুবিধা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্কের ভিত্তিতে হিসাব-নিকাশ করছে, তখন আমরা মানবিক আবেদন উপেক্ষিত ও ভূলুণ্ঠিত হতে দেখছি। রোহিঙ্গা সঙ্কটকে যারা মানবিক দৃষ্টি দিয়ে দেখছেন, তারা রাষ্ট্রিক তথা অভ্যন্তরীণ যুক্তিকে অগ্রাহ্য করছেন। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় তথা অনুসৃত আন্তর্জাতিক নীতিমালায় আর যেকোনো সরকার তার নাগরিকদের ওপর যথেচ্ছাচারের ‘অধিকার’ রাখে না। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা-১৯৪৮, আন্তর্জাতিক অপরাধসংক্রান্ত রোম ঘোষণা-১৯৯৮ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-২০০২ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার আলোকে সঙ্গতভাবেই রোহিঙ্গা সঙ্কটকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অপর দিকে, যারা বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চাচ্ছেন, তারা রাষ্ট্রিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দোহাই দিচ্ছেন। বিশেষ করে ৯/১১-এর পরে কায়েমি স্বার্থবাদ যেকোনো মানবিক ও মুক্তি সংগ্রামের ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ তথা জঙ্গিবাদ বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করছে।
এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রয়াস ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মৌলিক সত্য প্রকাশিত হয়। জাতিসঙ্ঘ সাধারণভাবে নিরপেক্ষ, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে জাতীয় সঙ্কটগুলো, যা মানবতাকে বিচলিত করে, তা তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে থাকে। সেখানে অবশ্য জাতিসঙ্ঘের নিজস্ব কর্মধারা এবং বৃহৎ শক্তির কার্যব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। জাতিসঙ্ঘের কর্মধারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের প্রশ্নে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রদান করেছে। তাদের পরিচালিত কর্মধারা অংশ হিসেবে কফি আনান কমিশন একটি উল্লেখযোগ্য প্রয়াস। ২৫ আগস্ট ২০১৭-এর ব্যাপক নৃশংসতার পরে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বানে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তেনিয়ো গুতেরেসের পদক্ষেপ সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুসংক্রান্ত সংস্থা ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রথম থেকেই সংবেদনশীলতার সাথে বিষয়টি মোকাবেলা করছে। এই মুহূর্তে সংগঠনের সহকারী কমিশনার জর্জ ওকত ওবু বাংলাদেশ সফর করছেন। এ দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়েদ বিন রায়াদ আল হুসাইন ১১ সেপ্টেম্বর জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের দেয়া বক্তব্যে দেয়া মিয়ানমারের নৃশংস সেনা অভিযানের তীব্র নিন্দা জানালেন। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় আধা-সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, সেখানে নিয়মিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে, এমনকি পলাতক বেসামরিক মানুষকে গুলি করা হচ্ছে- এমন অনেক তথ্য আর স্যাটেলাইটের ছবি আমাদের কাছে রয়েছে।’ ইউনিসেফ বলেছে, দুই লাখ রোহিঙ্গা শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক জর্জ গ্রাহাম বলেছেন, ‘মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ, রোহিঙ্গা শিশুদের দুর্ভোগ চরমে।’ এসব মানবিক আবেদন ও তৎপরতা মিয়ানমার সরকার কর্তৃক মানবতা লঙ্ঘনের প্রমাণ। জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক গৃহীত ও স্বীকৃত এসব মানবিক বিষয়ের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর স্বার্থে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করা। এ ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের নির্বাহী কর্তৃত্বের ধারক নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা পরিষদ : রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসার কথা। মানবিক সঙ্কট বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের উদ্যোগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মিয়ানমারের আরাকানে তথা রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা তীব্র আকার ধারণ করার পর নিরাপত্তা পরিষদ দ্বিতীয়বারের জন্য এই বৈঠক করছে। একই ইস্যুতে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে নিরাপত্তা পরিষদের আর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠকে রাখাইন ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে তথ্য দেয়া হয় যে, তিন হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এদের পরিসংখ্যান মোতাবেক তিন লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের গৃহীত ব্যবস্থার ওপর সঙ্কট উত্তরণের বিষয় নির্ভর করছে। তাই এ বৈঠককে কেন্দ্র করে দ্বিবিধ সমীকরণ ঘটছে। বাংলাদেশ সরকার সঙ্গতভাবেই প্রত্যাশা করে, সঙ্কট সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদ যথার্থ ভূমিকা রাখবে। অপর দিকে, মূল অপরাধী মিয়ানমার সরকার সর্বতোভাবেই চেষ্টা করছে যাতে সিদ্ধান্ত তাদের বিরুদ্ধে না যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলো, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়া) এবং অস্থায়ী সদস্য (বলিভিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ইতালি, জাপান, কাজাকস্তান, সেনেগাল, সুইডেন, ইউক্রেন ও উরুগুয়ে) রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে উভয়পক্ষের জোর তৎপরতা লক্ষণীয়। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কটে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা নিম্নরূপ:

যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ইতঃপূর্বে তারা নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠক আহ্বান করেছেন। উল্লেখ্য, ২০১১ থেকে মিয়ানমার সরকার ‘বন্ধ দ্বার’ নীতির ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বিশে^র সামনে যখন নিজেদের উন্মুক্ত করে দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ^ পরিবর্তিত এই নীতিকে স্বাগত জানায়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হন। তারই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় আনান কমিশন গঠিত হয়। ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব সারাহ স্যান্ডার্স বলেছেন, মিয়ানমারে চলমান সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তল্লাশির চৌকিতে হামলার পর কমপক্ষে তিন লাখ লোক বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা এই হামলা এবং চলমান সহিংসতার আবারো নিন্দা জানাচ্ছি।

যুক্তরাজ্য : সঙ্কটের প্রথম থেকেই যুক্তরাজ্য পরিচালিত নৃশংসতার নিন্দা করেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব প্রদান এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে যুক্তরাজ্য সোচ্চার। যুক্তরাজ্য এবং সুইডেন নিরাপত্তা পরিষদের চলমান বৈঠকটি আহ্বান করেছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রশ্নে বিশ্ব জনমত গঠনে বিবিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

চীন : বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবেই গন্য হয়ে আসছে চীন। বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ে ‘সম্পর্কের উচ্চতা’র কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশের বড় ধরনের এই সঙ্কটে চীন বাংলাদেশের সাথে নেই। মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান দাবি করে আসছিলেন যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন আন্তর্জাতিকপর্যায়ে তাদের দৃঢ় সমর্থন দেবে। অপর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন, ‘ভারত ও চীন দু’টিই আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। অতীতের মতো এবারো তারা আমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে এবং এই সমস্যা সমাধানে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে’। (প্রথম আলো, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭) কিন্তু পরে চীন রাখাইনে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমারের প্রয়াসের প্রতি সমর্থন জানায়’। রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের এই প্রচেষ্টায় চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছে। পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায় যখন নিরাপত্তা পরিষদ রুদ্ধদ্বার বৈঠকের সার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখনই চীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো। উল্লেখ্য, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন যেকোনো সিদ্ধান্ত বাতিলের পক্ষে ‘ভেটো’ দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এএফপি জানায়, বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত হামলার নিন্দা জানাই। রাখাইনের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রাখতে মিয়ানমারের প্রয়াসের প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে। আমরা মনে করি, জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে স্থিতিশীলতা সুরক্ষায় মিয়ানমারের প্রচেষ্টার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকা উচিত।’ চীনের এই অবস্থানে বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। চীনের এ ভূমিকার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৪৮ থেকে ২০১১ সালের ‘মুক্তদ্বার নীতি’ পর্যন্ত চীনই ছিল মিয়ানমারের একমাত্র অভিভাবক। চীনের সাথে মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। মিয়ানমারের অফুরন্ত সম্পদের প্রতি চীনের রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে চীনের অর্থায়নে কয়েকটি বড় বড় প্রকল্প রয়েছে। বার্মার আমদানি দ্রব্যের ১৮ শতাংশ চীন থেকে আনা হয়। মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে চীন পূর্ব এবং পশ্চিমে সড়ক ও সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। মিয়ানমারের বৃহৎ অবয়বের পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থান নিতান্তই অকিঞ্চিত বৈকি! তবে শান্তি ও স্বাধীনতার নীতি অনুসরণের যে কথা চীন জোরেসোরে বলে আসছে তা থেকে এ বিচ্যুতি যে কাউকে মর্মাহত করবে।

ভারত : বাংলাদেশের আর এক ‘মহান প্রতিবেশী’ ভারত ও হতাশ করেছে বাংলাদেশকে। চীন আর ভারত পরস্পর বৈরী হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গা নিধনে চীন ও ভারতের অবস্থান অভিন্ন হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন অনেকে। উল্লেখ্য, মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, ‘সপ্ত কন্যা’র বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ভারত সরকার পরিষ্কার বলে দিয়েছে, তাদেরকে কোনো ক্রমেই আশ্রয় দেয়া হবে না। ইতঃপূর্বে এসব রাজ্যে আশ্রয় প্রার্থীরা হিন্দু হলে আশ্রয় পাবে বলে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের বিরূপ মনোভাবের উৎস ‘হিন্দুত্ব’ নীতিতে নিহিত বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দিল্লিকে ঢাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক এবং ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ওই আশা ব্যক্ত করা হয়।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের প্রতি চলমান সহিংসতা সত্ত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফর করেন। তিনি প্রকারান্তরে রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের পরিচালিত বেপরোয়া নিগ্রহের প্রতি ভারতের সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন। কূটনৈতিক ভাষার মারপ্যাঁচে এ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশ সরকার ভারতের এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আহত হলে ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লি থেকে একটি দায়সারা গোছের বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন আশা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মিয়ানমার নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে। ভারতের করপোরেট পুঁজির প্রতিনিধি নরেন্দ্র মোদি পৃথিবীর সর্বত্র স্বার্থ সুবিধা খুঁজছেন। মিয়ানমারের বিপুল সম্পদ ও সম্ভাবনা ভারতের জন্যও একটি বড় লাভের জায়গা। মানবিকতার পরিবর্তে সেখানে স্বার্থ ও সুবিধা অগ্রাধিকার পাওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ বিস্মিত। চীনের মতো ভারতেরও মিয়ানমার এবং বিশেষত আরাকান রাজ্য তথা রাখাইন স্টেটে বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য বিবিসিকে বলেছেন, ‘ভারতের অবস্থাটা আসলে খুব জটিল’। এক দিকে বাংলাদেশ, অন্য দিকে মিয়ানমার- দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক খুব ভালো। দুই দেশকেই ভারতের দরকার। কিন্তু এই রোহিঙ্গা প্রশ্নটি এমন একটি ইস্যু যাতে এই দুই সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ভারতের পক্ষে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে ভারতের মরিয়া হয়ে চেষ্টা।

তুরস্ক : মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের ভূমিকা প্রথম থেকেই জোরালো। রোহিঙ্গা ইস্যুর প্রতি মানবিক সমর্থনের পাশাপাশি তুরস্ক এ ইস্যুতে মুসলিম বিশে^র ভূমিকা সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিন এরদোগান এবং তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন প্রশংসনীয় বিবেচিত হয়েছে। নৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি তারা বিপুল ত্রাণ ও অর্থ সাহায্য প্রদান করেছেন। তুরস্কের এই ভূমিকাকে মিয়ানমার পক্ষের লোকেরা এবং বাংলাদেশে তাদের সমর্থকরা নেতিবাচকভাবে দেখাই স্বাভাবিক। গোটা বিশে^ যেখানে মানবতার বিপর্যয় ঘটছে সেখানেই এরদোগান সরকার সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ইতঃপূর্বে তারা সাইপ্রাস ও গাজায় ত্রাণ সাহায্য পাঠিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, এরদোগান সরকার বিলুপ্ত গৌরবময় উসমানীয় সালতানাতের উত্তরাধিকার বহন করতে চায়। বিলুপ্ত ‘খলিফাতুল মুসলিমীন’ এর প্রতিনিধি হিসেবে মুসলিম বিশে^র প্রতি তারা হয়তো দায় অনুভব করেন।

মধ্যপ্রাচ্য : মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো তথা ওআইসির ভূমিকা যথার্থ সন্তুষ্ট নন সাধারণ মানুষ। ওআইসির মহাসচিব ঘটনার শুরুতে বাংলাদেশস্থ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেছেন। তবুও ওআইসির তরফ থেকে যে শক্ত অবস্থান ও সহায়তা বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিল, তা পূরণ হয়নি। সৌদি আরব ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছিল। তখন বেশ কিছু রোহিঙ্গাকে তারা আশ্রয় দিয়েছিলেন। এবারে যদিও তারা সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন তবুও তা যেন পূর্ণতা পায়নি- এরকম মন্তব্য আশাবাদী মানুষের। গৃহযুদ্ধ বিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্য অবশ্য যথার্থ সহায়তা প্রদানের অবস্থানে নেই। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমার সরকারের বর্বরোচিত গণহত্যাসহ ভয়াবহ দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ১২ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছেন, গণহত্যা বন্ধ করতে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করার জন্য মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত। সরকারের ‘দূরতম প্রতিবেশী’ পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দুর্বল।

ফ্রন্টলাইন স্টেট : বাংলাদেশ যেমন রোহিঙ্গা সমস্যায় যথার্থভাবে আক্রান্ত, তেমনি মিয়ানমারের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া- উভয় দেশ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এসব দেশেও বেশ কিছু রোহিঙ্গা মুসলমান স্থলে ও নৌপথে আশ্রয় নিয়েছে। ইন্দোনেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর তাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার প্রমাণ দেয়। মালয়েশিয়া সরকারের বক্তৃতা-বিবৃতিও বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তৎপর। নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসসহ কয়েকজন নোবেল বিজয়ী রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে একটি যৌথ আবেদন নিরাপত্তা পরিষদে পেশ করেছেন। আরেক নোবেল বিজয়ী ডেসমন্ড টুটু অং সান সু চিকে লেখা খোলা চিঠিতে রোহিঙ্গা নিধন থেকে বিরত থাকা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। বিশে^র প্রধান প্রধান টিভি চ্যানেল ও পত্রিকাগুলো বিষয়টিকে অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রচার করছে।

বর্তমান বিশ্ব পরস্পর নির্ভরশীল। একের সমস্যা অন্যের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। প্রয়ই বলা হয়, আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বসবাস করছি; ‘ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী’। এই বাস্তবতার আলোকে রোহিঙ্গা সমস্যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, রোহিঙ্গা জনগণ বিশ্বজনমতের চাপে একদিন না একদিন সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছবে এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষে বৈশ্বিক সমীকরণ কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছবে।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫