ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

মতামত

নির্বাচন কমিশন : পথ ও পাথেয়

আবু জাফর

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:১৭


প্রিন্ট
নির্বাচন কমিশন : পথ ও পাথেয়

নির্বাচন কমিশন : পথ ও পাথেয়

দেশের রাজনীতি নিয়ে কোনোরূপ আলোচনা করা বস্তুতপক্ষেই অনেকটা দুরূহ। দুরূহ এ জন্য যে, রাজনীতির ময়দান সততই খুব কোলাহলমুখর ও কলহ-কণ্টকিত। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না, আমাদের রাজনীতি ঠিক তেমনই পক্ষ-প্রতিপক্ষের বিবদমান ঈর্ষা ও অসূয়া নিয়ে সর্বক্ষণ অশান্ত ও অবিরাম স্বরবর্ষণে তৎপর। এ অবস্থায় সর্বপ্রেমে উজ্জীবিত কোনো নির্মোহ-নিরপেক্ষ ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় কিন্তু বাস্তবে তেমন মানুষের দেখা পাওয়া খুবই অসম্ভব। আর এ কারণেই দেশব্যাপী ২০ দল ও ১৪ দল ইত্যাদি বহু দল-উপদলের এখন উদয়াস্ত ও প্রাণান্ত অনুশীলন চলছে। এর মধ্যে দলহীন নিরপেক্ষ থাকার অবকাশ খুবই সামান্য। ক্রিকেট গ্রাউন্ডে যেমন কোনো-না-কোনো পক্ষের সমর্থক না হয়ে খেলা দেখাটা আদৌ উপভোগ্য হয় না, তেমনি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত কারো-না-কারো সমর্থক না হলে নির্বাচনী আয়োজন ও ভোটযুদ্ধ সবার কাছেই অত্যন্ত ফিকে ও নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে। অতএব ইলেকশনের ময়দানে যারা একেবারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সর্বপ্রেমী বৈষ্ণব, তারাও ইলেকশনের প্রশ্নে সবাক ও অত্যুৎসাহী। এটা অন্যায় কিংবা অসমীচীন নয়? এটা বরং নির্বাচনী মাঠের একটি উপভোগ্য উপাদান। কে জয়ী হবে অথবা পরাজিত, সেটা ভবিষ্যতের গর্ভে লুক্কায়িত এক রহস্য। সেই রহস্য যখন উন্মোচিত হবে তখনই জানা যাবে নির্বাচনের খোলা মাঠে বাতাস কতটা নির্মল ছিল নাকি অসাধু তৎপরতায় ছিল দূষিত ও বিবমিষা উদ্রেককারী।

নির্বাচন হলো পণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য শর্ত। অবশ্য অনেকের মতে গণতন্ত্র খুব একটা উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা নয়। অ্যারিস্টটল বহু আগেই বলেছেন, ‘Democracy is the worst type of Govt. but there is no alternative of it’। অর্থাৎ নিকৃষ্ট বটে কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। তবে একটি কথা সত্য যে, বিকল্প থাক বা না- থাক, গণতন্ত্রের একটি কার্যকর ও ফলদায়ক উপাদান হলো নির্বাচন, যে-নির্বাচন স্বৈরাচারের হাত থেকে দেশ ও জনগণকে সাফল্যের সাথে সুরক্ষা দান করে। অতএব কোথাও যদি স্বৈরাচার প্রবল ও অপ্রতিহত হয়ে উঠতে চায়, তাহলে সেখানে প্রথম কাজ হয়ে ওঠে নির্বাচনকে নিরঙ্কুশ স্বচ্ছতার হাত থেকে কোনো-না-কোনোভাবে বিকৃত ও বিকারগ্রস্ত করে তোলা, জনগণকে দূষিত নির্বাচন মেনে নিতে বাধ্য করা। অর্থাৎ নির্বাচনকে এমনভাবে রূপদান করা যা গণতন্ত্রের নামে হয়ে ওঠে স্বৈরাচার বা একনায়কতন্ত্রের বিশ্বস্ত সহগামী ও সহচর। স্ট্যালিনের একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘It is enough that the people know there was an election. The people who cast the votes decide nothing. The people who count the votes decide everything’- ভোট দেয়া-না-দেয়া কোনো বিষয় নয়, ভোট গণনার মধ্যেই থাকে জয়পরাজয়ের আসল রহস্য। বহু দেশে এই পন্থা ও অপকৌশল নিপুণভাবে গৃহীত হয়ে থাকে, যেখানে গণতন্ত্র ও নির্বাচন জনগণের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন না-ঘটিয়ে কার্যত হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের ব্যবচ্ছেদকারী এক-একটি গর্হিত অনাকাক্সিক্ষত স্বৈরাচার। এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন শুধু নিয়োগকর্তার বশংবদ ইচ্ছানুদাসে পরিণত হয়। আমাদের নির্বাচন কমিশন ধারণা হয় এসব বিষয়ে যথোচিত অবহিত এবং তারা-যে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সর্বতোভাবে সচেষ্ট, এ নিয়ে এখনই কোনো সংশয় ও সন্দেহ পোষণ করা সমীচীন হবে না। দেশ ও জনগণের প্রতি তারা কতখানি বিশ্বস্ত ও সৎ, আপন ভূমিকায় তারা কতখানি প্রত্যয়ী ও অপক্ষপাত, সে কথা নির্ভুলভাবে বোঝার জন্য আরো কিছু দিন গত হওয়া প্রয়োজন। এই মুহূর্তে শুধু এটুকু আশা করতে চাই, বিক্ষিপ্তভাবে যে দিক থেকেই যত ঝড়ঝঞ্ঝা আসুক, নির্বাচন কমিশন সততা, সাহস ও দক্ষতা নিয়ে তা সবই মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।

ইতোমধ্যে কমিশন কর্তৃক সাত দফা সুপারিশ জনগণের সামনে পেশ করা হয়েছে। সুশীলসমাজ রাজনৈতিক দলগুলোসহ আরো অনেকের সাথে নির্বাচন কশিন প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করবে ও করছে। আশা হয়, সঠিক পথনির্দেশিকা নিশ্চয়ই সবার দৃষ্টিগোচর হবে। এবং এই আশাও হয় যে, নির্বাচন কমিশনের কোনো প্রচেষ্টা ও তৎপরতাই একেবারে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে না; নিশ্চয়ই দেশ একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার পাবে। বলা আবশ্যক, নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো একটি অতীব গুরুদায়িত্ব স্কন্ধে নিয়ে জাতির সামনে নির্বাচন কমিশনের অবতরণ। কমিশনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং বলা উচিত- সংবিধানপ্রদত্ত পর্যাপ্ত ক্ষমতা সত্ত্বেও অত্যধিক সঙ্কটাপন্ন। বিশেষ করে চিন্তায় ও আদর্শে বহুধাবিভক্ত এই দেশে সঙ্কট শুধু গভীর নয়, রীতিমতো স্থায়ী ও বহুমুখী যা প্রশমিত করে একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সফল আয়োজন বস্তুতপক্ষেই একটি বিরাট যুদ্ধজয়ের মতো ব্যাপার!

অনুমান করি, মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করি- নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই জ্ঞাতসারে কোনো অন্যায্য পথ অবলম্বন করবে না; পূর্ণ সতর্কতার সাথে কমিশন বিবেকসম্মত সরল পথের ওপরই অবিচল দৃঢ়তা নিয়ে দণ্ডায়মান থাকবে। এ এক প্রচণ্ড গুরুভার ও কঠিন অগ্নিপরীক্ষা! তবে এটুকু মনে রাখলে যথাযথ হবে- ইনসাফ, সাহস ও সত্যনিষ্ঠা থাকলে যত বড় গুরুভারই হোক, সাফল্যের সাথে বহন করা অসম্ভব হবে না।

সবশেষে উল্লেখ করি, নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রধানত দু’টি বিষয় গুরুতর বাধা হয়ে বিরাজমান। প্রথমত, ইচ্ছা ও আদর্শের প্রশ্নে বহুধাবিভক্ত জনগণের মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য সৃষ্টি করা এবং দ্বিতীয়ত, ইলেকশন যেহেতু প্রাণান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপার, নির্বাচন সহিংস রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। ভোট একটি যুদ্ধই বটে। আর যেহেতু ‘ঘড়ঃযরহম ৎিড়হম রহ ধিৎ’ যুদ্ধে কোনো পাপ নেই- বিচারবোধ বিবেকদংশন নীতিবোধ কোনো কাজই করে না; প্রতিপক্ষকে জ্ঞাত-অজ্ঞাত যেকোনো কৌশলে পরাভূত করাই একমাত্র লক্ষ্য; অনেকটা মল্লবীরদের মতো প্রাণসংশয়ী মুহুর্মুহু শাণিত আক্রমণই এই লড়াইয়ের সার্বক্ষণিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং লড়াইয়ের ফলাফল নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে বিজয়ীর উল্লাস ও ভূলুণ্ঠিত প্রতিপক্ষের নিশ্চিত পরাভবে। অতএব অর্থ ও পেশিশক্তি হয়ে ওঠে যুদ্ধজয়ের অপ্রতিরোধ্য হাতিয়ার। এবং কার্যত ভোট হয়ে পড়ে অনৈতিক শক্তির মাধ্যমে আচ্ছন্ন ও অধিকৃত একটি জবরদস্তি, যা পুরো নির্বাচনকে রীতিমতো ট্র্যাজিক মেলোড্রামায় পরিণত করে। কার্যত ফলাফল আর জনগণের অনুকূলে থাকে না; আর জনগণও ফলাফলকে ভালো চোখে দেখে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে কিন্তু অনৈতিক পরাক্রম যদি গোপনে-প্রকাশ্যে সব কিছু ছাপিয়ে ওঠে, তবে তা সব ইতিবাচক কার্যক্রমকে করে দিতে পারে অসার ও ম্লান। সবার মনে একই প্রশ্ন- এই দ্বিবিধ সঙ্কটকে কমিশন তার বুদ্ধি, মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে কিভাবে কতটা সামাল দিতে পারে, সেটাই দেখার বিষয়।

অনেকের অনেক সুপারিশ আছে, পরামর্শও আছে; কশিমন অবশ্যই বিবেচনা করে দেখবে- কোনটা সঠিক ও আন্তরিক, আর কোনটা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মতলবি। তবে এই প্রশ্ন তো থেকেই যায়, অন্তত সরকারবিরোধীদের কাছে, নির্বাচন কমিশন স্বেচ্ছায়-অনিচ্ছায় ক্ষমতাসীনদের বশংবদ ক্রীড়নকে পরিণত হবে না তো! খুবই সাধারণ বুদ্ধির কথা, সিংহাসন হারানো রীতিমতো পুত্রশোকের মতোই মর্মদ্রোহী। অতএব কমিশন কি পারবে ক্ষমতাসীনদের প্রদত্ত লোভ ও ভয়কে (যদি তেমন কিছু থাকে) অক্লেশে উপেক্ষা করতে! জনগণ কী চায়? জনগণ চায় এক অপ্রতিহত দৃঢ়তা নিয়ে কমিশন আপন লক্ষ্যে স্থির ও আত্মনিবিষ্ট থাকুক। নিরপেক্ষতা রক্ষার কোনো অবকাশ নেই। নিরপেক্ষতাও বহু সময়ই চালাকির ছদ্মবেশ। চতুর প্রকৃতির মানুষ প্রয়োজনবোধে এ ছদ্মবেশ গ্রহণ করে। এবং এ জন্যই দান্তে যথার্থই বলেছেন, ‘The hottest places in hell are reserved for those who in time of great moral crisis maintain their neutrality’ Daute (Divine comedy : Inferno)। বড় কঠিন অবস্থা! নিরপেক্ষতা রক্ষা করাও পাপ না-করাও পাপ। এ অবস্থায় সমস্যা উত্তরণের একটিই মাত্র পথ- আল্লাহর ভয় এবং আখেরাতের জবাবদিহিতা। কিন্তু সঙ্কট উত্তরণের এই শাশ্বত অব্যর্থ হেদায়াত কি আদৌ এতটুকু মূল্য পাবে। পেলে ভালো, না পেলেও ভালো; কারণ অন্ধকার আরো ঘন হয়ে একদিন নিশ্চয়ই প্রস্ফুটিত আলোর বার্তা বয়ে আনবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, গীতিকার ও কলামিস্ট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫