ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

মতামত

ভূকৌশলগত ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট

ইমরান আনসারী

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:০৬ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৩


প্রিন্ট
ভূকৌশলগত ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট

ভূকৌশলগত ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট

চীন-ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থের বলী হচ্ছেন মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি মিয়ানমার ইস্যুতে দেশ দু’টির ভূমিকা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুসন্ধিৎসু মনকে আন্দোলিত করেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিয়ানমার সফর এবং জাতিসঙ্ঘে চীনের রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থান ও মিয়ানমার সরকারের প্রতি চীনের সহানুভূতিপূর্ণ বিবৃতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন চিন্তার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাজে-অকাজে জমি জবরদখলের পুরাতন অভ্যাসও এ ক্ষেত্রে কম দায়ী নয়।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার ইতিহাস নতুন নয়। অন্তত ১৯৪২ থেকেই এ বঞ্চনার শুরু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে ১৯৪২ সালে জাপানিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে মিয়ানমার দখল করে নেয়। স্থানীয় রাখাইনরা এ সময় জাপানিদের পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগণকে আক্রমণ করে। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রাখাইন অধ্যুষিত মিমবিয়া ও ম্রোহাং টাউনশিপে প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে রাখাইনরা। সেই থেকে উচ্ছেদ, হত্যা, নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি আসে ১৯৮২ সালের ১৫ অক্টোবর। এদিনে দেশটির ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে স্বীকার করা হলেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করে নে উইনের সামরিক সরকার।

সেই থেকে তাদের নির্যাতন ও বঞ্চনার নতুন ধাপ শুরু হয়। এর পর থেকে নানা পর্যায়ে দেশান্তরিত হতে থাকেন অসংখ্য রোহিঙ্গা। ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশ, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এত দিন রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও গণহত্যার বিষয়টি বিবেচনা করা হতো একভাবে। কিন্তু বর্তমানে এ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কারণ ভূকৌশলগতভাবে অঞ্চলটি পরাশক্তি চীন ও আঞ্চলিক শক্তি ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এ ছাড়াও চীনকে টেক্কা দেয়ার জন্য এ অঞ্চলে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্নমুখী কর্মতৎপরতা চলছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার মিয়ানমার সফরের মধ্য দিয়ে এ তৎপরতায় গতি পায়।

এ কথা সত্যি যে, মুসলিম নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী হওয়ার কারণেই তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাটা বেশি। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকটিও এ ক্ষেত্রে কম গুরুত্ব বহন করে না।
ভূমি অধিগ্রহণ নীতি

১৯৯০ সাল থেকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী উন্নয়নের নামে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিগ্রহণের দিকে নজর দেয়। তবে এর বিনিময়ে তাদের দেয়া হয়নি কোনো ভূমি কিংবা নগদ অর্থ। উন্নয়নের নামে সেনাবাহিনীর ভূমি অধিগ্রহণ একটি মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম আর সেনাবাহিনীর নির্যাতন এসব এলাকার মানুষদের প্রতিবাদী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে কমই। ১৯৯০ সালের পর প্রায়ই দেখা যায় সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ কিংবা ব্যাপক কৃষিভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এসব ভূমি দখল করে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাচিন অঙ্গরাজ্যে স্বর্ণের খনির নামে ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

আর এ উন্নয়ন এসব অঞ্চলের মানুষদের বাধ্যতামূলক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে। তারা বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে আশ্রয় নেয়। আবার কেউ কেউ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের নামে কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে অবাধ তথ্যপ্রবাহের সীমাবদ্ধতার কারণে তা নিরূপণ করা অত্যন্ত দুরূহ। অন্য দিকে, সামরিক সরকারের অর্থনৈতিক ব্যয় মেটাতে ২০১১ সাল থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করে দেশটি। সেই থেকে চীন-ভারতসহ বিশ্বের বড় বড় করপোরেট হাউজের দৃষ্টি পড়ে মিয়ানমারের দিকে। বিশেষ করে পশ্চিমে সমুদ্রতীরসংলগ্ন রাখাইন প্রদেশের ওপর।

পাশাপাশি ২০১২ সাল থেকে থেমে থেমে নতুন করে হামলা শুরু হয় রোহিঙ্গাদের ওপর, যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে বিদেশীদের জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে। এর পরপরই দক্ষিণ কোরিয়ার সর্ববৃহৎ কোম্পানি ‘দাইয়ো’ রাখাইন অঞ্চলে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ কোম্পানি জাতিসঙ্ঘের বিগত মহাসচিব বান কি মুনের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বলে একটি কথা জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে চালু ছিল। এ নিয়ে মুন কয়েক দফা সাংবাদিকদের জেরার মুখে পড়েন। তখন সাংবাদিকেরা বলাবলি করতে থাকেন, মহাসচিবের ব্যক্তিস্বার্থেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চি সরকারের বিরুদ্ধে কিছুই করবেন না তিনি। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশনও বাতিল করে দিয়েছিলেন সাবেক মহাসচিব।

ভূকৌশলগত ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট
মিয়ানমারের ভূকৌশলত অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দীর্ঘ দিন ধরেই দৃষ্টি চীন ও ভারতের। ১৯৯০ সাল থেকে চীনের বিভিন্ন কোম্পানি মিয়ানমারের উত্তরের প্রদেশ শান থেকে কাঠ, নদীর পানি ও খনিজসম্পদ নিয়ে নিচ্ছে। আর এ শোষণ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সঙ্ঘাতকে উসকে দেয়। গঠিত হয় কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট অর্গানাইজেশন ( কেআইও)।

রাখাইন প্রদেশে চীন ও ভারতের স্বার্থ অনেকটাই চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। আর চীন ভারতের স্বার্থ আবর্তিত হচ্ছে এতদঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও পাইপলাইন স্থাপনকে কেন্দ্র করে। এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ট্রানজিট থেকে আয় এবং গ্যাসক্ষেত্র থেকে মুনাফার নিশ্চয়তা দেবে বলে মনে করে সরকার।

এরই অংশ হিসেবে চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ২০১৩ সালে রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিত্তুই থেকে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত একটি বহুজাতিক পাইপলাইন তৈরির কাজ শুরু করে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তেল ও গ্যাস মিয়ানমারের সোই গ্যাসফিল্ড থেকে চীনের গুয়াংজুতে স্থানান্তরিত করা। প্রায় সমান্তরালভাবে আরেকটি পাইপলাইন রাখাইনের কাউকপিয়া পোর্ট থেকে চীনের দিকে যাবে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সাগরপথে আমদানি করা তেল কাউকপিয়া পোর্টে মজুদ করা হবে। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই আমদানি করা তেল চীনে নিয়ে যাওয়া হবে। কাউকপিয়া পোর্ট হচ্ছে পশ্চিম মিয়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিটি ও বন্দর।

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নীতিমালায় অবকাঠামো উন্নয়নের যে রোডম্যাপ রয়েছে তাতে চীনের ৮৫ শতাংশ আমদানি এই বন্দরের মাধ্যমেই শেষ করতে চায় দেশটি- সম্প্রতি এমন একটি সংবাদ বেরিয়েছে রয়টার্সে। তবে এ ধরনের প্রকল্পের দরুণ স্থানীয় জনগণের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করে দিয়েছে রাখাইন অঙ্গরাজ্যের অ্যাডভাইজরি কমিশন। এতদঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনধারা হুমকির মুখে পড়বে বলেও মনে করে কমিশন। আরো মনে করে, এ ধরনের প্রকল্প স্থানীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। কারণ এতে বিপুল ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে, যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে, তদপুরি পরিবেশের ওপর পড়বে বিরূপ প্রভাব। এ ছাড়া এ ধরনের প্রকল্পে স্থানীয় শ্রমিকদের চেয়ে বিদেশী শ্রমিকেরাই বেশি কাজ পাবেন, ফলে স্থানীয় অসন্তোষ দানা বাঁধবে।

অনুরূপভাবে রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিত্তুই গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন এবং অর্থনৈতিক সহায়তা করছে ভারত। ভারতের এ প্রকল্পটি হচ্ছে কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের অংশ। এর লক্ষ্য হচ্ছে ভারতের উত্তর-পূর্বের মিজোরাম অঙ্গরাজ্যকে বঙ্গোপসাগরের সাথে সংযুক্ত করা।

চীন ও ভারতের এ ধরনের বড় বড় প্রকল্প সমুদ্রসংলগ্ন রাখাইন প্রদেশের কৌশলগত গুরুত্বের স্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছে। আর এ জন্যই মিয়ানমার সরকার তার ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করতে ভূমি থেকে জনগণকে উচ্ছেদ করার বিভিন্ন পাঁয়তারা করছিল, যাতে বিনা বাধায় জমিগুলো ব্যবহার করা যায়। এরই অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হয়ে গেছে স্মরণকালের ভয়াবহ নির্যাতন ও হামলা। জীবন বাঁচাতে তাই বাংলাদেশে আজ শরণার্থীর ভিড় এবং মানবতার হাহাকার।


উদীয়মান ওই দুই পরাশক্তির বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বলি আজ হাজারো রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মিয়ানমার সরকারের এ ভূমি দখলনীতি অচিরেই দেশটিকে একটি ‘ভঙ্গুর রাষ্ট্রে’ পরিণত করবে।

লেখক : নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
ই-মেইল : mran.ansary@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫