ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

আলোচনা

রোহিঙ্গাদের আরাকান ও বাংলা সাহিত্য

ড. ফজলুল হক সৈকত

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৩০


প্রিন্ট

কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পূরী
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী ॥
তাহাতে মগধ বংশক্রমে যুদ্ধাচার
নাম শ্রী থুধম্মা রাজা ধন অবতার ॥
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।
দেব গুরু পুজ এ ধর্মেতে তান মন
সে পদ দর্শনে হএ পাপের মোচন ॥
পুণ্যফলে দেখে যদি রাজার চরণ
নারকীও স্বর্গ পাএ সাফল্য জীবন ॥
- দৌলত কাজী, সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী

আরাকান মিয়ানমারের (বার্মা) একটি অঙ্গরাজ্য। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত এবং অতি প্রাচীনকাল থেকে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বঙ্গোপসাগর এবং নাফ নদীর দক্ষিণ-পশ্চিম মোহনা-বেষ্টিত আরাকান-ইয়োমা নামের দীর্ঘ পর্বতশৃঙ্গ আরাকানকে মিয়ানমারের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করেছে। আরাকানের প্রাচীন নাম ‘রাখাইনপিয়ে’ এবং ‘রখইঙ্গ’। ‘রখইঙ্গ’ বা ‘রাখাইন’ কথাটির আরাকানি অর্থ রাক্ষস বা দৈত্য। আর এ কারণেই দেশটিকে বলা হয় রাক্ষসভূমি বা ‘রখইঙ্গ তঙ্গী’। এই রখইঙ্গ থেকেই উৎপত্তি হয়েছে ‘রোসাঙ্গ’ শব্দটি। রোসাঙ্গ-এর আঞ্চলিক উচ্চারণ রোহাঙ্গ। আর যারা রোহাঙ্গে বসবাস করে, তারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্ম প্রচারের আগে অধিকাংশ আরাকানি ছিল প্রকৃতি-পূজক। আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্য বিকাশের কথা ভাবাই যায় না। মগরাজ্য আরাকানকে ‘রোসাং’ বা ‘রোসাঙ্গ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে বাংলা সাহিত্যে।
মগরাজারা প্রতিভাবান মুসলমানদের প্রতিভা মূল্যায়নের মাধ্যমে নিজেদের রাজকার্যের গতিশীলতা, জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতার পরিধি প্রসারের লক্ষ্যে সহজভাবেই গ্রহণ করেছিলেন মুসলমান প্রভাবকে। তাই তাদের সভাসদবর্গও বাঙালি মুসলমান কবিদের বাংলা সাহিত্য চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল উদারভাবে। মগরাজ্যে বাংলা সাহিত্যে দু’টি বিশেষ ধারা ছিল লক্ষণীয় বিষয়Ñ এর একটি হচ্ছে ধর্মীয় বিষয় অবলম্বনে রচিত সাহিত্য, অপরটি ধর্মনিরপেক্ষ ধারার রোমান্টিক প্রণয়কাব্য বা প্রণয়োপাখ্যান। সে সময় ইসলাম ধর্মের ব্যাপক সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপট ও এর উপলব্ধির কারণসমূহ ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এক ধরনের ধর্মীয় কাব্য রচিত ও প্রসার লাভ করেছিল বাঙালি মুসলিম কবিদের হাতে। অন্য দিকে সামাজিক মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদন, প্রেম-ভালোবাসা, প্রণয়গাঁথা তথা মানবিক প্রণয়ের মর্মস্পর্শী কাহিনী বর্ণিত রোমান্টিক প্রণয়কাব্য। এ ধারায় আবার আধ্যাত্মিকতার অনুপ্রবেশ ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশেষ করে হিন্দি ভাষায় রচিত প্রণয় কাব্যসমূহ সুফি মতবাদের প্রভাব পুষ্ট হয়ে তাতে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া আছে বলেই অনুভূত হয়।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্য যখন ছিল শুধুই দেবদেবীনির্ভর, সামাজিক রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক মানুষের কথা যখন সাহিত্যের উপকরণ হিসেবে ভাবা ছিল প্রায় অকল্পনীয়, সে সময়ে আরাকানে আশ্রিত বাঙালি মুসলমান কবিরা রাজা এবং তাদের সভাসদবর্গের সহায়তায় বাংলা সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। অর্থাৎ কয়েকজন বাঙালি মুসলমান কবি তাদের মেধা, মনন, চিন্তাশক্তি, অভিজ্ঞতার সাথে সামাজিক মানুষের জীবন কাহিনীর নানা দিকের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কাব্যের কাহিনী বিনির্মাণ করেন। দেশের বাইরে সুদূর আরাকানে বৌদ্ধ রাজাদের সভায় বাংলা সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত হয়ে তাদের নির্দেশে সাহিত্য রচনা করেও তাতে চিরাচরিত প্রথা ভেঙে বাংলা সাহিত্যে মানবিক প্রণয়কাহিনী রচনার মাধ্যমে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নবদিগন্তের সূচনা করেন।
মোগল আমলে মোগল সাম্রাজ্যের বাইরে অবস্থিত দু’টি স্বাধীন প্রত্যন্ত-প্রাদেশিক রাজ্যে বাংলা সাহিত্যের বিশেষ চর্চা হয়। এ দু’টি রাজ্যের নাম রোসাঙ্গ ও ত্রিপুরা। রাজ্য দু’টি মোগল আমলের শেষ পর্যন্ত স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখলেও মোগল যুগের সাংস্কৃতিক প্রভাবে ভরপুর ছিল। এই দুই রাজ্যে এখনকার মতো বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানের সংখ্যা ছিল অনেক। কতকটা যুগ ধর্মের প্রভাবে এবং কিছুটা বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যার কারণে রাজ্য দু’টিতে ফারসি ও বাংলা ভাষার প্রভাব ছিল। এই দুই রাজ্যের মুসলিম বাংলা সাহিত্য চর্চা এতই ব্যাপক ও মূল্যবান যে, মোগল আমলের মুসলিম বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে রোসাঙ্গ ও ত্রিপুরার কথা কিছুতেই বাদ দেয়া যায় না। মুঘলেরা বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্য চর্চার জন্য সরাসরি যা করেননি রোসাঙ্গ ও ত্রিপুরার রাজাগণ তা করেছিলেন। মোগল আমলে আরাকান রাজ্যের সীমা নির্ণয় কঠিন। সময় সময় হাত বদলালেও সমগ্র চট্টগ্রামের অধিকাংশ স্থান, বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী ভূভাগ, মোগল যুগের শেষ দিক পর্যন্ত রোসাংগ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমগ্র চট্টগ্রামে এখনও যে মঘী সন প্রচলিত তা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় চট্টগ্রামে আরাকানি প্রভাব কত গভীর। এখনো আরাকানের মুসলমানেরা বাংলা ও বর্মি এই দুই ভাষায় সমান পারদর্শী।
রোহিঙ্গা একটি জাতির নাম। সুলতানি আমলে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে এই রোসাঙ্গ রাজসভার ব্যাপক প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। আরাকান রাজসভার সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় মহাকবি আলাওল তার সাহিত্য সাধনা করেছেন। মৌলিক রচনা এবং বিশেষত অনুবাদ সাহিত্যে আরাকানের কবিদের অনন্য অবদানের কথা আমাদের জানা।
সুলতানি আমলে মুসলমান শাসকরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসেন। বাংলা সাহিত্যের কাহিনীকাব্য বা রোমান্টিক কাব্যধারার প্রবর্তনে তাদের বড় অবদান লক্ষ করা যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বৌদ্ধ-হিন্দু রচিত বাংলা সাহিত্যে যেখানে দেবদেবীরা প্রধান এবং মানুষ অপ্রধান সেখানে মুসলমান রচিত সাহিত্যে মানুষ প্রাধান্য পেয়েছে। কাহিনীকাব্য ও ধর্মীয় সাহিত্যের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির সমন্বয়মূলক সাহিত্যও রচনা করেছেন মুসলমান কবিরা; এমনকি চৌতিশা, জ্যোতিষ ও সঙ্গীতশাস্ত্রীয় কাব্যও তারা রচনা করেছেন।
মধ্যযুগের শেষভাগে বঙ্গদেশের সীমান্তবর্তী স্বাধীন ও অর্ধস্বাধীন রাজাদের রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য চর্চা হয়। উত্তরবঙ্গের কামাক্ষা-কামরূপের (অর্থাৎ কোচ রাজবংশের) রাজসভা, পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা ও আরাকানের (রোসাঙ্গ) রাজসভায় বাংলা ভাষায় বিবিধ কাব্যধারার সৃষ্টি হয়। রোসাঙ্গ রাজসভার সাহিত্য আরাকানি ধারা নামে পরিচিত। ১৪৩০ সালে গৌড় করদ রাজ্যে পরিণত হওয়ার পর থেকে ১৬৪৫ পর্যন্ত ২০০ বছরেরও বেশি সময় আরাকানি রাজারা বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি ধারায় প্রভাবিত ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। সেখানকার বাংলাভাষী সভাসদ ও বিদ্বৎসমাজেরও অবদান ছিল। আরাকান রাজসভাতেই বাংলা ভাষায় প্রথম মানবীয় প্রণয়কাব্য রচিত হয়। আরাকান রাজসভার উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় যারা কাব্যচর্চা করেন তাদের মধ্যে দৌলত কাজী (আনুমানিক ১৬০০-১৬৩৮) প্রাচীনতম। তার সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী প্রথম মানবীয় প্রণয়োপাখ্যান। তিনি এ কাব্যের রচনা শেষ করে যেতে পারেননি। শেষ করেন মহাকবি আলাওল (আনুমানিক ১৬০৭-১৬৮০)। বাঙালি পুনর্জাগরণে কিংবা চেতনা বিকাশে দৌলত কাজী অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলা কাব্যে ধর্মনিরপেক্ষ প্রণয়কাহিনীর পথিকৃৎ।
দৌলত কাজী অল্প বয়সে নানানশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। নিজের জন্মস্থান চট্টগ্রামে স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তিনি আরাকানে ভাগ্য অন্বেষণে যান। সে সময়ে চট্টগ্রামবাসী জীবিকা অর্জনের জন্য আরাকানে যেত। আরাকান রাজসভায় তখন বহু কবি এবং জ্ঞানী লোকের ভিড় ছিল। রাজার প্রধান উজির আশরাফ খান একদিন হিন্দি ভাষার কবি মিয়া সাধন রচিত ‘সতী ময়না’ কাহিনী শুনতে চান। দৌলত কাজী পাঞ্চালীর ছন্দে সতী ময়নার কাহিনী বর্ণনা করে সবার প্রশংসা অর্জন করেন এবং আরাকান (রোসাঙ্গ) রাজ দরবারে স্বীকৃতি ও মর্যাদা লাভ করেন। দৌলত কাজী ও আশরাফ খান সুফি মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আশরাফ খানের আগ্রহে কবি সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী কাব্য রচনা করেন। মিয়া সাধন নামক একজন মুসলিম কবির গ্রাম্য হিন্দি ভাষায় লেখা মৈনাসত নামক কাব্যই ছিল কবি দৌলত কাজীর সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী কাব্য রচনার আদর্শ। দৌলত কাজী এবং আলাওল হিন্দু শাস্ত্র ও সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন।
রোসাঙ্গ রাজের যেসব মুসলমান সভাসদ বাংলা ভাষা-সাহিত্যচর্চায় স্বজাতীয় কবিকে নিয়োজিত করে মাতৃভাষার শ্রীবৃদ্ধি করেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন শ্রী সুধর্ম রাজার সমর সচিব আশরাফ খান (১৬২২-১৬৩৮)। এ সময় আরো একজন মুসলিম কবির নাম পাওয়া যায়, তার নাম মরদন। তার কাব্যের নাম নসীরা নামা। শ্রী সুধর্ম রাজার পরে রাজা হলেন নৃপগিরি (১৬৩৮-১৬৪৫)। নৃপগিরির শাসনামলের সাত বছর আরাকানে রাষ্ট্রবিপ্লব ও গৃহ-বিবাদ চলতে থাকে। ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভূ-ভাগ আরাকান রাজের হস্তচ্যুত হয়। দেশের এই অরাজকতা ও অশান্তির সময় সাহিত্যচর্চা অব্যাহত ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু পরবর্তী সাদ উমাদারের রাজত্বকালে (১৬৪৫-১৬৫২) তার মুখপাত্র প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের সহযোগিতায় মহাকবি আলাওল তার অমর কাব্য পদ্মাবতী রচনা করেন। আলাওলের এই অনুবাদের মৌলিকতা বাংলা সাহিত্যের সমালোচক মহলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা আজও অতুলনীয়। এ ছাড়া ওই কাহিনীতে সুখ পাখির ভূমিকার কথাও কোনো পাঠক ভুলতে পারে না। আলাওল বিভিন্ন ভাষায় এবং কলা ও বিদ্যায় সুপণ্ডিত ছিলেন। সমকালে এবং উত্তরকালে তাঁর সমকক্ষ সাহিত্যিকের সন্ধান পাওয়া কঠিন। উপদেশমূলক কাব্যগ্রন্থ তোহফা মহাকবি আলাওলের একটি অন্যতম বিখ্যাত রচনা। ১৬৬৩-৬৪ খ্রিষ্টাব্দে কবি মুহম্মদ সোলায়মানের আদেশে এটি অনুবাদ করেন। মাগন ঠাকুর নিজেও একজন কবি ছিলেন। তিনি কোরেশ বংশ-সম্ভূত মুসলমান ছিলেন। তিনি চন্দ্রাবতী নামে কাব্য রচনা করেন। সাদ উমাদারের মৃত্যুর পর তৎপুত্র চন্দ্রসুধর্ম (১৬৫২-১৬৮৪) রোসাঙ্গের রাজা হলেন। মাগন ঠাকুরের মৃত্যুর পর সোলেমান নামক ওপর একজন মুসলমান চন্দ্র সুধর্মের প্রধানমন্ত্রী হলেন। এ সময় সয়্যিদ মুহাম্মদ চন্দ্র সুধর্মের সমর সচিব ছিলেন। মহাকবি আলাওল তারই আদেশে সপ্তপয়কর কাব্য রচনা করেন। এ সময় মজলিস নামক অপর এক ব্যক্তি চন্দ্র সুধর্মের রাজ সভার নবরাজ মজলিস নামে পরিচিত ছিলেন। আলাওল তার আদেশেই সিকান্দার নামার পদ্যানুবাদ করেন। চন্দ্র সুধর্মের আরেক মন্ত্রী সয়্যিদ মুসার আদেশে সয়ফুলমূলক রচনা করেছিলেন। এভাবে আরাকানে যে সাহিত্য চর্চা চলতে থাকে, আলাওলের মৃত্যুর পরও তা বিলুপ্ত হয়নি। আলাওলের অধ্যাত্ম উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আবদুল করিম খন্দকার ১৭০৫ খ্রিষ্টাব্দ দুল্লা মজলিস নামে একখানা বিপুল আকৃতির কাব্য রচনা করেন। মূলত আরাকান বাংলা সাহিত্যের এক স্বর্ণালী অধ্যায়।
অবিভক্ত ভারতে মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আরাকানের ব্যাপারে (রাখাইন রাজ্য) সঠিক ভূমিকা গ্রহণ করলে আজ রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ভিন্ন রকম হতে পারত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আরাকান মিয়ানামার থেকে আলাদা হতে চেয়েছিল। কারণ ঐতিহাসিকভাবে আরাকান মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল না। বার্মিজরা এক সময়ের স্বাধীন আরাকান দখলে নেয়। ব্রিটিশ উপনিবেশে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পূর্ব-পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সাথে একীভূত হতেও মত দেয় আরাকান নেতৃত্ব। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে ১৯৪৬ সালে ‘আরাকান মুসলিম লীগ’ গঠন করে তারা। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাখাইনের মুসলিম নেতাদের কোনো গুরুত্বই দেননি। তিনি তাদের বলেছিলেন- ‘তোমাদের নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নতুন ঝামেলা সৃষ্টি করতে চাই না, বার্মা আলাদা রাষ্ট্র। এতে ভারত-পাকিস্তান আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হবে।’ অথচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে একসময় আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল। আরাকান ও বাংলার মাঝে তখন কোনো আন্তর্জাতিক সীমারেখা ছিল না। ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণেই মূলত রোহিঙ্গা মুসলমানরা, ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের আবহে নিপতিত হয়েছে। সেই সময়ে আরাকান পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হলে হয়তো এ অঞ্চল আজ বাংলাদেশের অঙ্গীভূত হতে পারত। আর এমনটি হলে এক দিকে যেমন রোহিঙ্গারা পেত নিরাপদ আবাসভূমি, অন্য দিকে বাংলা সাহিত্যেও যুক্ত হতো ভিন্নতর এবং নতুন নতুন প্রবাহ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫