ঢাকা, শুক্রবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপমহাদেশ

ভারতীয় স্বার্থে যেভাবে নিজেকে বলী দিলো ভুটান

আসিফ হাসান

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:০৬


প্রিন্ট
ভারতীয় স্বার্থে যেভাবে নিজেকে বলী দিলো ভুটান

ভারতীয় স্বার্থে যেভাবে নিজেকে বলী দিলো ভুটান

মিটে গেছে দোকলাম সঙ্কট। কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, পুরো দুনিয়ার নজর ছিল ভারত-ভুটান-চীন সীমান্তে থাকা ছোট্ট মালভূমি দোকলামের ওপর। যেকোনো সময় প্রবল যুদ্ধও বেধে যেতে পারত দুই দেশের মধ্যে; কিন্তু হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবেই মিটে গেছে। দুই দেশই তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আবার ‘সুখে-শান্তিতে’ বসবাস করতে শুরু করে দিয়েছে চীন ও ভারত।


এখন নানা কূটনৈতিক সাফল্যের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। চীন ও ভারত নিজ নিজ কৃতিত্ব সজোরে প্রচার করছে। কেউ আর ভুটানের কথা তুলছেই না। পুরোপুরি চাপা পড়ে গেছে ভুটান। অথচ শুরু থেকেই ভারত ও চীনা ভাষ্যে ভারাক্রান্ত থাকলেও অনেকটা নীরব ও দৃঢ়প্রত্যয়ী ভুটান চূড়ান্ত সমাধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বক্তব্য দিয়েছে। এটাও পরিষ্কারভাবে এখানে উল্লেখ করা দরকার, ক্ষুদ্র ভুটানকে রক্ষা করার জন্য ভারত এগিয়ে এসেছে বলে জনপ্রিয় যে ভাষ্য দেয়া হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। দোকলাম সঙ্কটে ভারতের নিরাপত্তাই ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, বিশেষ করে তাদের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন নেক’ (মুরগির গলা?) হয়ে পড়েছিল নাজুক। অত্যন্ত সরু এই অংশটি বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারত চীন। সেই আশঙ্কা থেকেই ভারত সামরিক শক্তি প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকেছিল।


অথচ এই দোকলাম থেকে ভুটান অনেকভাবে লাভবান হতে পারত। বিশেষ করে চীনের কাছ থেকে তার অনেক কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। চীন ১৯৯০-এর দশক থেকে ‘প্যাকেজ চুক্তির’ কথা বলছে। বিতর্কিত এবং অপেক্ষাকৃত ছোট দোকলাম মালভূমির বিনিময়ে মধ্য ভুটানে বিতর্কিত তবে আরো বড় ভূখণ্ড ভুটানকে দিতে দেয়ার প্রস্তাব করেছে বিন। ১৯৯৬ সাল নাগাদ ব্যাপকভিত্তিক পন্থায় বারবার চীনা প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। এই প্রস্তাব মেনে নেয়ার মানে হলো, ভুটানের সামনে ভূমি নিয়ে বিরোধের অবসান হওয়া ছাড়াও চীনের ‘শুভেচ্ছা’ লাভ। চীনের আনুকূল্য লাভের জন্য এখন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো দেশও লালায়িত।
ভুটানের ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে দোকলামের কোনো কৌশলগত মূল্য নেই, এর কোনো অর্থনৈতিক দামও নেই। বেশির ভাগ সময়ই স্থানটি বরফে ঢাকা থাকে, এখানে কিছুই জন্মায় না।


ভুটানের জাতীয় পরিষদে ১৯৭০-এর দশক থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোতে দেখা যায়, চীনের সাথে অমীমাংসিত সীমানা নিয়ে অনিশ্চয়তার বাতাবরণ সৃষ্টি ছাড়াও ভুটান মারাত্মক যন্ত্রণায় ভুগছে। ভুটানের গণতন্ত্র-পূর্ব জাতীয় পরিষদ মনে করেছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উচিত রাখালদের মাধ্যমে, অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ বা পশু চরানোর মাধ্যমে চীনের ভূমি দখলের ব্যাপারে চীনের কাছে অভিযোগ দাখিল করা। চীনের সাথে সীমান্ত ইস্যুটি নিষ্পত্তির ব্যাপারে এসব প্রতিনিধির বারবার ও দৃঢ় আহ্বান ছিল।
এসব আহ্বানের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে প্রধানত দোকলাম নিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে চীনের উদারভাবে দেয়া প্যাকেজ চুক্তিটি বাতিল করে দেয়।


অনেক ভারতীয় জানে না, প্যাকেজ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যানের পরপরই ভুটানকে বড় ধরনের মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। তখন থেকেই চীন সীমান্ত এলাকায় উল্লেখযোগ্য দৃঢ়তা ও সক্রিয়তা প্রদর্শন করে রাস্তা নির্মাণকাজ হাতে নেয়। তারা এমনকি ঐতিহ্যবাহী ভুটানি এলাকাগুলোও দখল করতে নিতে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে।


জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে জাতীয় পরিষদের ২০০৫ সালের অধিবেশনে ভুটান সরকার প্রকাশ করে, চীন ভুটানমুখী ছয়টি রাস্তা নির্মাণ করছে। এগুলোর চারটি ইতোমধ্যে ভুটানি ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুটান স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানায় এবং অনেকটা ঢুকে পড়ার পর চীন রাস্তা নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে সম্মত হয়।


এ ধরনের সড়ক নির্মাণের একটি উদাহরণ হলো ফুতেগঞ্জ প্রান্ত। এই এলাকাটি সব সময় ভুটানের ছিল। কিন্তু রাস্তা নির্মাণের পর চীন ওই এলাকায় সড়কটির কথা উল্লেখ করে আর সীমান্ত আলোচনায় ওই এলাকাটি ছাড় দিতে নারাজ।
ভুটানকে আরো অনেকভাবে মূল্য দিতে হচ্ছে। আলোচনার কৌশল হিসেবে ভুটানের বিশাল এলাকার ওপর তাদের দাবি উত্থাপন করেছে। এমনকি যেসব এলাকা দীর্ঘ দিন ধরে ভুটানের বলে স্বীকৃত এবং ১৯৫৮ সালে চীনা নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের মাধ্যমে নেহরু ভুটান সফর করেন তখনো তা ভুটানি এলাকা বলে স্বীকৃতি পেয়েছিল, সেখানেও চীনা দাবি উত্থাপিত হয়। চীন এসব দাবি করেছে দোকলাম এলাকা যাতে ভুটান তাদের দিয়ে দেয়।


সাম্প্রতিক অচলাবস্থাটি ভুটানের জন্য ছিল একটি সুযোগ। চীনা শক্তির সামনে ভুটান তার হাত ধুয়ে ফেলে ভারতের কাছে তার অসহায়ত্বের কথা জানাতে পারত। অবশ্য ভুটান আবারো দৃঢ়ভাবে ভারতের পাশে দাঁড়ায়Ñ রাজনৈতিকভাবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির মাধ্যমে। এ ধরনের অবস্থান নিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে থিম্পু যে মাত্রায় চাপ গ্রহণ করেছে, তার প্রশংসা করতেই হবে দিল্লিকে, যদিও তা করা হচ্ছে না।
বস্তুত ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ব্যাপারে ভুটানের দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থানের কারণেই (প্রকাশ্যভাবে ও পর্দার অন্তরালে) ভারত ও চীনের মধ্যে মুখ রক্ষার সমঝোতা করা সম্ভব হয়েছে।


ভুটানের নিরাপত্তা উদ্বিগ্ন হয়ে ভারতের এবারের ছুটে যাওয়াকে বাদ দিলে অতীতে কখনো ভারত এ ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি। ভুটানি এলাকায় ঢুকে চীনের রাস্তা নির্মাণের আরো গুরুত্বপূর্ণ কথাও এ ব্যাপারে উল্লেখ করা যায়। কারণ এসব রাস্তা কখনোই দোকলামের মতো ভারতের নিরাপত্তায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি।


প্রচুর বিভ্রান্তকর গুজবের বিপরীতে (১৯৪৯ সালে কিংবা ২০০৭ সালে সংশোধিত মৈত্রী চুক্তি) ‘নিরাপত্তা চুক্তিতে’ ভুটানে ‘নিরাপত্তা সহায়তা’ প্রদানের কোনোই ব্যবস্থা নেই। তবে ভারতের কাছে নিরাপত্তা সহায়তা চাওয়ার সুযোগ রয়েছে ভুটানের। তবে তা ভারতের জন্য খুবই জটিল বিষয়। ভারতের এবার দৃশ্যপটে আসার কারণ হলো, যে রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছিল সেটি জমপেলরি রিজে (‘ঝুমপেলরি’ নয়) দিকে যাওয়ার কথা ছিল। এখান থেকে দেখা যায় ভারতের নাজুক ভৌগোলিক অবস্থান ‘চিকেন নেক’।
ফলে বাস্তবতা হলো (অনেকের কাছে এটা অসম্ভব বিবেচিত হতে পারে), ভুটান আবারো ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। এতে ভুটান নিজে ঝুঁকিতে পড়েছে এবং তাকে মূল্য চুকাতে হয়েছে।


ভুটান ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত আলোচনা বার্ষিক বিষয়। তবে এবার ২৫তম সীমান্ত আলোচনার সময় চীনা পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। যখন এবং যদি আলোচনা শুরু হয়, তবে চীনা পক্ষ কী বলবে তা জানা যাচ্ছে না। এই দীর্ঘ অচলাবস্থার পর তাদের অবস্থান কী হবে এবং কী কর্কশ কথা তারা বলবে তা বোঝা যাচ্ছে না।


অচলাবস্থার সময় ভুটানের গ্রহণ করা অবস্থান নিয়ে দেশটির মধ্যে একটি অংশের সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কাছে মনে হয়েছে, এর ফলে দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে ভুটান। সামাজিক মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের বক্তব্যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই চাপ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।


তবে এ ধরনের আহ্বান প্রতিরোধ করেছে ভুটান সরকার। কারণ সঙ্কটের মধ্যে দীর্ঘকালীন ও ভালো বন্ধুর প্রতি অপ্রত্যাশিত কিছু করা ঠিক হতো না।


দোকলাম সঙ্কটের সময় অনেকটা নিরপেক্ষ জাপানি বিবৃতি ছাড়া ভারত তার নতুন ও শক্তিশালী মিত্রদের থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল। কেবল ভুটানই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে একেবারে শেষ পর্যন্ত তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই পাশে থাকার বিনিময়ে তাকে তার স্বার্থ বড় ধরনের জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫