ঢাকা, বুধবার,২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

শেষের পাতা

বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না সু চি

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০২:১২


প্রিন্ট

রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ আর সমালোচনার মুখে আসন্ন জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না মিয়ানমারের মতাসীন দলের নেত্রী রাষ্ট্রীয় পরামর্শক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি।
গতকাল মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইউ কিউ জেইয়া জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। লোকজন আতঙ্কের মধ্যে আছে। এ সময়ে তার (সু চির) দেশে থাকা উচিত। সামগ্রিক বিষয়ে আরো মনোযোগ দিতে তিনি দেশেই থাকছেন।
আগামী ১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে বার্ষিক সাধারণ অধিবেশন বসছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ দেয়ার জন্য এই সঙ্কটের কথা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে তুলবেন বলে এরই মধ্যে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশন এই অধিবেশনে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনায় মুখর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুরস্ক এ ব্যাপারে একটি নিন্দা প্রস্তাবও আনতে পারে।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সহিংসতাকে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশন ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ আখ্যা দিলেও মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এমন অভিধা দেয়ায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুলে কমিশনকে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মিয়ানমার।
আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কমিটি গঠন : রাখাইন রাজ্যের সঙ্কট নিরসনে জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনে দেয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে মিয়ানমার সরকার। গতকাল দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি অব রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিটি’ নামে ১৫ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি রোহিঙ্গা এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে সামাজিক সম্পর্কের ওপর কাজ করবে। পাশাপাশি তারা জাতিগত সংখ্যালঘুদের গ্রাম এবং উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের শিবিরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্কট নিরসনে পরামর্শ দেয়ার জন্য গত বছর কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি নিজেই কফি আনানকে ওই কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। সু চি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন।
কিন্তু আনান কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই উত্তর রাখাইনে পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ তুলে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। হামলার সাথে রোহিঙ্গাদের একটি সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ জড়িত বলে মিয়ানমার সরকার দাবি করলেও অনেকেই এটিকে সাজানো ঘটনা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, আনান কমিশনের প্রতিবেদনকে হত্যা করার জন্যই পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে হামলার ঘটনা সাজানো হয়েছে।
আনান কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, তাদের অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ দেয়াসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, স্থানীয় জনগণের বৈধ অভিযোগগুলো উপো করা হলে তারা জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেয়ার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। এমনকি দেশটির সরকার তাদের আদি নৃগোষ্ঠী হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়নি। বরং রোহিঙ্গাদের অবৈধ বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বস্তুচ্যুত করতে বারবার নৃশংস হামলা ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা প্রতিবেশী বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।
মিয়ানমারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা বন্ধের আহ্বান : মিয়ানমারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন আইনপ্রণেতা। রাখাইন রাজ্যে চলমান পরিস্থিতিতে তাদের এই পদপে মিয়ানমারকে শক্তিশালী বার্তা দেবে বলে মনে করছেন তারা। প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইন, হাউজ ডেমোক্র্যাটিক ককাস চেয়ারম্যান জো ক্রাউলি ও কংগ্রেসম্যান স্টিভ চ্যাবট মিয়ানমারে মার্কিন অস্ত্র সহায়তা বন্ধের পে নিজেদের এই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
সিনেটের আর্মড সার্ভিস কমিটির প্রধান ম্যাককেইন বলেছেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম মিয়ানমারে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে এনডিএ (সু চির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি)। কিন্তু এমন মানবিক সঙ্কট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর এখন আর আমি তাদের সাথে সামরিক সম্পর্ক রাখাকে সমর্থন করতে পারি না।’ তিনি বলেন, মিয়ানমারে ২০১৫ সালের নির্বাচনের পর খুবই থউৎসাহী ছিলাম আমি। আমরা বিশ্বাস করতাম বেসামরিক সরকার দেশকে অন্যভাবে পরিচালিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের পাশে থাকবে। এ জন্যই সিনেটের আর্মড সার্ভিস কমিটি দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক জোরদারের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে পরিস্থিতি এখন পাল্টে গেছে। তাই এনডিএকে এখন আলোচনা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
ম্যাককেইন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইন সঙ্কট সমাধানে অং সান সু চিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। তিনি অনেক দিন ধরেই গণতন্ত্রের জন্য অনুপ্রেরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।’
হাউজ ডেমোক্র্যাটিক ককাস চেয়ারম্যান জো ক্রাউলি ও কংগ্রেসম্যান স্টিভ চ্যাবট জানান, তারা রাখাইন রাজ্যে চলমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখাচ্ছে না। অত্যাচারের শিকার হয়ে পালাচ্ছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। খুব দ্রুতই এখানে মানবিক সঙ্কট দেখা গেছে। এই সঙ্কট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়া উচিত। চলমান এবং ভবিষ্যতের মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করে মিয়ানমারকে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা দেয়া উচিতÑ এমনটা চলতে পারে না।
শীর্ষ রিপাবলিকান নেতারা অবশ্য সু চির বিরুদ্ধে কোনো পদপে নিতে রাজি নন। সিনেট মেজরিটি লিডার ম্যাককনেল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি সু চির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পপাতী নই। আমি মনে করি এই সঙ্কট সমাধানে তিনিই সবচেয়ে বড় আশা। সামরিক স্বৈরতন্ত্র থেকে মিয়ানমার এখন যেখানটায় অবস্থান করছে, সেখান থেকে একে প্রত্যাশার পথে এগিয়ে নিতে সু চিই সব থেকে বড় ভরসার জায়গা।’
ম্যাককনেল বলেন, এই মুহূর্তে সু চি বিপাকে রয়েছেন। সবাই তাকে দোষারোপ করছেন। তার দিকেই আঙুল তুলছে। সু চির বিপদে মিয়ানমারের বিপদ বাড়বে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫