ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

দেশে ফিরতে চান গুলিবিদ্ধ রহিমুল

ভাষান্তর : আহমেদ বায়েজীদ

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৯:২৮ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৯:৪০


প্রিন্ট
রহিমুল মুস্তফা

রহিমুল মুস্তফা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা রহিমুল মুস্তফা। সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত রহিমুলকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তার পরিবার। আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ের নতুন শরণার্থীশিবিরে। সেখানেই আলজাজিরার প্রতিনিধি কেটি আর্নল্ডের কাছে তুলে ধরেছেন সহিংসতা আর দুর্গম যাত্রার কথা। জানিয়েছেন বাড়ি ফিরে যাওয়ার আকুতি-

‘আমি রহিমুল মুস্তফা, বয়স ২২ বছর। এখানে আসার আগে আমি স্থানীয় একটি মাদরাসার ছাত্র ছিলাম। সত্যিই আমি ধর্মীয় শিক্ষাকে খুব উপভোগ করতাম। মাঝে মধ্যে নিজ উদ্যোগেই ছোটদের পড়াতাম। আমাদের এলাকার বেশির ভাগ লোকই অশিক্ষিত। আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল শিক্ষক হওয়া। সব মিলে সেনাবাহিনী আসার আগের দিন পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যের ফইরা গ্রামে খুব সুখেই ছিলাম আমি।

একদিন রাত ৩টার দিকে হঠাৎ সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামে এসে গুলিবর্ষণ ও ঘর-বাড়িতে আগুন দিতে শুরু করে। আমরা ঘর থেকে বের হতেও পারছিলাম না, দেখলেই ওরা গুলি করবে। সবাই ঘরের মধ্যেই অবস্থান করলাম। একপর্যায়ে ওরা আমাদের ঘরের কাছে চলে আসে এবং জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর গুলি করতে শুরু করে। আমার হাঁটুতে একটি গুলি লাগে। সে রাতে আমাদের গ্রামের অনেক লোক নিহত হয়েছে। আমি নিজেই তিনজনকে নিহত হতে দেখেছি।

আমার বাবা ও ভাই আমাকে চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়; কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তাররা আমার চিকিৎসা করেনি। এরপর নিকটজনেরা আমাকে নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে চলতে শুরু করে। সেনাবাহিনীর চোখে পড়ার ভয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে তারা আমাকে নিয়ে এসেছে। এটি ছিল দীর্ঘ ও কষ্টকর একটি যাত্রা। হাঁটুর ক্ষতস্থানে সংক্রমণ শুরু হয়ে যায় পথিমধ্যেই। একমাত্র আমাকে ছাড়া বাড়ির আর কিছুই আনতে পারেনি আমার পরিবার। সব কিছুই ফেলে আসতে হয়েছে। স্বস্তির খবর, আমরা নিরাপদে বাংলাদেশে আসতে পেরেছি। এখানে এসে ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার (এমএসএফ) স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে চিকিৎসা পেয়েছি। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আশ্রয় বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পাইনি।

দেশে শান্তি ফিরে এলে সেটিই হতে পারে আমাদের একমাত্র নিরাপদ ভবিষ্যৎ। আমাদের চোখের সামনে যা ঘটছে তা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই, আমরা শান্তি চাই। আমি মনে করি, বিশ্ব এই সঙ্কট দেখছে ও তারা আমাদের সহযোগিতার চেষ্টা করছে।’

========================

রোহিঙ্গাদের দুর্গম যাত্রা
‘৮ দিন শুধু পাতা খেয়েছি’

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সচ্ছল সংসার ছিল রাশিদার। কিন্তু হঠাৎ নেমে আসে ভয়াবহ অন্ধকার। সেনাবাহিনীর গণহত্যা থেকে বাঁচতে তিন সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তিনি। আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়ার উনচি প্রাঙ্ক শরণার্থীশিবিরে। সেখানেই আলজাজিরার প্রতিনিধি কেটি আর্নল্ডের কাছে তুলে ধরেছেন সহিংসতা আর ভয়াবহতার কথা-

‘রাশিদা আমার নাম, বয়স ২৫ বছর। আরাকানে সহিংসতার আগে আমার খুবই শান্তিপূর্ণ ও সাদাসিধে জীবন ছিল। কিছু চাষের জমি ছিল আমাদের। ছিল গবাদিপশু। সুন্দর একটি ঘর ছিল। স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে সেখানে বাস করতাম। এই সহিংসতার আগে সুখের সংসার ছিল আমার। কিন্তু সব কিছুই আমরা ফেলে এসেছি। আমাদের বাড়ি ও ফসলের ক্ষেত পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে জীবিকা নির্বাহের আর কোনো পথ নেই। সেনাবাহিনী যখন আমাদের গ্রামে হামলা করল- দ্রুত তিন সন্তানকে নিয়ে জঙ্গলে লুকাই। জঙ্গলে খুবই ভয়ে ছিল বাচ্চারা।

কিছুক্ষণ পর ওদের জঙ্গলে রেখে বাড়ি গিয়ে দেখি, অনেক লোককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের লাশ পড়ে আছে। তারপর সেই জঙ্গল থেকেই বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটা শুরু করি। আট দিন পর এসে পৌঁছলাম বাংলাদেশ সীমান্তে। এ সময় খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম আমরা। গাছের পাতা ছাড়া খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। বাচ্চারা খাবার চেয়েছে। কিন্তু আমরা তো সাথে কিছুই আনতে পারিনি খাওয়ার মতো।

ছোট্ট একটি নৌকায় চড়ে সীমান্তের নদী পার হয়েছি আমরা, যা ছিল খুবই বিপজ্জনক। মনে হয়েছে এই বুঝি নৌকা ডুবে গেল। শিশুদের শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম দু’হাতে। বাংলাদেশে এসে আমি মোটেই খুশি নই। এক একর জমিতে ধান চাষ করতাম। নিজেদের গবাদিপশু ছিল। থাকার ঘর ছিল। তা ছাড়া, আমাদের গ্রামটি ছিল খুবই সুন্দর। এর সব কিছুই আমরা ফেলে এসেছি। কাজেই আপনারা হয়তো বুঝতে পারছেন, কতটা কষ্টে আছি আমরা।

বাড়ির কথা মনে পড়লে ভীষণ কষ্ট হয়। এখানে আমরা আশাহীনভাবে বেঁচে আছি। ভবিষ্যতে কী হবে, তা জানি না। পর্যাপ্ত সাহায্যও পাচ্ছি না। বাংলাদেশীরা খুবই দয়ালু। তারা খাদ্য ও কাপড় দিয়ে আমাদের সহায়তা করছে। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এখানে দেখছি না। আশা করি, তারা আমাদের সাহায্য করবে। আমাদের খাদ্য দরকার। বিশ্ববাসীর কাছে আমার আকুতি, আমরা শান্তি চাই। শান্তি ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫