ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

করপোরেট অগ্রযাত্রায় চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা

মো: কামরুল ইসলাম

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বুধবার, ০০:০০


প্রিন্ট

একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের কর্মপদ্ধতিই একটি বিভাগকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে ও সব বিভাগের সম্মিলিত কর্মযোগ প্রতিষ্ঠানকে সফল ব্যবসায়ের শিখরে পৌঁছাতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, এয়ারলাইন্স ব্যবসায় পরিচালনা করতে বিভিন্ন বিভাগের প্রত্যক্ষ কর্মপদ্ধতির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
পৃথিবীর যেকোনো এয়ারলাইন্সে প্রাত্যহিক কাজকর্ম করার জন্য বেশ কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ফ্লাইট অপারেশন, কেবিন সার্ভিস, ক্যাটারিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, স্টোর, কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স, গ্রাউন্ড সার্ভিস কিংবা এয়ারপোর্ট সার্ভিস, ক্লিনিং, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, কার্গো, রিজার্ভেশন, অ্যাকাউন্টস, রেভিনিউ, ট্রান্সপোর্ট, সিকিউরিটি, টেইলারিং, ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সফটওয়্যার, এইচ আর অ্যান্ড অ্যাডমিন, ইভেন্ট অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং ও পাবলিক রিলেশন্স ডিপার্টমেন্ট।
১৯ বছর এয়ারলাইন্সের পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করার সুবাদে খুব কাছ থেকে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সহকর্মীদের দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রথমেই কেবিন সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের উল্লেখ করা যাকÑ যারা প্রতিদিন বিমানযাত্রীদের সরাসরি সেবা দেয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। এয়ারলাইন্সের যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে তাদের সেবা প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। ফ্লাইট অপারেশন ডিপার্টমেন্ট : পাইলট ছাড়া একটি এয়ারলাইন্স কোনো দিন কল্পনাও করা যায় না। ফ্লাইট ছাড়ার আগমুহূর্তে একজন ক্যাপ্টেন অসুস্থ অনুভব করলে ফ্লাইট বাতিল কিংবা দেরি ঘোষণা করা হতে পারে। পাইলট হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। পাইলটদের সঠিক দায়িত্ববোধ থাকলে এয়ারলাইন্স অর্থনৈতিকভাবে অনেক সাশ্রয় করতে পারে। ক্যাটারিং ডিপার্টমেন্টের সেবার ওপর একটি এয়ারলাইন্সের ভাবমূর্তি অনেকটা নির্ভর করে। নির্দিষ্ট ফ্লাইটে উন্নতমানের ও সময়োপযোগী খাবার সরবরাহ করতে না পারলে এয়ারলাইন্সকে অনেক সমালোচনার শিকার হতে হয়।
এয়ারলাইন্সে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা যদি সঠিক সময়ে এয়ারক্র্যাফটকে উড্ডয়ন উপযোগী করে না দেয়, ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে। একটি এয়ারলাইন্সকে সেফটি এয়ারলাইন্স বলা যায় যদি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ হয়। বিরাট দায়িত্বের অধিকারী প্রকিউরমেন্ট ডিপার্টমেন্ট। যদি সময়মতো তারা এয়ারক্র্যাফটের ইকুইপমেন্টস কিংবা পার্টস সরবরাহ করে দিতে না পারেন, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট যত দক্ষই হোক না কেন ফ্লাইট উড্ডয়নের উপযোগী হবে না। স্টোর ডিপার্টমেন্টে লোকবল কম হলেও তাদের প্রয়োজনীয়তা কম নয়। আবার কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ডিপার্টমেন্টের কথা না বললেই নয়। এয়ারক্র্যাফটের টেকনিক্যাল সাপোর্ট যথোপযুক্ত কি না তা সার্টিফাই করে থাকে এই ডিপার্টমেন্ট। গ্রাউন্ড সার্ভিস কিংবা এয়ারপোর্ট সার্ভিস বা কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টও এয়ারলাইন্সের জন্যই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একজন যাত্রী এয়ারপোর্টে পৌঁছামাত্রই তার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা যেমনÑ লাগেজ চেকইন, বোর্ডিং পাস ইস্যু, ইমিগ্রেশন, ট্রান্সপোর্ট, সিকিউরিটি চেকইনসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার প্রধান দায়িত্ব এয়ারপোর্ট সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের। অনেক বেশি সচেতন থাকতে হয় গ্রাউন্ড সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বিশেষ করে আবহাওয়াজনিত কিংবা টেকনিক্যাল কারণে ফ্লাইট বাতিল বা দেরি হলে সব ধরনের অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় এয়ারপোর্ট সার্ভিস ডিপার্টমেন্টকে। তারা যদি যাত্রীদের সঠিকভাবে সার্ভিস না দিতে পারে, সম্পূর্ণ এয়ারলাইন্সকে ইমেজ সঙ্কটে পড়তে হবে।
ক্লিনিং একটি অত্যাবশ্যকীয় ডিপার্টমেন্ট। প্রতিটি ফ্লাইট শেষ করে আসার পর খ্বু দ্রুততার সাথে এয়ারক্র্যাফটের ভেতরে অল্প সময়ের মধ্যে পরিষ্কার-পরিছন্ন করে তোলা হয় পরবর্তী ফ্লাইট পরিচালনা করার জন্য। প্রতিদিন ফ্লাইট শেষ করে রাতের বেলা কিংবা যখন নির্দিষ্ট এয়ারক্র্যাফটের ফ্লাইট শিডিউল থাকে না তখন এয়ারক্র্যাফটের বাইরের দিকে পরিষ্কার করা হয়। সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের অভিব্যক্তি, তারা হচ্ছেন এয়ারলাইন্সের হার্ট। তারা যদি ব্যবসা এনে দিতে না পারেন তবে এয়ারলাইন্সের চলার পথ থমকে যাবে। যত ভালো প্রোডাক্টই হোক না কেন, প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনামাফিক মার্কেটিং প্লান। তাই এয়ারলাইন্সের ব্যবসার সব কিছু নির্ভর করে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের ওপর। প্যাসেঞ্জার এয়ারলাইন্সে কার্গো ডিপার্টমেন্ট মোট আয়ের এক বিশাল অংশ দখল করে আছে। যদি পর্যাপ্ত যাত্রী নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট ফ্লাইটে না থাকে তখন আয়ের পরিমাণে যেন তারতম্য না ঘটে, সেজন্য কার্গো ডিপার্টমেন্ট কার্গো পরিবহন করার ব্যবস্থা করে থাকে। বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণ গার্মেন্ট পণ্য ও কাঁচা সবজি বিদেশে রফতানি করে আসছে।
এয়ারলাইন্স কত আধুনিক হতে পারে, কত উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন হতে পারে, রিজার্ভেশন সিস্টেম কত বেশি যাত্রীদের জন্য আন্তরিক হতে পারে, তা রিজার্ভেশন ডিপার্টমেন্টের ওপর নির্ভর করে। এই ডিপার্টমেন্টকে অনেক বেশি গতিশীল হতে হয়। ২৪ ঘণ্টাই সার্ভিস দিতে হয়। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে অর্থের জন্য এই ডিপার্টমেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। রেভিনিউ অ্যাকাউন্টিং ডিপার্টমেন্ট। সাধারণত এয়ারলাইন্সেই এই ডিপার্টমেন্টের তৎপরতা খুব দেখা যায়। একটি এয়ারলাইন্সের রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট যত বেশি শক্তিশালী, সেই এয়ারলাইন্সের আর্থিক হিসাব-নিকাশ তত বেশি গোছানো। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্ট ও করপোরেট অফিস, নিজস্ব সেলস অফিস এবং এয়ারপোর্ট সার্ভিস যদি হিসাব-নিকাশসংক্রান্ত ভুল করে থাকে তবে রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট সেই ভুল বের করে নিতে পারে। তারা হিসাব-নিকাশ করে থাকেন নিজস্ব সফটওয়্যারের মাধ্যমে। রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টে প্রাইসিং, ইলড ম্যানেজমেন্টসহ অনেক সংবেদনশীল বিষয় যুক্ত থাকে। ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট কত বেশি অনটাইম তার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে এই ডিপার্টমেন্ট। সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট এয়ারলাইন্সকে সুরক্ষিত রাখে। বিমানবন্দরে এয়ারক্র্যাফট, যাত্রীদের লাগেজ থেকে শুরু করে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধান করতেও সচেষ্ট থাকে। ইনফরমেশন টেকনোলজি ও সফটওয়্যার ডিপার্টমেন্ট আধুনিক করপোরেট যুগে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। এয়ারলাইন্সের গতিশীলতা বাড়াতে আইটি ও সফটওয়্যার ডিপার্টমেন্ট কার্যকর ভূমিকা রাখছে সর্বত্রই। টেইলারিং ডিপার্টমেন্ট ও এয়ারলাইন্সের ব্র্যান্ড ইমেজ ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেসব ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ অথবা পাইলট অথবা ইঞ্জিনিয়ার বা কেবিন ক্রু অফিসিয়াল ইউনিফর্ম পরে থাকেন তাদের সব ধরনের ড্রেস নিজস্ব টেইলারিং ডিপার্টমেন্ট তৈরি করে থাকে। এ ছাড়া লোডার, পিয়ন, ড্রাইভার কিংবা মেকানিকস সবার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে একই ডিজাইনের ড্রেস তৈরি করে থাকে, যা এয়ারলাইন্সের স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখে। এতে ইউনিফর্মের কোয়ালিটি যেমন বজায় রাখতে হয়, তেমনি নিয়মানুবর্তিতা বজায় থাকে। এইচ আর অ্যান্ড অ্যাডমিন ডিপার্টমেন্ট ব্যাক অফিস হিসেবে এয়ারলাইন্সের সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। এইচ আর ডিপার্টমেন্ট যদি ভালো কর্মী নিয়োগ দিতে না পারে তবে এয়ারলাইন্স লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। এয়ারলাইন্সে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করার জন্য অ্যাডমিন ডিপার্টমেন্টের ভূমিকা অগ্রগণ্য। বছর শেষে স্টাফদের ইনক্রিমেন্ট কিংবা প্রতি মাসে বেতন প্রদানে এই ডিপার্টমেন্টের ভূমিকা রয়েছে। সরকারি অফিস-আদালতের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এয়ারলাইন্সের গতি বৃদ্ধি করার দায়িত্ব এই ডিপার্টমেন্টের। ইভেন্ট অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং যেকোনো ধরনের প্রোডাক্ট ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে সারা বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যবসায় টিকে থাকতে ব্র্যান্ডিং টিমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এয়ারলাইন্স একটি সেবামূলক ব্যবসায় হওয়ার কারণে সারা বছর বিভিন্ন ইভেন্টের মাধ্যমে নিজেদের অন্য প্রতিযোগীদের থেকে আলাদাভাবে প্রকাশ করার সুযোগ থাকে। পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্ট একটি সেবামূলক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানি যখন স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এই ডিপার্টমেন্টের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সবার আগে এই ডিপার্টমেন্টই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সারা বছর নিজের প্রতিষ্ঠানকে প্রচার করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্ট। ইন্টারনাল ও এক্সটার্নাল রিলেশনের বন্ধনে মূল ভূমিকা পালন করে এই ডিপার্টমেন্ট। একজন পাবলিক রিলেশন এক্সিকিউটিভ কত বেশি শক্তিশালী, তা বোঝা যায় যখন তিনি প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকেন। তার উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিই বেশি অনুভূত হয়। এটাই পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্টের সার্থকতা।
যেকোনো ব্যবসায় প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। ডিপার্টমেন্টাল প্রতিযোগিতা একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে করে তোলে আরো বেশি গতিশীল। সবার উপলব্ধি ‘আমিই সেরা’। একটি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই অনুভূতি অনেকাংশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যদি সব ডিপার্টমেন্টকে সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, তবেই বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের কর্মীদের মধ্যে কোনো ধরনের অসন্তোষ কাজ করবে না, বরং তাদের উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে বহুগুণ। তখন সবাই একটি টিম হিসেবে কাজ করবে, যার সুফল ভোগ করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫