ঢাকা, শুক্রবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

মাইনে উড়ে গেল ছেলের দুটি পা : অসহায় মায়ের হাহাকার

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৫:১৪


প্রিন্ট
রুশিদা হকের ১৫ বছর বয়সী ছেলে দুটি পা হারিয়েছে। তার ভাষায় 'এমনভাবে বেঁচে থাকার দরকার কী ছিল'

রুশিদা হকের ১৫ বছর বয়সী ছেলে দুটি পা হারিয়েছে। তার ভাষায় 'এমনভাবে বেঁচে থাকার দরকার কী ছিল'

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে আহত হয়েছে বহু রোহিঙ্গা মুসলিম। পঙ্গু হয়ে যাওয়া কজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।
১৫ বছর বয়সী মিয়ানমারের এক কিশোরের চিকিৎসা চলছে বাংলাদেশের এক হাসপাতালে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে দুটি পা হারিয়েছে এই কিশোর ।
একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরেক নারী, যিনি জানিয়েছেন সীমান্তে গুলি খাওয়ার পর মাইনের ওপর আছড়ে পড়েন তিনি।

নব্বইয়ের দশকে ওই এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর নিষিদ্ধ এ্যান্টি-পার্সোনাল মাইন পুঁতেছে বলে অভিযোগ তুলে বাংলাদেশি বিভিন্ন সূত্র এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
যদিও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

সম্প্রতি মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।
জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জেইদ রাদ আল-হুসেইন সোমবার বলেছেন, 'মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর-নির্মম অভিযান চলছে'। পাশাপাশি তিনি এটাও বলেছেন যে সেখানে যে হামলা চালানো হচ্ছে তা পাঠ্য বইয়ের জন্য 'জাতিগত নিধন'-এর একটি অন্যতম উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আহত রোহিঙ্গাদের কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে, একটি হাসপাতালে ঘুরের বিবিসির রিতা চক্রবর্তী দেখেছেন বেশিরভাগই সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। অনেকের দেহের নানা জায়গায়, কেউ হাত আবার কেউবা পা হারিয়েছেন।

১৫ বছর বয়সী আজিজু হক, তার দুই পা হারিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, সাথে আছে তার মা। আজিজুর ভাইও অন্যএক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে, তারও একই অবস্থা-জানালেন তাদের মা রুশিদা হক।
"তাদের দেহের ক্ষত এতটাই যে আমার কাছে সেটা মৃত মানুষের মতোই। ওপরওয়ালা যদি তাদের নিয়ে যেত তাহলে ভালো হতো। ছেলেগুলো আমার অনেক কষ্ট করছে" বিবিসিকে বলেন রুশিদা হক।

বিস্ফোরণে আজিজু হকের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে, দুটো পা নেই,এছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
আজিজুকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে ডাক্তাররা। কিন্তু তাকে বাঁচানোর আশা ক্ষীণ বলে জানা যাচ্ছে। কারণ আজিজুরের রক্তের গ্রুপ বিরল, ওই গ্রুপের রক্ত কোনো ব্লাড ব্যাংকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ কদিন রক্তদাতা পাওয়া গেলেও এখন আর কোনো দাতারও সন্ধান মিলছে না।
অন্যদিকে আহত আরেক নারী সাবেকুর নাহার বিবিসিকে বলেন, মিয়ানমারে তাদের সম্প্রদায়ের লোকজনকে লক্ষ্য করে সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর পর তিন ছেলেকে নিয়ে নিজ গ্রাম থেকে পালান তিনি। যখন সীমান্ত পার হচ্ছিলেন তখনই গুলির আঘাতে মাইনের ওপর পড়ে যান।
আমাদের গুলি ছুঁড়ল, এবং তারা মাইনও পুঁতে রেখেছিল সেটার ওপর পড়লাম," বলেন ৫০ বছর বয়সী সাবেকুর নাহার।

ছোটখাট দেখতে সাবেকুরের দেহেও নানা ক্ষত রয়েছে।


রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শুরু
নয়া দিগন্ত অনলাইন

নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে৷ এদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে নতুন করে আগুন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে৷
মিয়ানমারে নাফ নদীর তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে আরও পাঁচটি গ্রামে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়িতে আগুন দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী৷ সোমবার ভোর রাতে আগুনের পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে শাহপরী দ্বীপে প্রবেশ করছে৷

সোমবার সকালেও টেকনাফের শাহপরি দ্বীপ থেকে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে৷ সকালে শাহপরী দ্বীপে ছিলেন সাংবাদিক আমানুর রহমান রনি৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘নাফ নদীর জেটি থেকে আমরা মিয়ানমারের গ্রামে আগুন এবং কালো ধোঁয়া দেখতে পাই৷ আগুনের কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় মিয়ানমারের নাফ নদীর তীরবর্তী এলাকার আকাশ৷ আগুনের পর ট্রলারে করে আসা আশ্রয়প্রত্যাশী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঘগুনিয়া, গর্জনদিয়া, খুইন্যাপাড়া, সায়ড়াপাড়া, মাঝেরডিগি ও মংডুর পাহাড় অঞ্চলের সব গ্রামে আগুন দেওয়া হয়েছে৷’

তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার রোহিঙ্গা ভোররাত থেকে ট্রলারে করে শাহপরী দ্বীপের দিকে আসে৷ তারা জানায়, আগুন দেয়ার আগে এক ধরনের গ্যাস ছড়িয়ে দেয়া হয়৷ ওই গ্যাসে চোখ জ্বলে৷ বাড়ির বাইরে বের হলেই বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া হয়৷ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বোমাও ছুড়ে মারে৷’
রনি আরো জানান, ‘তারা (রোহিঙ্গা) তিনটি কথাই বলছেন, সেনাবাহিনী, আগুন, বোমা৷’
এদিকে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস পরিস্থিতিতে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন৷ এতে করে আবারও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে৷ সাধারণ মানুষদের জীবনের স্বার্থে আমি সব পক্ষকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই৷’

তিনি বলেন, ‘এখন আসলে আক্রান্তদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময়৷ মিয়ানমার সরকারের উচিত মানবাধিকার ও ত্রাণ সংস্থাগুলোকে মানবিক সহায়তা প্রদানের অনুমতি দেয়া৷’
আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে জাতিসংঘ ও রেডক্রসকে অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান তিনি৷

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘গত কয়েক দিনে আমরা মিয়ানমার নিয়েই কথা বলছি৷ এই সময়ে ২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আর এটি সামলানো বাংলাদেশের জন্য কঠিন৷ বাংলাদেশের এমন পদক্ষেপকে আমরা প্রশংসা করি ও স্বাগত জানাই৷’
জাতিসংঘের সেন্ট্রাল এমার্জেন্সি ফান্ড (সিইআরএফ)-এর মাধ্যমে জার্মানিও এই রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে জানান গ্যাব্রিয়েল। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক এই সংকটে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, রাখাইনে টেকসই পরিবর্তন দরকার৷’

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনান কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবগুলো জার্মান সরকার সমর্থন করে বলে তিনি অং সান সুচি’র প্রতি সেগুলো বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানান৷
সিগমার গাব্রিয়েল আরো বলেন, ‘জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত আছে৷’

বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আনার কাজ শুরু করেছে৷ সোমবার বিকেল থেকে এই কাজ শুরু হয় বলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট খালেদ মাহমুদ ডয়চে ভেলেকে জানান৷ তিনি বলেন, ‘দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সকালে কাজ শুরুর কথা থাকলেও শুরু হয়েছে বিকেলে৷ এই কাজে সহায়তার জন্য ঢাকা থেকে কক্সবাজারে একটি টিম গেছে৷’
বায়োমেট্রিক রেজিষ্ট্রেশন কেমন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের নাম, ঠিকানা, ছবি এবং আঙুলের ছাপ নেয়া হবে৷ তবে এ কাজে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো তাদের এক জায়গায় নেয়া৷ আমরা বালুখালিতে দুই হাজার একর জমির ওপরে একটি ক্যাম্প বানাতে শুরু করেছি৷ দু’টি নিবন্ধিত ক্যাম্পের ৩২ রাজার রোহিঙ্গা বাদে বাকি সবাইকে ওই ক্যাম্পে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে৷’
তিনি আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে, তারা ট্রাকে করে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে৷ তাদের এক জায়গায় নেয়া অনেক কঠিন কাজ৷ তাই বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজ কবে শেষ হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না৷’

বাংলাদেশে এখন মোট সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে৷ এর মধ্যে তিন লাখ এসেছে ২৫ আগস্টের পর থেকে৷ এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইন রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে৷ ওই সময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা৷ ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ একটি টাস্কফোর্স গঠন করে জরিপ করে মোট চার লাখ রোহিঙ্গা থাকার কথা জানিয়েছিল৷ এবার যোগ হলো আরো তিন লাখ৷ এবং প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে৷
বাংলাদেশে দু'টি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প হলো উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া৷ এর বাইরে আরো ১২টি অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প আছে৷

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫