ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

মধ্যপ্রাচ্য

মাওলানার রুমি (রা.) এবং ইরান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান

হামিদ মীর

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৫:০২


প্রিন্ট
মাওলানার রুমি (রা.) এবং ইরান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান

মাওলানার রুমি (রা.) এবং ইরান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান

বিরক্তি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আপনাআপনি এ বিরক্তি সৃষ্টি হচ্ছিল। রাজনীতির নামে বিদ্বেষের কারবারিদের হাটে সাংবাদিকতাও এক কপটতায় পরিণত হয়েছে। এ কপটতার ধুলাবালুতে নিঃশ্বাস নেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং ধুলাবালু থেকে মুক্তি পেতে সফরের সিদ্ধান্ত নিলাম। সফরের গন্তব্য এমন এক সুফির মাজার ছিল, যার চিন্তাদর্শন ও ফালসাফায় প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবালও প্রশান্তি ও মুক্তি তালাশ করতেন এবং ওই সুফিকে নিজের মুরশিদ অভিহিত করতেন। আপনারা বুঝে ফেলেছেন, আমার গন্তব্য ছিল তুুর্ক শহর কৌনিয়ায় মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ:-এর মাজার, যেখানে ফাতিহা পাঠের তামান্না বহু বছর আগে আফগান শহর গজনিতে হাকিম সানায়ী রহ:-এর মাজার জিয়ারতের পরে সৃষ্টি হয়েছিল।

আল্লামা ইকবালের রচনায় মাওলানা রুমি রহ:-এর আলোচনা প্রচুর পাওয়া যায়। মাওলানা রুমি রহ: যেসব বুজুর্গ মাধ্যমে প্রভাবিত ছিলেন, তাদের মধ্যে বায়েজিদ বোস্তামি রহ:, ফরিদুদ্দিন আত্তার রহ:, বাহাউদ্দিন জাকারিয়্যা মুলতানি রহ:, শামস তাবরিজি রহ: ও হাকিম সানায়ি গজনবি রহ: অন্যতম। আল্লামা ইকবাল ‘মাসনবীয়ে মুসাফির’-এ হাকিম সানায়ি গজনবি রহ:-এর নাম উল্লেখ করেছেন। আল্লামা ইকবাল ১৯৩৩ সালে মাওলানা সাইয়েদ সুলায়মান নদভির সাথে আফগানিস্তান সফর করেন। নদভি সাহেবের ‘সায়রে আফগানিস্তান’ গ্রন্থে এ সফরের বিস্তারিত আলোচনা পড়ে জানা যায় যে, আল্লামা ইকবাল গজনিতে মাহমুদ গজনবির মাজার ছাড়াও হাকিম সানায়ি রহ: ও হজরত উসমান হাজবেরি রহ:-এর মাজার খুঁজে বের করে ওখানে ফাতিহা পাঠ করেছিলেন। আমিও আল্লামা ইকবালের অনুসরণে ওই মাজারগুলোকে খুঁজে ফাতিহা পাঠ করি।

হজরত আলী হাজবেরি রহ:-এর বাবা হজরত উসমান হাজবেরি রহ:-এর মাজার খুঁজে বের করতে বেশ কষ্ট হয়। কেননা এটা গজনির পুরনো কবরস্থান থেকে একটু দূরে ছিল। ওখানে পৌঁছে অনুভব হলো, গজনিতে হজরত উসমান হাজবেরি রহ:-এর দাফন আর লাহোরে হজরত আলী হাজবেরি রহ:-এর দাফন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে এমন এক বন্ধনে বেঁধেছে, যা কখনো ভাঙবে না। আল্লামা ইকবাল ‘জাভেদনামা’য় আফগানিস্তানকে এশিয়ার হৃৎপিণ্ড অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেছেন, যদি ওই হৃৎপিণ্ডে বিশৃঙ্খলা ঘটে, তা পুরো এশিয়ায় বিশৃঙ্খলা হবে। আল্লামা ইকবালের রচনায় পুরো মুসলিম উম্মাহকে এক সত্তা অভিহিত করেছেন। আফগানিস্তানের পাশাপাশি ইরান ও তুরস্কের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আল্লামা ইকবালের মুরশিদ মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ: আফগানিস্তানের বালখ শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি ইরানে ফরিদুদ্দিন আত্তার রহ:-এর ভালোবাসার ফয়েজ লাভ করেন। ফারসি ভাষাকে নিজের ভাবপ্রকাশের মাধ্যম বানান।

তিনি তুরস্কের কৌনিয়া শহরে সমাহিত হন। মাওলানা রুমি রহ:-এর প্রতি আল্লামা ইকবালের ভালোবাসার মৌলিক কারণ প্রাচ্যের কবির ফারসি ভাষায় পারদর্শিতা। আল্লামা ইকবাল তার মুরশিদ রুমি রহ:-এর সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন তার ফারসি রচনাবলিতে। উর্দুতে রচিত একটি কবিতা স্বীয় মুরশিদের প্রতি আল্লামা ইকবালের শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়Ñ ইসি কাশমাকাশ মেঁ গুঁজরে মেরি জিন্দেগি কি রাঁতে/কাভি সুজো সাজে রুমি, কাভি পিচো তাবে রাজিÑ এ দ্বিধাদ্বন্দ্বেই কেটে যায় আমার জীবনের রাতগুলো/কখনো রুমির জন্য অন্তর্জ্বালা, কখনো অন্তর্ভেদি ব্যাকুলতা।


কয়েক বছর আগের আফগানিস্তান সফরে আল্লামা ইকবালের মুরশিদ রুমি রহ:-এর মাজার জিয়ারতের তামান্না অবশেষে বাস্তবে পরিণত হলো। এ অধমের এ মাজারে ফাতিহা পাঠ ছাড়া মাজারসংলগ্ন মসজিদে জোহর নামাজ আদায়ের সৌভাগ্যও অর্জন হয়। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ:-এর মাজারে এক বড় সারপ্রাইজ মাজারের ভেতর ও বাইরে বিদ্যমান খোদাই করা বাণীর নমুনা। যেখানে ‘ইয়া হজরত মাওলানা’ লেখা রয়েছে। উর্দু, ফারসি ও আরবি পড়তে পারা লোকেরা ‘ইয়া হজরত মাওলানা’ অনায়াসে বুঝতে পারে। তবে বহু তুর্কির কাছে এ লিখনপদ্ধতি অপরিচিত হয়ে গেছে। তার পরও মাওলানা রুমি রহ: তাদের কাছে অপরিচিত নন।

২০০৩ সালে বাগদাদে শায়খ আবদুল কাদের জিলানি রহ:-এর মাজারে অনেক পাকিস্তানি, বাংলাদেশী, ভারতীয় ও আফগানদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। ২০১৭ সালে মাওলানা রুমি রহ:-এর মাজারে অনেক ইরানি, আফগান ও আরবের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়, যারা মাজারে উৎকীর্ণ রুমি রহ:-এর ফারসি বাণী পড়ার চেষ্টা করছিলেন। এ বাণী আমাদের একে অপরের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিচ্ছিল। মাজারের একটি অংশে মাওলানা রুমি রহ:-এর বিখ্যাত মাসনবির একটি হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি রয়েছে। আমি ওই পাণ্ডুলিপির পুরনো ফারসি পড়ার চেষ্টা করছিলাম, এমন সময় এক ভদ্রমহিলা মুচকি হেসে ইংরেজিতে আমাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি পাকিস্তানি? আমি হ্যাঁসূচক জবাব দিয়ে বললাম, আপনি নিশ্চয় ইরানি? ভদ্রমহিলা হ্যাঁসূচক জবাব দিলেন। পেছন থেকে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি বলে উঠলেন, আমি আফগান। রুমি রহ:-এর ভালোবাসা আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। তবে দুঃখ হচ্ছে, আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তানের শাসকদের অন্তরে রুমি রহ:-এর ভালোবাসা নেই।

ওই প্রৌঢ় ব্যক্তির একটি কথাই আমাকে চিন্তিত করে ফেলল। কেননা আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তান একে অপরের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যাদেরকে বহু সুফি একে অপরের সাথে সম্পর্ক বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছেন। আফসোস, এসব দেশের সম্ভ্রান্ত শাসকগোষ্ঠীর পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লির হাতে বন্দী। আরবি ভাষায় মাওলানার অর্থ আমাদের নেতা। তুর্কি জনগণ জালালুদ্দিন রুমি রহ:-কে নিজেদের মাওলানা আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্ভ্রান্ত শাসকগোষ্ঠীর মাওলানা কোনো সুফি কবি নন, বরং তাদের মাওলানা হচ্ছে ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লি।

কিছু দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব ভ্রমণ করেন এবং সৌদি শাসকগোষ্ঠীর সাথে তরবারির ছায়াতলে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য করেন, তখন এ প্রতিক্রিয়া শোনা গিয়েছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পুরো ইসলামি জগতের ‘ইয়া হজরত মাওলানা’ হয়ে গেছেন। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এক বক্তৃতায় পাকিস্তানকে যে ধমক দিয়েছেন, তাতে তুরস্কে অনেক ক্ষোভ দেখা গেছে। আমি তুরস্কে যখন এ বক্তৃতা শুনি, তখন এক স্থানীয় তুর্কি বললেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প দু’টি ইসলামি ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে পরস্পরে লড়াই বাধিয়ে নিজেদের অস্ত্র বিক্রয় করতে চাচ্ছেন এবং নিজের যুদ্ধ শিল্পকারখানার হাটে ইরান, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যকেও শামিল করতে চাচ্ছেন।

আমাদের একে অপরের সাথে লড়াই করার পরিবর্তে এ ষড়যন্ত্রকে বোঝা উচিত, যদি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমেরিকার সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া বেঁচে থাকা শিখে যায়, তাহলে পুরো ইসলামি জগৎ জেগে উঠতে পারবে। আমি ওই তুুর্কিকে বেশ গভীরভাবে দেখলাম। তিনি কোনো আবেগপ্রবণ ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি আমাকে ওই কথায় বলছিলেন, যা কয়েক শ’ বছর আগে মাওলানা রুমি রহ: তাকে বলেছেন। মাওলানা রুমি রহ:-এর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে এ কথা আল্লামা ইকবালও আমাদের বলেনÑ ‘হুস নে কার দিয়া টুকরে টুকরে নাওয়ে ইনসান কো/উখুওওয়াত কা বাঁয়া হো জা, মুহাব্বাত কি যুবাঁ হো জা/ইয়ে হিন্দি, ওহ খোরাসানি, ইয়ে আফগানি, ওহ তুরানি/তু আয় শারমিন্দে সাহেল! উছাল কার বে কারাঁ হো জা।’ Ñউচ্চাকাক্সক্ষা মানবজাতিকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে, ভ্রাতৃত্বের বাণী হয়ে যাও, ভালোবাসার ভাষা হয়ে যাও। এ ভারতীয়, ও খোরাসানি, এ আফগানি, ও তুরানি, (এ বিভেদ করো না।) হে লজ্জিত উপকূল, উছলে গিয়ে অকুল হয়ে যাও।


আমি জানি কিছু বুদ্ধিজীবী আমার কথায় ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করবেন। বলবেন, ট্রাম্পের ধমকের জবাব রুমি রহ: ও ইকবালের দর্শনে তালাশ করা আত্মপ্রবঞ্চনা। তবে কি ট্রাম্পের ধমকের সামনে মাথা নুইয়ে দেয়া আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? রুমি রহ: ও ইকবাল পাকিস্তানকে আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্কের সাথে যে বন্ধনে বেঁধেছেন, ওই বন্ধনকে মজবুত করুন। ওই পুরনো সম্পর্ককে নিজেদের নতুন পররাষ্ট্রনীতি বানালে ওয়াশিংটন আমাদের ‘ইয়া হজরত মাওলানা’ থাকবে না এবং আমরা গোলামি থেকে মুক্তি পেয়ে যাবো। 


পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৯ আগস্ট, ২০১৭ থেকে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫