ঢাকা, শুক্রবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

অপরাধ

জঙ্গল থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার গল্প

পর্ব-২

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১০:৩৬


প্রিন্ট
র‍্যাবের কাছে আত্মসমর্পণের আগে।

র‍্যাবের কাছে আত্মসমর্পণের আগে।

সুন্দরবনকে শুধুই একটি ম্যানগ্রোভ অরণ্য হিসেবে বিবেচনা করলে এর অর্থকরী এবং রাজনৈতিক দিকটি আপনার নজর এড়িয়ে যেতে পারে। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা।

এই অরণ্যের আশেপাশে যেসব জনপদ রয়েছে সেখানকার বাসিন্দা কয়েক লাখ মানুষ সুন্দরবন এবং সংলগ্ন উপকূলের ওপর নির্ভরশীল। তারা অনেকটা নিজের প্রাণ হাতে নিয়েই প্রতিদিন বনে ঢোকেন। বাঘ, সাপ, নানা ধরনের কীটপতঙ্গ এবং পানিতে কুমীর ও কামটের সাথে লড়াই করে তাদের টিকে থাকতে হয়।

ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটাতে সম্প্রতি আমি সামিল হয়েছিলাম একজন মৌয়ালের সাথে। সুন্দরবনে কিভাবে মধু সংগ্রহ করা হয় তা সরেজমিনে দেখাই ছিল উদ্দেশ্য। স্বীকার করতে লজ্জা নেই ওরকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আমি দ্বিতীয়বার সামিল হবো কি না, তা নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে।

বনের ভেতর রয়েছে ডজন ডজন খাল যেগুলো মাছে ভরপুর। সরকারের কাছ থেকে পারমিট নিয়ে (অনেক সময় অবৈধভাবেও) স্থানীয় জেলেরা এই খালগুলোতে মাছ ধরেন।

এদের কাছ জলদস্যুরা নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। এর পাশাপাশি যারা জঙ্গলে অবৈধভাবে গাছ কাটে কিংবা কাঁকড়া শিকার করে তারাও জলদস্যুদের আয়ের একেকটা উৎস।

বনের বাইরে, যেসব ট্রলার বঙ্গোপসাগরের উপকূল জুড়ে মাছ ধরে তারাও জলদস্যুদের নিয়মিত শিকার।

উপকূলে জলদস্যু সমস্যা নিয়ে মংলায় কথা হচ্ছিল ঐ অঞ্চলের একজন প্রধান মাছ ব্যবসায়ী বুলবুল আহমেদের সঙ্গে। হাজার ছয়েক লোক তার অধীনে কাজ করে।

তিনি জানালেন, একটা সময় ছিল যখন ব্যবসায়ীরা জাল বিক্রি করে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছিল। কারণ জলদস্যুদের হাতে পড়লেই জেলেদের অপহরণ করা হতো।

‘ট্রলার ছিনতাই করা হতো। মাঝিদের আটক করা হতো লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে জেলে, ট্রলার এবং জাল ফেরত আনতে হতো।’ তিনি বলছেন- ‘মাছ থাকে সাগরে, আর জেলেরা সাগর থেকে খালি হাতে ফিরে এলে লোকসান হয় সবগুলো পক্ষের। যে ব্যবসায়ী তিন মাসে ৬০-৭০ লাখ টাকা খরচ করেন তার জন্য জলদস্যুরা তো মূর্তিমান আতঙ্ক।’

দস্যুরা যখন বিশেষভাবে তৈরি দ্রুতগামী স্পিডবোট নিয়ে মাছ ধরার ট্রলারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাকে দস্যুদের ভাষায় বলা হয় ‘কোপ মারা।’

জলদস্যু দলগুলো গড়ে বছরে তিন থেকে চার বার এ ধরনের কোপ মারতো। প্রতিবার কোপে তারা ২০ থেকে ১০০ জন জেলেকে জিম্মি হিসেবে অপহরণ করতো।

কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্রের হিসেব অনুযায়ী, জিম্মিদের কাছ থেকে গড়ে মাথাপিছু দুই লাখ করে টাকা আদায় করা হলে প্রতিবার হামলা থেকে এসব দলের আয় হয় গড়ে প্রায় দুই কোটি টাকা।

কিন্তু সেই আয় জলদস্যুরা একা ভোগ করতো না। লুঠের বখরা চলে যায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার স্থানীয় কিছু শক্তিশালী মহলের হাতে। এই জাল রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত প্রসারিত বলেও ওয়াকিবহাল মহলের সন্দেহ।

মাছ ব্যবসায়ী বুলবুল আহমেদকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, যেখানে কোটি কোটি টাকার স্বার্থ জড়িত রয়েছে সেখানে জলদস্যুতা কি কখনও সম্পূর্ণভাবে নির্মূল সম্ভব?

বর্তমান দলগুলোর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সুন্দরবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, নতুন কোনো গ্রুপ যে সেটা পূরণ করবে না সেই নিশ্চয়তা কোথায়?

‘আমি মনে করি এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম। কারণ, এখন যারা আত্মসমর্পণ করেছে তারাই হবে ভবিষ্যতের দৃষ্টান্ত। অবশ্য সরকারকেও ঠিক লাইনে থাকতে হবে। আর নতুন কোনো দল তৈরি হলে তার জন্য সরকারের যেসব সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন ব্যবসায়ীরা তাদের নিজের স্বার্থেই সেটা দেবে।’

সুন্দরবনের জলদস্যুদের আয়ের একটি বিশেষ ক্ষেত্র ছিল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নিধন। বিদেশি খরিদ্দারের চাহিদা মতো জলদস্যুরা বাঘ শিকার করে মোটা টাকার বিনিময়ে সেই চামড়া, নখ, দাঁত, লিঙ্গ এবং হাড় পাচার তুলে দেয় পাচারকারীদের হাতে।

কিন্তু আত্মসমর্পণকারী যেসব জলদস্যুর সাথে আমি কথা বলেছি তারা প্রত্যেকেই এই অভিযোগ তুমুলভাবে অস্বীকার করেছেন। খুন-জখম, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের কথা তারা অবলীলায় স্বীকার করলেও বাঘ নিধনের কথা তারা একেবারেই স্বীকার করতে চাননি।

এর পেছনে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও কোনো জলদস্যু কিংবা স্থানীয়ভাবে অন্যরাও আমাকে দিতে পারেনি।

বাগেরহাটে সুন্দরবন পূর্ব অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো: সাইফুল ইসলাম বলছিলেন, জলদস্যুরা কুকুর বা শুয়োর মেরে তাকে বিষ-টোপ হিসেবে ব্যবহার করে।

‘তারা এই কাজে বন্দুক ব্যবহার করতে চায় না। কারণ বিষ-টোপ দিয়ে বাঘ হত্যা করা একটা নীরব উপায়। বন্দুক ব্যবহার করলে মানুষ তাদের অবস্থান জেনে যেতে পারে,’ বলছেন তিনি।

বন বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু বাগেরহাট রেঞ্জেই ২০০২ সালে থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মারা পড়েছে ১৯টি বাঘ। এর মধ্যে একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে সাইক্লোন সিডরের সময়, চারটি মারা পড়েছে গ্রামের মানুষের হাতে, চারটি বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

কিন্তু ১০টি বাঘ মারা পড়েছে, বন বিভাগের ভাষায়, ‘দুষ্কৃতকারীদের হাতে’। বন বিভাগ ২০১৫ সালে যে বাঘ জরিপ চালিয়েছিল তাতে বলা হয়েছে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে একশোটির সামান্য কিছু বেশি বাঘ রয়েছে।

সেই হিসেবে ২০০২ সাল থেকে মোট ১০ শতাংশ বাঘ মারা পড়েছে অবৈধ শিকারিদের হাতে।

বন কর্মকর্তা মো: সাইফুল ইসলাম বলছেন, ‘অবৈধ বাঘ শিকারের গডফাদাররা সবাই চিহ্নিত। এরা শহরেই থাকে। কিন্তু যতদিন এদের দমন করা না যাবে ততদিন সুন্দরবনের বাঘ নিরাপদ না।’

সুন্দরবনসহ সমগ্র উপকূল অঞ্চলে জলদস্যু তৎপরতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে দস্যুতা থেকে লাভবান হয়েছে একটি বিশেষ চক্র। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় যেসব দস্যু এরা সেই চক্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ। আর এই চক্রের একটি বড় অংশ থাকে জঙ্গলের বাইরে -- লোকালয়ে। এরা ভদ্রলোক।

এরাই গ্রামের দুর্বল ও নিরীহ জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে জলদস্যু তৈরি করে, তাদের অস্ত্র ও রসদপত্র সরবরাহ করে এবং দস্যুতা থেকে আয়ের একটি বড় অংশ কেটে নেয়। সেই টাকা ভাগাভাগি হয় ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করলেও এরা এখনও আইনের নাগালের বাইরেই রয়ে গিয়েছে।

কিন্তু ইতোমধ্যে আইনের হেফাজতে নিজেদের তুলে দিয়েছে যেসব জলদস্যু তাদের ভাগ্যে কী রয়েছে?

এ ব্যাপারে নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত নয় বলেই সরকারি সূত্রগুলো থেকে জানা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেশ কয়েকবার জানিয়েছেন যে, জলদস্যুদের পুনর্বাসনের প্রশ্নে সরকার আন্তরিক।
র‍্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে জলদস্যু পরিবারগুলোকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

র‍্যাবের যে ইউনিটটি জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের দায়িত্ব পালন করছে সেই র‍্যাব-৮ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো: আনোয়ারুজ্জামান বলছিলেন, ‘আমরা তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছি। ইতোমধ্যে অনেকেই দোকান খুলেছেন, অটোরিকশা চালাচ্ছেন।’

‘এদের মধ্যে যারা ইচ্ছুক তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যাপারেও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। তারা যাতে আবার আগের জীবনে ফিরে না যায় তার জন্য দেয়া হচ্ছে মোটিভেশন।’

কিন্তু জলদস্যুদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা এবং তাদের আত্মসমর্পণের আইনগত ভিত্তি ঠিক কী সে সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা, কিংবা জলদস্যুরা কেউই ব্যাখ্যা করতে পারেননি যে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোন কোন আইন কার্যকর রয়েছে।

জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সাংবাদিক মোহসীন-উল হক উল্লেখ করেন, পুরো প্রক্রিয়াটি দাঁড়িয়ে রয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। একদিকে রয়েছে জলদস্যুরা, অন্যদিকে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক সরকার। এর মধ্যে কোনো একটির আস্থা নষ্ট হলে পুরো প্রক্রিয়াটি বিপন্ন হবে।

‘বিশেষভাবে র‍্যাব, কোস্টগার্ড এবং পুলিশ - এই তিন বাহিনীর মধ্যে জলদস্যুদের ব্যাপারে অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখতে হবে’, বলছিলেন তিনি।

‘পাশাপাশি, দস্যুদের পুনর্বাসনের প্রশ্নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীদেরও বড় একটা ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তাদের সেটা করতে দিতে হবে।’

‘আপনি লক্ষ্য করবেন, এই সাধারণ ক্ষমায় জলদস্যুদের অপরাধের জন্য কিন্তু কোনো দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি। অর্থাৎ খুনের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে তারা ইতোমধ্যে জেলে ঢুকেছে,’ ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি- ‘সরকার জলদস্যুদের শুধু এটুকুই বলেছে: তোমরা এখন আত্মসমর্পণ করো, বাকিটুকু আমরা দেখবো।’

বেশ ক’জন সাবেক জলদস্যুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালন না করলে তারা কি আবার জঙ্গলে ফিরে যাবেন? সবাই একবাক্যে বলেছেন- না, সেটা তারা করবেন না। সরকারি প্রচেষ্টার ওপর তাদের শতভাগ আস্থা রয়েছে। এখনও।

‘আমাদের আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। ঐ জীবনে আর ফিরে যেতে চাই না। আর সেই আশা করেতো আমরা আত্মসমর্পণ করিনি,’ বলছিলেন জলদস্যুদল মাস্টার বাহিনীর প্রধান মোস্তফা শেখ।

‘মৃত্যু হলেও আমরা এখানেই থাকবো। অন্তত বাবা-মা আমাদের লাশগুলো দাফন করতে পারবে। ওখানে থাকলে তো লাশ শিয়াল-কুকুরে খাবে। ওখানে যে যন্ত্রণা তার চেয়ে এখানে মৃত্যু অনেক ভালো।’

মি. শেখসহ সুন্দরবনের বহু জলদস্যুর সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তীব্র এক অস্তিত্বের সঙ্কট তাদের ভাবনাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তারা এখন চাইছেন শুধুই একটু বেঁচে থাকতে।

প্রতিবেদন : মাসুদ হাসান খান, বিবিসি বাংলা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫