ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

সম্রাট আওরঙ্গজেবের যে চিঠি আজো তোলপাড়ের সৃষ্টি করে

প্রফেসর মোহাম্মদ আলী

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৯:১৬


প্রিন্ট
সম্রাট আওরঙ্গজেব

সম্রাট আওরঙ্গজেব

আওরঙ্গজেব পিতা শাহজাহান ও তার সহোদরদের সাথে উত্তরাধিকার প্রশ্নে দীর্ঘ যুদ্ধ ও রক্তাক্ত কলহের পর ১৬৫৮ সালে হিন্দুস্তানের সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুদীর্ঘ ৫০ বছর বিচক্ষণতা, শাসনকর্মে ন্যায়নিষ্ঠা ও সামরিক সাফল্যের সাথে রাজত্ব করেন। তিনি কখনো তার শৈশব ও প্রাক-যৌবনকালে প্রাপ্ত শিক্ষাকে সম্রাট হিসেবে তার সাফল্যের ভিত্তি বলে মনে করতেন না। তিনি কখনো তার এ মনোভাব গোপন করতেন না। সিংহাসনে আরোহণের স্বল্পকাল পরে তার এক তারুণ্যের শিক্ষক তার কাছে খেলাত ও অর্থসম্মানীর প্রত্যাশায় আগমন করলে সম্রাট আওরঙ্গজেব লিখিতভাবে পত্রের মাধ্যমে তাকে কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন, তিনি ওই শিক্ষকের (সম্ভবত মোল্লা শাহে) কাছে মোটেই ঋণী নন। পত্রটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো। উদ্ধৃত পত্রটিকে বলা যেতে পারে- তরুণদের জন্য অবশ্যপাঠ্য প্রকৃত শিক্ষাসম্পর্কিত একটি সন্দর্ভ।

 

‘ওস্তাদজি, আপনি আমার কাছে কী প্রত্যাশা করতে পারেন? আপনি কি যুক্তিসঙ্গতভাবে বলতে পারেন- আমি আপনাকে আমার দরবারে মুখ্য ওমরাহ নিযুক্ত করি? আপনি যদি আমাকে সত্যিকার অর্থে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে পারতেন, তাহলে আপনার পক্ষে এ ধরনের অনুরোধ অবশ্যই সঙ্গত হতো। কেননা আমি বিশ্বাস করি, একজন সুশীল ও সুশিক্ষিত সন্তানকে বাবার মতোই তার শিক্ষকের কাছে কৃতজ্ঞ ও বাধিত থাকতে হয়। কিন্তু কোথায় আপনার সে শিক্ষা? আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন ইউরোপ তেমন কিছু নয়। ওই মহাদেশের বড় রাজাদের সম্পর্কে আপনি আমাকে কিছুই বলেননি। বলতে পারেননি পর্তুগালের মহান নৃপতির কথা, তার পরে ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনের মহান রাজন্যবর্গের কথা। আপনি তাদেরকে আমার কাছে উপস্থাপন করেছিলেন- আমাদের সামন্ত রাজা-মহারাজাদের সমগোত্রীয়। আপনি আমাকে বলেছিলেন, হিন্দুস্তানের বাদশাহদের তুলনায় তারা কিছুই নয়। হিন্দুস্তানের সম্রাট তাদের চেয়ে অনেক উচ্চতায় আসীন। তারা সবাই একসাথেও হিন্দুস্তানের বাদশাহর সমতুল্য নয়। আপনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন, সারা বিশ্বের রাজন্যবর্গ- ইরান, তুরান, চীন প্রভৃতি দেশের নৃপতিরা হিন্দুস্তানের বাদশাহের নাম শুনে কাঁপতে থাকে ইত্যাদি। কী চমৎকার আপনার ইতিহাস আর ভূরাজনীতি জ্ঞান!

আপনার শেখানো উচিত ছিল, কিভাবে এসব দেশকে আমি বিশেষায়িত করতে পারি। অর্থাৎ বিশেষভাবে এক একটি দেশকে চিহ্নিত করতে পারি, তাদের নিজ নিজ দেশের শক্তির উৎস কোথায় নিহিত, তাদের নিজ নিজ দেশের রাজনীতি, তাদের শাসনব্যবস্থা, তাদের দেশের আইনব্যবস্থা, নিয়মনীতি, ধর্মীয় বিধিবিধান, সরকারব্যবস্থা, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি। এসব দেশের বাস্তবভিত্তিক সঠিক ইতিহাস অনুশীলনের মাধ্যমে শেখানো উচিত ছিল সেসব দেশের উত্থান, অগ্রগতি, অবক্ষয়ের কথা। শেখানো উচিত ছিল সেসব দেশের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ বিপ্লব ঘটেছিল কি না, হয়ে থাকলে তার কারণগুলোর বিশ্লেষণ, সে সবের পূর্ণ বিবরণ।

সেসব তো দূরের কথা, আমার মহান পূর্বপুরুষ যারা এ দেশ জয় করে এক মহান সাম্রাজ্য তথা সভ্যতার পত্তন করেছিলেন সেসব মহান বিজয়ীর সঠিক বংশপরিচয়, নামধাম, তাদের রণকৌশল, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে তাদের অনুসৃত রীতিনীতি- তাদের এসব কাহিনী আপনার শিক্ষার বিষয় ছিল না। আপনি আমাকে আরবি ভাষা পড়তে ও লিখতে শিখিয়েছিলেন। তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আরবি ভাষা শিক্ষায় আমার যথেষ্ট সময়ের অপচয় ঘটেছিল। এ ভাষায় পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জনে ১০ থেকে ১২ বছর সময় ব্যয় করতে হয়। আমার তো আরবি ভাষার বড় পণ্ডিত বা ব্যাকরণবিদ হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। আরবি ভাষার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য ভাষার উপাদানও এর মধ্যে এসে পড়ে, যা না জানলেও আমার কোনো ক্ষতি ছিল না। বড় বড় গুরুগম্ভীর শব্দ ও শব্দগুচ্ছ আয়ত্ত করার কোনো আগ্রহও আমার ছিল না, ছিল না কোনো প্রাণের তাগিদ। অথচ এ দীর্ঘ সময়কালে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, যা আমি অধ্যয়ন ও আয়ত্ত করতে পারতাম।

 

আপনি কি জানেন না, শৈশব তথা বাল্যকাল জীবনের এমন এক সময় যখন মানুষের স্মরণশক্তি যেমন প্রখর ও তীক্ষè থাকে, তেমনি ওই সময়ের শিক্ষা ও উপদেশ মনের গভীরে ছাপ ফেলে চির জীবনের জন্য এবং মনকে চির উন্নত করে ভবিষ্যতের উন্নত কর্ম ও কল্পনার জন্য। মানবসন্তান কি আরবি ছাড়া, আপন মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব আইন ইত্যাদি বিষয় শিখতে পারে না। আপনি আমার বাবা সম্রাট শাহজাহানকে বলেছিলেন আমাকে দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা দেবেন। সত্য বটে, দর্শনের নামে বহু বছর ধরে আমাকে অলীক, কাল্পনিক, অবাস্তব অনেক কাহিনী শুনিয়ে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন এবং আমার অপরিণত মনকে এমন সব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতেন, যার কোনো প্রয়োজন বা আবেদন সমাজে নেই। এসব আমি অল্পই বুঝতাম আর সহজে যেতাম ভুলে। আপনার দর্শনের শিক্ষার এটুকুই কেবল আমার মনে আছে, খুব গুরুগম্ভীর, দুর্বোধ্য শব্দ কণ্টকিত, দীর্ঘ বাক্য সমারোহ যা সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান মানুষকেও সহজে ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত করতে পারে। এ ছিল আপনার মতো আহাম্মক, মূঢ়, পণ্ডিতমন্য ব্যক্তির নিজের অজ্ঞতা ও মূর্খতা ঢাকার অপচেষ্টা মাত্র।
ওস্তাদজি, আপনি যদি দর্শনের সেই মৌলিক শিক্ষা আমাকে দিতে পারতেন যা দিয়ে আমি আমার মনকে সদা ন্যায়বিচারে উজ্জীবিত রাখতে পারি, আমার মননে যুক্তিগ্রাহ্যতাই হয় বড় মানদণ্ড।

আপনি কি আমাকে সেই শিক্ষা দিয়েছিলেন যার সাহায্যে আমি ভাগ্যের উত্থান-পতনকে অগ্রাহ্য করতে পারি, যেন আমার চিত্তবৃত্তির এমন স্থিতিশীল অবস্থান হয়, যার পরিণতিতে আমি সম্পদে অকারণ উল্লসিত না হই, বিপদে যেন না হই অবনত। আপনি যদি আমাকে সেই শিক্ষা দিতেন যার ফলে আমার আত্মোপলব্ধি হতো- ‘আমি‘ কে বা ‘আমি’ কি? বস্তুজগতের মূল সূত্রগুলো যেসবের জ্ঞান আমাকে বিশ্ব পরিচয়ে সহায়তা করত, বিশ্বজগতের নানা অংশের গতিপ্রকৃতিতে নিয়মশৃঙ্খলা বিরাজমান তা আমার বোধগম্য হতো। তাহলে আমি বুঝতাম, আপনি প্রকৃতই আমাকে দর্শনশাস্ত্রে শিক্ষিত করেছেন। তাহলে আমি নিজেকে মহাবীর আলেক্সান্ডারের চেয়ে অধিক ভাগ্যবান মনে করতাম এবং ভাবতাম তিনি দার্শনিক অ্যারিস্টটলের কাছে যেমন ঋণী ছিলেন- আপনার কাছে আমার ঋণ আরো বেশি বলে আমি মনে করতাম এবং আমার উচিত হতো, আলেক্সান্ডার যেমন তার গুরুকে পুরস্কৃত করেছিলেন, তার চেয়ে আরো বেশি আপনাকে আমার সম্মানিত করা উচিত হতো।

না, আপনি আমাকে সে শিক্ষা দিতে পারেননি। আমাকে নিত্য তোষামোদ না করে আপনার কি উচিত ছিল না আমাকে বুঝিয়ে দেয়া রাজা-প্রজার পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, রাজার কর্তব্য প্রজার প্রতি, আমার প্রজার আনুগত্য ও কর্তব্য রাজ্যেশ্বরের প্রতি। যেহেতু আমার জন্ম সম্রাটের পুত্র হিসেবে- আপনার কি এ বিবেচনা থাকা উচিত ছিল না যে, একদিন হয়তো রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাকে জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে সিংহাসনের অধিকারী হতে হবে।

আমার হয়ে আপনি কখনো কি একবারও ভেবেছিলেন, যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে একটি নগরে কিভাবে অবরোধ করতে হবে অথবা একটি সামরিক বাহিনীকে কিভাবে রণসজ্জায় সজ্জিত করা যায়? আমাকে এসব শিখতে হয়েছে অন্যদের কাছে, আপনার কাছে নয়।
ওস্তাদজী, ফিরে যান, আপনি যে গ্রাম থেকে এসেছেন, সেখানে। আর কাউকে বলবেন না, আপনি কী ছিলেন বা আপনার কী হয়েছে।’


সূত্র : A Treasury of the World`s Great Letters
Ed : M. Lincoln Schuster, New York 1960

লেখক : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫