ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

ধানক্ষেতে সন্তান জন্ম দিচ্ছে রোহিঙ্গা মা-বোনেরা : এক তরুণের করুণ চিঠি

আলজাজিরা

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৮:১২


প্রিন্ট
সন্তান কোলে এক রোহিঙ্গা মা

সন্তান কোলে এক রোহিঙ্গা মা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এক বাসিন্দা তাদের অবস্থা সম্পর্কে আলজাজিরার প্রতিনিধি ফয়সাল ইদ্রিসের সাথে কথা বলেছেন। দেশটিতে তারা প্রতিনিয়ত যেসব সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছেন সেসব বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন। প্রতিনিয়ত তারা সেখানে বৈষম্য, সহিংসতার শিকার হয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন। সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।


‘২৪ বছরের জীবনে আমার মনে হয়েছে রাখাইন রাজ্যের মুক্ত বাতাসে আমি বন্দীর জীবনযাপন করছি। মা-বাবার মতো আমিও মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করেছি; কিন্তু মায়ের গর্ভে আসার আগেই আমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়। জাতিগত পরিচয়ের কারণে আমার চলাফেরা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেশা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। আমাকে সরকারি চাকরিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অধিকার দেয়া হয়নি, কোনো দিন রাজধানী ইয়াঙ্গুনে যেতে দেয়া হয়নি এমনকি রাখাইন রাজ্যের বাইরেই যেতে দেয়া হয়নি কোনো দিন।


তিনি বলেন, জঘন্যতম এক বৈষম্যের শিকার আমি, এর কারণ আমি রোহিঙ্গাÑ একজন রোহিঙ্গা মুসলিম। বছরে পর বছর ধরে আমাদের লোকদের মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করতে দেয়া হয়নি, উল্টো প্রতিনিয়ত তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। সরাসরি গুলি চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। চোখের সামনে বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার শিকার আমরা।


ক্ষুধার্ত বিড়ালের খাঁচায় একটি ইঁদুরকে ঢুকিয়ে দেয়া হলে যেমনটি হয়, রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি তেমনই। আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হচ্ছে পালিয়ে যাওয়া নয়তো কেউ এসে আমাদের সাহায্য করবে সেই আশা করা। আমাদের যারা এখনো টিকে আছে তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে রাখাইন সমাজব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলছে। এখানে আমাদের ‘কালার’ বলে ডাকা হয়। এটি একটি মুসলিমবিদ্বেষী গালি, যা বৌদ্ধরা ব্যবহার করে। বুড়ো থেকে শিশুÑ কেউ এই নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারে না। স্কুল ও হাসপাতালগুলোতেও আমাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বৌদ্ধরা আমাদের বয়কটের জন্য প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তারা বলেন, ‘শুধু বৌদ্ধদের দোকান থেকে কিনবে। তোমরা বৌদ্ধদের একটি পয়সা দিলে তা থেকে তারা প্যাগোডা নির্মাণে সহায়তা করবে, আর মুসলিমকে একটি পয়সা দিলে তা দিয়ে তারা মসজিদ বানাবে।’ এভাবে বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা আমাদের আক্রমণ করে।


২০১৫ সালে ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে যখন নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি পার্লামেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন, আমাদের মধ্যে পরিবর্তনের আশার সঞ্চার হয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম এই নেত্রী আমাদের ওপর বৈষম্য ও নির্যাতন দূর করবেন। কিন্তু বেদনাদায়ক হচ্ছে, তিনি আমাদের হয়ে কথা বলার পরিবর্তে আমাদের দুর্ভোগকে দেখেও না দেখার ভান করছেন। তার নীরবতাই প্রমাণ করে এই সহিংসতায় তার সমর্থন রয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের এই শেষ আশাটিও মরে গেছে।


২০১২ সালে ভয়াবহতম এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অনেক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। এক লাখ ৪০ হাজার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০১৬ সালের শেষ দিকে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। গুলি, গলা কর্তন আর জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় পরিবারের সামনে। গত অক্টোবরের ওই সহিংসতার ঘটনাই হয়তো আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি নামক বিদ্রোহী সংগঠনের জন্ম দিয়েছে, যারা কতিপয় লোক এই সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা জানতো আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লাঠি ও পাথর দিয়ে কোনো প্রতিরোধই করতে পারবে না কিন্তু তবু তারা চেষ্টা করেছে।


আপনারা যে সহিংসতাকে ‘দুই পক্ষের সঙ্ঘাত’ বলছেন, তা আসলে সত্যি নয়। আমরা জীবন বাঁচাতে পালাচ্ছি, আমাদের মা-বোনেরা ধানক্ষেতে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছে। পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা, নারীদের লাশ ভেসে উঠছে নদীতে, এগুলো কখনোই সমযুদ্ধের লক্ষণ নয়। আমাদের নির্মূল করা হচ্ছে। যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, আমার গণহত্যার শিকার হতেই থাকব। আর আপনারা তা চেয়ে চেয়ে দেখবেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫