ঢাকা, শুক্রবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

শিল্প ও সাহিত্য

নজরুলের ছেলেবেলা অনুপ্রেরণার অসাধারণ উৎস

আনিসুর রহমান এরশাদ

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৯:৪৩ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ২০:৪১


প্রিন্ট

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমার প্রিয় কবি। মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক বলিষ্ঠ প্রতিভা, যুগস্রষ্টা, নবজাগরণ বা রেনেসাঁর কবি। এই সংগ্রামী কবির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তার ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার আকুতি ছিল।

কবি নজরুলের পূর্ব পুরুষগণ এক সময় পাটনায় বসবাস করতেন; সম্রাট শাহ আলমের সময় চুরুলিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন, তারা বাদশার দরবারে চাকুরি করতেন। বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসরাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ, মাতা: জাহেদা খাতুন, পিতামহ: কাজী আমানুল্লাহ, মাতামহ: তোফায়েল আলী।

ফকির আহমদের বাড়ির পূর্বদিকে ছিল রাজা নরোত্তম সিংহের গড়। আর দক্ষিণে ছিল পীরপুকুর। এই পুকুরের পূর্বপাড়ে হাজী পাহলোয়ানের মাজার শরীফ এবং পশ্চিমে একটা ছোট্ট মসজিদ। নজরুলের পিতা ও পিতামহ সারা জীবন এই মাজার শরীফ ও মসজিদের সেবা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাংলা কাব্য ও ফার্সি ভাষার প্রতি অনুরাগ তিনি পিতা ও পিতৃব্য কাজী বজলে করীমের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।

কাজী নজরুল বাল্যকালেই পিতৃহীন হন। কাজী ফকির আহমদের দুই সংসারে সাত ছেলে ও দুই কন্যা। কাজী নজরুলের ভাইবোনের সংখ্যা ছিল চারজন। অগ্রজ কাজী সাহেব জান, কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন, ভগ্নী উম্মে কুলসুম এবং কবি স্বয়ং। ফকির আহমদের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর চারটি পুত্রের অকালমৃত্যুর পর তার জন্ম হয় বলে, তার ডাকনাম রাখা হয় দুখু মিঞাঁ। পিতার মৃত্যুর পর কাজী পরিবার অশেষ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিপতিত হয়। তাই বাল্যকাল থেকেই কবিকে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়।

নিম্ন প্রাইমারি পরীক্ষা উত্তীর্ণ নজরুলকে  মাজার ও মসজিদ দেখাশোনা এবং গ্রামে ধর্মীয় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। এভাবে তিনি অর্জন করেন ধর্মীয় জ্ঞান ও মুসলিম সমাজ সম্পর্কে ধারণা। নজরুলের প্রথম বয়সে 'সালেক' গল্পে মুক্তি কবিতায় এবং রোগাক্রান্ত হবার পূর্বে লিখিত কোনো কোনো রচনায় যে অলৌকিকতার সন্ধান পাওয়া যায় তা হয়তো বাল্যের ঐ সংসর্গ ও অভিজ্ঞতার ফল।

মসজিদে ইমামতিও করতেন প্রখর মেধাবী নজরুল। সপ্রতিভ ও চঞ্চল প্রকৃতির নজরুল পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেন। যাত্রা, পালাগান, কথকতা কিংবা কুরআন পাঠ অথবা লেটো গান যেখানে হতো দুরন্ত নজরুল গভীর আগ্রহ নিয়ে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন। এমনকি তিনি বাউল-সুফী-দরবেশ ও সাধু-সন্ন্যাসীর সাথে বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও অনায়াসে মেলামেশা করতে পারতেন। তার আচার আচরণে ঔদাসীন্য লক্ষ করে লোকে তাকে 'তারাক্ষেপা' বলেও ডাকতো। কেউ কেউ আদর করে বলতো নজর আলী।

কবি নজরুল চঞ্চলমতি ছিলেন বলে কোথাও থিতু হতে পারেননি। আজ হেথা কাল হোথা পরশু অন্যকোথাও  দূরে বেড়িয়েছেন আর মিলেছেন বারো রকম মানুষের সাথে এবং সঞ্চয় করেছেন অদ্ভূত সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা। তার পড়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রবল ছিল, তাই যেখানে যা পেতেন পড়ে ফেলতেন সাগ্রহে। এভাবেই তিনি বাংলা, ইংরেজি ও ফার্সি সাহিত্য থেকে রস আহরণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।

নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক উত্তীর্ণ হয়ে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন এবং পাশ্ববর্তী গ্রামে মোল্লাগিরিও করতেন। দু'মুঠো ডাল-ভাতের সংগ্রামে নজরুল দু'বছর (১৯০৯-১৯১০) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এগারো বছর বয়সে কবি রোজগারের জন্য লেটো দলে প্রবেশ করেন এবং লেটোদলে গান ও নাটক রচনা করে সামান্য অর্থোপার্জন করতেন।

লেটোদলে গান রচনাকালেই তার প্রতিভার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থাৎ নজরুলের কবি প্রতিভার প্রখরতা অনুমান করে গোদা কবি তাকে 'ব্যাঙাচি' বলে ডাকতেন এবং বলেছিলেন-"আমার ব্যাঙাচি বড় হয়ে সাপ হবে।" জনাব আনওয়ারুল ইসলাম বলেন: এ সময় তিনি কালে শকুনীবধ মেঘনাদধ, চাষার সঙ, রাজপুত্র, আকবর বাদশা ইত্যাদি পালাগান রচনা করেন।

কাজী নজরুল বাল্য- কৈশোর কালে দুষ্টুমিতেও কম যেতেন না। তার দুষ্টুমিতে গ্রামবাসী যখন অতিষ্ঠ এমনই এক সময়ে তিনি গ্রাম ত্যাগ করেন। নজরুলের এই সময় কিছুদিন (১৯১১) বর্ধমানের মাথরুন স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে লেখাপড়া করেছিলেন। তখন ঐ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। তিনি নজরুল সম্পর্কে লিখেছেন, "আমি ২৩ বছর বয়সে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে ঢুকি। তখনকার দিনে নজরুল পড়িত। ছোট সুন্দর ছনছনে ছেলেটি, আমি ক্লাস পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই আসিয়া প্রণাম করিত।''

কাজী নজরুল  কবিগানের আসরে যোগ দেন এবং পালাগান লিখতে শুরু করেন। গান লিখে সুরারোপ করতেন, এমনকি ঢাকঢোল বাজিয়েও গান গাইতেন। বর্ধমান জেলার অণ্ডালের ব্রাঞ্চলাইনের একজন বাঙালি খ্রিস্টান গার্ড সাহেব তাকে এক শীতের রাত্রিতে কবিগানের আসরে গান গাইতে শুনে মুগ্ধ হন এবং তার প্রসাদপুরের বাংলোতে বাবুর্চির কাজ দেন। গার্ড সাহেব ছিলেন অত্যন্ত মদ্যপ এবং সে কারণে নজরুলের যে গান শোনার জন্যে তাকে বিশেষভাবে কাজ দিয়েছিলেন তা শোনার অবকাশ ও সুযোগ প্রায়ই তার হতো না। কিছুদিনের মধ্যেই এক হাঙ্গামার সূত্রপাত হতেই নজরুল গার্ড সাহেবের চাকরি ছেড়ে দেন।

এরপর নজরুল আসানসোল ফিরে এসে আব্দুল ওয়াহেদের রুটির দোকানে কাজ শুরু করেন, খাওয়া-দাওয়া ছাড়া ১ টাকা মাইনে পেতেন। জনাব আজহার উদ্দিন খান বলেন, " নজরুল প্রসাদপুর থেকে আসানসোল ১৯১৩ সালের দিকে ফিরে এলেন। অপরিচিত জায়গায় গ্রামের ছেলে কি আর করেন স্টেশনের কাছেই হুগলী নিবাসী মুহম্মদ বখসের রুটির দোকানে পেটখোরাকী মাসিক এক টাকা বেতনে কাজ পেলেন।"

১৯১৭ সালে দশম শ্রেণির ছাত্র নজরুল যোগ দেন যুদ্ধে। তার কথায়, "আমি জীবনের তরঙ্গে তরঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছি, ক্লাসে ছিলাম ফার্স্টবয়, হেডমাস্টারের বড় আশা ছিল আমি স্কুলের গৌরব বাড়াব। কিন্তু এই সময় এলো ইউরোপের মুহাযুদ্ধ। একদিন দেখলাম এদেশ থেকে পল্টন যাচ্ছে যুদ্ধে। আমিও যোগ দিলাম সে পল্টনে।"

শৈশবে - খুকি ও কাঠবেড়ালী, লিচুচোর, ভোর হলো দোর খোল.......; কৈশরে কান্ডারী হুশিয়ার, তারুণ্যে বিদ্রোহী; সবমিলিয়ে নজরুল আমার ভাললাগা এক মানুষ। তাকে ভালবাসি, ভালবাসি তার লেখাকে। তার উদার মন, সৃষ্টিশীলতা, সৌন্দর্যবোধ ও ক্ষিপ্ততা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি এগিয়ে চলার শক্তি পাই। 

 

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫