ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

অন্যান্য

কান্ট্রি ব্রান্ডিং কী, কেন, কীভাবে?

আনিসুর রহমান এরশাদ

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৭:৩৬


প্রিন্ট

দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সম্ভাবনা, সফলতা, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি বিষয়সহ সার্বিক অবস্থা বিশ্বকে জানানোর মাধ্যমে কান্ট্রি ব্রান্ডিং করা যায়। ফ্রান্স মানেই মানুষ আইফেল টাওয়ারের নাম বলে, হল্যান্ড মানেই ফুলের দেশ বলে, জাপান মানেই ভূমিকম্পের সাথে লড়াই করে অপরাজেয় জাতি হিসেবে চেনে, চীন মানেই পরিশ্রমী জাতির নাম আসে। তেমনি বাংলাদেশ নিয়ে কান্ট্রি ব্রান্ডিং মানেই এমন কিছু করে দেখানো যাতে বাংলাদেশ মানেই সেই ব্রান্ডের নাম চলে আসে।

কান্ট্রি ব্রান্ডিং বা 'দেশ পরিচিতি' হচ্ছে, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সফলতা, বিশেষত্ব প্রভৃতি বিষয়সহ সার্বিক খবরা খবর বিশ্বকে জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও এ পদ্ধতিতে তাদের দেশের আন্তর্জাতিক প্রচারের কাজ এগিয়ে নিয়েছে অনেকদূর। হাজার দেশের ভিড়ে বিশেষ একটি দেশকে বিশ্বসাসীর মনে আস্থার জায়গা করে নেওয়াকে প্রাথমিকভাবে কান্ট্রি ব্রান্ডিং বলা যায়। কান্ট্রি ব্রান্ডিং হচ্ছে দেশ ও জাতির সুনাম বৃদ্ধি করা, অন্য দেশের উপর নিজের দেশের গুরুত্ব, মর্যাদা, সম্মান তথা শ্রেষ্টত্ব নিশ্চিত করা।

কান্ট্রি ব্রান্ডিং এর জন্য প্রচারণা দরকার, দরকার বিদেশিদের মনে আস্থা সৃষ্টি, দেশের আকর্ষণীয় দিগুলোকে বারংবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আর সেজন্যই ব্রান্ডিং এর সাথে প্রয়োজন বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার টুলসগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। তবে এই সব কিছুর সাথে জড়িত থাকে কতগুলো সৃষ্টিশীল মানুষ, নীতি, দৃষ্টিভঙ্গি, সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাগণ। সমন্বিত প্রচেষ্টাই দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি  তৈরিতে সহায়ক হয় এবং বিদেশিরাও ঐ দেশ ও জাতির সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী হয়, বাড়ে আস্থাশীলতা। সামগ্রিক কর্মকান্ড এমনভাবে পরিচালিত হতে হবে,যাতে দেশ ও জাতির ব্যাপারে  অন্য দেশ ও জাতির মাঝে বিদ্যমান নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা পাল্টে যায় এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে। বাংলাদেশকে বিশ্বে উচ্চকিত করে তোলতে এবং বাংলাদেশিদের মর্যাদার আসনে সমাসীন করতে সাহিত্য-সংস্কৃতি, খেলাধূলা, জ্ঞান-গবেষণা, বিনোদন, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানি, বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন- এসব নানান ক্ষেত্রেই হতে পারে।

সংস্কৃতির জন্য পর্যটন বাড়ে, সংস্কৃতির কারণে পণ্য ব্রান্ডিং হয়। চট্টগ্রাম মহানগরীকে সুইজারল্যান্ডের মতো করে সাজানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে কাতারি আরবিরা যত দূর জানেন সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ খুব গরীব একটা দেশ; এখানে জঙ্গিরা বোমা-বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, মানুষ পড়ালেখা জানে না, খেতে পায় না, বলার মতো কোনো রাস্তাঘাট নেই। এসব পরিবর্তন করতেই দরকার কান্ট্রি ব্রান্ডিং। এদেশের জনসংখ্যা অভিশাপ না হয়ে আশির্বাদ হতে পারে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ  পেলে। সোনালী আঁশ খ্যাত বাংলাদেশের পাটকে বিশ্বের দরবারে ব্রান্ডিং হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সঠিক রাষ্ট্রীয় নীতি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার হতে পারে সমগ্র পৃথিবী। মিরপুর এর শাড়ি পল্লীর উৎপাদিত বেনারসী শাড়িকে বলতে পারি মিরপুরি শাড়ি। বাংলাদেশের ভিতরে থাকা ব্রান্ডকে ইন্টারন্যাশনালি রিকগনাইজড করার উদ্যোগ নিতে পারি। শুধুমাত্র ট্যুরিজাম সেক্টরটাকেও যদি প্রোপারলি ইউটিলাইজ করা যায়, উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একদম প্রথম সারির দিকে নিয়ে আসা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সম্ভব।

তলাবিহীন ঝুড়ি আর প্রাকৃতিক দূর্যোগের তকমা ছাড়িয়েছি উদীয়মান বাঘ, গার্মেন্টস লিজেন্ড, ফিউচার আইটিল্যান্ড, হার্ট অব এশিয়া, ল্যান্ড অব ফ্রেন্ডশীপ এরকম পজেটিভ তকমা লাগাতে পারি। যতদিন না এটা করতে পারছি ততদিন আমাদের অর্জনগুলো ফিকে হয়ে যাবে আর ব্রান্ড বাংলাদেশতো দূর, বহুদূর। দক্ষ এবং কাজ জানা শ্রমিকেরা অদক্ষ শ্রমিকদের চেয়ে ৫ গুন বেশি রোজগার করে। তাই শুধু লাখ টাকা খরচ করে শ্রমিক পাঠানোর চেয়ে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে কাজ শিখিয়ে শ্রমিক পাঠাতে পারি। শ্রমিকদের দক্ষ হয়ে উঠার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারি।

মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ভারত ও সিঙ্গাপুর এর অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনকে কেন্দ্র করে। এ দেশের নদ-নদী, সবুজ-শ্যামল মাঠ, ফসলের ক্ষেত, ছায়াঢাকা গ্রাম, শান বাঁধানো পুকুর,গ্রামবাংলার মানুষের সরল জীবন বিশ্বের যে কোনো মানুষের হৃদয় আকৃষ্ট করে। তাই যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে শুধু পর্যটন শিল্প থেকেই বছরে হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি পর্যটনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণ কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশের পর্যটন স্পটের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ, পরিচর্যা আর প্রচারের অভাবে সবকিছুই পর্যটকদের অজানা রয়ে গেছে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের কান্ট্রি ব্রান্ডিং নির্মাণের বিষয়ে আরও ভার্চুয়াল জগৎকে বেছে নিতে হবে এবং এর সর্বোচ্চ উপযোগিতা কিভাবে অর্জন করা যায় সে দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে। এখানে ইংরেজি জানা লোকের অভাব দূর করতে হবে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্রান্ড চালু করতে পারি ব্যাপকভাবে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রচারণা বৃদ্ধি করতে পারি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে। ‘হার্ট অব এশিয়া’ হিসেবে প্রচারণা চালাতে পারি। গার্মেন্টস শিল্পে ‘উই আর নাম্বার ওয়ান’ হওয়ায় সচেষ্ট হতে পারি। দেশে নতুন এক সম্ভাবনা ইলেকট্রনিক কমার্স।

প্রাথমিক পর্যায়ে দেশে ১০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করলে তারা দশকোটি মানুষকে সেবা দেবে। শুধু চাকরি নয় নতুন প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদেরকে দেশে বিনিয়োগে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশের ব্যাপারে নেতিবাচক ইমেজ পরিবর্তন করতে হবে এবং সংগঠনগুলোকেও সহায়তা দিতে হবে। নিজেদের ‘লোকাল ব্র্যান্ড’ তৈরির দিকে আমাদের এখন নজর দেওয়া দরকার। শুধু বিদেশি পর্যটকদের নির্ভরতায় না থেকে ‘দেশকে চিনুন, দেশকে জানুন’; ‘ঘুরে দেখি বাংলাদেশ’ এরকম দেশাত্মক স্লোগানে দেশের মানুষকে দেশ দেখানোর লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচার চালানো দরকার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫