ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

বাংলাদেশীদের প্রশংসায় সবকিছু হারিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী রাশিদা

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৭:১৯


প্রিন্ট
রাশিদা

রাশিদা

মিয়ানমারে সরকারি বাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধদের নিষ্ঠুর আক্রমণে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা। পাহাড়, নদী, জঙ্গল পেরিয়ে যারা বাংলাদেশে এসে পৌঁছতে পারছেন তারা এখন এখানে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করছেন।

নয় দিন আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসেছেন রাশিদা। সহিংসতার আগে রাশিদার জীবন ছিল খুব সাধারণ। নিজেদের কিছু জায়গাজমি রয়েছে। সেখানেই চাষবাস করতেন তিনি। নিজের বাড়িতে স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল স্বস্তিতেই।

এখন সবকিছুই পেছনে ফেলে আসতে হয়েছে রাশিদাকে। চট্টগ্রামের টেকনাফ উপজেলার উখিয়ার উচি প্রাঙ্কে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে রয়েছেন তিনি। আল-জাজিরার সাংবাদিক কেটি আর্নল্ডকে বলেছেন ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। বলেছেন নিজের যন্ত্রণা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা।

২৫ বছরের রাশিদা বললেন, ‘আমার বাড়ি, জমি সব পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে ফিরলেও আর আমরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারব না। যখন সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামে গুলি চালানো শুরু করল, আমরা তাড়াতাড়ি সন্তানদের জঙ্গলে লুকিয়ে রেখে আসি। সন্তানেরা বনের মধ্যে বিপদের ভয় পাচ্ছিল। যখন বাড়ির কাছে গেলাম, দেখলাম, অনেক লোককে মেরে ফেলা হয়েছে।’

সেই ভয়ংকর সময়ের কথা মনে করে রাশিদা আরও বলেন, ‘জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলাম। সীমান্তের কাছে যাওয়া পর্যন্ত আট দিন ধরে কেবল হাঁটলাম। আমরা খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। গাছের পাতা ছাড়া খাওয়ার আর কিছু ছিল না। সন্তানেরা খেতে চাইছিল। কিন্তু আমরা সঙ্গে কোনো খাবার নিতে পারিনি।’

ছোট্ট একটি নৌকায় করে বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়েছেন বলে জানান রাশিদা। বলেন, ‘এটা খুব বিপজ্জনক ছিল। মনে হচ্ছিল নৌকাটি ডুবে যাচ্ছে। তাই তিন সন্তানকে শক্ত করে আঁকড়ে রেখেছিলাম।’

রাশিদা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে থেকে আমি খুশি নই। এক একর ধানি জমিতে আমরা গবাদিপশু চরাতাম। আমাদের গ্রামটি খুব সুন্দর ছিল। আমার বাড়ির কথা মনে পড়ে। এখানে আমরা অসহায়বোধ করি। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, সে নিয়ে কোনো ধারণা নেই।’

বাংলাদেশিদের প্রশংসা করে রাশিদা আরও বলেন, ‘এখানে আমরা যথেষ্ট সমর্থন পাচ্ছি না। বাংলাদেশের লোকজন খুবই দয়ালু। তারা আমাদের কাপড় ও খাবার দিচ্ছে। কিন্তু আমি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার দেখা পাইনি। যদি তারাও আমাদের সাহায্য করত। আমাদের খাবার প্রয়োজন। বিশ্ববাসীর কাছে আমার বার্তা হলো, আমরা শান্তি চাই। শান্তি ছাড়া আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’

মিয়ানমারে সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে ঢুকেছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো সহিংসতা নিরসনে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চির ওপর চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মিয়ানমার সেনারা ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে : ব্রিটিশ অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ

বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটেনের ১৫৭ জন এমপি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমার সরকারের ওপর আরো চাপ সৃষ্টির জন্য তাদের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনকে বুধবার লেখা এক পত্রে তারা বলেন, ‘সাম্প্রতিক ইতিহাসে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও মানবিক সঙ্কট নজিরবিহীন অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ফলে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ প্রয়োজন।’

তারা বলেন, সেনা অভিযানে সেখানে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ ফর ডেমোক্র্যাসি ইন বার্মার কো-চেয়ার রুশনারা আলী এমপি স্বাক্ষরিত পত্রে ব্রিটিশ এমপিরা আশা প্রকাশ করেন, অতীতের মতোই ব্রিটিশ সরকার মিয়ানমারের জনগণের বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় বিশ্ব নেতৃত্ব প্রদর্শন করবে। পত্রে বলা হয়, ‘এতে প্রতীয়মান হচ্ছে ২৫ আগস্ট সরকারি ভবনগুলোতে হামলায় জড়িত আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরগা) সদস্যদের গ্রেফতারের পরিবর্তে ওই হামলাকে সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিশাল এলাকা জনশূন্য করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।’

জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সংস্থা ও রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর রিপোর্ট থেকে আমরা দেখছি, মিয়ানমারের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ওই পত্রে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে, লোকদের সারিবদ্ধভাবে জোরপূর্বক শোয়ানো হয় এবং অতঃপর তাদের মাথার পেছনে গুলি করা হয়, শিরচ্ছেদ ও ধর্ষণ করা হয়, লোকদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং শিশুদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালানো হয়।

এতে বলা হয়, সরকারিভাবে যে কয়েক শ’ লোকের নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য রোহিঙ্গা সংস্থাগুলোর হিসেবে এই সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি এবং তা দুই হাজার থেকে তিন হাজারের মধ্যে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চিঠিতে আরো বলা হয়, কয়েক লাখ উদ্বাস্তু আসায় মিয়ানমারের প্রতিবেশী বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

ব্রিটিশ আইন প্রণেতারা বর্তমানে ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্মিজ সেনাবাহিনী যেভাবে মারাত্মক আকারে সহিংসতার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে তা পর্যালোচনা করার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন। তারা বর্তমানে চলমান বার্মিজ সেনাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থগিত করার জন্যও সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে শর্তাবলী ও অঙ্গীকার পুনঃগ্রহণ ও সেদেশে আর কোনো সামরিক সরঞ্জাম রফতানি বন্ধ করতে হবে।’

চিঠিতে তারা নতুন রোহিঙ্গা ইস্যুতে সৃষ্ট মানবিক চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দেরও আবেদন করেন।

কফি আনানের নেতৃত্বাধীন রাখাইন কমিশনকে স্বাগত জানিয়ে তারা অর্থনৈতিক সম্পদ ও বিশেষজ্ঞ প্রদান করে দ্রুত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের সাথে কাজ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

এই চিঠিতে ব্রিটিশ আইন প্রণেতাদের মধ্যে স্বাক্ষর করেন, অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ ফর ডেমোক্র্যাসি ইন বার্মার কো-চেয়ারম্যান ব্যারোনেস গ্লিনিজ কিন্নক, এপিপিজি ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান ক্লয়েড, টিউলিপ সিদ্দিক, এড্রিন বেইলে, আফজাল খান, অ্যান কফে, চি অনওয়ার্শ, ব্যারোনেস ডোরোথেয়া গ্লিনেজ থ্রনটন, এলিয়নর স্মিথ, এঙ্গেলা ইগল, বব, ব্ল্যাকম্যান, বারবারা কিলে, এলিসন ম্যাকগর্ভন, অ্যালেক্স কুমিনঘাম ও ইভেটি কোপার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫