ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

নারী

আমিও বলতে চাই

নাম দিয়ে কি মানুষ চেনা যায়

শফিকুল ইসলাম খোকন

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ জন্ম থেকে শিখতে শুরু করে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেখে। শেখার কোনো শেষ নেই, শেখার কোনো বয়স নেই। তেমনি একটি এলাকায় যদি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, সেখান থেকেও মানুষ শেখে। কোনো কলহের সৃষ্টি হলে ওই শিক্ষণীয় থেকে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। আবার কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সেখান থেকেও অনেকেই শিক্ষা নেয়। যে শিক্ষা থেকে এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি ধর্ষণ আর ধর্ষণ; প্রতিদিন ধর্ষণের ঘটনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওই ধর্ষক বা ধর্ষিতা, তাদেরও নাম আছে। নামে কি চেনা যায় এই পুরুষটি ধর্ষক আর এই নারী ধর্ষিতা? ঘটনার পরে বোঝা যায় কে ভালো কে খারাপ। স্বাধীন বাংলাদেশ সবুজ শ্যামলে ভরা সুন্দর একটি দেশ। ৯ মাসে স্বাধীন করে বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এ দেশটি। কিন্তু এ সুন্দর নামক দেশেও কিছু অসুন্দর নামধারী পুরুষ ধর্ষণ নামক শব্দটি দিয়ে বিশ্বের কাছে নিচু করছে দেশটি।
ইয়াসমিনের কথা আমরা অবশ্যই ভুলে যাইনি। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট কিশোরী মেয়েটি কাজ শেষে ফিরতে চেয়েছিল গ্রামে, মায়ের কাছে। নরপশুরা ধর্ষণ ও হত্যা করে তাকে। ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটল জাকিয়া সুলতানা রূপার; ইয়াসমিনের মতো এ নামটি এখন সবার পরিচিত। সভ্য মানুষ হিসেবে মনে করেই রূপা সবার মতো বাসে উঠেছিলেন। পরিশ্রমী, মেধাবী রূপার অপার সম্ভাবনা ছিল। অন্যদের মতো একজন নারী, যে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। স্বাধীন দেশে আর দশজন মধ্যবিত্ত মানুষের মতো পাবলিক বাসে করে গন্তব্যে পৌঁছতে চেয়েছিলেন। একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ‘নিরাপদ’ নামের একটি বাসে ধর্ষণের শিকার হন রূপা। রূপাকে বাসেই গণধর্ষণ করে মাথা থেঁতলে হত্যা করে বাসের চালক, সুপারভাইজার, কন্ডাক্টররা। রূপাকে বহনকারী বাসের নাম ‘নিরাপদ’। বাসে লেখা ছিল ‘গড ব্লেস ইউ’। সবচেয়ে অনিরাপদ বাসটির নাম ‘নিরাপদ’। ‘নিরাপদ’ ও ‘গড ব্লেস ইউ’ সেই বাসেই ঘটে গেল সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা।
যেখানে বাসটির নাম ‘নিরাপদ’ ছিল, রূপা নিরাপদ বাসেই অনিরাপদ হয়েছিল। পাঁচজন পুরুষ। কারো মনেই এতটুকু দয়ামায়া জাগল না? এদের অনেকেই বিবাহিত ছিল। গণধর্ষণ দিয়েই শেষ হয়ে যায়নি। ধর্ষণ শেষে ঘাড় মুড়িয়ে রূপাকে নৃশংসভাবে রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলে দেয়। এরা সবাই রাতে বাড়িতে স্বজনদের কাছে যায়। বাড়িতে গিয়ে কেউ আদরের মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েছে। কেউ মা, বোন, স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেছে। ওই সময় এতটুকুও ভাবল না, ‘আমার মেয়ের মতো এক মেয়েকে ধর্ষণ করেছি, আমার বোনের মতো এক বোনকে ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে হত্যা করেছি’। রূপাকে দেখে এদের কাউকে মনে পড়েনি? মনে হয়নি কাল রূপার জায়গায় এদের যে কেউ হতে পারে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিদিন ধর্ষণ; এ থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি আসলে মানসিক রোগী হয়ে গেছি? কিছু পুরুষের কি মনুষত্ব বিকৃত হয়ে গেছে? ওই সব পুরুষ কি পশুত্ব বরণ করেছে? ওই সব মানসিক রোগী ও পশুত্ব বরণকারী পুরুষ আকৃষ্ট হয়েছে ধর্ষণে। তারা শিখে গেছে কী করে ধর্ষণ এবং নৃশংসতা একই সঙ্গে চলন্ত বাসের ভেতর করতে হয়। গণধর্ষণ করে কী করে ধর্ষিতাকে মেরে ফেলতে হয়, কী করে ধর্ষণের আলামত বা প্রমাণ নষ্ট করতে হয়। ভারতের জ্যোতি সিংকে ফেলেছিল রাস্তার কিনারে, রূপাকে ফেলেছিল জঙ্গলে। রূপার ধর্ষকেরা রূপার মাথা থেঁতলে মৃত্যু নিশ্চিত করে ফেলে দেয় জঙ্গলে। একটি ঘটনা বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে, অন্যটি ভারতের দিল্লিতে। ধর্ষণ সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব ভাষার, সব দেশের, সব সংস্কৃতির মানুষই করে। শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই করে। আজ কোথাও শিশুধর্ষণ ঘটলে পরপর অনেক শিশুধর্ষণ ঘটবে। তারই ধারাবাহিকতায় কয়েক দিন ধরে ধর্ষণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ওই সব পুরুষের যৌনকামনা চরিতার্থ করার জন্য রেহাই পায়নি ঈদের দিনেও। পটুয়াখালীর বাউফলের ২২ বছরের একটি মেয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে যাওয়ার পথে চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন। ঈদের আগের দিন গাইবান্ধার ফুলছড়ির মাত্র ৮ বছরের সিনথিয়াকে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বরগুনার বেতাগীতে নারী শিক্ষককে বিদ্যালয়ে ধর্ষণ, একই জেলার পাথরঘাটা উপজেলা মামা কর্তৃক ভাগ্নি ধর্ষণ। সব মিলিয়ে আমাদের দাবিদার এ সভ্য সমাজে কী জানান দিচ্ছে?
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ৮৬ জন, ২০১৩ সালে ১৭৯ জন, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন, ২০১৫ সালে ৫২১ জন, ২০১৬ সালে ৬৮৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার (বিএমবিএস) মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের তথ্যমতে, ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে এক হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বিএমবিএসের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুধু জুলাই মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮০ জন নারী ও শিশু। এদের মধ্যে ৩২ জন কন্যাশিশু। ধর্ষণ চরম আকার ধারণ করেছে। এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে মাঠে নামার সময় এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র দেরি করার অবকাশ নেই।
পরিশেষে বলতে চাইÑ স্বাধীন রাষ্ট্রটি নারী নেতৃত্বে চলছে, বাস্তবিক অর্থে পরিবার-সমাজ এখনো পুরুষশাসিত। এ জন্য নেতৃত্বদানকারী পুরুষ শুদ্ধ না হলে, সুস্থ না হলে, সভ্য না হলে, সত্যিকার শিক্ষিত না হলে, সচেতন না হলে, নারীরা যতই শিক্ষিত হোক, সচেতন হোক, যতই তারা স্বনির্ভর হোক, কোনো লাভ নেই। ওইসব পুরুষ চরিত্রগত ভালো না হলে সমাজকে কলুষিত করবেই। তবে এ দায় থেকে এড়াতে পারেন না ঘরের নারীরাও। তাই আসুন এ সমাজকে সভ্যসমাজে রূপ দেয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি। শুধু নামেই নিরাপদ নয়, বাস্তবে নারীকে নিরাপদ রাখি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫