ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

অবকাশ

কোনো এক শরতে : চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শরতের এই আবছায়াময় মাঝ রাতে সৌরভ একা একা ছুটে চলছে চৌধুরী বাড়িতে। চৌধুরী বাড়িময় রকমারি ফুলের সমারোহ। সেখানে চুরির অভিযান চালাবে সৌরভ। চৈতীর জন্য শরতের শিউলি ফুল আনতে সে এখন চৌধুরী বাড়িমুখী। আজ ওদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। গরিব মানুষ ওরা। তাই জমকালো আয়োজনে ম্যারেজ ডে পালন হচ্ছে না। এসবে আগ্রহও নেই চৈতীর। হয়তো রোজ দিনের অভাব তার সেই আগ্রহবোধ নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু বউটারে বড্ড ভালোবাসে সৌরভ। সন্ধ্যায় বাসায় এসে দেখে চৈতী নিরস মুখে বসে আছে। সৌরভ তার পাশে বসে আহ্লাদি গলায় বলল ‘গত বছর এদিনে কিন্তু আমরা...।’ চৈতী মুচকি হেসে বলে ‘জানি জানি। আমার সব মনে আছে গো।’ সৌরভের মনে হলো আজ এই বিশেষ দিনে বউটারে অন্তত কিছু গিফট করা দরকার ছিল। স্বামীকে চুপ থাকতে দেখে রসিকতা করে চৈতী বলল ‘কেমন মানুষ তুমি আমার, ভেবেছিলাম আমার জন্যে কিছু নিয়ে আসবে।’ অনুশোচনার আকুতি নিয়ে সৌরভ বলল ‘ইসরে, বড় ভুল হয়ে গেছে। কি চাও বউ? বলো। এক্ষুনি নিয়ে আসবো।’ অভিমানের ভাব ধরে চৈতী বলল ‘থাক আর ঢং করা লাগবে না।
এতই যদি টান হয়, তো এই শরতে আমার প্রিয় শিউলি ফুল এনে দাও।’ হাসতে হাসতে সৌরভ বলল ‘আমার বউ সামান্য একটা শিউলি ফুল চাইছে। আর আমি দিতে পারব না! এক্ষুনি যাচ্ছি চৌধুরী বাড়ি।’ বলেই ঘর থেকে হনহনিয়ে বের হয়ে গেল সৌরভ। পেছন থেকে চৈতী ডাকছে বার বার ‘পাগলামি করো না গো! আমি কি সত্যি সত্যি শিউলি চাইছি নাকি! শোনো, এই শোনো...। উফ!’ না, বউয়ের কথাই শুনলো না বেচারা সৌরভ। শরতের এই স্নিগ্ধ রাতে সে চৌধুরী বাড়ি চলল শিউলি ফুলের সন্ধানে। দুনিয়ার সব ফুলের গাছ আছে ওই বাড়িতে।
২.
শরতের চৈতালী এই রাতে চৌধুরী বাড়িতে চুপিসারে ঢুকলো সৌরভ। বাড়ি পাহারাদারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে ফুল বাগানে ঢুকে গেল। এত এত ফুলের মাঝে কোনটা যে শিউলি ফুল! নাম না জানা সব শরতের ফুলের মিষ্টি গন্ধে পরান জুড়িয়ে যায়। আহা বউটা এখন পাশে থাকলে কত না ভালো হতো। ফুলের মধ্যে যে কী পেয়েছে বউটা।
আধো ছায়ায় এত ফুলের মাঝে শিউলি ফুল নির্ণয় করতে পারছে না সৌরভ। তাতে কী! সব গাছ থেকে সব ধরনের ফুল মুঠো মুঠো ছিঁড়তে লাগল সে। তারপর সব নিয়ে যাবে চৈতীর কাছে। সেখান থেকে শিউলি ফুল খুঁজে নেবে চৈতী।
চৌধুরী বাড়ি পরিত্যাগ করতেই সদর দরজায় কে যেন পথ আগলে দাঁড়ায় সৌরভের। চৌধুরী মহল পাহারাদার আকমলের কড়া নজরদারিতে এভাবে ধরা পড়বে সৌরভ, ভাবেনি। আকমল চোর সন্দেহে সৌরভকে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। মাথায় মুগুরের কয়েকটি আঘাত খেয়ে মাটিতে নেতিয়ে পড়ে সৌরভ।
পরদিন পুরো পাড়ায় মুখে মুখে খবর রটেÑ কাল রাতে চৌধুরী বাড়িতে চোর পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। সবাই চোরের লাশ দেখতে গিয়ে সৌরভের মরা মুখ দেখে শোকে কাতর হয়।
৩.
আজ চৈতী বিধবা। বিবাহবার্ষিকীর দিনে এভাবে বিধবা হওয়ার পেছনে সে নিজেই নিজেকে দায়ী করে। কেন সে দিন শিউলি ফুলের আবদার করেছিল স্বামীকে! এই অনুতাপে প্রতিক্ষণ জ্বলছে সে।
সৌরভের মৃত্যুর কয়েকদিন পর চৈতী বাড়িতে একটি শিউলি গাছ লাগায়। প্রতি শরতে গাছে ফুল ফোটে। তখন শরতের প্রতি সকালে ঝরা শিউলি ফুলগুলো কুড়িয়ে সে সৌরভের কবরে দেয়। এই শিউলি ফুলের জন্যই সৌরভ আজ পরপারের বাসিন্দা।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫