ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

বিউটি বোর্ডিং

শওকত আলী রতন

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১৭:০২


প্রিন্ট
ঢাকার শ্রীশদাস লেনে ঐতিহাসিক বিউটি বোডিং

ঢাকার শ্রীশদাস লেনে ঐতিহাসিক বিউটি বোডিং

ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক দিয়ে রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজারসংলগ্ন এলাকার ১ নম্বর শ্রীশদাস লেনের ধূসর বর্ণের দোতলা বাড়িটি এখন কালের সাক্ষী। বাড়িটির প্রধান ফটকের সামনে বড় করে নামফলক টানিয়ে রাখা হয়েছে বিউটি বোর্ডিং। এক সময় দেশের প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, অভিনেতা ও গানের শিল্পীদের প্রধান আড্ডাস্থল ছিল এই বিউটি বোর্ডিং। তবে এখন আর আগের মতো বিউটি বোর্ডিংয়ে জমজমাট আড্ডা না হলেও বিউটি বোর্ডিং এখনো টিকে আছে।

বিউটি বোর্ডিংয়ে যেসব গুণী মানুষ নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন তাদের অনেকই আজ আর বেঁচে নেই। আর যারা জীবিত রয়েছেন তারা আগের মতো বিউটি বোর্ডিংয়ে সময় কাটাতে এখানে আসেন না। তবুও অতীতের স্মৃতি বয়ে বেড়ান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গুণী মানুষেরা। এ ব্যাপারে কথা হয় কবি ও টেলিভিশন উপস্থাপক আসাদ চৌধুরীর সাথে। তিনি জানান, এক সময় আড্ডা মানেই ছিল বিউটি বোর্ডিং। সবাই সারাদিন সাহিত্য আড্ডা দিয়ে বিউটি বোর্ডিংয়ে খাওয়া-দাওয়া করে রাতে ঘরে ফিরতাম। সেই সময় সাহিত্যের সাথে যারাই জড়িত ছিল তাদের সবারই ঠিকানা ছিল বিউটি বোর্ডিং। আর এখন বিউটি বোর্ডিংয়ের কথা বললে অনেকেই চিনবে না। শিশু সাহিত্যিক ও ছড়াকার জগলুল হায়দার বলেন, ঢাকা বলতে এক সময় পুরান ঢাকাকেই বোঝাত। কিন্তু কালক্রমে ঢাকার শহর বিস্তৃত হওয়ার ও অন্যান্য স্থানে সাহিত্য আড্ডা গড়ে ওঠায় বিউটি বোর্ডিংয়ে আসা-যাওয়া কমে গেছে। তারপরও বছরে দু-একবার যাওয়া পড়ে। অন্য দিকে বাংলাবাজার এলাকায় জ্যাম থাকার কারণে যেতে চান না অনেকেই।

বিউটি বোর্ডিয়ের বর্তমান মালিক তারক সাহা ও সমর সাহা জানান, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় তৎকালীন জমিদার তাদের দোতলা বাড়িটি রেখে অন্যত্র চলে যান। তখন এখানে একটি ছাপাখানা গড়ে ওঠে। এই ছাপাখানা থেকেই সোনার বাংলা নামে একটি পত্রিকা বের হতো। তখন থেকেই কবি সাহিত্যিকদের প্রধান প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এটি। ১৯৪৯ সালে সোনার বাংলা পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় চলে গেলে পত্রিকার মালিক সুধীরচন্দ্র দাসের কাছ থেকে জমিটি কিনে নেন দুই সহোদর প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী চন্দ্র সাহা।

নলিনী চন্দ্র সাহার বড় মেয়ে বিউটির নামেই নামকরণ করা হয় বিউটি বোর্ডিং। দুই ভাই মিলে সেখানে আবাসিক হোটেলের পাশাপাশি খাবারের আয়োজন করেন। বাংলাবাজার জনবহুল এলাকা হওয়ায় সেই থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিউটি বোর্ডিং। তবে কবি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের আনাগোনার কারণেই বিউটি বোর্ডিংয়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মহলে। বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডার জন্য জায়গাটি খুব বেশি বড় না হলেও সেই সময় সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে সাহিত্য সভা-সেমিনার আর আড্ডা হতো বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই ঐহিতাহিক স্থানটিতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাস চন্দ্র সাহা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পল্লীকবি জসীম উদ্দীনসহ নিয়মিত আড্ডা দিতেন সৈয়দ শামসুল হক, সমর রায় চৌধুরী, শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, শামসুর রাহমান, জিয়া আনসারী, আব্দুর রহিম, আমিরুল হক জিলু, এ ওদুদ খান সন্তু, ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু, মোস্তফা আনোয়ার, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মুস্তফা কামাল, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবুল হাসান, কবি সমুদ্র গুপ্ত, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা হায়াত মাহমুদ, এনায়েত উল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, সত্য সাহা, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জহির রায়হান, খালেদ চৌধুরী, ফয়েজ আহমেদ, খান আতা, নির্মল সেন, গোলাম মোস্তফা, সাদেক খান, সমর দাশ, খান আতাউর রহমান, ইমরুল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী ও শফিক রেহমানসহ আরো চেনাজানা অনেক পরিচিত মুখ।

এদের মধ্যে যারা প্রয়াত হয়েছেন তাদের একটি নামে তালিকা টানানো হয়েছে বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রধান ফটকের সামনে। প্রবেশ করলে প্রথমেই এটি চোখে পড়ে। এ ব্যাপারে প্রহ্লাদ চন্দ্র দাসের বড় ছেলে তারক সাহা জানান, বিউটি বোর্ডিংয়ের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য ১৯৯৫ সাল থেকে গড়ে তোলা হয় বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ। প্রতি বছর একবার আমাদের দেশের প্রথিতযশা গুণী মানুষগুলোকে একত্র করার চেষ্টা করা হয় এ সংগঠনের মাধ্যমে। আর এসব গুণী মানুষ তাদের অতীতের স্মৃতি তুলে ধরেন বর্তমান প্রজন্মের কাছে।

তারক সাহা আরো জানান, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ বছর বিউটি বোর্ডিং সিসি টিভির আওতায় আনা হয়েছে। আগামীতে দর্শনার্থীদের কথা বিবেচনা করে একটি পাঠাগার নির্মাণের কথা ব্যক্ত করেন তিনি। সেই সাথে তার বাবার স্মৃতিকে অম্লান রাখার জন্য মুর‌্যাল তৈরির একটি পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান আমাদেরকে।

এ ব্যাপারে কথা হয় প্রহ্লাদ সাহার ছোট ছেলে সমর সাহার সাথে। তিনি জানান, দীর্ঘ দিন ধরে বিউটি বোর্ডিংয়ে আসা দর্শনার্থীদের রাতযাপন ও খাবারের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে এবং খাবারের মান ঠিক রেখে সেবা প্রদান করে যাচ্ছি। নিচতলায় খাবারের জন্য যে কক্ষটি রয়েছে সেখানে কাঠের ফ্রেমে টাঙানো রয়েছে খাবার তালিকার মূল্য। বিউটি বোর্ডিংয়ে একজনের জন্য ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। রাত যাপনের জন্য রয়েছে ছোট-বড় ২৭টি কক্ষ। একরাত সিঙ্গেল বেডের জন্য ২০০ টাকা আর ডাবল বেড ৪০০ টাকা।

বিউটি বোর্ডিং নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিয়ে একটি বই বের করা হয়েছে। বইটি পড়লে আরো বিস্তারিত অনেক তথ্য জানা যাবে। ইমরুল চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘পূর্ণিমার মধ্যবয়সী বিউটি বোর্ডিং’ নামে বইটি প্রকাশ করেছে সোনা রং প্রকাশনী।

হাজারো গুণী মানুষের স্মৃতিধন্য এই বিউটি বোর্ডিং একনজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসেন সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরা। আপনি ঘুরে আসতে পারেন রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজারসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত বিউটি বোর্ডিং। প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে বিউটি বোর্ডিং ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫