ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

প্রিয়জন

ঝরা ফুল

তারিকুল ইসলাম লিমন

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট


শাহবাগে বসে চা খাচ্ছি। রঞ্জুর সাথে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে কথা বলছি। হঠাৎ একটি ছোট্ট মেয়ে কতগুলো তাজা গোলাপ হাতে এসে বললÑ স্যার, একটা ফুল কিনবেন।
আমি অন্য দিকে তাকিয়ে বললামÑ না, ফুল লাগবে না।।
স্যার আমার মায়ের খুব অসুক হইছে। হেরে হাসপাতালে নিতে হইব। একটা ফুল লন না, স্যার।
বললাম তো লাগবে না।
মেয়েটি মাথা নিচু করে নিঃশব্দে চলে যেতে লাগল। রঞ্জু ডেকে বললÑ এই মেয়ে শোনো। কী নাম তোমার?
শেফালি।
একটা ফুল দাও। কত টাকা?
স্যার দশ টাকা।
ফুল নিয়ে মেয়েটিকে টাকা দিতেই সে চলে যেতে লাগল।
শোনো। এ ফুলটি তোমার জন্য।
শেফালির ঠোঁটের কোণে চন্দ্রোজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। মনে হয় সে যেন কোনো রাজদরবার থেকে বিশেষ উপঢৌকন পেয়েছে।
রঞ্জু অনেকটা এ রকমই মানবতাবাদী। তার অন্তর সব সময়ই মানুষের জন্য কাঁদে। সে সব সময় সমাজে ইকুইটির কথা বলত। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলত। সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করার কথা বলত। রঞ্জু করুণা বস্তুটিকে ঘৃণা করত।
প্রিয়াকে ভালোবাসত রঞ্জু। আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ত। প্রিয়ার চিন্তাচেতনা অনেকটা রঞ্জুর সহজাত। প্রিয়া অনেক ভালো ছবি আঁকত। চারুকলায় তার নাকি চান্স হয়েছিল, কিন্তু ইচ্ছা করেই পড়েনি। দেখতে একেবারে অসুন্দর নয়। রঙ শ্যামবর্ণ, চোখ কাজলা দীঘি, চোখের নজর কথা বলে আর পলক সবাইকে থামিয়ে তার কথা শুনতে বাধ্য করে। ঠোঁটের কোণে হাসির ঝরনা বইছে অনন্তকাল ধরে। চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা, একগুচ্ছ বুকের ওপর ফেলে রাখে। উচ্চতা ৫ বাই ৫। জিন্স আর টি-শার্টই বেশি পরে। গানের গলাও খুব ভালো। রবীন্দ্রসঙ্গীতের গলা।
তমার জন্মদিনের দাওয়াতে গিয়ে অবাক। সেই টি-শার্ট পরা প্রিয়া, শাড়িতে। যেন সুশ্রী এক পরীকে দু’টি ডানা কেটে দেয়া হয়েছে। তমাও রঞ্জুকে পছন্দ করত। রঞ্জু এ কথা জানত। কিন্তু তার মনের নজর তমাকে এড়িয়ে গেছে। প্রিয়া তমার জন্য নিজ হাতে আঁকা একটি স্ক্যাচ উপহার দিয়েছিল।
রঞ্জুর চাওয়া ছিল একটু বেশি। বলত দেশে সেবা খাতে বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রফেশনাল ডিগ্রিধারীদের ভালো স্যালারি দিয়ে দেশে ধরে রাখতে হবে। ব্রেনড্রেন ঠেকাতে হবে। কোয়ালিটি এডুকেশনের দিকে জোর দিতে হবে। মানুষকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
ওর স্বপ্ন একটু বড়ই ছিল। সে বলত, থিংকিং বিগ। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। আমার চিন্তা ছিল রঞ্জুর পরিপন্থী। পাঁচতলার ওপর থেকে পড়লে জীবনে ইতি ঘটবে। একতলা থেকে পড়লে হাত-পা ভাঙবে, কিন্তু মৃত্যুর আশঙ্কা কম। সে রকম বড় স্বপ্ন পূরণ না হলে কষ্টটাও একটু বেশি পেতে হবে।
রঞ্জু প্রায়ই শেফালির কাছ থেকে ফুল কিনত। ফুল কেনার বাহানায় শেফালিকে সাহায্য করত। পয়লা ফাল্গুনে সে অনেক ফুল কিনেছিল প্রিয়াকে দেয়ার জন্য। কিন্তু শেষমেশ সে ফুলগুলো দিতে পারেনি। প্রিয়া সেদিন আসবে বলে আসেনি। কেন আসেনি সে কারণটা রঞ্জুর হয়তো আজো জানা নেই। পরের দিন অবশ্য ওদের দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রঞ্জু ফুলগুলো দেয়নি। রঞ্জু হয়তো জানত বাসি ফুলে পূজা হয় না।
দেখতে দেখতে পড়াশোনা শেষ হয়ে গেল। যে যার মতো চাকরি নিয়ে এদিক-ওদিক চলে গেলাম। আমি বিসিএসে টিকে গেলাম। পোস্টিং হলো কুমিল্লায়। তারপর কেটে গেল সাত বছর। কী এক অফিসিয়াল কাজে ঢাকার সচিবালয়ে কাজ শেষে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি সেই ফুল বিক্রেতা শেফালিকে। অনেক দিন পর দেখে চিনতে প্রথমে খানিকটা সময় নিলাম।
কিরে শেফালি, তুই এখানে?
স্যার কত দিনপর আপনারে দেখলাম।
ভালো আছিস?
হ। খুব ভালো আছি।
তুই রঞ্জুর কোনো খবর জানিস? মনে আছে রঞ্জুর কথা?
কী যে কন স্যার, মনে থাকব না ক্যান। হেয় তো প্রিয়া আফারে বিয়া করছে।
কী বলিস। ওরা কোথায় থাকে জানিস।
হ জানি। আফনে যাইবেন?
হ্যাঁ। চল।
রঞ্জু, তোর কোন খোঁজখবরই নেই। আমি সবার সাথে যোগাযোগ করেছি। কেউ তোর কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। কেমন আছিস?
ভালো।
আমি জানতাম, তুই একদিন আসবি।
আমি একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছি না। তোর মতো ব্যাচ টপার, যে কোনো দিন সেকেন্ড হয়নি, সে আজ এখানে কেন?
খারাপ কী? শিশুদের পড়াতে ভালো লাগে। আমি এই কচিকাঁচাগুলোকে পরিপক্ব করে তুলব; যাতে ঝড় এলে ভেঙে না পড়ে।
প্রিয়া কোথায়?
অফিসে। ও একটা এনজিওতে কাজ করে। দু’জনে মিলে এই পথশিশুদের নিয়ে ভালোই আছি।
আজ বাসস্ট্যান্ডে একটি তেরো-চৌদ্দ বছরের ফুলবিক্রেতা মেয়ে গাড়িচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তখন সেই পুরনো দিনের ভেলায় ভেসে বেড়ালাম স্মৃতির সাগরে। রঞ্জুর শেষ কথা আমার মনে খুব করে গেঁথে গেছে। ও ঠিকই বলেছিলÑ শাহবাগের ফুলের দোকানের সব ফুলই তো আর পূজার উদ্দেশ্যে মন্দিরে যায় না, কিছু ফুল শ্মশানঘাটেও যায়।
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫