ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

মু ক্ত গ দ্য

কষ্টের নদী

আলফ্রেড যোশেফ

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

হঠাৎ অকস্মাৎ এই তো সেদিন মধ্যরাতে, নেমে এসেছিল মংথাং গ্রামে এক তাণ্ডবলীলা!
দেখেছিল সে গ্রামে লোকজনে কিয়ামতের আলামত! কী হয়েছিল সে রাতে?
কারা এসেছিল সেই গ্রামে? পাপীষ্ঠ দানবেরা?

এসেছিল মিয়ানমারের সেনাশার্দুলেরা! পাপীষ্ঠ হানাদার ওরা, মানবরূপী জানোয়ার ওরা! জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছিল মংথাং শহরসহ আরো কিছু!
গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর, ফসলের ক্ষেতের পর ফসলের ক্ষেত,
নদীর মাছের পর নদীর মাছ, গোয়ালের পর গোয়াল ভরা গরু, ঘরের শিশু-যুবা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবতীÑ
নারীসহ, সব...সব কিছুকে...সব! উজাড় কোরে ছিল তারা!
আহারে মানব হৃদয়! আহারে পাপীষ্ঠ মানবপুঙ্গবেরা!
তোমরা কি মানুষ? নাকি তোমরা দানব? নাকি অন্য কিছু?

তখনো অবশ্য বিশ্ববাসী শোনেনি সে চিৎকার!
রোহিঙ্গাবাসীর সে চিৎকার যেন আটকে গিয়েছিল মাঝ আকাশে!
হয়তোবা পৌঁছুতে পারেনি সে চিৎকার, বিশ্ববাসীর কানে, বিশ্বনেতা হোথার কানে,
হয়তোবা সে চিৎকার ভেসে বেড়িয়েছে, আকাশে বাতাসে কিংবা কষ্টের নদীর পানিতে।
অথচ যখন শুনেছিল, তখন নির্বাক বিশ্ববিবেক! নির্বাক বিশ্বনেতা হোথা! নির্বাক আমরা!

এপারে আমরা, ্নিঝুম বাংলাদেশ! মাঝখানে কষ্টের নদী প্রবাহিত!
সে পানিতে মিশে আছে রোহিঙ্গা নারী পুরুষ আর শিশুর রক্ত মাংস প্রাণ!
সে পানিতে মিশে আছে ওয়াতি জামজার সতিত্ব হরণের এক অবিশ্বাস্য বিরহের গান!

সেদিন গ্রামবাসী সবাই ছুটছিল সামনের দিকে, আমাদের নিঝুম বাংলাদেশের দিকে!
জান বাঁচাতে যে যেদিকে পারে, মুক্ত আকাশেরন দিকে চেয়ে চেয়ে ছুটে চলেছিল,
খোলা প্রান্তর বেয়ে, ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ চিৎকার কোরে!

ওয়াতি বিন জামজা তখন স্বামীর ঘরে। ধলপহরের চাঁদের আলোয় ধোয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে, ওয়াতি বিন জামজা রাত ছিল স্বামী সোহাগে!
সে দিনের পরে সেই মধ্যরাত! সেই পাপীষ্ঠ দিন! এখন আর নেই।
স্বামীর সোহাগ আদর রেখে, সেদিনের সেই কষ্টের স্মৃতিমাখা মধ্যরাতে,
স্বামীর দু’হাত শক্ত কোরে নিজের বুকের নরম মাংসের মধ্যে ধরে, জীবন রক্ষা করতে দৌড়ে পালিয়েছিল ওয়াতি বিন জামজা, চারদিক দেখছে সে বেশ সন্তর্পণে, সামনে কষ্টের নদী।
এ নদী সে নদী নয়! এ নদী পার হওয়া অত সোজা কথা নয়!

এ নদী ওয়াতি বিন জামজার লজ্জা ধোয়া পানির ধারা!
রৌদ্রছায়ায় মাখামাখি করে পানি, ওয়াতির পোয়াতি পেটের শিশুটি যেন খেলা করে,
ওয়াতি বিন জামজা হাসে, কাঁদে, পেছনে তাকিয়ে থাকে, কপালে ভাঁজ ফেলে ভাবে।
স্বামী সংসার বাড়িঘর কাগান জমি ক্ষেত পুকুর নদী আকাশের পাখির কথা।
ভাবতে থাকে, দৌড়ে চলে, আবার ভাবতে থাকে, আসবে নাকি মিয়ানমার সেনা দলে?
হিংস্র নেকড়ের মতো ঝাপটে ধরবে নাকি তাকে? আবার কি তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে,
নাকি টেনে-হিঁচড়ে তাকে ফের নিয়ে যাবে দূর অন্ধকার কোনো দোজখে?
মিয়ানমারের পোষ্য কুত্তার মতো হানাদার সেনাদলে?
অসভ্য তারা! নৃশংস তারা! ধিক তাদের, শত ধিক দেই তাদের আমি, ওয়াতি বিন জামজা!

সামনে কষ্টের নদী, ওপারে বাংলাদেশ, নিশ্চুপ নিঝুম বাংলাদেশ! দাঁড়িয়ে আছে আরবি
হরফ আলিফের মতো মাথা তুলে! মুসলমানের দেশ! ওয়াতি বিন জামজার স্বপ্নের দেশ!
জান বাঁচানোর জন্য তার প্রিয় শ্রেষ্ঠ দেশ! ওয়াতি বিন জামজাদের কাহিনী শুনে,
নিশ্চুপ একেবারে বাংলাদেশ, তার জনগণ এবং তার মাটি ও আকাশ বাতাস!

পেছনে ধাবমান রোহিঙ্গাবাসী, তারা নবীর উম্মত, মুসলমান, তারা সবাই দৌড়াতে ব্যস্ত!
নারী শিশু যুবা বৃদ্ধ বৃদ্ধা, তারাও সবাই দৌড়–চ্ছে যে যার মতো কোরে।!
তখন সুবেহ সাদিকের ক্ষণ! বাতাসে আজানের ধ্বনি ভাসছে সারা মিয়ানমারে,
যেন ভেসে এসে মিশে যাচ্ছে সে ধ্বনি বাংলাদেশের বাতাসে! আহা কী মধুর সে ধ্বনি।
‘আস সালাতু খাইরুম মিনান্নাউম’

পেছনে সামান্য সূর্যের আলো, এক চিলতে।
ওয়াতি বিন জামজা ধীরে ধীরে নেমে যায় কষ্টের নদীতে। পিছন তার স্বদেশ মিয়ানমার, আর ধাবমান মিয়ানমার সেনাদল! নিজ বাসভূমে, বাসভিটে স্বামী পিতা মাতা, কী করে তারা, কে জানে! জীবিত? নাকি মৃত তারা? ভাবতে থাকে ওয়াতি বিন জামজা, চোখের নোনাপানির স্রোত মুহূর্তে থামে, পবিত্র কলেমা পড়ে, ধীরে ধীরে নামতে থাকে কষ্টের নদীতে!
ওপারে মুসলমানের দেশ, বাংলাদেশ, যেতে হবে জান বাঁচাতে।
তত দিনে কষ্টের নদীর পানি ভরে গেছে রোহিঙ্গা মুসলমান মানব-মানবীর,
রক্ত-মাংস, হাড়-মজ্জা শিরা-উপশিরা আর চোখের পানিতে। সে পানিতে ওয়াতি বিন জামজা যেন আজ নাইতে নেমেছে বহু দিন পরে।

হঠাৎ অকস্মাৎ সেদিন রাত্তিরের মতো, একটি বুলেট এসে বিঁধে যায় ওয়াতি বিন জামজার কান্ত শরীরের, নরম বুকে। চোখের পানির স্রোত আরো বেগবান হয়! আহারে রোহিঙ্গা নববধূ তুমি!
তোমার রক্তে তোমারই কষ্টের নদীর পানি, লালে লাল হয়ে ওঠে তৎক্ষণাৎ।
মুসলমান রমণী ওয়াতি বিন জামজার মুখ থেকে, ধীরে ধীরে উচ্চারিত হয় পবিত্র কলেমার বাণী, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূল আল্লাহ’Ñ একবার দু’বার ধ্বনিত হয় বার বার।
ওয়াতি বিন জামজার দু’চোখ তখন কষ্টের নদী। কষ্টযন্ত্রণায় অশ্রু তখন চলে বহতা নদীর ধারায়!
তার কষ্টের দু’চোখ তখন চেয়ে থাকে আকাশের পানে! আতিপাতি কী যেন খুঁজে মরে সে!
তারপর একসময় অসাড় হয়ে পড়ে ওয়াতি বিন জামজার দেহ, উপুড় হয়ে ছুটে চলে নদীর স্রোতে।

এরপর আর কোনো দিন ওয়াতি বিন জামজার দেহ কষ্টের নদীতে দেখা যায়নি।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫