ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

শান্তির বিধান সব মানুষের জন্য

ডা: মোহাম্মদ আবুল কালাম আবদুল্লাহ

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট
শেখ জায়েদ মসজিদ, আবুধাবি, আরব-আমিরাত

শেখ জায়েদ মসজিদ, আবুধাবি, আরব-আমিরাত

ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের এক অর্থ শান্তি। বিশ^ মানবতার শান্তির জন্য দুনিয়ায় ইসলামের আবির্ভাব। ইসলামের বাণী দুনিয়া তথা বিশ্বজাহানের স্রষ্টা, প্রভু আল্লাহর পক্ষ থেকে। দুনিয়ার প্রথম মানব-মানবী পিতা আদম আ: ও মাতা হাওয়া আ:-এর শুরু থেকেই ইসলাম দুনিয়ায় এসেছে। যুগে যুগে, দেশে দেশে আল্লাহ তার মনোনীত বিশেষ কিছু বিশেষায়িত মানুষের মাধ্যমে ইসলামের বাণী মানুষের কাছে পরিচিত করেছেন। মানবকুলের এ শ্রেষ্ঠ মানবগণ নবী, রাসূল নামে খ্যাত। এঁরা আল্লাহর স্পেশালভাবে সৃষ্ট, প্রশিক্ষিত মহামানব যারা আল্লাহর কাছ থেকে বাণীপ্রাপ্ত হয়ে মনুষ্য সমাজে প্রচার করেছেন। উদ্দেশ্য যুগের মানুষগুলো যেন শান্তিতে থাকতে পারে। আর দুনিয়ার জীবন শেষে অনন্তকালের পরকালীন জীবনেও শান্তি লাভ করতে পারে। অর্থাৎ ইসলাম ইহকাল ও পরকাল দুই কালেরই শান্তি ও কল্যাণদায়ী ধর্ম যদি এর অমিয় বাণীকে কেউ পুরোপুরি মেনে চলে। আমরা আগেই বলেছি, যুগে যুগে নবী আ:-গণের মাধ্যমে ইসলামের মহান বাণী মানুষের মাঝে প্রচারিত-প্রসারিত, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব নবীগণের শেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হলেন বিশ^ মানবতার শান্তির দিশারি, দুনিয়ার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম। প্রভু আল্লাহর বাণী, ‘হে নবী, আপনাকে আমি বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ এখানে দুনিয়াবাসী সব মানুষের জন্য নবী মুহাম্মদ সা: রহমতস্বরূপÑ কোনো বিশেষ জাতি, গোষ্ঠী বা কওমের জন্য নয়। বিখ্যাত কবি বার্নার্ড শ বলেছেন, ‘আজ সমগ্র অশান্ত দুনিয়াটা যদি একটা রাষ্ট্র হতো আর সে রাষ্ট্রটির রাষ্ট্র নায়ক হতেন নবী মুহাম্মদ সা: তবে সমগ্র দুনিয়াটা শান্তির নীড় হয়ে উঠত।’ এখানেও দুনিয়াবাসী সমগ্র মানুষের শান্তির কথা বলা হয়েছে, কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা জাতের কথা বলা হয়নি। নবী মুহাম্মদ সা:-এর ওপর নাজিল হয়েছে আল কুরআন-সর্বশেষ আসমানি কিতাব। কুরআনে ইসলামকে পূর্ণ করে মানবজাতির জন্য তা জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ মনোনীত করে দিয়েছেন।
স্বয়ং আল্লাহর বাণী, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, আমার নিয়ামত তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম আর ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করে দিলাম।’ এ কথা কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা জাতির জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য। মানবকুলের যে অংশটা আল্লাহর অনিন্দ্য সুন্দর, শাশ্বত এ অমিয় বাণীকে মেনে নিয়ে বক্ষে ধারণ করে চলছে তারা মুসলমান। মুসলমান মানে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পিত ব্যক্তি। একজন আত্মসমর্পিত ব্যক্তির তিনি যার কাছে সমর্পিত তার ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছু চিন্তা ও অমূলক। কাজেই একজন মুসলমানের আল্লাহর আদেশ-নিষেধের বাইরে কোনো কিছু করা তো দূরের কথা চিন্তা করাও অচিন্তনীয়। মানবকুলের যে অংশটা ইসলামকে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়নি তারা অমুসলমান। এদের কেউ পৌত্তলিক, কেউ নাসারা, কেউ ইহুদি, কেউবা আবার অধার্মিক নাস্তিকও। এদের কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য মুসলমানেরা তার প্রভু আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট। দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ কাজটি মুসলমানেরা করবে ওদের কল্যাণকামী, হিতাকাক্সী, হিতৈষী হিসেবে। অন্যের ধর্মের ওপর নিজের ধর্মের কর্তৃত্ব খাটানোর জন্য নয়। ধর্মীয় উগ্রতা নিয়ে নয়। নিজ ধর্ম ইসলামকে অন্য ধর্মাবলম্বীর ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়ার জন্য নয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামের নবী সা:-এর প্রতি মহান আল্লাহর বাণী এমনÑ ‘হে নবী! আমি আপনাকে দুনিয়ায় দারোগা হিসেবে পাঠায়নি।’ অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য ইসলামের শিক্ষা তারা ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে অন্যের ওপর নিজ ধর্মমত জোর করে চাপিয়ে দেবে না। এটা মুসলমানের ওপর তাদের আল্লাহর কঠিন আদেশ। কাজেই মুসলমান ধর্ম প্রচারে উগ্র হবে? উঁহু। অসম্ভব। মুসলমান ধর্ম প্রচারক হবে, শান্তির পতাকাবাহী হয়ে। যেহেতু মুসলমানেরা বিশ^াস করে ইসলাম সমগ্র দুনিয়াবাসী মানুষের জন্য তাদেরই স্রষ্টা এবং প্রভু আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া শান্তির জীবনবিধান, কাজেই এ শান্তির বিধানের হক দুনিয়াবাসী সব মানুষের। কাজেই যেসব বনি আদম এখনো আল্লাহর এ বিধান মেনে নেয়ার সুযোগ পায়নি তাদের কাছে তাদের শান্তিকামী ও কল্যাণকামী হিসেবে ইসলামের বাণী পৌঁছানো মুসলমানের কাজ ও দায়িত্ব। কোনো বনি আদম যদি স্বেচ্ছায় এটা মেনে নিতে না চায় তাহলে তার জন্য ‘লাকুম দ্বীনিকুম অলিয়া দ্বীন- সে যে ধর্মের প্রতি বিশ^াস রাখে সে স্বাধীনভাবে সে ধর্ম পালন করবে।’ সে ইহুদি হতে পারে, সে নাসারা হতে পারে, হতে পারে পৌত্তলিক। তাদের জন্য ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে মুসলমান তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে থাকবে। এ মুসলমানের জন্য মহান আল্লাহর বাণী এমনÑ ‘তোমরা ওদের দেব-দেবীকে গালি দিও না।’ এ মুসলমানের জন্য আল্লাহর নবী, মুসলমানের নেতা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর হাদিসের মর্মবাণী এরকমÑ ‘কোনো মুসলমান যদি তার দেশের কোনো সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালায় তবে ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে কাল কিয়ামতে নবী সা: আল্লাহর আদালতে মামলা ঠুকে দেবেন।’ ওহে দুনিয়ার মানুষ! যেই নবী সা:-এর সাফায়াত ছাড়া কাল কিয়ামতে কোনো মুসলমান বেহেশতে যেতে পারবে না সেই নবী সা: যদি হন কোনো দুর্ভাগা মুসলমানের বিরুদ্ধে প্রভু আল্লাহর দরবারে মামলাকারী তবে সে মুসলমানের পরিণতি হবে কি? লোমহর্ষক। নিশ্চিত জাহান্নাম। কাজেই কোনো আমলদার মুসলমান তার দেশীয় সংখ্যালঘু জাতি সম্প্রদায়ের ওপর কোনোরূপ অত্যাচার তো দূরের কথা তাদের মনোকষ্টেরও কারণ হতে পারে না যদি সে প্র্যাকটিসিং মুসলমান হয়ে থাকে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সংখ্যলঘুরা আমানত। আমানত রক্ষা করা মানে আমানতের সংরক্ষণ করা মুসলমানের একটা অন্যতম ধর্মীয় দায়িত্ব। কাজেই আবারো বলছি, কোনো মুসলমান তার দেশের কোনো ভিন্নধর্মীয় লোকের ওপর নিবর্তনমূলক আচারণ দেখাতে পারে না যদি সে আমলদার মুসলমান হয়। মুসলমান রাষ্ট্রটা যদি ইসলামী রাষ্ট্র হয় তবে সে ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের অন্যতম একটা দায়িত্ব হয়ে যায় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিতকরণের। ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার আইন বানিয়ে, সে আইনের প্রয়োগ করে দেশের সংখ্যালঘু জাতির এসব অধিকার সংরক্ষণ করে থাকে। কাজেই ইসলামী বিধান সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে, বিশ^ মানবতার পক্ষে। নবী হজরত মুহাম্মদ সা: বিদায় হজের ভাষণে লক্ষাধিক মুসলমানের সমাবেশে বলে গেছেনÑ ‘তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না। কেননা এটা করতে গিয়ে অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’ মুসলমান মধ্যমপন্থী জাতি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর বাণী এরকমÑ ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ এবং মধ্যমপন্থী জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই মুসলমানের জীবন চলার সংবিধান পবিত্র কুরআনের বাণী যেখানে এমন, সেই মুসলমান ধর্মীয় উগ্রবাদী হতে পারে, হবে এ কথা অমূলক। হতেই পারে না। তবে মুসলমানের নামে এখন যা কিছু এমনই ধরনের দেখা যায় তার সাথে যারা জড়িত তারা ইসলামী শিক্ষাবর্জিত, ইসলাম না জানা অজ্ঞ মুসলমান। তাদের কেউ কেউ আছেন নামকাওয়াস্তের মুসলমান। বাস্তব জীবনে এরা ইসলামী জীবনব্যবস্থা থেকে যোজন যোজন কিলোমিটার দূরে। আরেক শ্রেণীর মানুষ এমনি কাজ করে থাকেÑ এরা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মধ্যে অনুচর। এরা ইসলামকে দুনিয়াবাসীর কাছে বিতর্কিত, নিন্দিত, ঘৃণিত করে তোলার হীন ঘৃণ্য মানসিকতায় এমনটি করে থাকে। আবার একশ্রেণীর দেশীয় কপট মানুষ এমনটি করে থাকে ঘৃণ্য রাজনৈতিক স্বার্থচরিতার্থকরণের লক্ষ্যে। কাজেই বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়, ইসলাম কোনো সম্প্রদায় বা জাতির জন্য নয় বরং ইসলাম বিশ^ মানবতার শান্তির জন্য,বিশ^ মানবতার মুক্তির জন্য, বিশ^ মানবতার কল্যাণের জন্য। কাজেই ইসলামকে যারা নিছক একটা ধর্মমাত্র মনে করে এটাকে সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যায়িত করতে চান তাদের অনুরোধ করব একটা মুক্ত, স্বাধীন মন নিয়ে ইসলামকে জানুন, চিনুন বুঝুন ইসলাম আপনাকেও শান্তির অমিয় সুধাদানে ধন্য করতে পারে। আপনিও হতে পারেন ইসলামী সুমহান আদর্শের একজন শান্তির পতাকাবাহী। হতে পারেন ইহকাল,পরকাল দুই কালেরই একজন কল্যাণযাত্রী। ইসলাম তারই জন্য এসেছে ধরার বুকে। সবার তরে। আবারো বলছি, ইসলাম কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য নয়। কাজেই ইসলাম কোনো সাম্প্রদায়িক মতাদর্শও নয়। ইসলামী আদর্শ সবার জন্য,পৃথিবীর সব মানুষের জন্য।
লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫