ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

চট্টলা সংবাদ

খাল অবৈধ দখলমুক্ত করতে মেয়রের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো টাস্কফোর্স গঠন

চট্টগ্রাম নগরীর অসংখ্য খালের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে গেছে

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে না দিলে স্বাভাবিকভাবেই বৈরী আচরণ করতে শুরু করে। চট্টগ্রাম মহানগরীর খালগুলো রায় প্রশাসনের ব্যর্থতার মাশুল গুনছে এখন চট্টগ্রামের মানুষ। তাই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে হালে অস্তিত্ব হারানো খাল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বিদ্যমান খালে অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে আসছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা। গত ২৮ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম নগরীর খাল থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ল্েয চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের আদেশ হাতে পেয়েই এক সপ্তাহের মধ্যে টাস্কফোর্সের সভা আহ্বানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিদ্যমান খালগুলোর বেশির ভাগই অবৈধ দখলে চলে গেছে। একসময় এ নগরীতে ৭০টি খাল থাকলেও বর্তমানে তা ৩৮টিতে নেমে এসেছে, তা-ও আবার অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ প্রশস্ততায়। জলাবদ্ধতা নিরসনের সাথে খালগুলো অবৈধ দখল মুক্ত করা জরুরি হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট রূপ নেয়ায় এক দিকে সরকারের টনক যেমন নড়েছে, অন্য দিকে নির্বাচনী হিসাবনিকাশ সামনে রেখে নানা উদ্যোগও গ্রহণ করা হচ্ছে। খাল বেদখলমুক্ত করার উদ্যোগ এরই অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, গত সোমবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আদেশ হাতে পেয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। চিঠি পেয়েই এক সপ্তাহের মধ্যে টাস্কফোর্সের প্রথম সভা আহ্বান করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সূত্র জানায়, সভাতেই কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খাল উদ্ধারের অভিযান শুরু হবে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন নামে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেক’র অনুমোদন পায়। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের ৫ লাখ ২৮ হাজার ঘনমিটার মাটি খনন এবং ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার কাদা অপসারণ করা হবে। ওই প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি খাল অবৈধদখলদার মুক্ত করতে টাস্কফোর্স গঠনের এই আদেশ আসে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশে বলা হয়, চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রাকৃতিক খালগুলো থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদকার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হলো।
টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) মেয়রকে এবং সদস্যসচিব করা হয়েছে সিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে।
পাশাপাশি এই টাস্কফোর্সে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম মহানগর থপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পরিবেশ অধিদফতরের একজন করে প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে থাকবেন। এ ছাড়া টাস্কফোর্সে খালসংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকেও সদস্য করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশে টাস্কফোর্সের কার্যপরিধিও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
এরমধ্যে আছে নগরীর প্রাকৃতিক খালগুলো থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, খালের দুই পাশে বেদখল হওয়া সরকারি জায়গা উদ্ধার, খাল থেকে মাটি উত্তোলন, খাল খনন এবং ভরাট হওয়া খালের মাটি ও আবর্জনা সরিয়ে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ অব্যাহত রাখা। খালগুলো অবৈধ দখলকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বও দেয়া হয়েছে টাস্কফোর্সকে।
উদ্ধার হওয়া জমিতে আবার যাতে অবৈধ স্থাপনা নির্মিত না হয় সে বিষয়ে মনিটরিংয়ের দায়িত্বও পালন করবে টাস্কফোর্স। আদেশে বলা হয়েছেÑ খালগুলোর উভয় পাশে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রতি মাসে একটি সভা করে গৃহীত কার্যক্রম স্থানীয় সরকার বিভাগ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে জানাবে টাস্কফোর্স।
বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি, আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ নয়া দিগন্তকে বলেন, সমুদ্র, নদী ও পাহাড় বেষ্টিত এই চট্টগ্রাম পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যময় শহর। আমরা আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও লোভের কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যা জটিল করে তুলেছি। প্রকৃতিকে যদি তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া না হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই বৈরী আচরণ করবে। তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের জন স্নেল অ্যান্ড কোম্পানির জরিপে চট্টগ্রাম নগরে যে সত্তরটি খালের কথা উল্লেখ ছিল তার বেশির ভাগ দখল হয়ে গেছে। অনেক খালের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে গেছে। আবার বিদ্যমান খালগুলোর কোনো কোনোটির প্রশস্ততা দুই ফুটে নেমে এসেছে, যা থাকার কথা ছিল ৫০ ফুট। দখল হয়ে যাওয়া প্রতিটি খাল আরএস জরিপ অনুযায়ী খালের জায়গা খালকে ফেরত দিতে হবে।
১৯৯৫ সালের মহা পরিকল্পনায় চিহ্নিত খালগুলো উদ্ধার করে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে এবং কর্ণফুলী নদী ও সংলগ্ন যেসব খাল বেদখল হয়ে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে তা উচ্ছেদ করে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশেই লাঘব হবে বলে তিনি মনে করেন।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫